Home ফিচার জোনাক জ্বলে

জোনাক জ্বলে

মৃত্যুঞ্জয় রায়

[dropcaps round=”no”]অ[/dropcaps]ন্ধকার রাতে আকাশ দেখেছ কখনো? লক্ষ লক্ষ তারা কালো আকাশে কেমন মিট মিট করে জ্বলে তাই না? কী সুন্দর দেখায় সেই তারাভরা আকাশকে। মনে হয় ছাদে গিয়ে বসে সেসব তারাদের দেখি। এই তারাদের মতোই আমাদের পৃথিবীতেও মিট মিট করে আলো জ্বালে এক রকম পোকা আছে। তোমরা যারা গ্রামে গিয়েছ তারা নিশ্চয়ই রাতের বেলা ঝোপ-ঝাড়ে, বনে-বাদাড়ে সেসব পোকাদের আলো জ্বলতে দেখেছ। ওরাই কিন্তু জোনাক পোকা। ওদের এই আলো জ্বালানো সৌন্দর্য নিয়ে তোমরাও নিশ্চয়ই অনেক ছড়া ও কবিতা পড়েছ। মনে পড়ে সেই কাজলা দিদি কবিতার কথা? লেবুর তলে, থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে। জোনাক বা জোনাকি পোকারা কিন্তু দলে দলেই থাকে। উড়ে উড়ে এখান থেকে ওখানে যায়, মিট মিট করে আলো জ্বালায়। কিন্তু একবারও কি ভেবেছ, জোনাক পোকারা কেমন করে আলো জ্বালায়, পোকাগুলো দেখতে কেমন? আচ্ছা দিনের বেলায় কি ওদের কখনো দেখেছ? দিনে ওরা কোথায় থাকে? এসব কথা তোমাদের শোনাতে পারি। তবে তার আগে আমার এক ছোট্ট ভাইপোর কাণ্ডটা আগে তোমাদের বলি।
আমার সেই ভাইপোর নাম অর্ক। বয়স ছয়। মফস্বল কোনো এক শহরে ওরা থাকে। একদিন রাতে সে বারান্দায় বসে পড়ছিল। ঘরের পাশেই ছিল একটা করমচার ঝোপ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। করমচা ঝোপের মধ্যে তখন হঠাৎ করে যেন শত শত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো জ্বলে উঠলো।  আলোগুলো নীলচে-সবুজ রঙের। এলোমেলো করে আলোগুলো করমচা ঝোপের ভেতরে নাচানাচি করছে। অর্ক আলোগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেষে মাকে বললো ওখান থেকে একটা আলো এনে দিতে। ঘর থেকে একটা বড় পরিষ্কার প্লাস্টিকের বয়েম আনা হলো। সে বয়েম আলোগুলোর মধ্যে এদিক ওদিক করে ঘোরাতেই বয়েমের মধ্যে এক টুকরো আলো ঢুকে গেল। বয়েমের মুখ বন্ধ করে অর্ককে দেয়া হলো। অর্ক বয়েম নিয়ে পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দিলো। বয়েমের মধ্যেও কী সুন্দর মিট মিট করে আলো জ্বলছে,  আলোটা এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। ভারী মজার আলো তো! অর্ক খানিকক্ষণ ওটা নিয়ে খেলা করে ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল হতে না হকেই অর্ক বয়েমের দিকে তাকিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো, ‘আমার আলো কই?  বয়েমের মধ্যে পোকা কেন?’ ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে ওই পোকাটাই কাল সারা রাত ধরে আলো জ্বেলেছিল। ও সেটা বিশ্বাসই করলো না, বললো, ‘আমাকে গাধা পেয়েছ? পোকারা আবার আলো জ্বালে নাকি?’ কী করে সেটা প্রমাণ করব? কী করলে অর্ক সেটা বিশ্বাস করবে? শেষে মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, বললাম, ‘ঠিক আছে। তোমার বিশ্বাস না হলে এই বয়েমটা এভাবেই ওখানে রেখে দাও। দেখবে রাতে ওর ভেতরে আলো জ্বলছে।’ কিন্তু ওতেও স্বস্তি মিলল না। অর্ক একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগল, ‘এখন কেন জ্বলছে না। এখনই ওটা জ্বালিয়ে দাও। আমি এখন আলো দেখব।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ওর সেসব প্রশ্নের উত্তর ঘাঁটতেই আবিষ্কার করলাম জোনাক পোকার আলো জ্বালানোর রহস্য।

জোনাকি কি পোকা?
জোনাকি এক ধরনের পোকা। এসব পোকা বিটিল শ্রেণির। ইংরেজিতে ওদের লাইটিং বাগ বা ফায়ার ফ্লাই বলে। বিটিল শ্রেণীর পোকাদেরও অনেক ভাগ আছে। শুধুমাত্র ল্যামপাইরিডি পরিবারের বিটিল পোকাদেরই জোনাকি পোকা বলা হয়। যদিও ওদের নামে ফ্লাই বলা হয়। ফ্লাই মানে মাছি। তবে ওরা কেউই আসলে মাছি নয়, বিটিল। ছোট্ট কালচে বাদামি রঙের পোকা, একটু লম্বাটে গড়নের। পোকার পেটের পেছনে থাকে সেই আলো জ্বলা অংশ। তোমরা জোনাক পোকার ছবিটা দেখলেই ওকে চিনতে পারবে। আমাদের দেশ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া-আমেরিকা পর্যন্ত অনেক দেশেই জোনাকি পোকা আছে। পৃথিবীতে প্রায় বিশ হাজার প্রজাতির জোনাকি পোকা আছে। প্রত্যেক প্রজাতির জোনাকি পোকার আলো কিন্তু এক রকম নয়, আলাদা। কোন কোন জোনাকি পোকার আলোর রঙ সবুজ, কারো আলো হলুদ আবার কারো বা কমলা। শুধু রঙই আলাদা নয়, ওদের আলোক সংকেতও ভিন্ন ভিন্ন।

জোনাকির আলো কেন জ্বলে?
জোনাকিরা অবিরাম আলো জ্বালায় না। ওদের আলো জ্বলে আর নেভে। কিন্তু কেন ওরা আলো জ্বালে? একটু গরম ও বর্ষা পড়তেই পড়তেই জোনাকি পোকারা ওদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। জোনাকি পোকাদের মধ্যেও পুরুষ আর মেয়ে জোনাকি পোকা আছে। পুরুষ পোকারা মেয়ে পোকার সাথে বন্ধুত্ব বা মিলনের আশায় আলো জ্বেলে ঝোপ-ঝাড়ে উড়তে থাকে। আর মেয়ে পোকারা ঝোপ-ঝাড়ের নিচে, ঘাসের পরে, মাটিতে বসে পুরুষ পোকাদের জ্বালানো আলো দেখার অপেক্ষায় বসে থাকে। পুরুষ পোকারা আলো জ্বেলে ঘুরতে থাকে। এসব আলো দেখে মেয়ে পোকা তার পুরুষ বন্ধুকে বেছে নেয়। কোনো পুরুষ পোকাকে পছন্দ হলে মেয়ে জোনাকিও একই রকম আলো জ্বালতে শুরু করে। এই আলো দেখে তারা একে অপরের কাছে আসে ও মিলনে যায়। অনেক প্রজাতির জোনাকি আছে। কিন্তু এক জাতের জোনাকি পোকার সাথে অন্য জোনাকি পোকার আলোক সংকেত হুবহু মেলে না। তাই নির্দিষ্ট প্রজাতির জোনাকি পোকারাই সেসব আলোকসংকেত চিনে তার স্ব-জাতির পুরুষ পোকাদের সাথে মিলতে পারে। সংকেত ঠিক মতো না চিনতে পারলেই বিপদ। এক প্রজাতির মেয়ে পোকা কখনো অন্য প্রজাতির পুরুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না, ওটা ওদের সমাজে অন্যায়। যদি নেহাত এমন কোনো দুর্ঘটনা কখনো ঘটে যায়, তাহলে কাছে আসার পর মেয়েটা পুরুষ জোনাকিকে বন্ধুত্বের ফাঁদে ফেলে মেরে ফেলে, ওর সাথে মিলনে যায় না। আসলে জোনাকি পোকারা আলো জ্বেলে এক অপরের সাথে সংকেত আদান প্রদানের মাধ্যমে কথা বলে, ভাব বিনিময় করে। আলো না জ্বললে এটা কখনো সম্ভব হতো না। ফলে জোনাকিদেরও আর কোন বাচ্চা হতো না। ফলে পৃথিবী থেকে জোনাকিরা হারিয়ে যেত।

আলো জ্বালারও কিন্তু একটা রহস্য আছে। ওদের পেছনে বা লেজে দুটো রাসায়নিক পদার্থ থাকে- লুসিফেরাজ ও লুসিফেরিন। লুসিফেরাজ একটি এনজাইম যা আলো ছড়ায়। আর লুসিফেরিন তাপ প্রতিরোধী যা আলোকে ঠাণ্ডা রাখে। জোনাকি পোকারা তার শক্তির শতভাগই আলোতে পরিণত করতে পারে। অন্যদিকে একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতি তার শক্তির মাত্র দশ ভাগ আলোতে পরিণত করতে পারে, বাকি নব্বই ভাগ শক্তিই তাপে পরিণত হয়। সে জন্য জোনাকির আলোতে কোন তাপ হয় না।

জোনাকি কী খায়?
জোনাকি পোকার বাচ্চারা মাটিতে, গাছের বাকলের নিচে ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থাকে। তারা সেখান থেকে কেঁচো, শামুকের বাচ্চা ও পচা জায়গায় থাকা অন্যান্য পোকার বাচ্চা খায়। এমনকি পচা প্রাণী ও আবর্জনাও খায়। বাচ্চারা দেখতে অনেকটা শুকনো পাতার মতো, তবে খুবই ছোট। বাচ্চাদের মুখে কাঁচির মত ধারাল এক রকমের অঙ্গ আছে। সেটা দিয়েই ওরা শত্রুকে ঘায়েল করে। শত্রুর আকার বড় হলে কয়েকজন মিলে তাকে আক্রমণ করে। মুখের ওই ধারালো অঙ্গ শিকারের দেহে ঢুকানোর সাথে সাথে ওরা এক ধরনের বিষ ছেড়ে দেয় যার প্রভাবে শিকার অবশ হয়ে যায়। এরপর তারা সবাই মিলে সেটা খায়। বড় হওয়ার পর বাচ্চাদের চেহারা বদলে যায়। তখন তারা আলো জ্বালতে শুরু করে। তবে কোন কোন প্রজাতির জোনাকি পোকার বাচ্চা এমনকি ডিম থেকেও আলো বের হয়। জোনাকিরা বড় হলে তারা মাত্র কয়েক মাস বাঁচে। তাই তখনও তাদের খেতে হয়। তখন আর তারা পচা আবর্জনা ও মরা প্রাণী খায় না। বড় হওয়ার পর তারা গাছ থেকে গাছে, ফুল থেকে ফুলে ঘুরে বেড়ায় আর পরাগরেণু ও মধু খায়। কখনো কখনো মেয়ে জোনাকিরা ক্ষেপে গেলে বা দুষ্টুমি করে অন্য প্রজাতির জোনাকি পোকার পুরুষদের ভুলিয়ে ভালিয়ে কাছে ডেকে নিয়ে আসে ও তাদের কামড়ে খায়। বাচ্চারা প্রায় এক বছর বাঁচে। কিন্তু বড়রা বাঁচে অল্পদিন বা কয়েক মাস। বড় মেয়ে জোনাকিরা মিলিত হওয়ার পর ডিম পাড়ার পরই মরে যায়, পুরুষরা মরে যায় মিলনের পরই।

জোনাকি কোথায় থাকে?
সবসময় জোনকি দেখতে পাও কি? ওরা কোথায় যায়? কোথায় থাকে? জোনাকিরা সাধারণত জোলো জায়গা পছন্দ করে। তাই জলের ধারে ওরা ওদের বাড়ি বানায়। এর মানে এই নয় যে ওদের খুব জলের দরকার। পুকুর, ডোবা, নালা, খাল, বিল, নদী- একটা কিছু হলেই হলো। ওরা তার পাড় ধরে গজিয়ে ওঠা ঘাস ও ঝোপ-ঝাড়ে বাসা বাঁধে। লম্বা ঘাস ওদের পছন্দ। সেসব ঘাস বা ঝোপের গাছেই ওরা থাকে, গাছই ওদের ঘরবাড়ি। তবে ওদের সবসময় গাছে দেখা যায় না। দিনের বেলায় ওরা লুকিয়ে থাকে গাছের বাকলের তলে, গাছের গর্তে বা ফাটলে, শুকনো পাতার নিচে, ঘাসে। রাত  হলেই বেরিয়ে আসে। শীতেও ওদের তেমন দেখা যায় না। ওরা স্যাঁতসেঁতে জায়গা পছন্দ করে। কোন কোন প্রজাতির জোনাকি পোকার বাচ্চারা জলে থাকে এবং সেখানে মাছের মতোই তারা প্রায় বছরখানেক বেঁচে থাকে। শীতপ্রধান এলাকায় ওদের কম দেখা যায়। এন্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর সব মহাদেশেই জোনাকি পোকা দেখা যায়।

জোনাকির শত্রু কে?
কিন্তু জোনাকিদেরও শত্রু আছে। তারা ওদের শিকার করে খায়। এ জন্য জোনাকিরাও কম চালাকি জানে না। তাদের কেউ শিকার করতে এলে তারা এক ফোঁটা রক্ত ছেড়ে দেয়। সেই রক্তবিন্দু যেমন তিতে তেমনি বিষাক্ত। তাই ওদের আর কেউ শিকার করতে আগ্রহ দেখায় না। এমনকি টিকটিকি, সাপও ওদের শিকার করতে সাহস পায় না। তাই বলে ভেবো না যে ওরা দুর্বোধ্য, কেউই ওদের বধ করতে পারে না। বাদুড়ের সাথে ওরা পেরে ওঠে না। রাতে বাদুড় বেশ ভালই দেখতে পায়। তার ওপর আবার জোনাকিরা যখন আলো জ্বেলে চলাফেরা করে তখন বাদুড় ওদের শিকার করে খায়।

জোনাকিরা কমে যাচ্ছে কি?
এখন গ্রামে গেলেও আর আগের মত জোনাকির আলো চোখে পড়ে না, ওদের আর আগের মত দেখা যায় না। জোনাকিদের এই কমে বা হারিয়ে যাওয়ার আসলে কারণ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ধীরে ধীরে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়াই এর মূল কারণ। এ ছাড়া আলোক দূষণকেও তারা দায়ী করেছেন। তাই জোনাকিদের আবার ফিরিয়ে আনতে ওদের বসবাসের উপযোগী বাসস্থান তৈরি বা ঝোপ-ঝাড় ও জলাভূমি রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। তাহলে আবার আমাদের বাড়ির আশপাশে লেবু-করমচার ঝোপগুলো সন্ধ্যের পর হাজার জোনাকির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে।

SHARE

Leave a Reply