Home গল্প রু মা নি য়া র রূ প ক থা সততা...

রু মা নি য়া র রূ প ক থা সততা ও ধূর্ততার লড়াই

রূপান্তর : হাসান হাফিজ

[dropcaps round=”no”]এক[/dropcaps] যে ছিলেন রাজা। তার দেশ ছোট হলে কী হবে। ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য খুব বিখ্যাত। অন্যান্য দেশ থেকে নিয়মিত ব্যবসায়ীরা আসেন। পণ্য আমদানি রফতানি করেন। এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে অনেক অনেক লাভ। সে জন্য ভিনদেশী ব্যবসায়ীদর ভিড়ভাট্টা এ দেশে লেগেই থাকে।
একবার হয়েছে কী, লোভী এক বণিক এসেছেন এই দেশে। আসবার দু-একদিন পরই বিশ্রী ঘটনার শিকার হলেন তিনি। ও এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড। সেই কাণ্ড নিয়ে তুলকালাম। পথ চলার সময় ধূর্ত লোকটা কোনও কারণে অসাবধান ছিল। এক ফাঁকে ঘটলো সেই দুর্ঘটনা। হারিয়ে গেল তার টাকার ব্যাগ। ব্যবসায়ী যখন সেটা টের পেলেন, হায় রে হায়! তখন সে কী আর্তচিৎকার তার! চেঁচামেচি, কান্নাকাটিতে পাড়া মাথায় তুলে ফেললেন তিনি। ওই ব্যাগে ছিল অনেক টাকা-পয়সা। সঙ্গে এক হাজার সোনার মোহর। সবই লোপাট। চোখের পলকে কিভাবে হাওয়া গেল! আস্ত একটা জলজ্যান্ত ব্যাগ। আহ হা রে! টাকা পয়সা গেছে যাক। সে না হয় ধীরে সুস্থে রোজগার করে নেয়া যাবে। কিন্তু এতোগুলো সোনার মোহর? সে সব কোথায় মিলবে? যতই তিনি এ কথা ভাবেন, ততই তার মাথা গরম হয়ে ওঠে। কোনোমতেই তিনি নিজেকে সামলাতে পারছেন না।
রাস্তার মোড়ে যত লোকের সঙ্গে দেখা হলো, হড়বড় করে সবাইকে ব্যাগ হারানোর কথা জানালেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ মুখ ফুলে গেছে। এতগুলো সোনার মোহর হারানোর শোক তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্য! কেউই কোন হদিস দিতে পারে না তার ব্যাগের।
হারানো মোহর ফিরে পাওয়ার জন্য একটা কৌশল বের করলেন তিনি। লোভনীয় একটা পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। ব্যাগটা যে খুঁজে বের করে দিতে পারবে, সে পাবে এক শ’ সোনার মোহর।
এক চাষি ব্যাগটা কুড়িয়ে পেয়েছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটবার সময় তার পায়ে ঠেকেছিল। সে সরল সোজা মানুষ। লোভী না। তার সততার জুড়ি নেই এ তল্লাটে। কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই তার মনের মধ্যে। ব্যাগ পেয়ে সে দেরি করলো না একটুও। ঝটপট ছুটে গেল ভিনদেশী সেই বণিকের কাছে। গিয়ে জানালো বৃত্তান্ত। নিজের বাড়ির কাছে মাছবাজারের পেছনে যে কেমন করে ব্যাগ পাওয়া গেল তার সবিস্তার বৃত্তান্ত।
বণিক লোকটি খুবই ধূর্ত। দুনিয়ার কাউকেই তিনি বিশ্বাস করেন না। এমনকি নিজের আত্মীয়স্বজকেও না। প্রথমটায় তিনি চাষিকে বিশ্বাস করছিলেন না যথারীতি। ব্যাগ হাতে পেয়ে তর সয় না তার। ঝটিতি সে গুনে গেঁথে দেখলো ভেতরে সব ঠিকঠাক আছে কি না। আশ্চর্য ব্যাপার! কোনো হেরফের নেই। সে যেভাবে রেখেছিল টাকা পয়সা, সোনার মোহর সব ঠিক আছে। কোনো নড়চড় হয়নি। একচুলও না। অবাক ব্যাপার। সে নিজে হলে ফেরত দিতো না। লোকটা নিশ্চয়ই অত্যন্ত বোকা। না হলে সে এমন উল্টোপাল্টা কাজ করতে যাবে কেন? আনমনা হয়ে এসব কথা ভাবছিলেন তিনি। ব্যাগ ফিরে পেয়ে তিনি মহা আনন্দিত। কিন্তু একটুক্ষণ পর তিনি বিষণœ হয়ে পড়লেন। কারণ প্রতিশ্র“তি মোতাবেক এক শ’ মোহর তাকে পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দিতে হবে। সে রকমই কথা। বিরাট লোকসানের ব্যাপার। তাই তো। অহেতুক এই গচ্চা দেয়ার ব্যাপারটি মেনে নেয়া যায় না। সেটা দারুণ বোকামি হবে। কী করা যায়, কী করা যায়! ভাবতে ভাবতে তার মাথা গরম হয়ে ওঠে।
হঠাৎই একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়। তিনি ঠিক করেন, এই বেকুব চাষিটাকে কোনো মোহর টোহর দেয়া যাবে না। ভুলিয়ে ভালিয়ে ব্যাটাকে বিদায় করতে হবে কোনোমতে।
প্ল্যান মোতাবেক তিনি গলাটাকে সাধ্যমত মোলায়েম করেন। অভিনয় ছাড়া এই মামলা জেতা যাবে না। বিদেশ বিভুঁই বলে কথা। একটু অসাবধান হলেই মহা বিপদ! কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে না। বরং ফাঁসিয়ে দেবে। মিষ্টি হাসি হেসে চাষিকে তিনি বলেন,
Ñ ভাই চাষি, তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই। কী উপকার যে তুমি করেছো আমার। তার কোনো তুলনা নেই। এমন উপকার একই মায়ের পেটের আপন ভাইও আজকাল করে না। এই ঋণ কোনোভাবেই শোধ করতে পারবো না আমি। তোমাকে কী পুরস্কার দেবো আর। ব্যাগে আমি পেয়েছি নয় শ’ সোনার মোহর। ছিল মোট এক হাজার। এইমাত্র গুনেগেঁথে দেখলাম। অর্থাৎ তুমি তোমার প্রাপ্য একশ সোনার মোহর আগেভাগেই নিয়ে নিয়েছো। এখন তুমি মানে মানে বাড়ি ফিরে যেতে পারো।
চাষি এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করে। সে ভাবতেই পারেনি এ ধরনের কথা লোকটা বলতে পারে। চিৎকার করে চাষি জানায়,
Ñ এটা তুমি কী বলছো? আমি এই ব্যাগ খুলে পর্যন্ত দেখিনি। আমি সে করম লোকই না। সুতরাং এখান থেকে মোহর নেয়ার কোনোও প্রশ্নই ওঠে না। তুমি যা বলছো, ভেবেচিন্তে বলছো তো?
চাষির প্রতিবাদ গায়ে মাখেন না লোভী বণিক। আপন মনে তিনি বলে যান,
Ñ আশা করি, পুরস্কারের এই একশ সোনার মোহর তোমার অনেক অনেক কাজে লাগবে। নিশ্চয়ই তোমার ভাগ্য বদলে দেবে। আমি তোমার শুভ কামনা করি। তুমি খুবই ভালো মানুষ। ভাই, তোমাকে আবারও অজস্র ধন্যবাদ জানাই। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। একইসঙ্গে বিদায়ও জানাতে চাই তোমাকে।
সরলমনা চাষি তো হতবাক। ঘটনার আকস্মিকতায় তার বোবা বনে যাওয়ার জোগাড়। কী বলবে, সে বুঝে উঠতে পারছে না। এ কেমন ধারা লোকের পাল্লায় সে পড়েছে, তাই ভাবছে গালে হাত দিয়ে। পুরস্কার কপালে জুটলো না। ভাগ্যে না থাকলে নেই। এ নিয়ে তার মনে দুঃখ নেই কোনো। আফসোস হচ্ছে এই যে, মোহর না নিয়েও বিনা অনুমতিতে সেটা নিয়ে ফেলার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হলো তাকে। এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। সে ঠিক করলো, রাজার কাছে এই অন্যায়ের বিচার চাইবে। ন্যায়বিচারক হিসেবে এই রাজার সুনাম রয়েছে। তিনি নিশ্চয়ই চাষিকে বঞ্চিত করবেন না।
যেই ভাবা সেই কাজ। সে ছুটে গেল রাজপ্রাসাদে। মহারাজার কাছে সবিনয়ে পুরো ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললো। রাজা বুদ্ধিমান লোক। মানুষ চিনতে তিনি ভুল করেন না কখনও। সে অভিজ্ঞতা চটজলদি কাজে লাগালেন। তিনি এক মুহূর্তের মধ্যে বুঝে নিলেন যে এই চাষি লোকটা সত্যি কথা বলছে। কাউকে ঠকানো ওর মতে লোকের পক্ষে সম্ভব নয়।
মহারাজ বণিককে ডেকে পাঠালেন লোকমারফত। এও বলে পাঠালেন যে বণিক যেন তার সোনার মোহরওয়ালা ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
খবর পেয়ে বণিক এলেন দরবারে। বণিক তার পক্ষ থেকে রাজাকে জানালেন কী কী ঘটেছে। চাষিও তার বক্তব্য জানালো রাজাকে। রাজা মন দিয়ে দু’জনের কথাই শুনলেন। জটিল সমস্যা। একজন যা বলছে, অন্যজন বলছে তার বিপরীত কথা। এবার বিচার করবার পালা।
গম্ভীর হয়ে রাজা বলেন বণিককে,
Ñ শোনো ভিনদেশী। তোমার যে ব্যাগ হারিয়ে গিয়েছিল, তাতে এক হাজার সোনার মোহর ছিল। তাই তো?
বণিক মাথা চুলকে বলেন,
Ñ আপনি ঠিক কথা বলেছেন মহারাজ।
রাজা কী যেন ভাবেন। চিন্তা ভাবনা করার পর বলেন,
Ñ তুমি হয়তো সত্যি কথাই বলেছো। খাঁটি সত্যক খুঁজে বের করা আসলেই কঠিন একটা কাজ। কারও প্রতি কোনো অবিচার করতে চাই না আমি। সেটা আমার স্বভাবেই নেই। দেখি তো ব্যাগটা।
ব্যাগটা মামুলি ধরনের। অন্য পাঁচ দশটা চামড়ার ব্যাগ যে রকম হয় ঠিক তেমনই। আলাদা কোনও বিশেষত্ব নেই। একই ধরনের আর একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে রাজা বলেন,
Ñ এটা যে তোমারই ব্যাগ, তার প্রমাণ কী? তুমি বলেছো, তোমার ব্যাগে এক হাজার সোনার মোহর ছিল। দুটো ব্যাগের মধ্যে থেকে তোমারটা কি তুমি বেছে নিতে পারবে?
বণিক পড়লেন মহা ফাঁপরে। তিনি তোতলাতে থাকেন। এ ধরনের বাজে অবস্থায় পড়তে হবে, তিনি ঘুণাক্ষরেও এ কথা ভাবেননি। তোতলাতে তোতলাতে কোনো কথা জোগায় না তার মুখে।
রাজার মুখে মুচকি হাসি। তিনি বললেন,
Ñ আমি নিশ্চিত যে, এটা তোমার ব্যাগ নয়। কারণ তুমি অকাট্য কোনো প্রমাণ দিতে পারছো না। আমার পরামর্শ হলো, তুমি রাস্তাঘাটে তোমার ব্যাগ খোঁজার কাজে লেগে পড়ো আবার।
এরপর তিনি তাকালেন চাষির দিকে। হাসতে হাসতে বললেন,
Ñ এই ব্যাগে যে নয় শ’ সোনার মোহর আছে, আমি তার হেফাজতের দায়িত্ব দিচ্ছি তোমাকে। এর সত্যিকারের মালিক যতদিন না আসবে, ততদিন পর্যন্ত তুমি এর দেখভাল করবে। যতœ করে রাখবে। যদি তিন মাসের মধ্যে কোনো দাবিদার না পাওয়া যায়, তাহলে এই ব্যাগ তোমার হয়ে যাবে।
চিরকালের জন্য। সেটা হবে তোমার সততার পুরস্কার।
বণিক স্তম্ভিত। রাজার রায় শুনে তার অজ্ঞান হয়ে পড়ার দশা। তার কোনো কথা রইল না বলার।
রাজার আদেশ মানতেই হবে। অমান্য করার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই। সেই চেষ্টা করতে গেলে মহাবিপদে পড়তে হবে। সেটা বণিক এখন টের পাচ্ছেন হাড়ে হাড়ে। চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই আর। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। অতি লোভে হারাতে হয়েছে সবই।
চাষি ও বণিক এরপর রাজদরবার ত্যাগ করেন। যে যার ঠিকানায় রওনা হন।
একজন মহা খুশি। অপর জনের মুখচোখ ভীষণ ভীষণ কালো। তাকানো যায় না এমনই অবস্থা।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to jahid hasan Cancel reply