Home উপন্যাস দীনেশের দীন বদল

দীনেশের দীন বদল

আহমদ বাসির

দ্বিতীয় কিস্তি

[dropcaps round=”no”]বি[/dropcaps]কেলে অনিমেষের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাঈনুল ইসলাম একজন জুনিয়র কর্মকর্তা ও কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে লাশ হস্তান্তর করতে আসেন। পুলিশের আগমনের কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত লোকজনের মধ্যে নতুন গুঞ্জন শুরু হয়। পুলিশ নাকি এরই মধ্যে অনিমেষের খুনিদের শনাক্ত করতে পেরেছে। অনিমেষের পরিবার যদি মামলা করেন, তাহলে অনিমেষের খুনিদের গ্রেফতার করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কে বা কারা অনিমেষকে খুন করেছে এ ব্যাপারে পুলিশ ছাড়া কারো কাছেই কোন তথ্য নেই। পুলিশের সঙ্গে কয়েকজন সাংবাদিকও এসেছেন। তারাও এ ব্যাপারে উপস্থিত লোকজনকে কোন তথ্য দিতে পারেননি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাকি সাংবাদিকদের বলেছেন, এ ব্যাপারে এখনই মুখ খোলা যাবে না। তাহলে তদন্ত কাজ ব্যাহত হতে পারে।
অনিমেষের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে রাজি হয় না। অনিমেষের মা পাগলিনীর মতো রোদন করেই চলেছেন। ‘আমার অনিমেষ’, ‘আমার অনিমেষ’ ছাড়া তার মুখে আর কোন কথাই সরতে চায় না। মাঝে মাঝে ‘হায় ভগবান এ কী হলো’ বলে প্রবল চিৎকার করে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অনিমেষের স্ত্রী, দীনেশের মা কঙ্কনা দাস ছোট মেয়েটাকে কোলে চেপে ধরে নাকিসুরে রোদন করছে ‘ও আমার, এ কী হলো গো’। দীনেশ উদভ্রান্তের মতো বসে আছে। দীনেশকে ঘিরে বসে আছে এ পাড়ার সমবয়সী কয়েকটি ছেলে। সঙ্গে আছে দীনেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবীর ও আসল। কারো মুখে কোন কথা নেই।
সন্ধ্যা লগ্নে অনিমেষের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় শ্মশানে। দীনেশের সহপাঠীদের অধিকাংশই মুসলমান। তারাও সঙ্গে সঙ্গে যায়। তবে শ্মশানে গিয়ে তারা একটু দূরে বসে থাকে। গোটা গ্রামে হিন্দু পরিবার মাত্র কয়েকটি। এদের মধ্যে দীনেশের নিকটাত্মীয় কেউ নেই। দীনেশের বাবা অনিমেষ ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। অনিমেষের একজন কাকা ছিলেন, যিনি বহু আগেই ভারতে পাড়ি দিয়েছেন। অনিমেষদেরও তিনি ভারতে চলে যেতে বলেছেন। কিন্তু অনিমেষ রাজি হননি। জন্মভূমির মায়া কাটিয়ে, সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে ভারতে যেতে তার মন সায় দেয়নি। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এক অন্যরকম আত্মীয়তার বন্ধন ছিল অনিমেষের। মুসলমান পরিবারগুলোতেও অনিমেষের যাতায়াত ছিল অবাধ, সরলপ্রাণ, পরোপকারী মানুষ হিসেবে অনিমেষকে সকলেই পছন্দ করতো। দীনেশও অনেকটা তার বাবার মতোই হয়েছে।
অনিমেষের লাশ দাহ করতে করতে রাত অনেক হয়ে গেছে। দীনেশকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। উদভ্রান্তের মতো বড়দের পরামর্শ মোতাবেক সবই করেছে দীনেশ। শ্মশান থেকে ফেরার পথে দীনেশের পা আর চলতে চায় না। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারিয়ে পথের ওপর লুটিয়ে পড়ে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবির ও আসল দীনেশকে কোলে তুলে নেয়। দীনেশের শরীরের অর্ধেক অংশ থাকে আবিরের হাতে বাকি অর্ধেক আসলের হাতে। আবির ও আসল দীনেশকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তার জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। দীনেশের জ্ঞান ফিরলে আবির ও আসল বাড়ি ফেরার জন্য দীনেশের কাছ থেকে বিদায় নেয়। যাওয়ার সময় দীনেশকে ওরা সান্ত্বনা দেয়। আবির খুব আন্তরিকতার সঙ্গে দীনেশকে বলে, দীনেশ, তুই একদম ভেঙে পড়বি না, তোকে শক্ত হতে হবে। তোর মা, তোর ঠাকুর মা, তোর ছোট বোনটার দিকে তাকিয়ে তোকে শক্ত হতে হবে। তোর বাবাকে তুই আর ফিরে পাবি না। এটাই সত্য। তোকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে দীনেশ। তুই ভেঙে পড়লে সব তছনছ হয়ে যাবে।
আবিরের দরদমাখা কথাগুলো শুনতে শুনতে দীনেশের মনে আবেগের প্লাবন সৃষ্টি হয়। সেই প্লাবনকে সে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে দীনেশ। আসল দীনেশকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে চায়, দীনেশ, তুই শান্ত হ, শক্ত হ। অনিমেষ কাকার এমন মৃত্যুতে আমরাও তোর মতোই কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই দীনেশ।
আসল হাত দিয়ে দীনেশের চোখের পানি মুখে দেয়। দীনেশও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। তবে আসলের কথা শুনতে শুনতে আবির কিছুটা তপ্ত হয়ে ওঠে। একটু ফাঁক পেয়ে আবির ফোঁস করে বলে ওঠে।
Ñ আসল, তোমার কথা ঠিক না, কে বলেছে যে, আমাদের কিছুই করার নেই। অবশ্যই আমাদের অনেক কিছু করার আছে। দীনেশের পুরো পরিবারের দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে।
অনিমেষ কাকার খুনিদের খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এসব করতে হলে দীনেশকে শক্ত হতে হবে।
আবিরের কথা শুনে আসলের বোধ-বুদ্ধি তৈরি হয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আসল বলে ওঠে,
Ñ তুই ঠিকই বলেছিস আবির। আমার শুধু নামই আসল, কিন্তু আসল কথাটা আমার মাথায় আসে না সহজে। এখন তুই-ই বল, আমরা তো ছোট মানুষ, আমরা কিভাবে কী করব।
Ñ আমি বাড়ি ফিরে আব্বুর সঙ্গে কথা বলব তুই বাড়ি গিয়ে চাচাজানের সঙ্গে কথা বল। আমরা কিছু করতে না পারলেও আমাদের মুরব্বিরা পারবেন। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করব। অনিমেষ কাকার মতো মানুষ কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। তাকে কোন অপরাধের জন্য খুন হতে হয়নি। তার খুন হওয়াটা পুরোটাই রহস্যময়। খুনিদের উদ্দেশ্য কী, আল্লাহই জানেন। চেষ্টা করলে আমরাও জানতে পারব। আমাদের চুপ করে থাকলে চলবে না। একনাগাড়ে কথা বলতে থাকে আবির। শেষের দিকে তার কণ্ঠস্বর দৃঢ় হয়ে ওঠে। আসল আবিরের কথায় একমত হয়। দু’জনই কাল সকালে দেখা হবে বলে দীনেশের কাছ থেকে বিদায় নেয়।

তিন.
আসরের নামাজ আদায় করে মাওলানা হাসান সাহেব মসজিদে বসে আছেন। নামাজ শেষ করে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় মসজিদেই বসে আছে আবির ও আসল। মাওলানা হাসান ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন জায়নামাজে। তার ধ্যান ভাঙাতে কারোই ইচ্ছে করে না। আবির ও আসল অনুচ্চস্বরে পরস্পর কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়, মাওলানা সাহেবের ধ্যান ভাঙাতে হবে। তার সঙ্গে এ মুহূর্তে কথা বলা জরুরি। মসজিদে আরও ক’জন মানুষ এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নামাজ আদায় করছেন। আবির মাওলানা সাহেবের নিকটবর্তী হয়ে নিচু স্বরে সালাম দিয়ে তার সঙ্গে কিছু কথা বলার অনুমতি চায়। মাওলানা সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন আবির ও আসলকে। ইশারায় ওদের বসতে বলে নিজেও ঘুরে বসেন। আবিরই কথা শুরু করে।
– হুজুর, আমরা আপনার সঙ্গে অনিমেষ কাকার বিষয়ে কথা বলতে এসেছি। মৃদু হেসে মাওলানা হাসান জানতে চান-
–কী কথা বলতে চাও অনিমেষকে নিয়ে। এ বিষয়ে তো তোমাদেরকেও আমার কিছু বলার আছে। আমি শুধু ভাবছি, কথাটা আমি কিভাবে প্রকাশ করব।
কথার মাঝখানে একটু বিরতি দিয়ে আবির ও আসলের দিকে সরাসরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন,
– আচ্ছা ঠিক আছে, আমার কথা না হয় পরেই বলা যাবে। আগে তোমাদের কথাই বল।
কথা শুরু করে আবির,
– হুজুর, অনিমেষ কাকার পরিবারের এখন কী হবে। ওদের তো আয়ের কোন উৎস নেই। অনিমেষ কাকার আয় দিয়ে ওদের সংসার চলত। এখন ওরা অসহায়। ওদের ব্যাপারে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।
মাওলানা সাহেব মাথা ঝাঁকিয়ে আবিরের কথায় সায় দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
– তুমি কি তোমার আব্বুর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছ?
– জি বলেছি। আসলও ওর আব্বুর সঙ্গে কথা বলেছে। দু’জনই বলেছেন, ব্যাপারটা নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে। ওনারাও আপনার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করবেন।
-খুবই ভালো কথা। এখন তোমরাই বল এ ব্যাপারে কী করা যায়। তোমরা ছাড়া কেউই আমার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আসেনি। আজ ক’দিন ধরে আমিও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। মাওলানা সাহেবের কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ে আসল,
– হুজুর, আপনি বলছিলেন, আপনারও কী যেন বলার আছে। কথাগুলো কি আমাদের বলা যায়। আমরা তো বুঝতেই পারছি না কেন অনিমেষ কাকাকে খুন করা হলো।
– আমার মাথায়ও কিছু ঢুকছে না। অনিমেষ আমার সমবয়সী। আমার সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা সেই ছোটবেলা থেকে। সমবয়সী হলেও সে আমাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। যেকোন ব্যাপারে আমার সঙ্গে পরামর্শ করতো। আমি সেই ছোটবেলা থেকেই মাদরাসায় পড়তাম। সেই সময় থেকেই দেখতাম, অনিমেষ কখনো আমাকে নাম ধরে ডাকে না। হুজুর, হুজুর বলেই সে আমাকে সম্বোধন করত। ও আমাকে এতটাই সম্মান করত যে, ওর বিয়েতেও আমাকে দাওয়াত করেছিল। ওর আবদার রক্ষা করতে গিয়ে ওর বিয়ের সেই ছোট্ট অনুষ্ঠানটিতেও আমার থাকতে হয়েছিল। আমি ওর কোনো শত্র“ দেখিনি কোনদিন। কারা, কেন অনিমেষকে খুন করেছে? এ সমীকরণ আমি কোনভাবেই মেলাতে পারছি না। তা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার আমাকে খুব বেশি কষ্ট দিচ্ছে…
– হুজুর, ব্যাপারটা কি আমাদের কাছে খুলে বলা যায় না?
– তোমাদের কাছে বলতে আমার কোনই আপত্তি নেই। কিন্তু অনিমেষের খুনের রহস্যটা জানার আগে তোমাদের কাছে ব্যাপারটি প্রকাশ করতে আমার একটু দ্বিধা হচ্ছে। তোমরা যদি আমাকে কথাটি আপাতত গোপন রাখার প্রতিশ্র“তি দাও, তাহলে ব্যাপারটি তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করে আমিও কিছুটা হালকা হতে পারি।
কথা বলতে বলতে মাওলানা হাসান মসজিদের ভেতরটা একবার দেখে নেন। আবির, আসল আর তিনি নিজে ছাড়া এ মুহূর্তে মসজিদে আর কোন মানুষ নেই। মাওলানা সাহেবের দৃষ্টি অনুসরণ করে আবির ও আসলের চোখও মসজিদের ভেতরটা একবার দেখে নেয়। জামায়াতে শরিক হতে পারেননি এমন দু’জন মুসল্লি মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন। আবির কোন প্রকার দ্বিধা না করে বলে ওঠে,
-হুজুর, আপনি জানেন, আমরা আপনার অবাধ্য নই। আমরা দু’জনই আপনার নিকট কুরআন পড়তে শিখেছি। আমরা আপনাকে প্রতিশ্র“তি দিতে পারি। আপনি যেভাবে বলবেন, ঠিক সেভাবেই হবে। কথা শেষ করেই আসলের দিকে তাকায় আবির। আসলেরও একই কথা।
– হুজুর, আপনি আমাদের বিশ্বাস করতে পারেন।
মাওলানা হাসান কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েন। তার সামনে বসে থাকা এই কিশোর ছেলে দু’টির নাম রেখেছেন তিনি নিজেই। উভয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে মাওলানা হাসানকে নবজাতক দু’টির নাম রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। এদের জন্ম হয়েছিল খুব কাছাকাছি সময়ে। মাওলানা হাসান তাদের যে নাম প্রস্তাব করেছিলেন, উভয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে সে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। আহমদ আদনান আবির ও আদিল উদ্দীন আসল। মাওলানা হাসান মনে মনে ভাবছিলেন, জন্মলগ্ন থেকেই এদের সঙ্গে নামের ব্যাপারটা নিয়ে তার একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। অতএব এদের ওপর আস্থা রাখা যায়।
মাওলানা সাহেবকে আনমনা হতে দেখে আবির ও আসল চুপ করে থাকে। এক পর্যায়ে মাওলানা সাহেবই কথা শুরু করেন।
– দ্যাখো, তোমাদের ওপর আমার আস্থার অভাব নেই। কিন্তু তোমাদের বয়স এখনও অনেক কম। এ বয়সে বুদ্ধি-বিবেচনার চাইতে আবেগ বেশি ভর করে। সে জন্যই আমি একটু দ্বিধা করছিলাম। তোমাদের আগ্রহ দেখে আমার দ্বিধাও কেটে গেছে। তোমাদের কাছে বিষয়টি প্রকাশ না করলে আমি আর শান্তি পাবো না। এমনিতেই আমার মন বড় অশান্ত হয়ে আছে। বিষয়টি তোমরা আপাতত গোপন রাখবে। সময়মতো কথাটি আমিই প্রকাশ করব সবার নিকট।
একটু থামেন মাওলানা হাসান। এরপর যে ঘটনা তিনি বর্ণনা করেন তা শুনে আবির ও আসলের চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। দীনেশের বাবা অনিমেষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কবে, কখন, কিভাবে, সে ঘটনাই আবির ও আসলের নিকট বর্ণনা করেন মাওলানা হাসান।
– আমার সঙ্গে অনিমেষের সম্পর্ক সেই শৈশবের। চলাফেরা ও খেলাধুলাও করতাম একসঙ্গে। মাঝে কয়েক বছর আমি মাদরাসার হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতাম। ফলে বাড়িতে আসা হতো কম। অনিমেষের সঙ্গেও দেখা সাক্ষাৎ হতো না তেমন একটা। মাঝে মাঝে বাড়ি এলে যখন অনিমেষের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো, তখন দেখতাম সে আমার প্রতি শ্রদ্ধায় বিগলিত। কথা বলার মতো কিংবা আড্ডা দেয়ার মতো সময় তখন হাতে থাকতো না। আমি ভাবতাম, অনিমেষ নিজে লেখাপড়ায় অগ্রসর হতে পারেনি, আমি এগিয়ে যাচ্ছি, আলেম হয়ে যাচ্ছি সে কারণেই হয়তো সে আমার প্রতি শ্রদ্ধাভাব দেখায়। আব্বাজানের ইন্তেকালের পর আমি হোস্টেল ছেড়ে বাড়িতে চলে আসি। বাড়ি থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যাই। এ সময় থেকে অন্য সবার মতো অনিমেষের সঙ্গেও আমার নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ হতে থাকে। প্রায়ই দেখতাম, অনিমেষ আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায়, কথাবার্তা বলতে চায়। ফলে দেখা সাক্ষাৎ হলে আমিও আর দু’চার কথায় তাকে বিদায় করি না। একটু দীর্ঘ সময় আমাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। তখন থেকেই দেখতাম ইসলামের ব্যাপারে তার প্রবল আগ্রহ। তার এ আগ্রহ দেখে আমার খুবই ভালো লাগত। তার প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, তবুও কখনো বিরক্ত হতাম না। আমার বরং তার প্রশ্নের জবাব দিতে খুব ভালো লাগত। অনেক সময় অনিমেষ আমাকে এমন সব প্রশ্ন করত, যে সব প্রশ্নের জবাব আমার জানা থাকতো না। আমি বিস্মিত হয়ে অনিমেষের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বলতাম,
– অনিমেষ, আমি জানি না, জ্ঞানবান ব্যক্তিদের কারো কাছ থেকে জেনে তোমাকে বলব। অনিমেষের প্রশ্নগুলো নিয়ে আমি অনেক সময় চিন্তায় পড়ে যেতাম। আলেম ওলামাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতাম কিংবা বইপত্র জোগাড় করে নিতাম। আমি আমার ছাত্রজীবনে সেসব বিষয় জানতাম না যেগুলো অনিমেষের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমাকে জানতে হয়েছে। আমি ছাত্রজীবনে এত বই পড়িনি যত বই পড়তে হয়েছে অনিমেষের প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে। অনিমেষ শুধু ইসলাম ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করতো না, নানা ধর্ম ও বিষয় নিয়ে সে আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতো। অনিমেষ আমাকে হাসান ভাই বলে ডাকতো, আমি ওকে ডাকতাম অনিমেষ বলে। আমাকে আর অনিমেষকে একসঙ্গে দেখলে কেউ কেউ বলত ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই/হাসান ছাড়া অনিমেষ নাই’। যদিও অনিমেষের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ধর্মীয় ছিল না, ছিল মানবিক। আমি কোনদিন তার বাড়িতে কোন পূজার অনুষ্ঠানে যোগ দেইনি, সেও আমার বাড়িতে কোন দোয়ার মাহফিলে হাজির হয়নি।
একটানা অনেক কথা বলে মাওলানা হাসান থামলেন। বিস্মিত হয়ে শুনছিল আবির ও আসল। ওরা চুপ করেই থাকলো। মাওলানা হাসান আবার শুরু করলেন-
– তোমরা তো জানোই, অনিমেষ সবার সঙ্গেই মিশতো। সবার সঙ্গেই তার সদ্ভাব ছিল। আড্ডা দিতেও সে পছন্দ করতো। কিন্তু আমাকে সে সবসময় একা পেতে চাইতো। সময়ের অভাবে আমি তাকে মাঝে মাঝে বই দিতাম। দিয়ে বলতাম, এটা পড়লে এটা জানতে পারবে। কিন্তু দু’দিন পরেই বইটি আমার হাতে ফেরত দিয়ে বলত,
– ‘বই পড়ে আমার জ্ঞান অর্জন হবে না। বই পড়ে আমি কিছু বুঝতে পারি না।’ বলতে গেলে তার কারণেই আমি এত বই পড়তে আগ্রহী হয়েছি, অথচ তাকে দিয়ে বই পড়াতে পারলাম না। বাংলা সে ভালোই পড়তে পারতো। পত্রিকার খবর পড়তো সে কিন্তু বই তার মাথায় ঢুকতো না। ফলে আমিও তাকে দিয়ে বই পড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করে দিয়েছি।
অনিমেষের মনে অনেক দুঃখ ও ক্ষোভ ছিল। তার দুঃখ ও ক্ষোভের কথা আমি জেনেছিলাম অনেক পরে। একদিন সবিস্তারে সে এসব বলেছিল আমাকে। অনিমেষের বাবা রমেশের মৃত্যুর পর অনিমেষের কাকা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দেয় গোপনে। তার নিজের অংশ বিক্রি করে সে ভারতে চলে যায়। ভিটেবাড়ি বিক্রি করার জন্য অনিমেষকেও সে ফুসলিয়েছে। কিন্তু সে পথে পা বাড়ায়নি অনিমেষ। অনিমেষের কাকা পরেশ সপরিবারে ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার পর জানা যায়, হারুন মাতবর গোপনে ওদের সব জমি কিনে নিয়েছে। পরেশ চলে যাওয়ার পর জমির দখল নেয় হারুন। এরপর থেকে হারুন মাতবর অনিমেষকে ফুসলাতে থাকেন,
– দেখো অনিমেষ, এক বাড়িতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পত্তি থাকা ঠিক না। নানান সমস্যা হয়। তুমি বরং তোমার অংশটা আমার কাছে বিক্রি করে দাও নতুবা পরেশের অংশটা আমার কাছ থেকে কিনে নাও। পরেশ আমাকে বলেছিল, তোমরাও তোমাদের অংশটা বিক্রি করে চলে যাবে। সে ভরসায় আমি পরেশের সম্পত্তি কিনে ছিলাম। এখন আমি মহামুশকিলে পড়ে গেছি। আমি ভেবেছিলাম আমার এক ছেলেকে এ বাড়িতে ঘরদোর তুলে দেবো। কিন্তু আমার কোন ছেলেই হিন্দু বাড়িতে বসবাস করতে রাজি হচ্ছে না। সে কারণেই আমি তোমাকে এ প্রস্তাব দিচ্ছি।
হারুন মাতবরের কাছ থেকে অনিমেষের পক্ষে পরেশের অংশ কিনে রাখা কোন মতেই সম্ভব না, সুতরাং একটা চমৎকার টোপ ফেলে হারুন মাতবর, অনিমেষ সবই বুঝতে পারে। কিন্তু শান্তিপ্রিয় অনিমেষ হারুন মাতবরের যুক্তিকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। হারুন মাতবরের চাপে পড়ে অনিমেষ একদিন ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে রাজি হয়ে যায়। বর্তমানে দীনেশদের যে ছোট বাড়িটা আছে এ বাড়ির জন্য জমিটুকু রেখে বাকি সব জায়গা জমি হারুন মাতবরের কাছে বিক্রি করে দেয় অনিমেষ। এ নিয়ে গ্রামে টুকটাক কানাঘুষা হলেও অনিমেষের কথায় এসব কানাঘুষা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। অনিমেষ সবাইকে জানিয়ে দেয়, নতুন বাড়ি করার জন্যই স্বেচ্ছায় সে পৈতিৃক ভিটা বিক্রি করে দিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই রাস্তার পাশে অনিমেষের ছোট্ট বাড়িটা তৈরি হয়। অনিমেষ নতুন বাড়িতে উঠেছে, বেশিদিন হয়নি। এটা তো তোমরাও দেখেছ। অনিমেষের নতুন বাড়িটার ওপরও হারুন মাতবরের চোখ পড়ে। এখান থেকে অনিমেষকে উচ্ছেদ করতে চায় হারুন মাতবর। চরে অনেক বেশি জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে এ বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে বলে হারুন মাতবর। কিন্তু এ গ্রামের লোকদের ছেড়ে এত দূরে নতুন জায়গায় গিয়ে বাড়ি করতে রাজি হয় না অনিমেষ।
কথা বলতে বলতে আবারও থামলেন মাওলানা হাসান। এই সুযোগে আবির বলে ওঠে,
– হুজুর এসব কথা তো কেউই জানতো না। তাহলে কি হারুন মাতবরের হাতেই খুন হয়েছে অনিমেষ?
– হ্যাঁ, এসব কথা কেউই জানতো না। আমিও জেনেছি খুব বেশিদিন হয়নি। তবে আমার মনে হয় না, এইটুকু বাড়ির জন্য হারুন মাতবর অনিমেষকে খুন করতে পারে। বললেন মাওলানা হাসান।
রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল আবির ও আসল। এবার আসলই প্রশ্ন করে,
– হুজুর, অনিমেষ কাকা মুসলমান হলেন কবে, কিভাবে।
– সে কথা বলার জন্যই এত কথা বললাম। এই কিছুদিন আগে অনিমেষ যখন আমাকে তার এসব কথা জানিয়েছে সে সময়ই সে মুসলমান হওয়ার ইচ্ছার কথা আমাকে জানায়। একদিন আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অনিমেষ হঠাৎ করেই বলে বসে,
– ‘হাছান ভাই, আমি মুসলমান হয়ে যেতে চাই। আমার মনটা খুব ছটফট করছে মুসলমান হওয়ার জন্য। আমি আমার মা ও স্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি। তারাও রাজি। আমার ছেলেমেয়েরাও রাজি হয়ে যাবে। আমরা সপরিবারে মুসলমান হয়ে যাবো। তুমি আমাদের মুসলমান বানানোর ব্যবস্থা করো।’ আমি হতভম্ভ হয়ে কিছুক্ষণ অনিমেষের দিকে তাকিয়ে থেকে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আমি কেঁদে ফেললাম। বেশ কিছুক্ষণ অনিমেষকে জড়িয়ে ধরে আমি ভাবছিলাম, অনিমেষকে এখনই মুসলমান বানানো ঠিক হবে না। ও আর ওর পরিবারের সদস্যরা আরও ভালোভাবে ইসলাম বুঝুক। তারপর সবাইকে জানিয়ে ওদের কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানানো যাবে। আমি ওকে আরও একটু সময় নিতে বলেছিলাম। এর কারণও আছে। আমাদের দেশে সপরিবারে কিংবা ব্যক্তিগত ভাবে কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে, সে ঘটনাকে অনেক রঙচঙ লাগানো হয়। বলা হয়, জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। অনিমেষ যাতে সবদিক বুঝে শুনে শক্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে সে জন্যই আমি তাকে আরও সময় নিতে বলেছিলাম। আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যাপারটি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না। এরই মধ্যে অনিমেষ আমাকে বহুবার চাপ দিয়েছিল ব্যাপারটি সেরে ফেলার জন্য। আমি তাকে দমিয়ে রেখেছিলাম। একদিন সে আমাকে বলেছিল, ‘হাসান ভাই, তুমি আমার মনের ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না। তুমি কেবল আইনের কথা বলছ। আমি মুসলমান হতে চাইলে কে আমাকে বাধা দেবে? বাধা দিলেও আমি কিছুই মানব না। তুমি মনে রেখ, এরই মধ্যে আমি মনে মনে মুসলমান হয়ে গেছি। আমার মা ও স্ত্রীর একই অবস্থা। আমার ছেলেমেয়েদেরও আমি বুঝাতে শুরু করেছি। ওরাও কোন আপত্তি করছে না। তাহলে কেন অপেক্ষা করব আমরা, কেন সত্য থেকে দূরে থাকব? অনিমেষের কথা শুনে আমার বুকে আবেগের ঢেউ উঠতো। কিন্তু বাস্তবতা বিচার করে আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি। এখন অনিমেষ নেই। এ ব্যাপারে ওর পরিবারের সদস্যদের কী মনোভাব আমি বলতে পারব না। তোমরা দীনেশের বন্ধু। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওর কাছ থেকে তোমরা ওদের মনোভাব জেনে নিতে পার।
আমি নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে করে খুব কষ্ট পাচ্ছি। অনিমেষকে দাহ করা হয়েছে। কিন্তু ও তো আমাকে সাক্ষী রেখে মনে মনে মুসলমান হয়ে গেছে। আমার হাতে কোনো প্রমাণ না থাকায় ওকে নিয়ে আমি কিছুই বলতে পারিনি, কিছুই করতে পারিনি। শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছি- হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, অনিমেষকে কবুল করুন, ওর পরিবারকে কবুল করুন।
বলতে বলতে অশ্র“সিক্ত হয়ে ওঠেন মাওলানা হাছান। আবির আর আসলের চোখেও পানি এসে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মাওলানা হাসান বলেন, মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। এখন মুসল্লিরা চলে আসবেন। তোমরা এসব কথা এখনই কাউকে বলবে না। দীনেশদের কিভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে ব্যাপারটা আমি দেখব। প্রয়োজন হলে তোমাদেরকে ডাকব। তোমরাও চিন্তা-ভাবনা করতে থাকো। আল্লাহ পাক আমাদের সাহায্য করবেন।

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply