Home তোমাদের গল্প রুহির স্বপ্ন পূরণের দিন

রুহির স্বপ্ন পূরণের দিন

মিশকাতুল জান্নাত মিশু

ছোট্টবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখত রুহি- বড় হয়ে সে একজন মস্ত বড়ো লেখিকা হবে। গল্প লিখবে, ছড়া কবিতা লিখবে এবং আরো অনেক কিছু। তার লেখা পড়ে কেউ হাসবে, কেউ বিভিন্ন মন্তব্য করবে। এইসব স্বপ্ন দেখত সে। তার সে স্বপ্ন আজ পূরণ হতে চলেছে। মস্ত বড় না হলেও খুদে লেখিকা হিসেবে ইতোমধ্যে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে সে। সম্মাননাও পেয়েছে। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এখন তার লেখা ছাপাও হয়, গল্প, ছড়া কবিতা ইত্যাদি। এইতো চেয়েছিল সে। এর চেয়ে আর বেশি কী দরকার? এতেই সে অনেক আনন্দিত।
আজ একটা অনুষ্ঠানে এসেছে সে পুরস্কার নিতে। সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক নতুন কিশোরকণ্ঠের গল্প প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার। সারা দেশের হাজার হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সে ফার্স্ট হয়েছে।
পুরস্কার বিতরণ শেষে এখন মঞ্চে চলছে শিল্পীগোষ্ঠীর মনোরম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিবেশনা করছে সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। সব বিজয়ী অতিথি ও অভিভাবক যার যার আসনে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। কিন্তু রুহির সে দিকে মন নেই, পুরস্কার হাতে নিয়েই সে অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। তার মনটা চলে গেল সেই তিন বছর আগের সময়ে।
রুহি তখন পড়তো ক্লাস ফাইভে। লেখাপড়ায় ছিলো অসম্ভব মেধাবী। যার কারণে সবাই তাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতো। সেও ছিলো খুব শান্ত প্রকৃতির। তাই সকলের আদর পেত। সেই ছোটবেলা থেকেই সে তার ছোট্ট মনের মাঝে লালন করে আসছিলো তার স্বপ্নটা। মাঝে মাঝে সে ছড়া লিখতো লুকিয়ে লুকিয়ে, কিন্তু কাউকে দেখাতো না লজ্জায়। ভাবতো, ইস কোথাও যদি ছাপতো! সে একটি পত্রিকা পড়তো নতুন কিশোরকণ্ঠ। সেখানে ছড়া প্রতিযোগিতায় ছড়া আহ্বান করা হলো পাঠক-পাঠীকাদের কাছে।

তো সে অনেক চিন্তা-ভাবনার পর লিখে ফেলে চমৎকার একটি ছড়া। নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় ছড়াটি পড়ে। এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো সেÑ ছড়া তো লেখা হলো কিন্তু পাঠাবে কিভাবে? সেতো কোন নিয়মই জানে না। তার ভাইয়া থাকে শহরে। ওখানে কী জানি কী একটা বড় ভার্সিটিতে পড়ে। ভাবলো, ভাইয়াকে দেবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সে সুন্দর করে ছড়াটি লিখল একটা কাগজে। তারপর ভাইয়াকে দিয়ে বলল, ভাইয়া এটা একটু ওখানে পাঠবেন প্লিজ! তার ভাইয়াও কথা দিল তাকে। সে তো ভীষণ খুশি, তার ছড়া উঠবে পত্রিকায়! রোমাঞ্চিত হলো সে।
এবার অপেক্ষার পালা। এক মাস যায়, দুই মাস যায়। প্রতি মাসেই সে পত্রিকা দেখে। সবার লেখা দেখে কিন্তু তার লেখা খুঁজে পায় না আর। হতাশ হয় সে। ভাবে হয়তো তার লেখাটা এতোটা ভালো হয়নি। কিংবা ঠিকানা ভুল হয়েছে। যার কারণে ছাপা হয়নি।
সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আবারও সে মনোযোগী হয় লেখাপড়ায়। কারণ সামনে পরীক্ষা। সেই সাথে মনোযোগী হয় ছড়া এবং গল্পেও। এবার আরেকটু উন্নত হওয়া দরকার লেখায়, না হয় ছাপা হবে না আগের মতো। চলতেই থাকলো তার লেখাপড়া, লেখালেখি…।
এরই মধ্যে সে বেড়াতে গেল নানুর বাড়ি, গ্রীষ্মের ছুটিতে। ভালোই কাটছিলো নানুর বাড়ির মজার দিনগুলো। কিন্তু হঠাৎ একদিন মনটা ছেয়ে গেলো কালো মেঘে। সেদিন সে ময়লার স্তূপে অনেক কাগজ দেখতে পেলো। কৌতূহলবশত এগিয়ে গেল সেখানে। দেখতে লাগলো একটা একটা করে কোনটা বইয়ের ছেঁড়া পাতা, কোনটা পত্রিকার পুরনো অংশ। ওই অসংখ্য কাগজের ভিড়ে সে একটা ময়লা মলিন কাগজ খুঁজে পেল, যা ছিলো তার অতি পরিচিত, অতি আপন। তার সেই ছড়া প্রতিযোগিতার জন্য পাঠানো ছড়াটি। এবার সে বুঝতে পারলো। পত্রিকায় না ছাপানোর কারণটা। ভাইয়া তার সাথে এভাবে প্রতারণা করতে পারলো? ছোট বলে এতো অবহেলা? অনেকক্ষণ কাগজটা জড়িয়ে ধর কাঁদলো সে। কাছে কোথাও কারো গলার আওয়াজ শুনে কান্না থেমে গেলো তার। দেখল তার বড় ভাইয়া। ভীষণ রাগ হলো তার ভাইয়ার প্রতি। ভাইয়া তাকে দেখে এগিয়ে এলো, ‘কিরে কাঁদছিস কেন? ব্যথা পেলি নাকি?’ সে তাড়াতাড়ি কাগজটা লুকিয়ে ফেলে। বলে হ্যাঁ ভাইয়া একটু হোঁচট খেয়েছি, পায়ে তাই ব্যথা লাগছে (মনে মনে বলল ব্যথাতো পেয়েছি মনে)। তার ভাইয়া তাকে কোলে নিতে চাইল কিন্তু সে বলল না, ভাইয়া হাঁটতে পারবো আমি। সেদিন সে কিছুই খেতে পারল না, মা অনেক বলার পরও। আসল কারণটা তো জানে না কেউ। কাউকে বলেনি সে।
ঘটনাটা এতদিন সে পুষিয়ে রেখেছে ছোট্ট মনের মাঝে। কান্নার ঢেউ উথলে উঠল তার চোখে। এখন তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে দেখে যাও ভাইয়া, আজ আমি এতোজনের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছি, যাকে তুমি অবহেলা করেছিলে ছোট বলে। আজ আমার লেখা আর ফেলনা নয়। দেখে যাও …।
হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল ছোট মামার আলতো ছোঁয়ায়Ñ ‘কিরে, কাঁদছিস কেন?’ সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, ‘না মামা কাঁদছি না তো, ময়লা পড়েছে চোখে।’ [/dropcaps]

SHARE

Leave a Reply