Home ফিচার ভয়ঙ্কর ১০ সাপ

ভয়ঙ্কর ১০ সাপ

Sapসাপ চেনেন না পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। হাত- পা বিহীন এ সরীসৃপটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে এক ভয়ঙ্কর বিষাক্ত প্রাণী হিসেবে। তবে মজার ব্যাপার হলো, সব সাপই ভয়ঙ্কর বা বিষাক্ত নয়। বেশির ভাগ সময়ই এরা আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ করে। আবার কোনো কোনো সাপ পথচারীদের ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। সব সাপ ভয়ঙ্কর না হলেও পৃথিবীতে অন্তত এমন ১০ সাপ আছে যাদের ছোবলে মৃত্যু অনিবার্য। কোনো কোনো সাপের কামড়ে পচে যায় শরীরের মাংস। কোনো কোনো সাপ গিলে খেতে পারে আস্ত মানুষ। আসুন তাহলে জেনে নেই পৃথিবীর সব থেকে ভয়ঙ্কর ১০টি সাপের পরিচিতি


ইনল্যান্ড তাইপেন
পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপ ইনল্যান্ড তাইপেন। এর বিষ এই গ্রহের সবচেয়ে মারাত্মক। এই সাপ সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার প্রান্তদেশে দেখা যায়। লম্বায় এগুলো প্রায় আট ফুটের মতো হয়ে থাকে। এক ছোবলে তাইপেন এত বিষ ছোড়ে যা ৬০ থেকে ১০০ লোকের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। অথবা এতে মারা যেতে পারে এক লাখ ইঁদুর। প্রাণিবিদরা জানান, তাইপেনের এক ছোবল অন্তত ৫০টি কোবরার ছোবলের সমান। এদের বিষে আছে মারাত্মক ধরনের নিউরোটক্সিন যা মানুষের শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুরোপুরি বিকল করে দিতে পারে। এর ছোবল পেশি অবশ করে হার্ট বন্ধ করে দেয়। আরেকটি টক্সিন রক্ত জমাট করে ঘন স্যুপের মতো করে দেয়। এদের বিষের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে, এ বিষ মানুষের রক্তে মিশলে রক্ত শক্ত হয়ে যায়। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই সাপের মানুষ মারার কোনো রেকর্ড নেই। কারণ এগুলো অস্ট্রেলিয়ার এমন প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করে যেখানে লোকজন খুব একটা থাকে না। ভয়ঙ্কর বিষাক্ত হলেও স্বভাবে এরা খুব শান্ত। সব মিলিয়ে তাইপেনকেই সবচেয়ে বিষাক্ত সাপের মর্যাদা দিয়েছেন প্রাণিবিদরা।


ব্ল্যাক মাম্বা
ভয়ঙ্কর আর বিষের দিক থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় সাপ ব্ল্যাক মাম্বা। এর শরীরের উপরের দিকটা সাদা হলেও এর মুখের ভেতরটা কালো। এই ব্যতিক্রমী চেহারার জন্য এর নাম ব্ল্যাক মাম্বা। বাস আফ্রিকায়। বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্ত ও প্রচণ্ড উত্তেজিত এ সাপের নিউরোটক্সিন বিষের ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। এ সাপ ছোবল দিলে মাত্র কয়েক মিনিটেই যে কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। এরা এতই ভীতু যে, কাউকে দেখলেই নিজের ওপর আক্রমণের ভয়ে তার উপরে আক্রমণ চালায়। যে কারণে অন্য সাপ থেকে এ সাপ হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর। প্রাণিবিদদের মতে, এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম সাপ। যার গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ কিলোমিটার। তা ছাড়া এটি একই সারিতে পরপর ১২ বার কামড় দিতে পারে।


পাইথন
সর্প জগতের দৈত্য বলা হয় পাইথনকে। কারণ এটিই পৃথিবীর একমাত্র সাপ, যা আস্ত মানুষ অনায়াসেই খেয়ে ফেলতে পারে। কোনো ঘুমন্ত মানুষকে অনায়াসেই গিলে নাচতে নাচতে ঘরে চলে যেতে তার কোনোই সমস্যা হয় না। প্রায় একদিন পরে শিকারের দেহটাকে সে শরীর থেকে বাইরে বের করে দেয়। এ সাপ ২০ ফুটের মতো লম্বা হয়। এরা সাধারণত দুপুরের গরম এড়াতে গর্তে ঢুকে থাকে। এরা একটু ঠাণ্ডা  পেলে পানির মধ্যে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। তবে প্রথমেই এরা শিকারকে গিলে ফেলে না। প্রথমে চেষ্টা করে নিজের শরীরের পাকে পাকে শিকারকে কাবু করার। পাইথনের শরীর এতই শক্ত যে, এটা কাউকে পেঁচিয়ে ধরলে তার হার্ট ও রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে এবং সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এরা যখন মানুষকে গিলে ফেলে তখন তাদের মুখ ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত খুলতে পারে। আরও ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে, এরা নিজের শরীরের থেকেও বড় শিকারকে অবলীলায় গিলে ফেলতে পারে। তবে এদের কোনো বিষ নেই। বিষ না থাকার পরও দৈত্যাকৃতি ও গিলে ফেলার কারণে এ সাপ চলে এসেছে ভয়ঙ্কর সাপের তালিকায়।


কালকেটে
ভাবুন তো, যদি একটা ১৪ থেকে ১৫ ফুট লম্বা কালকেউটে ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু তুলে মস্ত হাঁ করে আপনার দিকে তেড়ে আসে। কেমন লাগবে তখন? হুম, এখন যার কথা বলছি, সে এমনই প্রকৃতির সাপ। কালকেউটেরা ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। আর ওরা শরীরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাটির ওপরে ফণা তুলতে পারে। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো ওই ফণা তোলা অবস্থায়েই এগিয়ে যেতে পারে। কালকেউটে পানির মধ্যেও দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে। এদের শ্বাসনালিতে একটা ছিদ্র থাকে। তাতে কম্পনের ফলে ভয়ঙ্কর গর্জনের আওয়াজ হয়। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি সাপই এমন গর্জন করতে পারে। গর্জনের জন্য বিশাল প্রাণীটিকে আরও ভয়ঙ্কর লাগে। এ গর্জন সম্ভব হয় শক্তিশালী মাংসপেশির কারণে। ইন্ডিয়ান র্যাট স্নেক এদের প্রিয় খাবার। প্রাণিবিদদের মতে, কালকেউটের বিষ উৎপাদনের ক্ষমতাও অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, সব সাপের থেকে এদের বিষের থলি বড়। এক ছোবলে এরা দুই চা চামচ পরিমাণ বিষ ছোড়তে পারে। যা ২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। এদের বিষ যখন শরীরে ঢোকে তা নার্ভাস সিস্টেমের নিউরনগুলোর মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল ইমপার্লসকে আটকে দেয়। যার ফলে যে কেউ পঙ্গু বা হার্ট বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। এর ছোবলে কয়েক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু অনিবার্য। তবে এর বিষে অন্যান্য বিষাক্ত সাপের পরিমাণে টকসিকের পরিমাণ কম।


ভাইপার
পৃথিবীতে মাত্র এক প্রজাতির সাপই আছে, যাদের বিষ মাংসকে গলিয়ে দিতে পারে। এর নাম ভাইপার। ভারতসহ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই এদের নানা প্রজাতি বাস করে। অপরিচ্ছন্ন বাড়ির আশপাশে বা নারকেল গাছের পাতার ভাঁজে এরা চুপচাপ বসে থাকতে ভালোবাসে। তবে ভাইপারের মধ্যে র্যুসেল ভাইপার সবচেয়ে মারাত্মক। পৃথিবীতে বছরে এদের কামড়ে যত মানুষ মারা যায়, বাকি সব সাপ মিলেও এত মানুষ কামড়ায় না। এদের কামড়েই এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। গবেষকদের মতে, এদের বিষ খুবই তীব্র হিমোলেটিভ ধরনের। রক্ত এবং টিস্যুকে সরাসরি আক্রমণ করে। এরা নিশাচর প্রকৃতির সাপ। বৃষ্টির পরে রেইন ফরেস্টে এরা একা একা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। এদের অনুভব শক্তি বেশ শক্তিশালী আর এরা ক্ষিপ্রগতিরও হয়। সাধারণত পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যরে হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে এরাও পৃথিবীর ভয়ঙ্কর প্রজাতির সাপ।


বেলচার সি স্নেক
ভয়ঙ্কর সাপের তালিকায় থাকা বেলচার সি স্নেককেও কেউ কেউ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাপ বলে মনে করে থাকেন। এই সাপের মাত্র কয়েক মিলিগ্রাম বিষই ১০০০ মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। এদের বিষের পরিমাণও বেশি। সাগরের গভীরে এদের বিচরণ থাকায় সাধারণত জেলেরা এই সাপের কামড়ের শিকার বেশি হন। জেলেরা যখন জাল তোলেন তখন সমুদ্রের তলদেশ থেকে এরা জালের সঙ্গে উঠে আসে। বেলচার উত্তর-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সাগরে বেশি দেখা যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো একটু আদর পেলে এরা সহজেই বশ মানে।


স্পিটিং কোবরা
বলতে পারেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সাপ কোনটি? এখন যার কথা বলছি, নিঃসন্দেহে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সাপ। স্পিটিং কোবরা। দেখতে এরা যেমন সুন্দর, এদের আচরণও অন্যদের তুলনায় শান্ত। স্পিটিং কোবরার স্বর্গরাজ্য সাউথ আফ্রিকা। এরা কামড়  দেয়া থেকে বিষ ছুড়েতেই বেশি পছন্দ করে। এমনকি ফণা না তুলে শুয়ে শুয়েই এরা আট ফুট দূরের শিকারকে বিষ ছুড়ে কাবু করতে পারে। এরা সাধারণত বিষ ছোড়ে মানুষের চোখ লক্ষ্য করে। এ বিষ চোখে গেলে অন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তবে ত্বকে বা মুখের ভেতরেও এ বিষ গেলে তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এরা যদি দাঁত ফুটিয়ে রক্তে বিষ প্রবেশ করিয়ে দেয় তাতে পঙ্গুত্ববরণ এমনকি হার্ট বন্ধ হয়ে যে কেউ মারাও যেতে পারে। গবেষকদের মতে, অত্যন্ত বিষধর হলেও স্পিটিং কোবরা শুধু আত্মরক্ষার জন্যই বিষ ছোড়ে। কাউকে চমকে দিয়ে পালানোর পথ করে নেয়াই তাদের উদ্দেশ্য। এদের দৈর্ঘ্য ছয় ফুটের বেশি হয় না।


ব্লু ক্রেইট
ব্লু ক্রেইট এমনই হিংস্র যে, শিকার ছাড়াও নিজ প্রজাতির সাপও এদের হাত থেকে রেহাই পায় না। দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এ সাপ বেশি পাওয়া যায়। এদের ছোবলে মৃত্যু অবধারিত। তবে সঙ্গে সঙ্গে সুচিকিৎসা দিলে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ বেঁচেও যেতে পারেন। এই সাপের বিষ স্নায়ুকে আক্রান্ত করে। এর একটি কামড় কোবরার ১৬টি কামড়ের সমান বিষাক্ত। এদের বিষ খুব দ্রুত পেশিগুলোকে দুর্বল করে দেয় এবং নার্ভের গতি কমিয়ে দেয়। তবে লড়াইয়ের মাঝপথে এসব সাপের পালিয়ে যাওয়ার রেকর্ড আছে। এরা রাতে চলাচল ও শিকার করতে বেশি পছন্দ করে।


ইস্টার্ন ব্রাউন স্নেক
ধরুন, আপনি একটা ইস্টার্ন ব্রাউন স্নেকের সামনে পড়লেন। সাপটি আপনাকে দেখে ফণা তুলে নাচতে লাগল। সে চাইছে আপনি তার দিকে এগিয়ে যান, আর তারপরই সে চোখের পলক পড়ার আগেই কাজ সেরে নেবে। আপনি ভুলেও সে কাজ করবেন না। এমন সাপের সামনে পড়লে নড়াচড়া না করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। কারণ, এরা শুধু চলমান মানুষ বা বস্তুকেই আক্রমণ করে। আর এর বিষ এতটাই বিপজ্জনক যে, এর এক ছোবল একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। ব্রাউন স্নেকের মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় বাদামি সাপই বেশি বিষধর। এটি অস্ট্রেলিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এরা যেমন দ্রুত চলাফেরা করতে পারে তেমনি উপযুক্ত পরিবেশে হরহামেশাই আক্রমণ করে বসতে পারে। আরও ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, এদের বিষ স্নায়ু ও রক্তে একসঙ্গে আক্রমণ করে। তবে এরা প্রতি দুই ছোবলে একবার বিষ প্রয়োগ করতে পারে। আর পারতপক্ষে এরা কামড়ায়ও না।

১০
ডেথ এডার
ডেথ এডারও সাপ শিকার করে। মূলত অস্ট্রেলিয়া ও নিউ ঘানায় এদের সদলবল বসবাস। ডেথ এডার আকারে ছোট হলেও এর মাথার ভিন্নতার কারণে এটি দেখতে অনেকটা ভয়ঙ্কর। এদের মাথা অনেকটা ত্রিভুজাকৃতির। এদের শরীরও বেশ মোটাসোটা। প্রাণিবিদরা জানান, এক ছোবলে এরা ৪০ থেকে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত বিষ ঢালতে পারে। কেউ কেউ এর বিষকেই সবচেয়ে বিষাক্ত বিষ বলে মনে করে থাকেন। এই সাপের বিষ মানুষের স্নায়ুতে আক্রমণ করে। এর কামড়ে মানুষের দেহ প্যারালাইসিস হতে পারে, এমনকি শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যে কেউ সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টার মধ্যে মারা যেতে পারেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছে এর ছোবল দেয়ার ক্ষমতা। এটি ০.১৩ সেকেন্ডের মধ্যে কামড় দিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।

SHARE

Leave a Reply