Home বিশেষ রচনা বাংলাদেশে প্রতি মিনিটে একজন শিশুকন্যা নির্যাতিত হচ্ছে

বাংলাদেশে প্রতি মিনিটে একজন শিশুকন্যা নির্যাতিত হচ্ছে

আব্দুল হাদী আল হেলালী

Shishu-Nirjatonপ্রযুক্তির এই যুগে একটি দেশ বা সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে ছেলেমেয়ে উভয়কে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় বিশ্ব। আর এসব ভবিষ্যৎ প্রবক্তার হাত ধরেই আঁকা হবে আগামীর স্বপ্নের কারুকাজ। তাইতো কন্যাশিশুকে সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখ বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়, যাতে করে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কন্যাশিশুরা সামাজিকভাবে নিজেদের আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
বিষয়টি খুবই চমৎকার। কিন্তু তা যেন কেবল আমাদের দিবসের গণ্ডির মধ্যেই  সীমাবদ্ধ। বাস্তবিক অর্থে এই প্রক্রিয়া যেন কেবলমাত্র আমাদের কিছুকিছু পরিবারের মধ্যেই সীমাবব্ধ। অথচ মুষ্টিমেয় এমন কিছু শিশুর বাইরেও অনেক কন্যাশিশু রয়েছে যারা দীনহীনভাবে বসবাস করে। দু’বেলা দু’মুঠো অন্নই যেখানে তাদের ঠিকমত জোটে না, সেখানে অন্যান্য চাহিদার কথা তো সুদূর পরাহত।
দেশে প্রতি মিনিটে একটি কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার  হচ্ছে। তাদের রক্ষায় নেই কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাদের রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। পথশিশু, টোকাই যে নামেই ডাকা হোক না কেন এরাই হলো সেসব শিশু যাদের বসবাসের একমাত্র ভরসা রাস্তা, কখনও ট্রাফিক সিগন্যালে পুল অথবা অন্য কোনো পণ্য হাতে কিংবা গাড়ির কাচ মুছে দিচ্ছে। এমন বহু চিত্র অঙ্কিত হয়। এ দেশের মেয়েশিশুদের জীবনের গল্প।
সারা বিশ্বে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সম্প্রতি এক রিপোর্টে বলা হয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনীতি সংকোচনের কারণে মেয়েশিশুরা সুনির্দিষ্টভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কেননা মন্দা চারিদিকে দারিদ্র্য  ছাড়িয়ে দেয় আর দারিদ্র্য মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়তে বাধ্য করে।
প্ল্যানের রিপোর্টে বলা হয়, মন্দার প্রভাবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই ২৯ শতাংশ মেয়ে ¯ু‹ল থেকে ঝরে পড়ে, যেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ২২ শতাংশ।
স্কুল থেকে ঝরে পড়লে একটি মেয়ে তখন ঘরের কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। আর একবার যদি সে ¯ু‹ল ছেড়ে দেয়, পুনরায় স্কুলে যোগ দিয়ে আগের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অপেক্ষাকৃত বেশ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তখন বাল্যবিয়ের হার বেড়ে যায়। এভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের মেয়েশিশুরা তাদের আলোকিত জীবনের স্বপ্নকে নিভৃতে দাফন করছে। কন্যাশিশুর এই কষ্টই শেষ নয়। অভাবের তীব্রতায় বই ছেড়ে কাজে লেগেও যেন তাদের নিস্তার নেই। কোনো ঘরোয়া পরিবেশে কাজের  মেয়ে হয়ে যখন তারা বেঁচে থাকতে চেষ্টা করে সেখানেও গৃহকর্তা গৃহকর্ত্রীর হাতে সামান্য অপরাধে নির্যাতিত হতে দেখে আমাদের মনে ঘৃণার উদ্রেক করে, এমনকি গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর তো প্রায়ই প্রিন্ট ইলেকট্রনিকস মিডিয়াতে চোখে পড়ে। এসব ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয় উইমেন লইয়ারস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ফাহিমা নাসরিন জানান, শুধুমাত্র গৃহকর্মী হিসেবেই নয়, এ ছাড়াও নানাভাবে কন্যাশিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশে প্রায় ২০ হাজার মেয়েশিশু অবৈধ কাজে লিপ্ত। যাদের ৪৫ ভাগই নানা রোগে আক্রান্ত। অন্য দিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু এ প্রসঙ্গে বলেন, শিশুদের যৌন নির্যাতন আমাদের সমাজে নিষিদ্ধ হলেও এর সুরাহায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। এমনকি জাতীয় শিশুনীতিতে এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। আর তাই এমতাবস্থায় সম্প্রতি এক জরিপের ফলাফল বলছে, দেশে প্রতি মিনিটে একটি শিশুকন্যা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
তাহলে এবার ভেবে দেখা দরকার মেয়েশিশুদের নিরাপত্তা বিধান ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে। আর এর প্রেক্ষিতে কতটুকুইবা সম্ভব নারী উন্নয়ন ঘটিয়ে অগ্রযাত্রার পথে হাঁটা। তাহলে কি কেবল সভা, সেমিনার, দিবস পালন আর নারীবাদীদের ঝাঁঝালো বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন? প্রশ্ন রইল দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে?

SHARE

Leave a Reply