Home উপন্যাস দীনেশের দীন বদল

দীনেশের দীন বদল

আহমদ বাসির

Denesher-Bariস্কুল ছুটি হতে এখনও অনেক বাকি। হঠাৎ করেই আলীম স্যার ক্লাস রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি এ স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। ক্লাস নিচ্ছিলেন আরিফ স্যার। তিনি এ স্কুলের নবাগত জুনিয়র শিক্ষক। আলীম স্যারকে ক্লাস রুমের দরজায় দেখেই আরিফ স্যার একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন।
– আসসালামু আলাইকুম স্যার, আসুন স্যার আসুন, কোন সমস্যা স্যার?
আলীম স্যার কোন কথা না বলেই ক্লাস রুমে ঢুকে পড়লেন। আরিফ স্যার ভেবেছিলেন ছাত্রদের ক্লাস নিতে গিয়ে কোনো ভুল করে ফেলেছেন। সে কারণেই কিছুটা বিব্রত ভঙ্গিতে তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। ছাত্ররা সবাই দাঁড়িয়ে গেল। আলীম স্যার খুব নিচু গলায় আরিফ স্যারের সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
– না কোনো সমস্যা না। আপনি ক্লাস নিতে থাকেন। শুধু দীনেশকে একটু ছুটি দিতে হবে। এরপর আরিফ স্যারের কানে কানে আলীম স্যার কী যেন বললেন। আলীম স্যারের কথা শুনেই আরিফ স্যারের মুখমণ্ডল কেমন যেন শুকিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দীনেশকে ডাক দিলেন,
– দীনেশ!
ছাত্ররা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো অবস্থায়ই দীনেশ জবাব দিলো।
– ইয়েস স্যার।
– তুমি তোমার বইপত্র গুছিয়ে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি চলে যাও। তোমাকে আজ আর ক্লাস করতে হবে না।
– কেন স্যার?
দীনেশের সরাসরি প্রশ্নে আরিফ স্যার আবারও বিব্রত হয়ে পড়লেন। তিনি আলীম স্যারের দিকে তাকালেন সরাসরি। আলীম স্যার ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন,
– তোমরা সবাই বসে পড়। দীনেশের বাড়িতে একটু জরুরি কাজ পড়েছে। ওকে ছুটি দিতে হবে।
এরপর দীনেশকে আলাদা করে বললেন,
– দীনেশ তুমি দ্রুত বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমার কক্ষে চলে এসো। আমি তোমাকে সব বলছি।
কথাগুলো বলেই আলীম স্যার বের হয়ে গেলেন। আরিফ স্যার দাঁড়িয়েই থাকলেন। দীনেশ আগা-মাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তবুও স্যারের নির্দেশ মোতাবেক বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় আরিফ স্যারকে নমস্কার বলতেও ভুল করল না। আরিফ স্যার নমস্কারের জবাব দিয়ে দীনেশের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এরই মধ্যে ক্লাসে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। নিচু গলায় ছাত্রদের কানাকানি ফিসফিসানি লক্ষ্য করে আরিফ স্যার ছাত্রদের দিকে মনোযোগ দিলেন। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে তিনি ছাত্রদের বললেন, তোমরা সবাই চুপ করো। আরিফ স্যারের গম্ভীর গলা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। কিন্তু ক্লাসের একটু দুষ্টু প্রকৃতির মেধাবী ছাত্র মনোয়ার স্যারকে প্রশ্ন করে বসল,
– স্যার, কী হয়েছে, আমরা কি একটু জানতে পারি?
– কী হয়েছে, সে কথা আমি তোমাদের বলতে পারব না। এতক্ষণ পড়াবার সময় আরিফ স্যার যতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন এখন তার মুখমণ্ডল তার চেয়েও গম্ভীর এবং বিষণœ হয়ে আছে। মনোয়ার দমবার ছেলে নয়। সে আবারও প্রশ্ন করে বসে,
– স্যার, আলীম স্যার তো আপনাকে কানে কানে সব বলে গেলেন।
– সব কথা যদি তোমাদের জানাবার মতো হতো, তাহলে তো তিনি আর কানে কানে বলতেন না, জোরে জোরেই বলতেন।
– না স্যার, সে জন্য বলছি না। সম্ভবত দীনেশের কাছে কিছু লুকাবার জন্যই আপনার কানে কানে বলেছেন। এখন তো দীনেশ নেই, এখন কি আমাদের বলা যায় না।
– না বলা যায় না, তোমাদের কাছে বলতে হলে স্যারের অনুমতি লাগবে। হেড স্যার নেই, আলীম স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি তোমাদের কিছুই বলতে পারব না।
স্যারের কাট কাট জবাবে মনোয়ার এবার দমে যায়।
ক্লাস রুমজুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা।

দীনেশ দুরুদুরু বুকে আলীম স্যারের কক্ষে প্রবেশ করে।
– নমস্কার স্যার।
– নমস্কার। দীনেশ তোমাকে এখনই বাড়ি যেতে হবে। আমি তোমার জন্য একটা রিকশা ঠিক করতে পাঠিয়েছি। রিকশা এখনই চলে আসবে। তুমি রিকশা চড়ে সোজা বাড়ি চলে যাও। একদম কোনো দুশ্চিন্তা করবে না। হেড স্যার স্কুলে নেই। তিনি থাকলে আমিও তোমার সঙ্গে যেতাম। আশা করছি, তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। তিনি এলেই আমরা রওনা করবো।
স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই রুমের দরজায় পিয়ন এসে হাজির,
– আসসালামু আলাইকুম স্যার, রিকশা নিয়ে এসেছি স্যার।
আলীম স্যারের একটানা কথাগুলো শুনতে শুনতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে দীনেশ। তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই সরছিল না। সে বুঝে ফেলেছে, তার বাড়িতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। কী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সেটাই সে এতক্ষণ ধরে চিন্তা-কল্পনা করছিল মনে মনে। কিন্তু কোন হিসাবই মিলাতে পারছিল না। পিয়নের কথায় তার সম্বিত ফিরে আসে। হাউ মাউ করে দীনেশ আলীম স্যারকে জড়িয়ে ধরে,
– কী হয়েছে স্যার, আমার বাড়িতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে স্যার। কী হয়েছে স্যার আমাকে একটু বলুন।
– দীনেশ, তোমাকে এতটা ভেঙে পড়লে হবে না। ঘটনা- দুর্ঘটনা জীবনজুড়ে চলতেই থাকে। তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে। তুমি এসো, রিকশায় উঠে পড়ো। বাড়ি গেলেই সব জানতে পারবে।
কথা বলতে বলতেই দীনেশের জড়িয়ে ধরা হাতগুলো আলতো করে খুলে দিয়ে আলীম স্যার রুম থেকে বেরিয়ে পড়েন। দীনেশ একটা চলমান পুতুলের মতো স্যারের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। সিঁড়ি থেকে নেমে স্কুল ভবনের নিচতলার বারান্দা ধরে স্যার আগে আগে হাঁটতে থাকেন, দীনেশ তার পিছু পিছু, তারও পেছনে পিয়ন। যেখানে স্কুলের বারান্দার পাশেই একটা রিকশা দাঁড়ানো, সেখানে এসেই আলীম স্যার ঘুরে দাঁড়ান। একেবারে দীনেশের মুখোমুখি।
দীনেশ দাঁড়িয়ে পড়ে, সঙ্গে পিয়নও। আলীম স্যার দীনেশকে বললেন, রিকশায় ওঠো, বাড়ি গেলেই সব জানতে পারবে।
দীনেশ একবার সরাসরি আলীম স্যারের মুখের দিকে তাকায়। কিছু না বলেই আবার মাথাটা নিচু করে রিকশায় উঠে বসে। রিকশাচালক রিকশাটা টান দিতে দিতে যাবে ঠিক এমন সময় স্যার বলে ওঠেন, রাখো, রাখো। তারপর পিয়ন খলিলুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
– খলিলুর রহমান, আপনিও ওর সঙ্গে যান। ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এই রিকশাটা নিয়েই তাড়াতাড়ি চলে আসবেন। রিকশা ভাড়া এখানে এলেই পাবেন। একদম দেরি করবেন না।
পিয়ন খলিলুর রহমান রিকশায় উঠে বসে। রিকশাওয়ালা ও পিয়ন একই সঙ্গে স্যারকে সালাম দেয়। রিকশাটা চলতে শুরু করে। কিন্তু আনমনা দীনেশ স্যারকে নমস্কার বলতে ভুলে যায়। রিকশাটা স্কুলমাঠ পার হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আলীম স্যার স্কুলের নিচতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন।

আরিফ স্যার ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছেন না। ছাত্রদের মধ্যেও উসখুস ভাব। অবশ্য মনোয়ার দমে যাওয়ার পর কেউ আর কোনো কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। আরিফ স্যার হাতের বইটা বন্ধ করে ছাত্রদের বললেন,
– আজ আর পড়াতে ইচ্ছা করছে না। তোমাদেরও মনোযোগ নেই। দীনেশের ব্যাপারটা নিয়ে তোমরা উসখুস করছ। তোমাদের বরং আজকে একটা কবিতা শোনাই। কবিতাটা তোমরা খাতায় লিখে রাখো, মুখস্থ করে রাখো।
দীনেশের ব্যাপারটা নিয়েই কবিতাটা আমার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে।
আরিফ স্যারের কথায় ছাত্ররা নড়েচড়ে বসে। সবাই খাতা- কলম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভারি গলায় কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করেন,
– মারলে একটা পাখির ছানা
একটাই যায় মরে
ছিঁড়লে একটা ফুলের কলি
একটাই যায় ঝরে
কিন্তু একটা মারলে মানুষ
করলে একটা খুন
খুন হয়ে যায় সকল মানুষ
সকল তমদ্দুন
তাই খুনিদের বিরুদ্ধে হও জড়ো
লড়াই, লড়াই, তুমুল লড়াই করো।
শেষের পঙ্ক্তিটি উচ্চারণে সময় স্যারের মুখের মাংসপেশি শক্ত হয়ে ওঠে, হাত দু’টিও মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের ভালো লেগে যায় কবিতাটি। স্যার ধীরে ধীরে কবিতাটি আবৃত্তি করলেও অনেকে পুরোপুরি লিখতে পারেনি। ফলে আবারও আবৃত্তির অনুরোধ করে কোনো কোনো ছাত্র। আরিফ স্যার বেশ কয়েকবার কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান। এরই মধ্যে সবার খাতায় কবিতাটি লেখা হয়ে যায়। কারো কারো মুখস্থও হয়ে যায়।
আরিফ স্যার গণিতের শিক্ষক হলেও মাঝে মাঝে নতুন নতুন কবিতা আবৃত্তি করে ছাত্রদের শোনান। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের এসব কবিতা শুনে কোনো কোনো ছাত্র মুগ্ধ হয়। আবার কেউ কেউ মনে করে এসব কবিতা শুনে আমাদের কী লাভ? তবে আজকের কবিতাটি প্রায় সবারই মনে ধরে।
সবার খাতায় কবিতাটি লেখা হয়ে যাওয়ার পর এ কবিতা সম্পর্কে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন আরিফ স্যার। ঠিক এ সময় আবারও ক্লাস রুমের দরজায় এসে দাঁড়ান আলীম স্যার।
তড়িঘড়ি করে আলীম স্যারকে সালাম দিয়েই আরিফ স্যার বলেন,
– আসুন স্যার আসুন।
আলীম স্যার সালামের জবাব দিতে দিতে ক্লাস রুমের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ছাত্ররা দাঁড়িয়ে যায়। আলীম স্যার আরিফ স্যারকে পাশে দাঁড় করিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে বলতে শুরু করেন,
– আজকের দিনটা তোমাদের বন্ধু, তোমাদের ক্লাসমেট আমাদের খুবই প্রিয় ছাত্র দীনেশের জন্য খুবই কষ্টের দিন। ওর বাবা আর এ পৃথিবীতে নেই। আজকের জন্য তোমাদের ছুটি। যদি তোমাদের পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে তোমরা ওর বাড়িতে যাবে এবং ওকে সান্ত্বনা দেবে।
এভাবে অযাচিত ছুটি পেয়েও ছাত্ররা কোন রকম হৈ-হুল্লোড় না করে চুপ করে থাকলো। গোটা ক্লাসরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।
চোখে রুমাল চেপে আলীম স্যার বের হয়ে গেলেন। ছাত্রদের নীরবতার মধ্যে রেখেই আরিফ স্যারও তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

দুই.
রিকশাটি বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। বাড়ির ভেতর থেকে অনেক মানুষের শোরগোলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আরেকটু এগোতেই দেখা গেল একদল মানুষ জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশাটি জটলার কাছাকাছি হতে না হতেই জটলার ভেতর থেকে কেউ একজন প্রায় চিৎকার করে ওঠে,
– ওই তো দীনেশ এসে গেছে।
সেই চিৎকারে দীনেশের বুকটা ধড়াস করে ওঠে। স্কুলে সেই আলীম স্যারের রুম থেকেই দীনেশের বুকে দুরুদুরু কাঁপন শুরু হয়েছে। এখন আর সেই দুরুদুরু কাঁপন নেই। আশঙ্কা আর আতঙ্ক তার বহুগুণ বেড়ে গেছে। জটলার লোকটার চিৎকার শোনার পর দুরুদুরু কাঁপন ধড়াস ধড়াস কম্পনে পরিণত হয়েছে। দীনেশের বেগতিক অবস্থা টের পেয়ে পিয়ন খলিলুর রহমান ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছেন। রিকশাটি মানুষের জটলা পার হয়ে যাওয়ার সময় জটলার ভেতর থেকে একজনের কণ্ঠ যেন তীরের ফলার মতো দীনেশের হৃৎপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে যায়। লোকটা বলছিল,
– আহারে অনিমেষের মতো মানুষটাকে এভাবে মেরে ফেললো!
দীনেশের বুকে সাগরের এক বিশাল ঢেউ এসে যেন আছড়ে পড়ল। তার কচি বুক এত বড় ঢেউয়ের আঘাত সহ্য করতে পারছে না। বুকটা তার ভেঙে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে যেন। চোখে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার। পিয়ন খলিলুর রহমানের বুকের কাছে দীনেশের মাথাটা যেন চট করে লুটিয়ে পড়ছে। কাঁচা রাস্তা দিয়ে রিকশাটা এগিয়ে যাচ্ছে বাড়ির ভেতরের দিকে।

বাড়ির ভেতরে মানুষের হইচই শোরগোলের মধ্যেই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে রোনাজারি। এরই মধ্যে বেশ ক’জন ছুটে এসে দীনেশকে পাঁজাকোলে করে রিকশা থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। পিয়ন খলিলুর রহমান রিকশাওয়ালাকে রিকশাটি স্কুলের দিকে ঘুরিয়ে দিতে বলে। সে রিকশাটি ঘুরিয়ে নেয়।
দীনেশকে পাঁজাকোলে নিয়ে লোকগুলো ওর দাদি আর মা যেখানে বসে রোনাজারি করছেন সেখানে নিয়ে যায়।
দীনেশকে দেখেই ওর মা আর দাদি দু’জনেরই কান্নার রোল হঠাৎ প্রবল আকার ধারণ করে। কান্নার সেই রোল বাতাসকে এতটাই ভারি করে তোলে যাতে উপস্থিত নারী- পুরুষ সবাই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মা আর দাদি দীনেশকে জড়িয়ে ধরে এমন হাহাকার শুরু করেন যাতে উপস্থিত লোকজনের কারো মুখেই কোনো কথা সরে না।
সেই সকালে অনিমেষের লাশ পাওয়া গেছে একটি খালের ধারে। যেখানে অনিমেষের লাশ পাওয়া গেছে সেই জায়গাটা দীনেশদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। স্থানীয় লোকজন অপরিচিত এক মানুষের লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে লাশটি নিয়ে যায়। অনিমেষের বুক পকেটে থাকা পরিচয়পত্র দেখে লাশটি শনাক্ত করে পুলিশ। তারপর বাড়িতে খবর পাঠায়। সঙ্গে সঙ্গেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে খবরটি। খবর চলে যায় দীনেশের স্কুলেও।

অনিমেষ থানা শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নাইট গার্ডের চাকরি করতেন। সন্ধ্যা নামার আগেই তার বাড়ি থেকে বাইসাইকেলে চেপে দুই মাইল দূরে থানা শহরে চলে যেতেন। আবার সকাল হলেই ফিরে আসতেন বাড়িতে। ফজরের আজান হলেই অনিমেষের ডিউটি শেষ হয়ে যেত। তার স্থানে অন্য গার্ড এসে ডিউটি করতেন। মাঝে মাঝে অন্য গার্ডের সঙ্গে ডিউটি পরিবর্তন করে নিতেন অনিমেষ। রাতের পরিবর্তে দিনেও ডিউটি করতেন। কিন্তু তার নির্দিষ্ট ডিউটি ছিল রাতেই।
গতকালও সন্ধ্যা নামার আগেই দীনেশ আর তার ছোট বোনটিকে আদর করে বাড়ির উঠান থেকেই সাইকেলে চেপে বেরিয়ে গেছেন অনিমেষ। সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে বৃদ্ধা মাকেও একবার ডাক দিয়ে গেছেন অনিমেষ।
– মা, মা, আমি গেলাম। সব দিকে খেয়াল রেখো।
দীনেশের দাদি বাড়ির উঠানে বসেই কিছু একটা কাটাকুটির কাজ করছিলেন। বৃদ্ধা ঘাড় তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
– বাবারে, সাবধান থাকিস। ভগবান তোর মঙ্গল করুন।
সেই যে গেল অনিমেষ, এখনও আর বাড়ি ফেরেনি। সকাল থেকেই তার বৃদ্ধা মা ছটফট করছিলেন। দীনেশ যখন ওর স্কুল ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির উঠান পার হচ্ছিল স্কুলের উদ্দেশে, তখনও বৃদ্ধা উসখুস করছিলেন,
– তোর বাপটা এখনও ফেরেনি। সকালে তো ওর কোনো কাজ থাকে না। আজ এত দেরি করছে কেন রে?
দীনেশ জানে ওর বাবা মাঝে মাঝে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে একটু দেরি করেই বাড়ি ফেরেন। রাস্তাঘাটে ঘনিষ্ঠ কারো সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে চা-দোকানে বসে একটু চা-পান খেয়ে, গাল-গল্প করেই তারপর বাড়ি ফেরেন। সে কারণেই দাদির কথা গায়ে না মেখেই সে স্কুলে চলে যায়।

ময়নাতদন্তের জন্য অনিমেষের লাশ নিয়ে গেছে পুলিশ। ভালো মানুষ অনিমেষের খুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে পাড়া-প্রতিবেশী হিন্দু-মুসলমান সবাই অনিমেষদের বাড়ির ছোট্ট উঠানটাতে এসে জড়ো হয়। জীবিত অনিমেষ ফেরেনি বাড়িতে। ফিরবে না আর কোনো দিন। আজই তার লাশ নিয়ে আসবে পুলিশ। এ লাশ হস্তান্তর করা হবে অনিমেষের বৃদ্ধা মা ও তার স্ত্রীর কাছে। সে অপেক্ষায় পাড়া-প্রতিবেশীরা এখনও বসে আছেন দীনেশদের ছোট্ট বাড়িটার আঙিনা ও পাশের রাস্তায়।    (চলবে)

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply