Home নাটিকা সাইকেল

সাইকেল

হুসনে মোবারক

Natok-Mubarokদৃশ্য-১
সকালবেলা পার্কে মধ্যবয়স্ক দিনমজুর তোফাজ্জল হোসেন ও তার পুত্র মারুফ প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছেন। আরো কিছু মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে। সালাম ও কুশলাদি বিনিময় হচ্ছে। এক সময় পুত্র ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। হঠাৎ একটা পাখির দিকে দৃষ্টি যায়। মনে হচ্ছে সকালের শুভ্রতায় পাখিটা যেন ছেলেটিকে অভিবাদন জানাচ্ছে। বাবার ডাকে সম্বিত ফিরে পায় সে।

তোফাজ্জল হোসেন : মারুফ, চলো বাবা ফিরে যাই।
মারুফ : বাবা, পাখি কথা বলতে পারে?
তোফাজ্জল হোসেন : হ্যাঁ, পারে।
মারুফ : তাহলে আমরা বুঝি না কেন?
তোফাজ্জল হোসেন : (হেসে) পাখির কথা পাখি বুঝে। যেমন আমার কথা তুমি বুঝছ।
মারুফ : পাখির কি বাবা আছে?
তোফাজ্জল হোসেন : (হাঁটা থামিয়ে) হ্যাঁ, পাখির বাবা আছে, মা আছে, ভাইবোন আছে।
মারুফ : ওরা খাবার পায় কোত্থেকে?
তোফাজ্জল হোসেন : যিনি পশু-পাখি সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকন।
মারুফ : আমরা পাখির মত উড়তে পারি না কেন।
তোফাজ্জল হোসেন : কে বলেছে আমরা উড়তে পারি না। এই দেখ উড়– উড়–, হাত প্রসারিত করো। উড় উড়–…।
(বাবা ছেলে দু’ হাত প্রসারিত করে উড়তে দৌড়াতে থাকেন। পার্কে ভ্রমণরত অন্যান্য মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।)
মারুফ : বাবা, আমার সাইকেল।
তোফাজ্জল হোসেন : তোমার ভাইতো বলেছে, এবার আসার সময় সাইকেল নিয়ে আসবে।

দৃশ্য-২
(মারুফ স্কুলের পোশাক পরা একাকী বসে আছে। তোফাজ্জল হোসেন বাড়িতে ঢোকেন। মারুফ নিশ্চুপ।)

তোফাজ্জল হোসেন : চলো বাবা, স্কুলের সময় চলে যাচ্ছে।
মারুফ : (মারুফ চুপচাপ বসে আছে মুখভার করে। কোনো কথা বলছে না।)
তোফাজ্জল হোসেন : বললাম তো। তোমার ভাইয়া পরশু আসবে।
মারুফ : আমার সাইকেল…।
তোফাজ্জল হোসেন : হ্যাঁ, আমার সাথে কথা হয়েছে। এবার টিউশনির টাকা পেলেই সাইকেল কিনে আনবে।
মারুফ : সেটা তো আগের বারও বলেছে।
তোফাজ্জল হোসেন : (বাবা কোনো কথা বলেন না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা বলেন) কী করবে বলো, ভাগ্যটাই খারাপ, তোমার জন্ম হয়েছে হতদরিদ্র হতভাগা এক দিনমজুরের ঘরে। আমার তো আর এতো টাকা নেই যে চার-পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে তোমাকে সাইকেল কিনে দেবো।
মারুফ : আমার বন্ধুরা সবাই সাইকেলে চড়ে আসে, লজ্জায় আমি ওদের সাথে কথা বলতে পারি না। ওদের স্কুল ড্রেসও অনেক। আর আমাকে একটা ময়লা কাপড় প্রতিদিন পরে যেতে হয়। আমাকে দেখে সবাই হাসাহাসি করে।
তোফাজ্জল হোসেন : তোমাকে তো আর সবার মতো হলে চলবে না। ওরা ধনী মানুষ। অনেক পয়সার মালিক ওদের পিতা-মাতা। মন দিয়ে পড়ালেখা করো বাবা, তোমারও একদিন হবে ইনশাআল্লাহ।

(মারুফ মন খারাপ করে একাই স্কুলের রাস্তার দিকে হাঁটা শুরু করে। তোফাজ্জল হোসেন পেছন থেকে ডাকেন।)
তোফাজ্জল হোসেন : কোথায় যাচ্ছ একা, আমিও তোমার সাথে যাবো। চলো স্কুলে যাবে-মারুফ…।
(মারুফ চলে যায়। তোফাজ্জল হোসেন মারুফকে ফেরাতে না পেরে বাড়িতে ফিরে আসেন। মোবাইল বেজে ওঠে। তোফাজ্জল হোসেন ফিরে এসে মোবাইল রিসিভ করেন।)
তোফাজ্জল হোসেন     : আসসালামু আলাইকুম। কে.. সাবিত…। কেমন আছ বাবা?
আলহামদুলিল্লাহ। ভালো। বাবা মারুফ কোথায়।
তোফাজ্জল হোসেন : ওতো রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। সাইকেলের জন্য মন খারাপ।
বাবা, আমি বোধ হয় এবারও সাইকেল কিনে আনতে পারবো না। এই মাসে আমার দুইটা টিউশনিই চলে গেছে। পড়ার চাপের কারণে নতুন টিউশনি খোঁজাও সম্ভব না।
তোফাজ্জল হোসেন : না ঠিক আছে, এটা নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করা লাগবে না। তুমি মন দিয়ে পড়ালেখা করো। ও ছোট মানুষ। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
সাবিত : পরীক্ষাটা হয়ে যাক। এবার আমি মারুফকে সাইকেল কিনে দেবোই ইনশাআল্লাহ।

দৃশ্য-৩
মারুফ স্কুলের পথে না গিয়ে দূরে একটি মাঠের কোনায় বসে আছে। স্কুলের ব্যাগ, গায়ের জামা, জুতা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। দূর থেকে দেখা যায় স্কুলের রাস্তা। সে দেখতে পাচ্ছে তার বন্ধুরা স্কুলে যাচ্ছে। কেউ সাইকেলে চড়ে, কেউ বা পায়ে হেঁটে। একটা কাক মারুফের পাশ থেকেই কা কা করে চেঁচাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন তাকেই ডাকছে।

মারুফ : কী ব্যাপার, এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন? যাও এখান থেকে..।
কাক : (মারুফকে অবাক করে দিয়ে সত্যিই কাকটা কথা বলতে শুরু করলো) কোথায় যাবো। আকাশের নিচে এই বিস্তৃত মাঠে তোমার যেমন অধিকার আছে বসার আমারও অধিকার আছে। আমার ইচ্ছে আমি কা কা করবোই- কা কা কা কা..।
মারুফ : (কাকের কথা শুনে মারুফ ভয় পেয়ে যায়।) কী ব্যাপার তুমি কথা বলতে পারো ? একেবারে মানুষের মতো!
কাক : কেন, কাক বলে কী কথা কথা বলতে পারবো না?
মারুফ : না, আমি সেটা বলিনি । তুমি কি আমাদের মতো কথা বলতে পারো?
কাক : যে স্রষ্টা তোমাকে বানিয়েছেন, সেই স্রষ্টা তো আমাকেও বানিয়েছেন। সুতরাং তুমি কথা বলতে পারলে আমি পারবো না কেন?
মারুফ : না, তা ঠিক আছে। তাহলে আল্লাহ কি সবাইকে সমানভাবে সবকিছু দেন।
কাক : সমানভাবে দেবেন কেন। যাকে আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তার প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে সে-টা দিয়েছেন। এই যেমন আমার পাখা আছে, আমি উড়তে পারি, যেখানে খুশি যেতে পারি। কিন্তু তুমি সে-টা পারো না।
মারুফ : হ্যাঁ, তোমার মতো উড়তে পারলে কতই না মজা হতো! আমি উড়ে উড়ে স্কুলে যেতে পারতাম। সবার আগে আমি স্কুলে পৌঁছতাম !
কাক : এতে দুঃখের কিছু নেই।
মারুফ : আমার দুঃখ তুমি বুঝবে কী করে। আমার বন্ধুদের সবার সাইকেল আছে। ওরা সবাই সাইকেলে চড়ে স্কুলে যায়। ওরা অনেক ধনী মানুষ।
কাক : ওই যে বললাম যার যা প্রয়োজন আল্লাহ তাকে তা দেন।
মারুফ : কই আমার তো সাইকেল নেই। কিন্তু সাইকেল আমার খুবই প্রয়োজন। তোমাকে পাখা দিয়েছেন তুমি উড়তে পারো।
কাক : মন খারাপ করো না। তোমাকে আল্লাহ বুদ্ধি দিয়েছেন। আর এই বুদ্ধি দিয়ে মানুষ অনেক কিছু করতে পারেন। এই যেমন ধরো আমাদের বুদ্ধি নেই। যার কারণে আমরা যখন কোনো খাবার লুকাই তখন নিজেদের চোখ বন্ধ করে লুকানোর চেষ্টা করি। আমরা মনে করি, আমার চোখ বন্ধ মানে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু এটা তো আমাদের বোকামি। কিন্তু মানুষ তো অনেক বুদ্ধিমান।
(হঠাৎ একটি বিকট শব্দে কাকটি উড়ে চলে যায়। মারুফ তাকিয়ে দেখে তার স্কুলের রাস্তায় কী যেনো হাঙ্গামা হচ্ছে। কাকের সাথে কথা বলে মারুফের মনটা ফুরফুরে লাগছে। মারুফের দৃষ্টি পড়লো-রাস্তায় হাঙ্গামার পাশ দিয়ে ক্র্যাচে ভর করে মারুফের চেয়ে কম বয়সী একটি ছেলে স্কুলে যাচ্ছে। মারুফের মনে ভাবান্তর ঘটে।)

দৃশ্য-৪
(তোফাজ্জল হোসেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারায় বাড়ির সামনে বসে আছেন। মারুফ বাইরে থেকে এসে নিশ্চুপভাবে পিতার পাশে এসে দাঁড়ায়।)
মারুফ : বাবা, আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে মাফ করে দাও । আমার সাইকেল লাগবে না।
তোফাজ্জল হোসেন : সারা দিন কোথায় ছিলে, স্কুলে যাওনি কেন?
মারুফ : আমার ভুল হয়ে গেছে…। আমার তো দু’টি পা আছে। কিন্তু বাবা, আমার চেয়ে ছোট একটি ছেলেকে দেখলাম-যার একটি পা নেই। ক্র্যাচে ভর দিয়ে সে স্কুলে যাচ্ছে। আমার তো পা আছে, ওর তো পা-ই নেই। আমার সাইকেল লাগবে না.. বাবা।
(মারুফ কাঁদতে থাকে। ছেলের এই উপলব্ধিতে তোফাজ্জল হোসেনের দুই চোখে আবেগে পানি চলে আসে । নিজেকে আরো বেশি অসহায় মনে হয় এই মুহূর্তে ছেলের সামনে।)
তোফাজ্জল হোসেন : চলো বাবা ঘরে চল, সেই কখন খেয়েছ, খাবে চলো…।

SHARE

Leave a Reply