Home সায়েন্স ফিকশন ইন্টারোগেশন ল্যাবরেটরি

ইন্টারোগেশন ল্যাবরেটরি

নাজমুস সায়াদাত

Labretoryঠকাস করে বিয়ারের ক্যানটা টেবিলের উপর রাখলো বোমা ইদ্রিস। গত বছর বোমা বানাতে গিয়ে নিজের ঘরের টিনের চালাসহ ওর ডান হাতের কবজি উড়ে গেছে। সেই থেকে ওকে সবাই বোমা  ইদ্রিস নামে ডাকে। বর্তমানে সে তার দলবল নিয়ে অবস্থান করছে পূলের হাট বসতির একটা খুপড়ী ঘরে। একটু আগেই মতিঝিলে একটা ব্যাংক লুট করেছে ওরা। লুটের মাল ভাগ বানোয়ারা চলছে। লুট করতে গিয়ে বোমা ইদ্রিস ওর বাম হাতে ট্রিগার টিপে এলোপাতাড়ী গুলি চালিয়েছিল কয়েকজন প্রহরীর উপর। এখনও সে নিশ্চিত না যে, কতজন আহত অথব নিহত। কাল সকালের পত্রিকার পাতা অথবা টিভি রেডিওর নিউজ এখন ভরসা। বোমা ইদ্রিসের এই মুহুতেৃ সবচেয়ে বেশী রাগ হচ্ছে জ্যাকেট মানিকের উপর। ‘কোৎ’ করে ঢোক গিলে সে জ্যাকেট মানিকের দিকে তাকালো। বিয়ারের শেষ টুকু পেটে চালান দিতে গিয়ে মনে হয় তারখুব কষ্ট হলো। জ্যাকেট মানিক লুটের মাল ভাগে এর আগেও বাগড়া দিয়েছে। এই অপারেশনে অবশ্য ওকে বাদ দিয়েই টিম গঠনের সিদ্ধান্ত ছিলো বোমা ইদ্রিসের কিন্তু বড় ভাইয়ের নির্দেশে ওকে সাথে নিতে বাধ্য হয়েছে সে। বড় ভাইকে ব্যাপারটা জানাতে হবে। লুটের মালে টাকা ভাগবানোয়ারার সময় বারবার অনাকাক্সিক্ষতভাবে দাবী করে বসছে এই জ্যাকেট মানিক । এর একটা উচিৎ বিহিত হওয়া দরকার। চেখের সানগ্লাসটা সাঁৎ করে ঠেলে দিলো বোমা ইদ্রিস। জ্যাকেট মানিকের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাজ বলছে জ্বলে উঠবে সে, হলোও তাই।
‘সবাই যা পাবে তুইও তাই পাবি মাইনকা।’
বোমা ইদ্রিসের কথাটাকে গুরুত্ব দিলো না জ্যাকেট মানিক। ঠোঁট উল্টে বললো, বললেই হলো। তোর ভাগে তাহলে বেশী ক্যান!’ একথাটার জবাবটা মুখে না দিয়ে রিভলবার দিয়ে দিতে চাচ্ছে বোমা ইদ্রিস। বাম হাতটা নিশপিশ করছে। কোমর থেকে শুধু বের করা আর জ্যাকেট মানিকের খুলি বরাবর ধরে ট্রিগার টেপা। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার।
‘তোরা ঝগড়া করস ক্যান! সমঝে কাম সারবার পারস না?’ ঢাকাইয়া পোলাগলাকাটা বাচ্চু মাঝখানে থেকে বলে উঠলো। লুটের টাকার দুটো বাণ্ডিল হাতে নিয়ে নিজের মনে তাস পিটাচ্ছে সে। ওর পাশে আরো দুজন বসে মজা দেখছে।  ঠিক এই মুহূর্তে ঝট করে ঘরে ঢুকলো বসতির এক মধ্যবয়সী মহিলা। যাকে সবাই ফেন্সি খালা বলে ডাকে। ফেন্সিডিল ব্যাবসায় সে সর্দারনী। ‘ডিবি রেইড দিছে।’

ফেন্সি খালার মুখের কথা শেষ না হতেই যেন জায়গাটাই হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। যে যার আগে পারে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। গালাকাটা বাচ্চু টাকাগুলো বস্তায় ভরে ফেলতে সময় নিলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সে তাকিয়ে দেখে আর কেউ নেই। সবাই ভাগছে। বেড়ার ওপাশ থেকে বোমা ইদ্রিসের অনুচ্চ কণ্ঠ শুনতে পেলো সে। ‘বাচ্চু! তুই মাল রাখ। লাল দালানের তিনতলা।’ সিগন্যালটা বুঝে নিতে সময় লাগলো না গলাকাটা বাচ্চুর। বললো ‘পাস ওস্তাদ!
ঠিক এই মুহূর্তে গুলি শুরু হলো বসতির শেষ মাথায়। পাঁচজন ডাকাত পাঁচ দিকে ছিটকে গেছে। সম্ভবত নিজেকে সেভ করতে প্রথম গুলি করেছে জ্যাকেট মানকা। ভাবলো ইদ্রিস। সে জানে মানকার বুদ্ধিও একটু কম।
প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো একটু পরেই। নিজের রিভলভারে কাজ হবে না বুঝতেই পারছে ইদ্রিস। দৌড়ে ঝিলের ওপাশে পাঁচা কচুরিপানাসহ পানিতে নেমে পরেলো সে। ধরা পড়া যাবে না। এক হাত দিয়ে কচুরিপানা সরাতে লাগলো । হ্যাঁ পেয়ে গেলো সে।
একটা একে-৪৭। হাতে তুলে নিয়েই দৌড় শুরু করলো সোজা। ডিবি কতজন? বুঝতে চেষ্টা করলো। তার মাথায় ঢুকছে না এখানে পুলিশকে কে এনেছে! বিশ্বাসঘাতক সোর্সটা কে?
ওপাশে গোলাগুলি থেমে গেছে। একটু থেমে আবার দৌড় শুরু করলো ইদ্রিস। ঠিক তখনই একজন ডিবির চোখে পড়ে গেলো সে। পুলিশকে দেখে ফেলেছে ইদ্রিসও। ওর একে-৪৭ রাইফেল রেডি। আর ডিবি অফিসার তার রাইফেল কেবল তুলছে। সুতরাং ফল যা হবার তাই হলো ট্রিগার টিপে ইদ্রিস। গুলিতে ঝাজরা হয়ে গেল পুলিশ কর্মকর্তার বুক।
পালাতে হবে। ভাবলো ইদ্রিস। ধরা পড়া চলবে না। পুলিশকে খুন করছে সে ! সর্বনাশ! ওপাশে দৌড় আরম্ভ করলো বোমা ইদ্রিস।
দুই.
পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে জ্যাকেট মানিক। এখন সেলে ওকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশের ভাষায় এই অবস্থাটাকে বলে রিমান্ড।
জ্যাকেট মানিকের প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে। কিন্তু তাকে সরবরাহ করা হয়েছে ধুতরার রস। জ্যাকেট মানিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এগুলো গলায় ঢালবে কি না। হাত বাধা। খেতে চাইলে শুধু ইশারা। পাশে দাঁড়ানো সিপাহী ঢেলে দেবে গলায়। একজন অফিসার ইয়া বড় একটা স্টিক হাতে নিয়ে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে জ্যাকেট মানিকের সামনে এলো। এই ব্যক্তির সাথে জ্যাকেট মানিকের পরিচয় হয়েছে দুই ঘণ্টা আগেই। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তবে শীর্ণ দেহ। নাম একরামুল হক। ‘ধুতরার বিষ তৃষ্ণার সময় উপাদেয়। খেতে পারো।’ অফিসার একরামুল হক জ্যাকেট মানিককে বললো হাতে লাঠিটা ঘোরাতে ঘোরাতে।
জ্যাকেট মানিক বুঝল, রিমান্ডের আসর মজাটা শুরু হচ্ছে। নিজেকে সান্তনা আর প্রবোধ দিচেছ- ‘এখন বুঝবা মানকা। কত ধানে কত চিড়া!’ কিছু বুঝে উঠবার আগেই ঠকাস’ করে একটা প্রচন্ড লাঠির বাড়ি খেলো জ্যাকেট মানিক। ওরে মারে ওরে বাবারে বল চিৎকার দিলো সে। জীবনে অনেক বড় বড় অপরাধ করলেও সে আসলে ভীতুর ডিম। সত্য বলবা। শাস্তি কম। মিথ্যায় আবার ঠকাস। অফিসার একরামুল হক হাতের লাঠি ঘুরাচ্ছে। স্যার সত্য বলবো। ’ প্রথম চান্সেই একশত পার্সেন্ট নিশ্চয়তা দিয়ে দিলো জ্যাকেট মানিক।
‘ও স্যার গো!’ চিৎকার করে ঊঠলো জ্যাকেট মানিক। তার আবৃত্তির মত বলতে লাগলো ‘আমি নির্দোষ স্যার। আমাকে নিয়ে গোলো বোমা ইদ্রিস। তার সাথে পুরান ঢাকার গলাকাটা বাচ্চু। ওরা, ওরা।।’ বক বক করেই যাচ্ছে জ্যাকেট মানিক।

তিন.
লাল দালানের তিন তলা। গলাকাটা বাচ্চু সেখানে পৌঁছে হতভম্ব! সোফায় ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে বসে আছে জ্যাকেট মানিক। তাকে দেখে প্রথমে সে খুশি হলো। কানে এসেছিল ব্যাটা ডিবির হাতে ধরা খেয়েছে। ওটা তাহলে গুজব।
‘কিরে মাইনকা! ধরা কাস নাই।’ গলাকাটা বাচ্চু ঘরে ঢুকে পাশের সোফায় বসলো।
জ্যাকেট মানিক কথা বলছে না। চুপচাপ একটা সিনে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে।
‘কতা কস না ক্যান, বোবা হইছস? হোন ভাগ কিন্তু ওইটাই। ওস্তাদ আইতাছে।’
হাতে ব্যাগটা পাশে রেখে দিয়ে একটা সিগারেট ধরলো গলাকাটা বাচ্চু। পকেটের মোবাইল বাজছে। মোবাইল সিরিভ করলো। ‘ওস্তাদ। লাল দালানো আহেন! একটা জবর খবর ওস্তাদ, মাইনকা তো ধরন খায় নাই । এখানে বইসা ছারপোকা মারতাছে!’
ওপাশের কথা শুনে ‘হ ওস্তাদ’ বলে ফোনটা বন্ধ করল।
মাইনকা শোন ওস্তাদ আইতাছে। হের বড় ভাইয়ের লগে কতা হইছে। ওস্তাদ কইলো তুই নাকি ধরা খাইছিলি তয় ছাড়া পাইচস কেমনে এটি ওস্তাদ হিসাব মিলাবার পারতাছে না।’টিক এই সময় আবার  ফোন  এলো রিসিভ করে বললে ‘হ ওস্তাদ কন !
ওপাশের কথা শুনতে শুনতে ওর মুখ ফাকাশে হয়ে যায়। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা নিয়েই সে দৌড়াতে লাগলো। কিন্তু ততক্ষণে বেশ দেরী হয়ে গেছে। দেয়ালের ধারে লুকিয়ে থাকা সাদা পোশাকের পুলিশরা ঝাঁপিয়ে পড়তে সময় নিলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। গলাকাটা বাচ্চু শেষ চেষ্টা হিসেবে রিভলবারটা বের করলো। কিন্তু হাতে নাতে ধরা খেলো বেচারা। ট্রিগার টেপার আগেই একজন পুলিশ অফিসারের কারাতের চাল লেগে ঠাকাস করে রিভলবারটা পাড়ে গেল মেজেতে! কিছুক্ষণের ধস্তাধস্তির পর পুলিশ অফিসাররা ওকে হ্যান্ডকাপ পরাতে সক্ষম হলো।
হ্যন্ডকাপ পরতে পরতে গলাকাটা বাচ্চু অগ্নি দৃষ্টি চোখে জ্যাকেট মানিকের দিকে তাকালো। জ্যাকেট মানিক তখনও ওভাবেই সোফায় বসে সিনে ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছে। এত কিছুর কোনটায় তাকে স্পর্শ করছে না। গলাকাটা বাচ্চু চিৎকার করছে, মাইনকা! তোরে দিয়ে পুলিশ টেরেপ দিচে বুঝবার পারি নাই! তুই এর জন্য বহু পস্তাবি রে? মাইনকা…
‘চুপ’ ঠকাস করে মাথায় একটা বাড়ি খেলো গলাকাটা বাচ্চু । পুলিশের ঘা! সুতরাং চুপ হয়ে গেল।
‘চল’ ওকে হেচকা টান দিয়ে নিয়ে চলল পুলিশরা।
একটু পর জ্যাকেট মানিকের হ্যন্ডকাপ পড়ানো হলো। তারপর সবাই ঘর থেকে বের হয়ে এলো।

চার.
এখন পর্যন্ত কোন তথ্য দেয়নি গলাকাটা বাচ্চু। পুলিশের ইন্টারোগেশনের জন্য প্রচলিত সব কৌশল প্রয়োগ শেষ। বেদড়ক মারপিট, ইলেকট্রিক শক, নাকে গরম ঝাল পানি ঢুকানো। প্লার্স দিয়ে হাতের নোখ উপড়ানো সবই শেষ হয়েছে। পুলিশ অফিসার একরামুল হক ব্যর্থ। এখন তার সামনে একটা বুদ্ধি আছে। ব্যাটার গায়ের গোশত ক্ষুর বা কাঁচি দিয়ে কেটে তাতে লবন ঝাল মেশানো। কিন্তু ব্যাপারটা ভীষণ অমানবিক। গলাকাটা বাচ্চু খুব বড় মাপের কোনো অপরাধী না। সামান্য ব্যাংক ডাকাত। তার কাছে যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে তাও সমান্য। বোমা ইদ্রিসের বর্তমান ঠিকানা। তার জন্য এত বড় অমানিবিক শাস্তি! তবে অফিসার একরামুল হক আশ্চর্য হয়েছে গলাকাটা বাচ্চুর সহ্য ক্ষমতা এবং নার্ভের শক্তিমত্তা দেখে। তার নিকট থেকে তথ্য বের করাই যাচ্ছে না। ওদিকে উপর থেকে প্রতিনিয়ত চাপ আসছে বোমা ইদ্রিস ধরা পড়ছে না কেন?
একজন সেন্ট্রিরুমে প্রবেশ করে স্যালুট দিলো। স্যার বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার’
‘আসতে বলো’ নির্দেশ দিলো অফিসার একরামুল হক।
সেন্ট্রি চলে গেলো স্যালুট দিয়ে। প্রবশে করলো বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার।
সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় হলো।
খুব সুদর্শন চেহারার একজন মানুষ জাহিদ হায়দার। অফিসার একরামুল হকের বাল্যবন্ধু। বিদেশে ছিল বহু দিন।
‘তারপর দোস্ত! তোর এক্সিপেরিমেন্টের খরব বল?’
‘সাকসেস! এখন বল কাজ আছে না কি? ’
‘আছে মানে? একটা ছিটকে ডাকাত ধরেছি। কিন্তু মুখ তো খুলছে না।’ অফিসার একরামুল হক জানালো
‘প্রসেস করে আমার ইন্টারোগেশন ল্যাবে পাঠানো ব্যবস্থা কর তারপর দেখছি।
‘দেখি অফিসিয়াল অনুমোদন পেলে তোর ল্যাবেই পাঠাবো। ভালো একখান আবিস্কার কি বলিস! অপরাধীদেরকে সত্য বলানোর যন্ত্র।’

পাঁচ.
সকাল দশটা তেইশ।
ইন্টারোগেশন ল্যাবরেটরি। ফ্লোর থ্রি।
অফিসার একরামুল হকের নেতৃত্বে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে গলাকাটা বাচ্চুকে প্রবেশ করানো হলো।
ল্যাবের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে অপরাধ বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার। তার পরনে প্রোটেকটিভ স্যুট। গলাকাটা বাচ্চুর হাত পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। তারপর তাকে একটি সেন্সর চেয়ারে বসানো হলো। এটি মূলত একটা ডিভাইস। অফিসার একরামুল হককে ডাকলো বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার। তারপর তার দু’জন সহকারী অফিসার একরামুল হককেও প্রটোকটিভ স্যুট, ইনফ্লারেড গগলস; মাইক্রোফোন চিপ পরিধান করে দিলো। বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার বললো, ‘দোস্ত যা প্রশ্ন করবি কর। গলাকাটা বাচ্চু যা বলবে তার ভিত্তিতে আমি সত্য মিথ্যা নির্ণয় করে দিচ্ছি। তারপর আবার প্রশ্ন করবি।
প্রশ্ন : মতিঝিলে ডাকাতি করার সময় দলে কত জন ছিলো?
উত্তর: পাঁচজন।
বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার তার সামনে রাখা কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রাখলো। ওখানে লেখা উঠছে: ইনফ্রারেড ইমেজার্স চোখের অভিব্যক্তি = সত্য ১০০% মিথ্যা০%
স্ক্যানার- মগজের অভ্যন্তর অবলোকান= সত্য ১০০% মিথ্যা০% সেন্সর চিপ দেহের স্নায়ূতন্ত্রীর কম্পন = সত্য১০০% মিথ্যা০% এফএসসিএস বা ফ্যাকস-ফেসিয়াল একশন কোডিং সিসটেম= সত্য ১০০%মিথ্যা০% বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার অফিসার একরামুল হকের দিকে তাকালো। দোস্ত! গলাকাটা বাচ্চু একশো পারসেন্ট সত্য বলেছ। পরের প্রশ্ন কর।’
প্রশ্ন : পাঁচজন কে কে?
উত্তর : বোমা ইদ্রিস, জ্যাকেট মানিক, আর আমি। বাকী দুজনকে চিনি কিন্তু নাম জানি না।
কম্পিউটার : আটানব্বই পারসেন্ট সত্য। দুই পারসেন্ট মিথ্যা।
সমস্যা : স্ক্যানার মগজের অভ্যন্তর অবলোকন । সত্য ৯৮% মিথ্যা২%
বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার বললো, দোস্ত স্মরণ করলে ব্যাটা ওই দুইজনের নামও বলতে পারবে। স্বল্প পরিচিতিতো। এখন মনে করতে পারছে না। পরের প্রশ্ন কর।’
প্রশ্ন : বোমা ইদ্রিস এখন কোথায়?
উত্তর : জানি না।
কম্পিউটার : চল্লিশ দশমিক একষট্টি পারসেন্ট সত্য। ষাট দশমিক ঊনচল্লিশ পারসেন্ট মিথ্যা।
সমস্যা : ইনফ্রা/ চোখ: ১০০% মগজ স্ক্যান : ২০.২২%, সেন্সর স্নায়ু : ১০.১২% ফ্যাকস : ৩০.০৫%।
বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার তার সহকর্র্মীদরকে  নির্দেশ দিলো থেরাপী স্টার্ট।
সঙ্গে সঙ্গে হাজারো ফ্রিকুয়েন্সির রশ্মি ছুটে গেলো গলকাটা বাচ্চুর দেহের দিকে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো সে। তারপর শুরু হলো গোঙানি। কয়েক সেকেন্ড পর থামলো এর থেরাপী।
এবার তাকে আবারো প্রশ্ন করা হলো। উন্নতি হলো। এবং সত্যতা হলো একাশি দশমিক চুরনব্বই পারসেন্ট। পরের প্রশ্নে সেই স্থানে নামও বললো, গলাকাটা বাচ্চু । পুরান ঢাকার একটা গলির শেষ মাথায় বাড়ীটা। সেখানে একটা রুম ভাড়া নেওয়া আছে বোমা ইদ্রিসের। সঙ্গে সঙ্গেই ফোর্স পাঠানো হলো তাকে ধরবার জন্য।
আপাতত জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে বোমা ইদ্রিস ধরা পড়ার সংবাদ শোনবার জন্য। বিজ্ঞানী বন্ধুর দিকে তাকালো অফিসার একরামুল হক। ‘দোস্ত তোর এই জিজ্ঞাসাবাদ মেশিন কিভাবে কাজ করে?’
হাসলো বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার। তারপর যা ব্যাখ্যা করলো তা হচ্ছে।
প্রায় একশ বছর আগে অপরাধীদের মিথ্যা কথা শনাক্তকরণের জন্য ‘পরিগ্রাফ’ পদ্ধতি অবিষ্কার হয়। মিথ্যোবাদীরা মিথ্যে বলার সময় তাদের অভিব্যক্তি ও আচরণে শান্ত ও স্থিতিশীল থাকতে পারে না। চাপের মুখে পড়লে তাদের হার্টবিট বেড়ে যেতে দেখা যায়। শ্বাস প্রশ্বাসের গতিমাত্রা বাড়ে ও অতিরিক্ত ঘাম ঝরতে দেখা যায়। এই সমস্ত প্রকাশ্য লক্ষণগুলো শনাক্ত করে পরিগ্রাফ। কোনো কোনো সময় যন্ত্রটি সঠিক কাজ কর যেতে পারে ঠিকই কিন্তু একে বহু সময় ব্যর্থ হতেও দেখা যায়। তাছাড়া চৌকস মিথ্যেবাদীরা বাহ্যিক অভিব্যক্তি গোপন রাখার মাধ্যমে যন্ত্রটিকে ফাঁকি দিতে পেরেছে বহুবার। পরিগ্রাফের গুণগ্রাহী প্রচারকেরা দাবি করেন, যন্ত্রটি অপরাদের তদন্তে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর আগে মার্কিন ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স কোনো কাজের নয় বলে মেশিনটি খারিজ করে দিয়েছে।
তবে কেউ কেউ বলেছন, বন্দুকের নলের ডগায় সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিও ব্যর্থ হতে বাধ্য।
যাই হোক, কোনো কোনো শহর পরিগ্রাফ প্রযুক্তি এখনো ব্যবহারের পক্ষপাতী। কিন্তু অন্যেরা একের বর্জনীয় মনে করেন।
এরপর অপরাধী শনাক্তকরণের জন্য কয়েকটি যন্ত্র এসেছে। যেমন:  নো লাইএম আর আই: এটি আবিষ্কার করেছে সান ডিয়োগো। এর গ্রাহক মূলত শিল্পকারখানা বা সরকারী প্রতিষ্ঠানসমুহ।
সেফোস অব পেপেরল : এটিও মিথ্যা ধরার তদ্রƒপ একটি আবিষ্কার। ম্যাসচুসেটস এর এই যন্ত্র বিভিন্ন শপিং মল, বিমানবন্দর কিংবা স্পর্শকাতর পাবলিক সমাগমে ব্যবহারে হচ্ছে।
ডিওডিপিআই ক্যামেরা : এর মাধ্যমে অপরাধীর চোখের গতি প্রকৃতি শনাক্ত করে এলগারিদমের সাহায্যে তার বিশ্লেষণ করা হয়। এই প্রযুক্তিতে মিথ্যা যাচাইয়ের ৮৫ থেকে ৯২ শতাংশে সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
ফেসিয়াল একশন কোডিং সিসটেম : সান ফ্রান্সিসকোর মনস্তত্ত্ববিদ পল একমেন চেহারার ৪৬টি ভাব অভিব্যক্তির ১০হাজারের বেশী মাইক্রো একপ্রেশন ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। প্রক্রিয়াটির নাম ফেসিয়াল একশন কোডিং সিসটেম বা এফ এসসি এস। সংক্ষেপে ফ্যাকস। এই প্রযুক্তির ক্যাটালগের সাহায্যে ৭৬ শতাংশ প্রতারণা শনাক্ত করা যায়।
এই পর্যন্ত শোনার পর ছোটখাটো একটা হাই তুললো পুলিশ অফিসার একরামুল হক। বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দার বললো, দোস্ত এক কাপ করে কফি হয়ে যাক। ’
‘কফি পরে আগে খোঁজ নিই ফোর্সের অগ্রগতি কতদুর।’
ওয়ারলেসে যোগাযোগ করে সংবাদ যা শুনলো তাতে হতভম্ব! পুরান ঢাকার সেইগলির মাথায় বাড়ীর কক্ষটি একটি জুতার কারখানা। গত দশ বছর ধরে জুতা তৈরিতে কাজ হয়। কেউ ভাড়া নেওয়া তো দূরের কথা ওদিকে সাধারণরা ফিরেও তাকায় না শুধু সংশ্লিষ্টরা ছাড়া।
ব্যাপারটা বিজ্ঞানী বন্ধুকে জানাতেই ক্ষেপে লাল হয়ে গেল সে। ফের নির্দেশ দিলো গলাকাটা বাচ্চুকে ইন্টরোগেশনের। আবারও শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব।
নাহ মেশিন বলছে গলাকাটা বাচ্চুর তথ্যটা নব্বাই পারসেন্ট সত্য। একেরবারে মহা ধাঁধায় পড়ে গেল ওরা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা গেল বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দারের।
ফের কম্পিউটারে বসে গেল বিজ্ঞানী। প্রায় আধা ঘন্টা কসরতের পর উঠে এলো। কফিতে চুমুকে দিয়ে বন্ধুর দিকে তাকালো। ‘চল দোস্তা!’ প্রস্তাব করলো পুলিশ অফিসার বন্ধুকে।
‘পুরান ঢাকার ওই বাড়িটাতে!’ ভ্রু নাচালো পুলিশ অফিসার। ‘ইয়েস। মাথা ঝাঁকালো বিজ্ঞানী।
‘লেটস গো।’ উঠে দাঁড়ালো দুজনেই।

ছয়.
গাড়ীতে বসে বেশ চিন্তান্বিত দেখাচ্ছে বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দাকে। পুলিশ অফিসার জাহিদ হায়দার বললো, দোস্ত আমরা কি ব্যর্থ হবো? সামান্য একটা ছিচকে ডাকাত সর্দারকে ধরতে পারবো না।! দেশ উদ্ধার করবো ক্যামন্?ে’
‘রিলাক্স ফ্রেন্ড! যন্ত্র তো আর মিথ্যে বলবে না।’ নিজের ল্যাবের সাফাই গাইছে বিজ্ঞানী।
‘রাখ তোর যন্ত্র । কী সব উদ্ভট আবিস্কার। ওদিকে বোমা ইদ্রিস কি দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুরে আশিয়ান সিটিতে ফ্ল্যাট বানাচ্ছে। ক্ষেপে গ্যাছে পুলিশ অফিসার। ‘আচ্চা এই ব্যাটা গলাকাটা বাচ্চু যে সত্য বলছে তার প্রমাণটা কি?’
‘দেখ দোস্ত, বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, কোনো মিথ্যোবাদী ব্যাহ্যত নিজেকে যতোই শান্ত দেখাতে চেষ্টা করুক না কেন, নিজের মানসিক অবস্থাকে শান্ত রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মিথ্যে বলার বা লুকানোর চেষ্টা যখন চলতে থাকে তখন বাহ্যত নিজেকে শান্ত দেখানোর চেষ্টা যতোই নিখুঁত হোক না কেন, ব্রেইন কিন্তু শান্ত থাকতে পারে না। তার কসরত আরো  বেড়ে যায়। মিথ্যে যতো কঠিন, ব্রেইনের পরিশ্রম ততো বেশী। তখন ব্রইনে রক্ত সঞ্চারণে অতিরিক্ত প্রবাহের প্রয়োজন হয়। মগজের কর্টেক্স এর অনেকগুলো অঞ্চলকে এক সাথে কাজে নিয়োজিত হতে হয় মিথ্যে বলার সময়। কিন্তু তিনটি অঞ্চল এই কাজে সঙ্গ দেয় না। সেগুলোর একটি হলো এন্টিরিয়ার সিংগুলোট। এর কাজ হলো উদ্দেশ্য ও বাসনা’ কে নিয়ন্ত্রিত করা। অপরগুলো হচ্ছে রাইট আর্বিটাল বা ইন্টেরিয়ার ফ্রন্টাল ও রাইট মিডল ফ্রন্টার। সাধারন চিন্তার চেয়ে অতিরিক্ত হিসেবে প্রয়োজনীয় জটিল চিন্তা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ও আঞ্জাম দেয়া হলো এদের কাজ। এই তিনটি অঞ্চল যদি উত্তেজিত তাহলে মিথ্যে ধরা পরে। মিথ্যেবাদীর গোপন মানসিক অবস্থাকে উদঘাটন করার জন্য ব্রইনের সঙ্কেত প্রেরণ চিহ্নিত করা হয়। এই সঙ্কেত প্রদান প্রক্রিয়ার নাম ইভেন্ট রিলেটিভ পোটেনসিয়াল/ই আর পিএস। সঙ্কেতগুলো পাকড়াও করা হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকেট্রা এন সেফালোগ্রাম বা ইসি মেশিন ও ১২৮ টি সেন্সর পুরো চেহারায় মাথার খুলিতে স্থাপিত করার মাধ্যমে।
‘থাক দোস্ত আর থিউরি বুঝানোর দরকার নেই মাথা ধরছে, ওই যে সামনেই গলি।’ বিজ্ঞানী বন্ধুকে, বাঁধা দিলে পুলিশ অফিসার একরামুল হক।

পরিশিষ্ট
নজরুল সু ফ্যাক্টরি।
সাইন বোর্ডটা পুরনো। ওদিকে দৃষ্টি দিয়ে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকলো পুলিশ অফিসার একরামুল হক। সারি সারি হয়ে বসে কারিগরেরা জুতা তৈরিতে ব্যস্ত।
না, ফোর্সের তথ্যই সঠিক। বিজ্ঞানী জাহিদ হায়দারের তথ্য ভুল। মাথা ভীষণ খারাপ হলো তার। ফিরতে যাবার আগে সর্ব বামের কারিগরের দিকে নজর গেল।
একটা লোক। বয়স ত্রিশ বত্রিশ হবে। চুল লম্বা। পোস্টিং এর দায়িত্ব তার। হঠাৎ লক্ষ্য করলো এক হাতে কাজ করছে সে। অন্য হাতটা কাপড়ে লুকানো।
‘তুমি! নড়ার চেষ্টা করবে না…..। কথা বলেই হোল্ডার থেকে রিভলবার বের করে তাকে করলো পুলিশ অফিসার।
ততক্ষণে উঠে দৌড় আরম্ভ করেছে বোমা ইদ্রিস। পায়ে গুলি খেলো সে। তারপর লুটিয়ে পড়লো দরজার সামনে অনেকগুলো জুতার ডাইসের উপর।
ওপাশে চামড়ার লাগানোর জন্য রাখা গামের পাত্রটি উল্টে গেলো। গামগুলো ছিটকে পড়লো ওর উপর।
পুলিশ অফিসার একরামুল হক ওদিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড পর তার পাশে এসে দাড়ার বিজ্ঞানী বন্ধু জাহিদ হায়দার।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply