Home খেলার চমক কয়েকটি খেলার আদিকথা

কয়েকটি খেলার আদিকথা

 হাসান শরীফ

Booolনির্মল বিনোদন হিসেবে বিশ্বের সর্বত্রই খেলাধুলা প্রচলিত। পরিবেশ, পরিস্থিতির আলোকে খেলাধুলার প্রচলন ঘটেছে। ফলে পৃথিবীতে খেলার সংখ্যা কম নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৩০-৩৫টি খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ ছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে আরো অসংখ্য খেলা প্রচলিত রয়েছে। অবশ্য কোন্ খেলার কোথায় উৎপত্তি বা কখন জন্ম তা অনেকের জানা নেই। এখানে ফুটবল, ক্রিকেট, ফিল্ড হকি, চাকতি নিক্ষেপ ও লুডুর আদিকথা তুলে ধরা হলো।
ফুটবল
কোথা থেকে ফুটবলের সূচনা হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে নানা অভিমত। চীন, জাপান, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইতালি, মেক্সিকো এমনকি এস্কিমোদের মধ্যেও কোনো না কোনো ধরনের ফুটবল খেলার ইতিহাস দেখা যায়। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে লিখিত দলিলের ভাষ্যানুযায়ী তিন হাজার বছর আগে হান রাজবংশের সময়ে চীনারা ফুটবল খেলত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। চীনা সামরিক বাহিনীর উক্ত পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী ‘সু চু’ (ঃংঁ পযঁ) নামে একটি খেলা হতো এবং তাকে চামড়ার একটি বলকে ৩০ ফুটের দু’টি পোলের মধ্যে টানানো সিল্কের গর্তের মধ্যে পাঠাতে হতো।
৬০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জাপানি রাজদরবারে ‘কেমারি’ নামে একটি খেলা প্রচলন ছিল। কেমারি খেলায় একটি বৃত্তের চারদিকে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় দাঁড়াত এবং তারা লাথি দিয়ে বলটিকে অন্যের কাছে দিত, তবে বলটিকে মাটিতে পড়তে দিত না। গ্রিক এবং রোমানরাও পায়ের ব্যবহারের কিছু কিছু খেলা সম্পর্কে অবগত ছিল। রোমান লেখক সিসেরো একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যাতে দেখা যায় লাথি থেকে আসা একটি বল নাপিতের দোকানে ঢুকে পড়ে শেভ করার সময়ে একটি লোককে আঘাত হানলে সে নিহত হয়। এ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে প্রাচীন বিভিন্ন আদিবাসী সমাজে বল খেলার বিভিন্ন বর্ণনা দেখা যায়। আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যেও এ ধরনের একটি খেলার বর্ণনা দিয়েছেন ১৬১০ সালে উইলিয়াম স্ট্রাসি। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অত্যন্ত প্রাচীন আধুনিক ফুটবলের আকৃতির পাথরের বল আবিষ্কৃত হয়েছে। আলাস্কার এস্কিমোরাও ‘একসাকটুক’ নামের একটি খেলা খেলতো বরফ দিয়ে। তবে মধ্যযুগে ইউরোপ জুড়ে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ‘শ্রভেটাইড’ ফুটবল ম্যাচ দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। সম্ভবত রোমান অধিকারে থাকার সময়ে ইংল্যান্ডে খেলাটির প্রচলন ঘটে। তারপর দ্রুত তার রূপান্তর ঘটতে ঘটতে আজকের ফুটবলে পরিণত হয়।
ক্রিকেট
অন্যসব খেলার মতো ক্রিকেটও একদিনে বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়নি। এক বিরাট ইতিহাস আছে। অবশ্য ক্রিকেট নামক খেলাটি ঠিক কবে কিভাবে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায় না। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইংল্যান্ডের রাখাল ছেলেরা ক্রিকেটের জন্ম দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ক্রিকেট সম্পর্কিত প্রথম রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৩০০ সালে প্রিন্স এডওয়ার্ড প্রথম ও তার বন্ধু পিয়ের্স গ্যাভেস্টনের মধ্যকার খেলাটিকে। অবশ্য যদিও এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী রেকর্ডকৃত প্রথম ম্যাচটি হয়েছিল ১৬৪৬ সালে কেন্টের কক্সহার্থে। সতেরো শতকে গ্রাম্য অবসর বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু পরের শতাব্দীতেই ক্রিকেট বেশ মর্যাদা পেয়ে যায়। বিশেষ করে সাসেক্স, কেন্ট এবং ইংল্যান্ডে ক্রিকেট অভিজাত লোকদের মধ্যেও প্রচলিত হয়ে যায়। ১৭৩০ সালে লন্ডনের ফিনসবুরির আরটিলারি গ্রাউন্ডে একটি ম্যাচের আয়োজনও করা হয়।
১৭৬০ এর দশকে ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের হ্যাম্বেডনে প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিকেট ক্লাবের গোড়াপত্তন হয়। এই ক্লাবটি ক্রিকেট সম্পর্কিত বেশ কিছু নিয়মকানুনের প্রবর্তন করে এবং সেই সব নিয়মের কিছু কিছু এখনো প্রচলিত আছে। তাই ক্রিকেটের ইতিহাস খাতায় ‘ক্রিকেটের জন্মস্থান’ হিসেবে হ্যাম্বেডনের নাম উচ্চারিত হয়। মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) গোড়াপত্তন করেন থমাস লর্ড। লর্ডস গ্রাউন্ডেই এর সদর দফতর। ১৮৩৫ সালে এমসিসি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটের নিয়মকানুনের প্রবর্তন করে এবং এগুলোর অনেকগুলো এখনো প্রচলিত।
ফিল্ড হকি
সাধারণভাবে হকি বলতে ফিল্ড হকি খেলাকেও বোঝানো হয়ে থাকে। অনেক দেশে বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে আইস হকিও প্রচলিত। হকি খেলার সৃষ্টি হয়েছিল সম্ভবত মিসরে। প্রাচীন কিছু চিত্রলিপিতে হকি খেলার মতো কিছু খেলতে দেখা যায়। মিসর থেকে খেলাটি সম্ভবত রোমে পাড়ি জমায়। সেখান থেকেই তা ইউরোপে বিস্তৃত হয়। আধুনিক অলিম্পিক গেমসের শুরু থেকেই হকি জায়গা করে নেয়। সম্ভবত ফুটবলের পর এটাই ছিল একসময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগত খেলা। অবশ্য বর্তমানে খেলাটি ক্রমাগত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। এখন উপমহাদেশ ছাড়া ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন প্রভৃতি দেশে হকি খেলা জনপ্রিয়।
চাকতি নিক্ষেপ
গ্রিক কবি হোমারের আমলেও চাকতি নিক্ষেপ খেলার প্রচলন ছিল। তার অনেক লেখায় এই খেলার কথা উল্লেখ রয়েছে। আদিকালে গ্রিসে যে অলিম্পিক খেলা হতো তার বিশেষ পাঁচটি ইভেন্টের মধ্যে এই চাকতি নিক্ষেপ ছিল একটি। ১৮৯৬ সালে এথেন্সে পুনরায় অলিম্পিক শুরু হলে আধুনিক অ্যাথলেটিক্সের একটি ইভেন্ট হিসেবে চাকতি নিক্ষেপ আবার শুরু হয়। এ যুগে এমন দেশ পাওয়া কঠিন, যেখানে অ্যাথলেটিক্স আছে অথচ চাকতি নিক্ষেপ নেই। শর্টপুট, বর্শা নিক্ষেপের মতো চাকতি নিক্ষেপও এখন সব জায়গাতে কম-বেশি প্রচলিত। আগে অ্যাথলেটরা চাকতি নিক্ষেপ করতে একটা বেদিতে দাঁড়াত। পরবর্তীকালে ৭ ফুটের এক বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে চাকতি নিক্ষেপের নিয়ম চালু হয়। বৃত্তটি বর্তমানের আকার ধারণ করে ১৯১২ সালে।
লুডু
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালে রোমানদের মধ্যে এই খেলাটি প্রচলিত ছিল। যার নাম ছিল বার লাইনের খেলা। প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে মনে হয়, আদিকালের মানুষরা এক ধরনের বোর্ড গেম ব্যাক-গ্যামন খেলত, যেটা অনেকটা লুডুর মতো। একটি বোর্ড বা টেবিলের ওপর কিছু ঘুঁটি রেখে পাশে দু’টি ডাইস নিক্ষেপের ফলাফল দিয়ে বোর্ডে ঘুঁটি চালাচালি করা হতো। আদিকালে রোমানরা একটি খেলা খেলত, যাকে বলা হতো লুডস ডুয়োডেসিয় স্ক্রিপটোরাম (১২ লাইনের খেলা)। পশ্চিমের ব্যাক-গ্যামন খেলার সঙ্গে এর অনেক মিল। এ থেকেই লুডুর জন্ম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। হাল আমলে প্রাচ্যের ভূমধ্যসাগরীয় সাগর এলাকার দেশগুলোতে এ খেলাটি হয়ে থাকে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply