Home প্রচ্ছদ রচনা রূপসী রূপের পরী শরৎ

রূপসী রূপের পরী শরৎ

ড. রফিক রইচ

prochchedবাংলাদেশের সোনার খনি ছোট ছোট সোনারা তোমাদের শরতের শুভেচ্ছা জানিয়ে রূপসী রূপের পরী শরৎ দিয়ে দুই কলম লিখছি। লেখাটা না হয় সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা ছড়া দিয়ে শুরু করি। কারণ ছড়া পড়তেও ভালো লাগবে বুঝতেও তোমাদের জন্য সহজ হবে। তাহলে ছড়াটি পড়ে দেখ আগেÑ
শরৎ পরীর খোঁপায় গোঁজা সাদা শিউলি ফুল যে
সবুজ ঘাসের ডগায় দোলে মুক্তা শিশির দুল যে।
পুকুর ডোবায় পদ্ম ফোটে নদীর পাড়ে কাশফুল
রূপ ঝলমল চাঁদের আলোয় ঘোমটা টানে ধান ফুল।
আকাশটা হয় স্বচ্ছ ভীষণ বুকটা ভরা নীল
নীলের মাঝে সাদা মেঘে হাসেরে খিল খিল।
নেইতো কোথাও ঝড় বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম কাদা
এই আরামে শহর গ্রামে তাই কাজে নাই বাধা।
আশা করি ছড়াটি তোমাদের ভালো লেগেছে এবং শরতের মৌলিক বিষয়গুলো বুঝতেও পেরেছো। ঋতু বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমাদের এ অতুলনীয় দেশটি অনন্য। ঋতু বৈচিত্র্যের এমন প্রাচুর্য অন্য দেশে থাকলেও এত বেশি নয়। আমরা একটু গভীরভাবে প্রকৃতির দিকে তাকালে কোন সময় কোন ঋতু তা বুঝতে পারি সহজেই। এই বুঝতে পারাটাই ভালো। কারণ পরিবেশ ভালো থাকার প্রকট ইঙ্গিত বহন করে এতে। অন্য দিকে আমাদের দেশটা কৃষিনির্ভর। কৃষিনির্ভর দেশে ঋতুর এ বিচিত্রতা বা পরিবর্তন না হলে কৃষি কাজে ব্যাপক বিঘœ ঘটে। সঠিক সময়ে সঠিক ফলন পাওয়া যায় না। কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। কিন্তু একটি বিষয় না বললেই নয়, ইদানীং আমরা ঋতুর এ পরিবর্তন অনেকটা কম বুঝতে পারছি বা লক্ষ্য করছি। সেটা মূলত পরিবেশ দূষণের কারণেই হচ্ছে। বিশেষ করে মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউজ গ্যাস মিশে যাবার ফলে তাপমাত্রা পরিবর্তন হেতু জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এতে ঋতুগুলোর প্রকৃত রূপ আমাদের সঠিক সময়ে দেখতে বেগ পেতে হচ্ছে। কাজেই আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সচেতন থাকতে হবে। যেন আমাদের কারণে কখনই পরিবেশ দূষণ না হয়।
গত জুন সংখ্যায় আমার লেখা ‘পরিবেশ ও আমরা’ নিঃসন্দেহে পড়েছ। তাতে অনেক কিছু জেনে থাকবে।
যাহোক, আমরা গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত ও বসস্ত ঋতু এলেও যেমনই বুঝতে পারি তার চেয়েও বেশি করে বুঝতে পারি রূপসী রূপের ঋতু পরী শরৎকে। কারণ শরতের রূপ সৌন্দর্য কেউ দেখতে না চাইলেও প্রকৃতিই তাকে দেখতে বাধ্য করে। কারণ মানুষের মন সৌন্দর্য পিপাসু। সৌন্দর্যের কাছে মানুষের মনের মাথা অবনত থাকে সর্বদা। তা ছাড়া মানুষ সহজাতভাবেই একটু বেশি আরামপ্রিয়। শরতের সময় প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের বেশি বসবাস উপযোগী হওয়ায় এ সময়টাতে কাজকর্মের পরিমাণ বেড়ে যায়। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের কাজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এ ঋতুর জুড়ি নেই। তাই শরৎ হলো গড়ার ঋতু। শরতের চোখে শুধু গড়ার স্বপ্ন, গড়ানোর স্বপ্ন। বর্ষার উর্বর মাটিতে সবুজ সোনা ফলাতে আসে শরৎ। চারিদিকে শুধু নবীন চারার বিস্তার ঘটায় কৃষক। সবুজ ফসলে মাঠের পর মাঠ ভরে যায়। কৃষক দুই চোখে সোনালি স্বপ্ন বোনে। ভালো করে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার আশা বোনে। গ্রামের মতো শহরে মানুষগুলো কাজের পরিধি বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের উন্নয়ন ঘটানোর সাথে সাথে দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে এই শরতের আরামে। তাই নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর ঋতু এই শরৎ হওয়ায়Ñ এমনিতেই এ ঋতুকে সবাই দারুণভাবে উপলব্ধি করত পারে। আর যারা ভাবজগতের মানুষ তারা উপলব্ধি করে আরো বেশি করে। লেখালেখির জন্য লেখকরা এই শরতের কাছ থেকে অনেক উপাদান উপকরণ নিয়ে লেখালেখির কাজটা খুব সফলভাবে সেরে ফেলেন।
যাহোক, শরৎকে আমি বলছি রূপসী রূপের পরী। সত্যিই শরৎ রূপসী রূপের পরী। তোমরা তো লাল পরী, নীল পরী, সাদা পরী কত পরীদের নাম শুনেছ। কিন্তু কোনো পরীকেই বাস্তবে দেখনি কখনো। শরৎ বাস্তবেই রূপের পরী। সেটা শরতের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে। অবশ্য এটি শেষের দিকে বেশি দৃশ্যমান হবে। কারণ প্রথম দিকে কিছুটা বর্ষার রেশ থেকে যায়। কাজেই ভাদ্রের চাইতে আশ্বিনেই শরৎকে একেবারেই পরীর মতো মনে হবে। এ সময় উপরে বিস্তীর্ণ আকাশ এত গাঢ় নীল হয়ে যায় যে, তাতে চোখ আটকে যায়। এতো নির্ভেজাল পরিচ্ছন্ন আকাশ শরতের এ সময় ছাড়া আর কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। এই নীল আকাশের সিঁড়ি বেয়ে শরৎ পরী মেঘের শাড়ি পরে, মাথায় সাদা শিউলিফুল গুঁজে এবং কাশফুলের ধবধবে সাদা ডানায় প্রকৃতির সবুজ কার্পেটে আলতো করে নেমে আসে। পা দু’খানায় জড়িয়ে থাকে শিশিরের চকচকে নূপুর। হিমেল হাওয়ায় শরৎ পরীর কাশফুলের ডানা ও সাদা মেঘের শাড়ির আঁচল নরম করে দুলতে থাকে উড়তে থাকে। রাতে জোসনার ঝকমকে আলোর ফোয়ারা ও আকাশের রাশি রাশি নক্ষত্রের মিষ্টি উজ্জ্বলতায় শরৎ পরী হয়ে ওঠে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ও নান্দনিক। এমন শরৎ পরীকে দেখে কবি বলে ওঠেনÑ
আহা! এ-কি সৌন্দর্যের স্রোত
শরতের জ্যো¯œায় চড়ে এলো
স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে না কি
পৃথিবী থেকে ঐ স্বর্গে গেল।
তোমরা যারা এ পরীকে দেখতে চাও, তারা এ সময়টাতে প্রকৃতির দিকে গভীর করে তাকালেই দেখতে পাবে। তোমরা দেখার পরে অন্য বন্ধুদেরও দেখতে বলতে পার।
ছোট সোনামণিরা, এ সময়ে সকালের নরম সোনা রৌদ্রে আলোকিত হয়ে ওঠে প্রকৃতি। এ রোদ যখন হালকা বাতাসে দোল খাওয়া সবুজ ফসলের উপরে পড়ে তখন এক অভিনব ভালো লাগায় চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রামের পরে গ্রাম ফুরিয়ে গেলেও সোনা রোদে ছেয়ে যাওয়া সবুজের সমারোহ যেন ফুরিয়ে যায় না। এ প্রসঙ্গে কবি বলেনÑ
কোথায় এমন হরিৎ ক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে
এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।
আবার সূর্যাস্তের সময় দিগন্তের লাল নীলিমা ভরা আকাশ ও সূর্যের ডুবে যাওয়ার স্পষ্ট দৃশ্যটা তোমাদেরকে আলোড়িত না করে পারবেই না। বর্ষার পরেই যেহেতু এই ঋতু শুরু হয়, তাই রিমঝিমঝিম বৃষ্টির পানিতে কানায় কানায় ভরে থাকে খালবিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা। এগুলোর বুক ভরে থাকে নানা প্রজাতির মাছে। বিলে-ঝিলে ধবধবে বকের মাছ শিকারের দৃশ্য মনোরম। বদ্ধ পুকুরে নীরব নিস্তব্ধে পদ্মফুল ফুটে থাকে। খাল-বিল ও নদীর পার ঘেঁষে ফুটে থাকে সারি সারি কাশফুল। ঝিরঝিরে বাতাসে দুলতে থাকে কাশফুলের মাথা। এতে শরতের নমনীয়তা, ভদ্রতা, শালীনতা, ¯িœগ্ধতা ও মিষ্টতা প্রকাশ পায় যেন। শিউলি তলায় ভোরবেলাতে শিউলি ফুলে ভরে থাকে শিশিরভেজা সবুজ ঘাসের শীতল শরীর। শিউলির গন্ধে মন মেতে ওঠে, নেচে ওঠে। এ সময়ে শিউলি ও কাশফুল ছাড়াও মল্লিকা, বকুল, হিজল, টগর, জবা, পদ্ম, ঘাসফুল, কামিনীসহ নানান ফুল চোখে পড়ে। উদ্ভিদরাজি, বনবনানী সবুজে নেয়ে ওঠে যেন। মেঘমুক্ত আকাশে নীলের মেলায় মাঝে মাঝে ভিড় করে সাদা সাদা মেঘের নৌকা। কখনো কখনো সাদা সাদা বৃষ্টিহীন এ মেঘের নৌকাগুলোকে নীল আকাশের সমুদ্রে পাহাড়ের মতো দেখায়। রাতে ভরাট জোসনার আলোয় এ আকাশ দেখলে সৃষ্টিকর্তার কথা মনে হয়ে যায় দ্রুত।
বন্যপ্রাণীসহ নানা বর্ণের পাখিদের কাছেও এ সময়টা বেশ পছন্দের। কারণ এ সময়টা তাদের কষ্ট করে বানানো থাকার বাসাটি ঝড়ে ভেঙে যায় না। ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে ডিম ও বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে না। নিজেরাও ভিজে ভিজে হয় না একাকার। ঝড়ের কবলে পড়ে হারাতে হয় না আশ্রয়হীন সেবাহীন এসব প্রাণীর জীবন। চারিদিকে দোয়েল, কোয়েল ও বুলবুলিসহ নানা গায়ক পাখির গানে ও কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আশপাশ। বিশেষ করে এ সময় দোয়েল পাখির শিস বাজানোটা দারুণ! এক কথায় সৃষ্টিকুলের সহনীয় ও আদরণীয় সময় যাপনের সূত্রপাত ঘটায় এই ঋতুপরী শরৎ।
ছোট বন্ধুরা সব শেষে বলতে চাইÑ ঋতু পরী শরৎ হলো, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধির প্রতীক। সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। শান্তির প্রতীক। উজ্জ্বলতা, নির্ভেজাল পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক। শরতের নিকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরাও হয়ে উঠি পরিচ্ছন্ন, পবিত্র। কলহ-বিবাদ বাদ দিয়ে হই শান্তিপ্রিয় ও শান্তিকামী। হই কর্মপাগল, হই সৃষ্টিশীল। গড়ার স্বপ্ন আঁকি চোখে, মন ও মগজে।

SHARE

4 COMMENTS

Leave a Reply to Admin Cancel reply