Home স্মরণ শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক

শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

Fozluশেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের নাম আশা করি তোমরা সবাই শুনেছ। নির্যাতিত ও শোষিত জনগণের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের প্রাণপ্রিয় নেতা, সাহসী রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, সর্বভারতীয় মুসলিম নেতা, শোষিত বঞ্চিত মজলুম বাঙালি মুসলমানদের প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিত্ব শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। দক্ষ রাষ্ট্রশাসক, কলকাতার মেয়র (১৯৩৫) পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, গভর্নর ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক শেরেবাংলা তাঁর উপাধি। এ উপাধি তিনি কোনো রাজা-মহারাজার কাছ থেকে পাননি বরং কৃতজ্ঞ দেশবাসী আদর করে তাঁকে এ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক একটি নাম, একটি শতাব্দী এবং একটি ইতিহাস। অধিকার-স্বাধিকার-স্বাধীনতা তথা ন্যায়ের আদর্শ ও সত্যের চেতনায় উজ্জ্বল বাংলা-ভারতের মুসলমানদের তথা বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠতম মহান নেতা ছিলেন তিনি। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে নানার বাড়িতে এ মহান নেতা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ওয়াজেদ আলী। তিনি ছিলেন বরিশালের একজন নামজাদা আইনজীবী। মা সাইদুন্নেছা খাতুন জমিদার বংশের মেয়ে। পিতা-মাতার একমাত্র পুত্রসন্তান ফজলুল হক। তাঁর দাদা আকরাম আলী একজন সমাজনেতা ছিলেন। ফজলুল হকের দুই বোনের একজনের নাম বদরুন নেসা এবং অপরজনের নাম আফজালুন নেসা।
ফজলুল হকের প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িতেই শুরু হয়। পরে তিনি পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকে জুনিয়র মাদরাসায়। পরে ভর্তি হলেন বরিশাল জেলা স্কুলে। অসাধারণ ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি। একবার পড়লেই সব পড়া তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত। কোন বই তিনি একবারের বেশি পড়তেন না। ক্লাসে সবসময় তিনি হতেন প্রথম। ক্লাসে যেমন ছিলেন সেরা ছাত্র, তেমনি খেলার মাঠেও ছিলেন সেরা খেলোয়াড়। তার শরীরে ছিল অসাধারণ শক্তি। বিশাল ছিল তার বক্ষ, সুউচ্চ শির, শক্তিশালী দুটো হাত আর দুটো পা। তার সাথে গায়ের শক্তিতে এঁটে উঠতে পারে এমন সাধ্য কার।
১৮৮৬ সালে অষ্টম শ্রেণীতে তিনি বৃত্তি লাভ করেন এবং ১৮৮৯ সালে ফজলুল হক বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা বিভাগ থেকে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় এসে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৮৯১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। নিজের মেধার বলে ফজলুল হক প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের (১৮৬১-১৯৪৪) দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এফএ পাস করার পর তিনি গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ একই কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৮৯৩ সালে তিনি তিনটি বিষয়ে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। বিএ পাস করার পর এমএ ক্লাসে প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায়। পরীক্ষার মাত্র ছয় মাস আগে তাকে এক বন্ধু ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, মুসলিম ছাত্ররা মেধাবী না হওয়ায় গণিত নিয়ে পড়ে না। এ কথা শুনে ফজলুল হকের জেদ চাপে। তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, গণিতশাস্ত্রেই মাস্টার্স পরীক্ষা দেবেন। মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতিতেই তিনি গণিতশাস্ত্রে রেকর্ড নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। তারপর ১৮৯৭ সালে ফজলুল হক ডিস্টিংশনসহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ল’ কলেজ থেকে বিএ পাস করে আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৬৪-১৯২৪) অধীনে কলকাতা হাইকোর্টে যোগদান করেন। স্যার আশুতোষের অধীনে তিন বছর শিক্ষানবিসি করার পর ১৯০০ সাল থেকে স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসায় নামেন। এর এক বছর পরই ১৯০১ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। অতঃপর তিনি কলকাতা ছেড়ে বরিশালে এসে আইন ব্যবসায় শুরু করেন।
ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ১৯০৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহর (১৮৭১-১৯১৫) সহযোগী হিসেবে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, ফজলুল হক সে সম্মেলনে সাংগঠনিক কর্মকর্তা হিসেবে সমগ্র ভারতে সম্মেলনের প্রচারণায় সফর করেন। সম্মেলনে ফজলুল হক মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। এ সম্মেলন শেষে জন্ম হলো মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। ১৯০৬ সালে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। ডেপুটি ম্যাজিট্র্রেটের পদ দেয়া হলো তাঁকে। কিন্তু কয়েক বছর চাকরি করে মন তাঁর হাঁপিয়ে উঠলো। তিনি ১৯১২ সালে সে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন। একই সাথে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসাও শুরু করেন। ১৯১৩ সালের নির্বাচনে ঢাকা বিভাগীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রবল প্রতাপশালী জমিদার রায় বাহাদুর কুমার নগেন্দ্রনাথ মিত্রকে পরাজিত করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদ লাভ করেন। এ বছরই তিনি মুসলিম লীগেরও সদস্যপদ লাভ করেন। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। আর ফজলুল হক নির্বাচিত হলেন সাধারণ সম্পাদক। ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯১৫ সালে গঠিত হয় নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি। ১৯১৬ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে ফজলুল হক খিলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯২২ সালে ফজলুল হক খুলনা জেলা থেকে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি তিনি অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষামন্ত্রী হয়ে তিনি মুসলিমদের জন্য পৃথক শিক্ষা দফতর স্থাপন করেন। গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য আলাদা শিক্ষা তহবিল প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতায় একটি প্রথম শ্রেণীর কলেজ স্থাপন করেন, এর নাম হয় ইসলামিয়া কলেজ। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালায় তাঁর হাতে রাখেন। তিনি বাংলার লাখ লাখ কৃষকের মুক্তি প্রচেষ্টায় ৬০ হাজার ঋণ সালিসি বোর্ড গঠন করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি প্রজাতন্ত্র আইন পাস করেন। এ আইনানুসারে জমিতে জমিদারের পরিবর্তে প্রজার ভোগ দখলের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে আবুল কাশেম মজলুল হক তাঁর সুবিখ্যাত লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে পাকিস্তান আন্দোলন। ১৯৪৩ সালে গভর্নর হার্ভার্ডের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে বরিশাল ও খুলনা আসন থেকে শেরেবাংলা জয়লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৩ সালে হক-ভাসানী- সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৪ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত পূর্ববাংলা আইন পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় লাভ করলে শেরেবাংলা মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (৯.৩.১৯৫৬-৩১.৩.১৯৫৮) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলার দরিদ্র কৃষকদের মহাজনদের শোষণ থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার বাংলাদশের এ মহান নেতা ইন্তেকাল করেন। তাঁর লেখা একমাত্র গ্রন্থ ‘বেঙ্গল টুডে’ ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়।

SHARE

Leave a Reply