Home ফিচার ভয়ঙ্কর জেলিফিশ

ভয়ঙ্কর জেলিফিশ

মৃত্যুঞ্জয় রায়

Fishকখনো যদি কক্সবাজার সাগর সৈকতে বা কুয়াকাটার সৈকতে যাও, ভাগ্য ভালো (নাকি মন্দ!) হলে বালুর ওপর উবু হয়ে শুয়ে থাকতে দেখবে জেলিফিশদের। অনেকবারই আমি তা দেখেছি বলেই তোমাদের বলছি। তখন না বুঝে জেলির মতো থকথকে প্রাণীদের সেসব দলা কত যে ছেনেছি! এখন ভাবলে নিজেকে কী বোকাই না মনে হয়,! উফ! কত বিপদই না হতে পারত! কী ভয়ঙ্কর যে ওরা হতে পারে তুমি হয়তো তা ভাবতেই পারবে না। একটা সি ওয়াসপ বা বক্স জেলিফিশ এতটাই ভয়ঙ্কর যে ওর বিষ দিয়ে ৬০ জন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। বক্স জেলিফিশ হুল ফুটালে মাত্র ২ মিনিটের মধ্যে মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এ জন্য এই জেলিফিশদের বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর ও ভয়ঙ্কর প্রাণী। উফ! কী সাংঘাতিক প্রাণী ওরা! সাপের চেয়েও বিষাক্ত। এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষ প্রজাতির জেলিফিশ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জেলিফিশই মানুষকে আক্রমণ করতে পারে বা মানুষের জন্য বিষাক্ত। কোনো দেশের মানুষ আবার জেলিফিশ খায়!
নামে জেলিফিশ হলেও জেলিফিশ কিন্তু আসলে মাছ না, এক ধরনের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী। ওদের দেহ স্বচ্ছ জেলির মতো। এ জন্য ওদের সহজে পানির মধ্যে কেউ দেখতে পারে না বা ওরা শত্রুর কাছ থেকে সহজে লুকিয়ে থাকতে পারে। দেহের প্রায় ৯৫ ভাগই পানি, বাকিটা প্রোটিন। দেহ থেকে পানি বেরিয়ে গেলে জেলিফিশরা আর বাঁচে না। দেখতে ওরা ছাতা বা ঘণ্টার মতো। প্রাণী হলেও ওদের কোনো মাথা, ঘিলু, হৃৎপিণ্ড, ¯œায়ু, কান, নাক, হাত, পা, হাড় এসব কিচ্ছু নেই। দেহটা একটা খোলা ছাতার মতো। ছাতার নিচ থেকে রশি বা দড়ির মতো কিছু অঙ্গ বা বাহু ঝুলতে থাকে। ওগুলোকে বলে টেনট্যাকেল। এসব দিয়েই ওরা শিকার ধরে। টেনট্যাকেল বা বাহুগুলো হাজার হাজার কোষ দিয়ে গঠিত। এসব কোষের মধ্যে থাকে নিমাটোসিস্ট। এর ভেতরে থাকে পাকানো সুতার মতো হুল ফুটানোর মতো বিষাক্ত সুতা। শত্রু এলে স্প্রিংয়ের মতো এসব সুতা ছুড়ে তাদের ঘায়েল করে বা বিষ ছুড়ে দেয়। জেলিফিশের দেহ থেকে এসব সুতো ছিঁড়ে আলাদা হয়ে গেলেও তা বিষাক্ত হুলের মতো ফুটাতে পারে। এমনকি মরা জেলিফিশও বিষাক্ত হুল ফুটাতে পারে। সবসময় মৃত্যু না হলেও এতে জ্বালাপোড়া হয় ও আক্রান্ত জায়গায় লাল রঙের ক্ষত হয়। ভাগ্যিস সব জেলিফিশের বিষ নেই!
জেলিফিশ নেই এমন কোনো সাগর নেই। এমনকি মিঠাপানির কোনো কোনো পুকুর, হ্রদ ও নদীতেও ওদের দেখা যায়। ওরা সাধারণত অগভীর সাগরে ও উপকূলের কাছাকাছি থাকে। তবে সাগরের ৯০০০ মিটার গভীর তলদেশেও জেলিফিশ দেখা গেছে। কত বড় হতে পারে জেলিফিশ? কাঠপেন্সিলের পেছনে যে এক টুকরো রাবার থাকে, কোনো কোনো জেলিফিশের আকার ততটুকু হতে পারে। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম জেলিফিশ হলো ক্রিপিং জেলিফিশ। এর দেহ চাকতির ব্যাস মাত্র আধা মিলিমিটার থেকে কয়েক মিলিমিটার। আবার নমুরা জেলিফিশ এতো বড় যে তা দুটো নীল তিমির সমান বড় হবে। ভাবা যায় যে একটা জেলিফিশের বাহু ২০০ ফুট লম্বা আর ২২৫ কেজি ওজন! অস্ট্রেলিয়ার সাগরে ওরা থাকে। গত ১১০ বছরের মধ্যে ওদের মাত্র ১৭ বার দেখা গেছে। লায়ন জেলিফিশরাও অনেক বড়। এদের বলা হয় জায়ন্ট জেলিফিশ। দেখতে এ একটা আস্ত দৈত্যের মতো! জেলিফিশ একবার উল্টে গেলে আর ভাসতে পারে না। তখন তাদের আশ্রয় হয় সাগরের তলার মাটিতে।
জেলিফিশরা মাংসভোজী। ওরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জুপ্লাংকটন, মাছের ডিম ও রেণুপোনা, ছোট মাছ এমনকি অন্য জেলিফিশদেরও ওরা খায়। জেলিফিশের ছাতার মতো দেহের মাঝখান থেকে একটি খাটো নল বেরিয়ে নিচে ঝুলতে থাকে। ওটাই মুখ ও পরিপাকতন্ত্র হিসেবে কাজ করে। ওদের চামড়া এতো পাতলা যে তার মাধ্যমেই ওরা শ্বাস-প্রশ্বাস চালায়। ওদের ¯œায়ুতন্ত্র না থাকলেও ছাতার মতো দেহের উপরের পিঠে ¯œায়ুর মতো কিছু একটা আছে যা দিয়ে ওরা আলো বুঝতে পারে, মাধ্যাকর্ষণ টান ও কম্পন অনুভব করতে পারে, পানিতে কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতি টের পায়।
কখনো কখনো জেলিফিশরা ঝাঁকে ঝাঁকে আবির্ভূত হয়। তখন ওদের এই ঝাঁককে বলে ব্লুম, সোয়াম বা স্ম্যাক। এটি ঝাঁকে ৫০ কোটি জেলিফিশও থাকতে পারে। জাপান উপকূলের কাছে এরূপ এক ঝাঁক জেলিফিশের দেখা মিলেছিল যে ঝাঁকের এক একটা জেলিফিশের আকার ছিল একটি ফ্রিজের সমান। জেলিফিশ কিভাবে চলে? ওদের তো পা নেই যে হাঁটবে। ওরা ছাতার মতো দেহে পানি টেনে নেয়। পিচকারির মতো সেই পানি আবার বের করে দেয়। বেরিয়ে যাওয়া এই পানির ধাক্কাতেই ওরা সামনে এগিয়ে চলে। কাঁকড়ারা তো সাঁতার জানে না। তাই মাঝে মাঝে কাঁকড়ারা জেলিফিশের মাথায় সওয়ার হয়ে সাগরে ঘুরে বেড়ায়। কাঁকড়াদের দেহ শক্ত খোলসের ভেতরে থাকে। তাই জেলিফিশরা ওদের বিষাক্ত বাহু দিয়েও কাঁকড়ার কিচ্ছু করতে পারে না। বরং কাঁকড়ারা জেলিফিশের খাবারে অনেক সময় ভাগ বসায়।
জেলিফিশরা খুব দ্রুত বংশ বাড়াতে পারে ও তাদের আবাস গড়ে তুলতে পারে। ১৯৮২ সালে কৃষ্ণসাগরে কিছু কম্ব জেলিফিশ ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। পরিণতিতে ৮ বছরের মধ্যে সেসব জেলিফিশ সেখানে এমন এক কলোনি তৈরি করে যার ওজন দাঁড়ায় ৯০ কোটি টন। এতে সেখানকার মৎস্যসম্পদ ও পর্যটন শিল্পে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৫ কোটি লোকের সাথে জেলিফিশের সাক্ষাৎ ঘটে। এর মধ্যে শুধু ফ্লোরিডাতেই ২ লক্ষ লোক জেলিফিশের বিষাক্ত হুলের শিকার হয়। প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে অন্তত ২০০ মানুষ শুধু বক্স জেলিফিশের বিষে প্রাণ হারায়। পৃথিবীতে প্রতি বছর হাঙ্গর যত না মানুষ মারে, জেলিফিশ তার চেয়ে বেশি মানুষ মারে! জেলিফিশের সংখ্যা বেড়ে গেলে সেখানে আর কোনো মাছ থাকে না, ওগুলো হয়ে যায় মৃত অঞ্চল। পৃথিবীতে প্রায় ৪০০টি এ রকম সামুদ্রিক মৃত অঞ্চল ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।
জেলিফিশরা ইচ্ছে করলে নিজেদের দেহকে দুই টুকরো করে দুটো আলাদা জেলিফিশ হতে পারে। তা ছাড়া পুরুষ ও মেয়ে জেলিফিশ মিলে একই সময়ে অনেক জেলিফিশের জন্ম দিতে পারে। মেয়ে জেলিফিশ পানির মধ্যে প্রচুর ডিম ছেড়ে দেয়। পুরুষ জেলিফিশ সেসব ডিমের ওপর শুক্রাণু ঢেলে দেয়। এভাবে পানির মধ্যেই ডিমগুলো নিষিক্ত হয়ে জেলিফিশ বাচ্চার জন্ম দেয়। জেলিফিশ কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত বাঁচে। একটি একুইরিয়ামে পোষা জেলিফিশের ৩০ বছর পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। ঞঁৎৎরঃড়ঢ়ংরং হঁঃৎরপঁষধ প্রজাতির জেলিফিশরা অমর। কেননা, ওরা কখনো মরে না। মৃত্যুকে এড়াতে তারা কেবল রূপ বদলায়। পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণীগুলোর একটি হলো জেলিফিশ। প্রায় ৬৫ কোটি বছর ধরে জেলিফিশ পৃথিবীর সাগরে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply