Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী

দুর্গম পথের যাত্রী

আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

Khalikকাফেলা ফেরার পথে যখন মদীনার কাছে দিয়ে আসছিল তখন মুসলমানরা খবর পেয়ে কাফেলাকে ঘিরে ফেললো। কিন্তু আবু সুফিয়ান একজন মানুষ ও একটি করে উঠ পেছনের সঙ্কীর্ণ গিরিপথ দিয়ে বেষ্টনী থেকে বের করে দিয়ে কোনমতে আত্মরক্ষা করে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
খালিদের অশ্ব আপন গতিতে ছুটে চলেছে মদীনার দিকে। কিন্তু খালিদের চিন্তাস্রোত ঘুরপাক খাচ্ছে ফেলে আসা দিনগুলোর ঘটনাবহুল জীবনে পরতে পরতে। মনে পড়ছে তার,  কোরাইশরা প্রতিশোধের পরিকল্পনা তৈরি করতে সকলে একত্র হয়েছে। তারা যে যা বলেছিল সেদিন সব যেন খালিদ এখনো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
‘যদি তোমরা আমার নেতৃত্বে কাজ করতে চাও তবে আমার সকল সিদ্ধান্ত তোমাদের মেনে নিতে হবে। আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমার প্রথম সিদ্ধান্ত হলো, এবারের ব্যবসায় যে পঞ্চাশ হাজার দিনার লাভ হয়েছে সে অর্থ পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করা হবে না। লাভের এ সমুদয় অর্থ যুদ্ধ ফান্ডে জমা করা হবে এবং এ অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা হবে এমন এক বাহিনী, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধে অংশ নেবে। আমার এ সিদ্ধান্ত কি আপনারা সবাই মানতে রাজি আছেন?
সকলের আগে এর জবাব দিয়েছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি রাজি আছি।’ তার কথা শেষ হওয়ার আগেই চারদিক থেকে আওয়াজ উঠলো, ‘তাই করা হোক, তাই করা হোক।’
‘আমার দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হলো’ আবু সুফিয়ান আবার বললেন, ‘বদর যুদ্ধে আমাদের যে সকল লোক মারা গেছে তাদের জন্য সবাই আহাজারি করছে। আমি মেয়েদের করুণ সুরে বিলাপ করতে এবং পুরুষদের কাঁদতে শুনেছি। আল্লাহর কসম, যখন মানুষের চোখের পানি ঝরে যায় তখন প্রতিশোধের আগুন নিভে যায়, ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তাই আজ থেকে বদরের নিহতদের জন্য কেউ আর শোক করতে পারবে না।’
‘আমার তৃতীয় সিদ্ধান্ত, বদর যুদ্ধে আমাদের যে সকল লোককে মুসলমানরা বন্দী করে নিয়ে গেছে তাদের মুক্তির জন্য কোনো চেষ্টা করা হবে না। তোমরা সবাই জানো, মুসলমানরা বন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারিত করে ফেলেছে। জনপ্রতি এক হাজার হতে চার হাজার দেরহাম পর্যন্ত মুক্তিপণ ধার্য করেছে। আমরা মুসলমানদের একটি দেরহামও দেবো না, কারণ সে অর্থ ওরা আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবে।’
আবু সুফিয়ানের এসব সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল সবাই। ঘোড়ার পিঠে বসে সে কথা মনে হতেই খালিদের হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে গেল। চেহারায় ফুটে উঠল এক ধরনের যন্ত্রণা ও ক্রোধ। সেই রাগ ছড়িয়ে পড়লো তার সমস্ত অস্তিত্বে। তার রাগের অনেক কারণ ছিল। সিদ্ধান্ত ছিল, মুসলমানদের কাছে কেউ বন্দী মুক্ত করতে মদীনা যাবে না। কিন্তু দেখা গেল, গোপনে একজন মদীনা গিয়ে ফিদিয়া দিয়ে তার পিতাকে মুক্ত করে নিয়ে এলো। এর প্রভাব পড়ল অন্যদের ওপর। এরপর দেখা গেল প্রতি সপ্তাহে কুরাইশদের কেউ না কেউ গোপনে মদীনা চলে যাচ্ছে আর আপনজনকে মুক্ত করে নিয়ে ফিরে আসছে। এমনকি আবু সুফিয়ান নিজেও নিজের আদেশ লঙ্ঘন করে বসলো।
খালিদের সহোদর ভাই অলিদও মুসলমানদের কাছে বন্দী ছিল। যদি কুরাইশদের অনেক বন্দীকে সে সময় মুক্ত করে আনা না হতো, তবে খালিদ তার ভাইকে মুক্ত করতে কখনো যেতেন না। সবাই বন্দীদের মুক্ত করে আনতে দেখে তার অন্যান্য ভাইয়েরা তাকে বলল, ‘ভাই, অলিদের মুক্তির জন্য তুমি সেখানে যাও!’ খালিদ তার ব্যক্তিত্বকে খাটো করবে না এই সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন, কিন্তু তার মনে পড়লো, রাসূলে করীম (সা) তো তাদেরই গোত্রের লোক, আর যারা তাঁর অনুসারী হয়েছে সবাই তো তাদেরই লোক। তারাও কুরাইশ এবং মক্কার বাসিন্দা ছিল। তারা তো আর আকাশ থেকে নেমে আসেনি। তারা এমন কোনো শক্তিধর ছিল না যে, তিন শ’ তেরোজনে এক হাজার যোদ্ধাকে পরাস্ত করবে? এখন তাদের মধ্যে এমনকি শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে যে, আমাদের দুর্বল করে আমাদের কাছ থেকে নির্ধারিত মুক্তিপণ আদায় করছে?
তাঁকে এক নজর দেখব। খালিদ এই চিন্তাই করছেন, মুহাম্মদ (সা)কে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করব। তিনি চার হাজার দেরহাম সঙ্গে নিয়েছিলেন। তার জানা ছিল, বনু মাখজুম গোত্রের সরদার আল ওয়ালিদের পুত্রের মুক্তিপণ চার হাজার দেরহামের কম হবে না।
ঠিক তাই হলো। তিনি যখন মুসলমানদের কাছে গিয়ে তার ভাইয়ের মুক্তির আবেদন করলেন তখন যিনি বন্দীদের মুক্তি ও মুক্তিপণ আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন তিনি বললেন, এর মুক্তিপণ চার হাজার দেরহাম। মুক্তিপণ দিয়ে তুমি তোমার ভাইকে নিয়ে যাও।’
‘আমি মুক্তিপণের ব্যাপারে আরেকটু বিবেচনা করতে বলছি।’ খালিদের ভাই হেশাম আবেদনের সুরে বললো ‘তোমরা তো আমাদেরই লোক। অতীতের আত্মীয়তার কথা মনে কর।’
‘এখন আর আমরা তোমাদের কেউ নই।’ তিনি বললেন, ‘আমরা এখন আল্লাহর রাসূলের অনুসারী, তারই অনুগত।’
‘আমরা কি তোমাদের রাসূলের সঙ্গে কথা বলতে পারি?’ হেশাম বললো।
‘হেশাম।‘ খালিদ গর্জে উঠে বললেন, ‘আমি আমার ভাইকে আত্মসম্মানের ওপর  কোরবানি করেছিলাম। কিন্তু তুমি যখন সঙ্গে আসলে, তখন এরা যা দাবি করছে তাই দিয়ে দাও। আমি মুহাম্মদের সামনে গিয়ে করুণার জন্য হাত পাততে পারবো না। তিনি দেরহামের থলিটি মুসলমানের সামনে ছুড়ে দিলেন, ‘গুনে নাও আর আমার ভাইকে ছেড়ে দাও।’
সাহাবী মুক্তিপণ বুঝে পেয়ে অলিদকে হেশাম ও খালিদের হাতে তুলে দিলেন। তিন ভাই তখনই মক্কার অভিমুখে যাত্রা করল। রাস্তায় দুই ভাই অলিদকে তাদের পরাজয়ের কারণ জিজ্ঞেস করল। তাদের ভরসা ছিল, অলিদ একজন লড়াকু বংশের যুবকক হিসাবে যুদ্ধে কুরাইশদের ভুল চাল ও কৌশল সম্পর্কে নিপুণভাবে তাদের ত্র“টিগুলো বর্ণনা করতে পারবে। কিন্তু অলিদ তাদের প্রশ্নের জবাবে কিছু না বলে সামান্য একটু মুচকি হাসল শুধু। ভাবখানা এমন যে, এর পেছনে যে গোপন রহস্য আছে তা সে কাউকে বলতে চায় না।
‘অলিদ, তুমি কিছু তো বল!’ খালিদ অধৈর্য হয়ে তাকে আবার তাগাদা দিলেন। ‘আমাকে যে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হবে। কুরাইশদের সব সরদার আবার কোমর বেঁধে নেমেছে। আশপাশের সব সম্প্রদায়কেও আমরা একত্র করেছি, তারা সবাই মক্কায় এসে শামিল হতে শুরু করেছে।’
‘সমস্ত আরবকে একত্র করলেও তোমরা মুসলমানদের পরাজিত করতে পারবে না। আমি এ কথা বলছি না যে, মুহাম্মদের হাতে কোনো জাদু আছে। কিংবা ভেবো না, আমি তার নতুন বিশ্বাস সত্য বলে মেনে নিয়েছি। এটাও ভেবো না, আমি তার বন্দী হয়েও তাকে অপছন্দ করি না।’
‘কিন্তু তোমার জবাব তো বলছে, তুমি নিজ সম্প্রদায়ের কাছে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছো।’
হিশাম বললো, ‘বিশ্বাসঘাতক হও আর যাই হও, সেই ইহুদি নেতার কথাই ঠিক, মুহাম্মদের কাছে কোনো নতুন বিশ্বাস বা ধর্ম কিছু নেই, তার কাছে আছে নতুন কোনো জাদু।’
‘হ্যাঁ, তার কাছে নতুন কোনো জাদুই আছে, নইলে কুরাইশরা কখনও পরাজয় বরণ করতে পারে না। খালিদ বললেন।
অলিদ যেন তাদের কথা শুনতেই পাচ্ছে না, তার ঠোঁটে খেলা করছে মৃদু হাসির আভা। সে বারবার ঘুরে মদীনার দিকে তাকাচ্ছিল। মদীনা থেকে বেশ খানিকটা দূরে জিল হালিফা নামে এক স্থান, তিন ভাই সেখানে পেঁৗঁছলো। ততক্ষণে বেশ রাত নেমে এসেছে। তিন ভাই রাত কাটানোর জন্য সেখানেই তাঁবু গাড়ল।
সকালে যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলো অলিদ নেই! তার ঘোড়াও নেই সেখানে। খালিদ ও হিশাম চিন্তা করে শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, অলিদ অবশ্যই মদীনা চলে গেছে। কারণ তারা লক্ষ্য করেছে, তার ওপর কোনো কিছু একটার প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাবটা মুসলমানের প্রভাব হতে পারে।
অলিদকে ছাড়াই দুই ভাই মক্কা ফিরে এলো। কিছুদিন পরে তারা খবর পেল, অলিদ মুহাম্মদকে আল্লাহর সত্য রাসূল বলে মেনে নিয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। হুজুর (সা)-এর বাণী, ব্যবহার ও ব্যক্তিত্ব তাকে এতই মুগ্ধ করেছে যে, শেষে রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসলাম গ্রহণ করে সে আত্মাকে তৃপ্ত করেছে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, অলিদ বিন ওয়ালিদ রাসূল (সা)-এর খুব প্রিয়ভাজন ছিলেন এবং কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
খালিদের সে সময় খুবই রাগ হয়েছিল। একে তো তার ভাই গেল, তার ওপর চার হাজার দেরহামও গেল। ফলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে খালিদের আক্রোশ আরো বেড়ে গেল। খালিদ ও তার ভাইয়েরা মুক্তিপণ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করলে অলিদ রাসূলে করীম (সা)-কে বললেন, ‘আমি যুদ্ধবন্দী হিসেবে আপনার কাছে আসিনি, এসেছি স্বেচ্ছায়। মুক্তিপণ নিয়ে আপনারা যখন আমাকে ফেরত দিয়েছিলেন তখনই মুক্তিপণের হিসেব চুকে গেছে। আমি জেনে এসেছি, কুরাইশরা মুসলমানদের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুতরাং একটি দিনার দিয়েও তাদের সাহায্য করার কোনো অবকাশ নেই।’
মরুভূমি মাড়িয়ে খালিদ মদীনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। দূর দিগন্তে ভেসে উঠল পাহাড়ের আবছা দৃশ্য। জায়গাটা চিনতে পারেন খালিদ। ওটা ওহুদের পাহাড়ি অঞ্চল। মদীনা থেকে মাত্র চার মাইল উত্তরে। খালিদ বালিয়াড়ির উঁচু-নিচু টিলার ওপর দিয়ে ক্রমাগত চলেছেন।
ওহুদ ওহুদ! খালিদের মুখ থেকে অস্ফুট বাক্য বেরিয়ে এল, ‘আমি আবু সোলায়মান!’ সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতিপটে ফুটে উঠল এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মারকাট আর্তনাদ। অসংখ্য ঘোড়ার পদধ্বনি ও তলোয়ারের ঝনঝনানি শুনতে পেলেন তিনি। খালিদ এই যুদ্ধে লড়াই করার জন্য ছিলেন ব্যাকুল বেকারার। যুদ্ধে তিনি লড়াই করার সুযোগও পেয়েছিলেন।
খালিদের স্মৃতি চার বছর পেছনে ফিরে গেল।
চার বছর। হ্যাঁ, মাত্র চার বছর আগেই ঘটেছিল এই লোমহর্ষক ঘটনা। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস। তৃতীয় হিজরির সাওয়াল মাস। কুরাইশরা মদীনার ওপর আক্রমণ করার জন্য যে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিল তারা সবাই মক্কায় একত্র হয়েছে। তিন হাজার যোদ্ধার বিশাল বাহিনী। তার মধ্যে সাত শ ছিল নিয়মিত সামরিক সেনা। অশ্বারোহী দুই শতাধিক। যুদ্ধের মালসামান ও খাদ্যদ্রব্য তিন হাজার উটের পিঠে চাপানো হলো। সৈন্যরা সবাই অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রস্তুত। খালিদের স্মৃতিপটে আজো এ ঘটনা যেন জীবন্ত। এতো সৈন্য দেখে খালিদের মন খুশিতে ভরপুর! এতদিনের প্রতিশোধের আগুন  নেভানোর সময় এসে গেছে। সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান। খালিদ সেনাদলের একাংশের কমান্ডার। তার বোন সেনাবাহিনীর সাথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে। এ ছাড়াও এসেছে চৌদ্দজন মহিলা। এদের মধ্যে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাও আছে। আরো আছে ওমর বিন আস ও আবু জেহেলের ছেলে আকরামের স্ত্রী। মহিলারা সবাই সৈন্যদের উজ্জীবিত করার জন্য গান বাজনার সামগ্রী সাথে নিলো। তারা ঢোল ও দফের বাজনার তালে তালে জ্বালাময়ী গান ধরল। মেয়েদের কাজই ছিল শুধু এই। তারা প্রেরণাদায়ক গান ও গীত গেয়ে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করবে। আর বদরের যুদ্ধে যারা মারা গেছে তাদের স্মৃতি জাগিয়ে তুলবে।
খালিদের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল আফ্রিকার হাবশী কৃতদাস ওয়াহশী বিন হারবের কথা। সে ছিল কুরাইশ গোত্রের সরদার জোবায়েরের কৃতদাস। প্রকাণ্ডদেহী কালো রঙের এ হাবশী ছিল অসম্ভব শক্তিধর। বর্শা চালনায় সে ছিল অতিশয় নিপুণ ও খ্যাতিমান। তার কাছে ছিল আফ্রিকার তৈরি নিজস্ব বর্শা। তার আফ্রিকান নাম থাকলেও যুদ্ধের নিপুণতা দেখে জোবায়ের তাকে আরবি নাম দিয়েছিল।
‘বিন হারব!’ যুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার আগে জোবায়ের তাকে বললো, ‘দেখো, আমার চাচা হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে! সম্ভবত আমার সুযোগ না-ও হতে পারে। আমার চাচাকে মুহাম্মদের চাচা হামজা হত্যা করেছে। যদি তুমি হামজাকে হত্যা করো তবে তোমাকে আমি মুক্ত করে দেবো।’
‘হামজা আমার বর্শার আঘাতে মারা যাবে, কথা দিলাম প্রভু!’ ওয়াহশী বললো। হাবশী গোলাম মহিলারা যে উটের ওপর আরোহণ করেছিল সেদিকে চলে গেল।
‘আবু ওসামা’। কোনো এক মহিলার স্বর ভেসে এলো। এটা ছিল ওয়াহশী বিন হারবের আরেক নাম। সে থেমে গেল এবং দেখলো আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তাকে ডাকছে। সে তার কাছে এগিয়ে গেল।
‘আবু ওসামা!’ হিন্দা ধীরে ধীরে বললো, ‘অবাক হয়ো না! তোমাকে আমিই ডাকছি। আমার বুকটা প্রতিশোধের জ্বালায় পুড়ে যাচ্ছে! তুমি কি প্রতিশোধ নিয়ে আমার বুক শীতল করবে, আমাকে একটু শান্তি দেবে?’
‘মহীয়সী, আদেশ করুন! আপনি আমার প্রভুর সেনাপতির বেগম। আপনার জন্য জীবন দিয়ে দেবো, বলুন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?
‘বদরের যুদ্ধে আমার পিতাকে হামজা হত্যা করেছে। হিন্দা বলল, ‘তুমি তো হামজাকে ভালো মতোই চেনো! এদিকে দেখ! আমার শরীর ভরা সোনার গহনা, যদি তুমি হামজাকে হত্যা করতে পারো তবে এগুলো সবই তোমার হবে। ’
ওয়াহশী হিন্দার গহনার দিকে তাকিয়ে হাসল। সদম্ভে ঘোষণা করল, ‘আমিই হবো হামজার হত্যাকারী, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।’
খালিদ তার নিজস্ব বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। এই রাস্তা ধরে তার বাহিনী সেদিন মদীনার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। উঁচু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে তার সৈন্য দেখছিলেন। গর্বে ফুলে ওঠে তার বুক। মদীনার মুসলমানদের জন্য তার করুণা হলো। কিন্তু করুণাও তাকে দিচ্ছিল অপার আনন্দ। এ লড়াইয়ের সাথে তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের নিধন করার বিরাট সঙ্কল্প কাজ করছিল তার ভেতরে।
ওহুদ যুদ্ধের অনেক দিন পর তারা প্রথম জানতে পারে, মক্কায় কুরাইশরা যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে সময় প্রতি মুহূর্তে তাদের তৎপরতা ও অগ্রগতির প্রতিটি খবর রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পৌঁছে যেত। যখন মদীনা আক্রমণের জন্য তারা রওনা দিয়েছিল তখনও রাসূলূল্লাহ (সা) জানতেন তারা কতজন, কী ধরনের অস্ত্র ও বাহন নিয়ে রওনা দিয়েছে। তারপর তারা যখন এগিয়ে যাচ্ছিল তখনও তাদের গতিবিধি ও অগ্রগতির খবর অনবরত পাচ্ছিলেন তিনি। মক্কা থেকে কুরাইশ বাহিনীর যাত্রা ও অগ্রগতির এ সকল খবর নবীজির কাছে পৌঁছে দিতেন হজরত আব্বাস (রা)।
কুরাইশদের সম্মিলিত সেনাবাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছে মদীনা থেকে সামান্য দূরে ওহুদ পাহাড়ের কাছে এমন স্থানে ঘাঁটি গেড়েছিল যেখানে ময়দান ছিল সবুজে ভরা। ছিল পানির মজুদ। খালিদের জানা ছিল না, মুসলমানদের দু’জন গোয়েন্দা এদের সমস্ত তৎপরতার খবর রাসূল (সা) কে পৌঁছে দিচ্ছেন।
৬২৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ। রাসূলে করীম (সা) মুজাহিদ বাহিনীকে এগিয়ে যাবার আদেশ দিলেন। মুজাহিদরা শায়খানি নামক এক পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে অবস্থান নিলো।
এ যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজার, এর মধ্যে মাত্র এক শ’ জন ছিল যুদ্ধের পোশাকে সজ্জিত। ঘোড়া ছিল সাকুল্যে দু’টি, একটি রাসূল (সা)-এর কাছে, অন্যটি এক মুজাহিদের নিকট।
এই সময় প্রথম মুসলমানদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির এক ভয়াবহ চেষ্টা হয়। মদীনার বিভিন্ন গোত্রের এমন কিছু লোকও ইসলাম গ্রহণ করেছিল যারা সত্যিকারার্থে ঈমানদার ছিল না। কিছুটা হুজুগে মেতে, কিছুটা নতুন ধর্ম দেখার লোভে এরা মুসলমান হয়েছিল। রাসূলে মকবুল (সা) এদের বলেছেন মুনাফিক। সে সময় কে সঠিক মুসলমান আর কে মুনাফিক এটা  বোঝা খুব সহজ ছিল না। মুজাহিদরা মদীনা থেকে যখন শায়খিন পাহাড়ের দিকে রওনা হলো, তখন আবদুল্লাহ বিন উবাই রাসূল (সা)-এর সাথে তর্ক জুড়ে দিল। বলল, কুরাইশ সৈন্য মুসলিম বাহিনীর তিন গুণ, এ জন্য মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা সমীচীন হবে না।
হুজুর (সা) মুজাহিদ বাহিনীর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মত নিলেন। অধিকাংশই শহরের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মত দিল। নবী করীম (সা) আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মত পছন্দ করলেও অধিকাংশের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত-ই মেনে নিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিলেন। আবদুল্লাহ বিন উবাই শহর ছেড়ে বাইরে যেতে অস্বীকার করলো। আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিল যথেষ্ট প্রভাবশালী লোক। তিনি মুসলিম বাহিনী থেকে সরে দাঁড়ালে তিন শ লোক তাকে অনুসরণ করল। রাসূল (সা) এদের মুনাফিক বলে অভিহিত করলেন, আবদুল্লাহ বিন উবাই হলো এদের নেতা।
এতক্ষণ তিন হাজারের মোকাবেলায় ছিল এক হাজার মুজাহিদ। সেখানে থেকে তিনশ জন সরে পড়ায় সাত শ’ মুজাহিদই এগিয়ে গেল কুরাইশদের মোকাবেলায়। হৃদয় তাদের এতটুকু টলল না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নেতৃত্ব জিন্দাদিল মুজাহিদরা ওহোদ পাহাড়ের পাদদেশে শায়খিন প্রান্তরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন শত্র“র মুখোমুখি। খালিদ একটি উঁচু টিলার ওপর দাঁড়িয়ে মুসলমানদের সারিবদ্ধ হওয়ার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করলেন। কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে সেনাপতি আবু সুফিয়ানকে সব কিছু রিপোর্ট করে নিজের জায়গায় চলে গেলেন।

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply