Home তোমাদের গল্প মধ্যরাতের আগন্তুক

মধ্যরাতের আগন্তুক

নাসরুল্লাহ শারাফাত রুহি

Agutukরাত বারোটা-সাড়ে বারোটার দিকে হঠাৎ তুমুল গর্জনে অসীম আকাশ থেকে ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি  নামল।
অবশ্য সন্ধ্যা হতেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, বাতাসে শোঁ শোঁ ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। উত্তরের ঝড়োবাতাসের দাপটে গ্রামের লোকজন, হাটবাজার থেকে যে যার বাড়িতে ফিরে আসছিল।
সন্ধ্যার পরেই তাই শঙ্খপুরের রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ  নির্জন হয়ে গেল।
গভীর রাতে গ্রামের সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন ঝন্টু  সজাগ। বুকের বামপাশের ঠিক মধ্যখানে সে সেই সন্ধ্যা থেকে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করছিল, এবার এই রাত্তিরে ব্যথাটা প্রকট হয়ে উঠল। শঙ্খপুরের মতো একটা গ্রামের চেয়ারম্যান ঝন্টুর বাবা, তবুও কেন তাঁর এই অদ্ভুত ব্যামো তার বাবা সারাতে পারে না? অবশ্য বাবা তো আর ডাক্তার নয়, কিন্তু ডাক্তার তো দেখাতে পারে?
রাত একটা-দেড়টার দিকে ঝন্টুর একটু তন্দ্রামত এসেছিল, হঠাৎ বিকট শব্দে কাছে কোথাও বাজ পড়ল। ঝন্টুর চোখ থেকে ঘুম উদাও। বাজ পড়ার কয়েক সেকেন্ড পর ঝন্টু দেখতে পেল তার ঘরের পশ্চিমের জানালাটার সরু ফাঁক গলে হালকা লাল আলোর একটা রশ্মি এসে তার নাদুস নুদুস মুখটাতে পড়েছে।
এমন সময় জানালার কাঠের শার্সিতে ঠক ঠক আওয়াজ তুলে টোকা মারল কেউ। অবাক হলেও সত্য যে, ঝন্টু ভয় পেল না। ছোটবেলা থেকেই তার একটা মানসিক টাইপের সমস্যা আছে।  কোন কিছুকে ভয় পায় না। ভয়টা কী জিনিস জানে না। বিস্মিত হতে শেখেনি। অনবরত ঠক্ঠক্ আওয়াজ প্রায় পনেরো-বিশ মিনিটের মতো চলছে। অগত্যা বুকের ব্যথায় অতিষ্ঠ ঝন্টু বিছানা থেকে অতিকষ্টে নেমে বন্ধ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’
কোনো সাড়া শব্দ নেই।
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে জানালা খুলে দিলো ঝন্টু।
প্রায় সাথে সাথেই ছায়ামতো কী যেনো গরাদবিহীন জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে লাফিয়ে নামল।
চোর-চোর বলে চিৎকার করার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল ঝন্টু, কিন্তু বিশাল হাতের থাবা তার মুখ চেপে ধরল। ড্যাব ড্যাবে দু’চোখ মেলে ঝন্টু অনুপ্রবেশকারীর মুখের দিকে তাকাল। মুখের ফর্সা নিচের চিবুকটুকু দেখা যায়, বাকিটুকু ধূসর চাদরে ঢাকা। লম্বায় প্রায় সাড়ে ছয় ফুট, ভীষণ হাড় জিরাজিরে শরীর। ঝন্টু কোনো রকমে বলার চেষ্টা করল, আ- আমার মুখ থে-থেকে হাত সরাও। ম-মরে যাচ্ছি!’
অবশেষে মুখ থেকে হাত সরলো। এইবার আগন্তুক নিচু স্বরে বলে উঠল, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি বাছা। খুব বিপদে পড়ে এসেছি। দয়া করে তুমি আমার কথাগুলো শোনো। চিৎকার চেঁচামেচি করো না।
লোকটির গলার স্বরে এমন কিছু ছিল, যা ঝন্টুকে চুপ থাকতে বাধ্য করল। সে বলল, ‘আমি আপনার কী সাহায্যে আসতে পারি?’
লোকটি ঝন্টুর কথা শুনে আশ্বস্ত হলো।  তারপর ঝন্টুর খাটের এককোণে বসে বলল, ‘রক্ত চাই। মানুষের হিমোগ্লোবিনযুক্ত উন্নতমানের আধসের রক্ত।’
‘এতো রাতে হঠাৎ আপনার রক্তের প্রয়োজন কেন? আর রক্ত তো হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে পাওয়া যায়। আমার কাছে এসেছেন কেন?’
‘ছ্যা: ছ্যা:! হাসপাতালের রক্ত বাসি পচা।
আমার চাই নাবালকের টাটকা সুস্বাদু রক্ত।
… তুমি তোমার দেহ থেকে যদি বেশি না, এই ধরো ২০০ গ্রাম রক্ত দাও, তাহলে আমি তা পান করে উপযুক্ত শক্তি উৎপন্ন করে আমার স্বদেশে ফিরে যেতে পারবো।
লোকটি নির্ঘাত পাগল! ভাবল ঝন্টু। একটু মজা করার লোভ সামলাতে পারল না। সে বলল, ‘আচ্ছা, আমি না হয় দেবো রক্ত কিন্তু তার বিনিময়ে কী পাবো?’
‘কী চাও?’
ঝন্টু কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে ভাবল। কী যে চাওয়া যায়, সে ভেবে পাচ্ছে না। টাকা পয়সা চাওয়া যাবে না। চাইতে হবে এমন কিছু যা লোকটির পক্ষে দেওয়া অসম্ভব। হঠাৎ ঝন্টু বলে বসল, ‘এই যে এখন আমার বুকে খুব ব্যথা করছে। হাড়কিপটে আব্বাটাকে আজ মাসখানেক ধরে বলছি, কিন্তু উনি আমার চিকিৎসা করান না। শহুরে ডাক্তার দেখালে যে অনেক টাকা খরচা হবে তাই।’
‘তা আমাকে নিশ্চয়ই তোমার বুক ব্যথা ভালো হওয়ার জন্য কিছু একটা করতে হবে?’
‘হ্যা।’
‘কাছে এসো।’
ঝন্টু এবার জীবনে প্রথমবারের মতো ভয় পেতে শুরু করল। তবুও সাহস করে তালপাতার সেপাই লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটি চাদরের  ভেতর থেকে বিশাল একটা হাত বের করলেন। তার হাতে ইঞ্জেকশন লাগানো অদ্ভুত খটমটো জাতীয় একটা সরু যন্ত্র। ঝন্টু কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুঁচের মতো একটা কিছু বিঁধে গেল তার গলার শিরায়। চিনচিনে একটু ব্যথা গলার শিরা-উপশিরায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য অনুভব করল ঝন্টু। সে আচ্ছন্নের মতো শুনতে পেল লোকটি বলছে, ‘যাক বাবা! বিষে বিষক্ষয় হলো।’
অজ্ঞান হওয়ার দুই সেকেন্ড আগে ঝন্টু লক্ষ্য করল, চারটি মাত্র আঙুল এই আজব লোকটির হাতে!
এই ঝন্টু, উঠে পড় বাবা। ওই কিপটে বুড়োটা তোকে ডাক্তার দেখানোর জন্য টাকা দিয়েছে।
সাতসকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো ঝন্টুর।  শরীরটা আজ বড্ড দুর্বল লাগছে তার।  আড়মোড় ভেঙে ওঠার পর, ঝন্টু বুঝতে পারল কাল রাতে স্রেফ স্বপ্ন দেখেছে সে।
অবশ্য এর আগে এতো বাস্তব স্বপ্ন আর কোনোদিন দেখা হয়নি তার।
ঝন্টুর মা তাকে এক গ্লাস দুধ খেতে দিয়ে তৈরি হয়ে নিতে বললেন। ঝন্টুও দুধটুকু খেয়ে তৈরি হয়ে মায়ের সাথে হাসপাতালে চলল।
শঙ্খপুর গ্রামের একমাত্র খ্যাতিমান ডাক্তার বাবু ঝন্টুকে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সর্বশেষে ঝন্টুর মাকে জানালেন, ‘আপনার ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ। তা ছাড়া ওর হার্টটাও খুব ভালো। আপনি ওকে নিশ্চিন্তে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।
ডাক্তার বাবুর কথা শুনে তো ঝন্টু ভীষণ অবাক। সে ভাবছে, হাঁদা ডাক্তারটা গাঁজা খেয়েছে নাকি। কাল রাতেও তো তার যন্ত্রণাময় বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। কিন্তু এখন তো নেই!  রহস্যটা কী?
অবশ্য মা খুশি হয়ে ঝন্টুকে বাড়ি নিয়ে এলেন। আর বিভিন্ন দোয়া দরুদ পড়ে ঝন্টুর বুকে ফুঁ দিয়ে বলছেন, ‘যাক বাবা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। খোদা তবে ছেলেটাকে সুস্থ করে দিয়েছেন।’
বাড়ি এসে ঝন্টু তার শোবার ঘরে চলে এলো। বিছানায় গা এলিয়ে বালিশ টানল মাথার কাছে, হঠাৎ এক টুকরো কাগজ তার হাতে এসে ঠেকল। বালিশের নিচ থেকে কাগজখানা নিয়ে ঝন্টু তার চোখের সামনে ধরল। অদ্ভুত ঝলমলে নীল সবুজাভ কালিতে বাংলা অক্ষরে সুন্দর করে তাতে লেখা :
‘ওহে বালক, তোমাকে অসংখ্য সুপারনোভার ধন্যবাদ। তোমার  দেহ হতে ২০০ গ্রাম রক্ত নিয়ে পান করলাম। আর আমাদের প্লাটিনাম-সিলিকন গ্রহের অভিনব ওষুধটি তোমার দেহে প্রবেশ করিয়ে দিলাম। আশা করি চিরতরে তুমি সমস্ত রোগ থেকে রক্ষা পাবে।
প্রতি পাঁচ শ’ বছর পরপর তোমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটিতে আমাদের গ্রহের বৈজ্ঞানিকেরা পরিদর্শন করতে আসেন।
এবারে আমি এলাম। কারণ, আমি একজন বৈজ্ঞানিক। তোমাদের পৃথিবীতে এসেই আমার খুব পিপাসা পেয়ে  গেল। পিপাসা পেলে আমরা রক্ত পান করি। আমাদের গ্রহে পানি নেই কিন্তু রক্তের সমুদ্র আছে।
… আচ্ছা, তুমি হয়তো বা ভাবছ- আমি যদি ভিনগ্রহী কোনো প্রাণী হই, তাহলে তোমার সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলছি কিভাবে বা লিখছিই বা কিভাবে?
আসলে তা সম্ভব হয়েছে আমার নব্য আবিষ্কৃত ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সফরমেশনের’  বদৌলতে।
… তোমার আংশিক কৌতূহল মিটিয়ে আমি এখন বিদায় নিচ্ছি বন্ধু। … অদৃশ্য হতে চলেছি; শীঘ্রই আমার গ্রহে পৌঁছে যাবো। ভালো  থেকো। মধ্য রাতের একজন আগন্তুক।’

SHARE

Leave a Reply