Home তোমাদের গল্প দাদুভাই

দাদুভাই

নাদিম নওশাদ

Dadu-Baiঅনেক দিন আগের কথা তখন আমি খুব ছোট, আমার বয়স তখন ৬-৭। আমার দাদু তখন বেঁচে আছেন।
দাদুভাই আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমিও দাদুভাইকে খুব ভালোবাসতাম। আমার আব্বু যখন দাদুভাইয়ের জন্য কিছু নিয়ে আসতেন, তখন দাদুভাই আমাকে ডাকতেন, ‘দাদুভাই, এদিকে এসো।’ আমি ছুটে দাদুভাইয়ের কাছে যেতাম এবং বলতাম,  বলুন দাদুভাই। তখন দাদুভাই আমাকে তাঁর অর্ধেক দিতেন এবং বলতেন এটা খাও। আমি দাদুভাইয়ের কথা অমান্য করতে না পেরে সেটা খেয়ে নিতাম।
আমাদের গ্রামের মধ্যে দাদুভাই ছিলেন অনেক মেধাবী। বিশেষ করে বাংলায়। তিনি ছিলেন বাংলা বিষয়ে পণ্ডিত। বাংলায় তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা দুষ্কর ছিল।
তিনি জারি, সারিসহ অনেক ধরনের গান ও কবিতা লিখতেন। একবার আবুল ইসলাম নামক এক ব্যক্তির গানের জবাবে তিনি বলেন,
‘ওরে আবুল তোর ভেঙে যাবে ভুল
ফানা বাকা হবে নিশ্চয়।’
তার এমন তীক্ষè মেধার কাছে সবই অতি তুচ্ছ। তিনি শুধু মেধাবী নন, রসিকও বটে। দাদুভাই সকলকে কড়া শাসনের মধ্যে রাখতেন। আব্বুর কাছে শুনেছি, তিনি সবাইকে এমনভাবে বলতেন যে, সবাই তার কথা অক্ষরে অক্ষরে মানতো।
তখন আমি বুঝতে শিখেছি। আমার বয়স তখন ৬-৭। আমার ও দাদুভাইয়ের দিন ভালোই কাটছিল।
কিন্তু হঠাৎ আমার ও দাদুভাইয়ের বন্ধুত্বে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সেই দিনটি ছিল ২০০৮ সালের ১লা আগস্ট, বৃহস্পতিবার। দাদুভাইয়ের সেদিন শরীর খুব খারাপ। তাই সেদিন সবাই দাদুভাইয়ের পাশে উপস্থিত। সবাই আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে দাদুভাই আর বাঁচতে পারবে না।
আম্মু, বড় আম্মু, ও অন্যরা কুরআন তেলাওয়াত করছিল। আব্বু, বড় আব্বু, সবাই অঝোর ধারায় কাঁদছিল আমার বড় ভাইয়েরাও কাঁদছিল। তখন আমি আর আবেগ সামলাতে পারিনি। সবার কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম। তারপর যখন রাত হলো তখন দাদুভাইয়ের অবস্থা আরও খারাপ হলো।
রাত ৯টায় আম্মু আমাকে বলে ঘুমাতে যেতে। আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। কিন্তু শেষে আব্বু বলাতে ঘুমাতে গেলাম। আমি ঘুমাতে গেলাম ঠিকই, কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসছিল না। অবশেষে আম্মু এসে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
তখন ভোর ৫টা বাজে, আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি। জেগে দেখি কেউ ঘুমায়নি, সবাই জেগে আছে। আমি তখন আব্বুকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আব্বু কী হয়েছে? আব্বু বললেন, তোমার দাদুভাই…। আমি তখন বুঝতে পারলাম দাদুভাই আর নেই।
তার পরদিন সবাই দাদুভাইকে দেখতে আসল। আমি তখন এত লোকের সমাবেশ দেখে অবাক  হই। এত লোক দাদুভাইকে ভালোবাসত। তারপর আমার মন তখন খুব খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে দাদুভাই সকলের পরশমণি ছিলেন। তার মত এমন এক প্রতিভাকে আমরা সবাই হারালাম।
তারপর দাদুভাইয়ের দাফন হলো। আমিও সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এর পর থেকে আমি দাদুভাইকে মিস্ করতাম। ভাবতাম, আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে বুঝি হারিয়ে ফেললাম। এর পর থেকে দাদুভাইয়ের কথা মনে হলেই খুব খারাপ লাগত। তখন আব্বু আমাকে বোঝাতেন, পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না। একদিন সবাইকেই চলে যেতে হয়।
আর আমার জীবন আগের মতো কাটে না। আর দাদুভাই আমাকে ডাকে না। তাই মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ আমি হারিয়ে ফেলেছি যা, আমি আর কোনো দিন ফিরে পাবো বলে আমার মনে হয় না।

SHARE

Leave a Reply