Home প্রচ্ছদ রচনা পরিবেশ এবং আমরা

পরিবেশ এবং আমরা

 ড. রফিক রইচ

আগামীর তারকা আমার সবুজ সতেজ ছোট ছোট বন্ধুরা সবাই নিশ্চয়ই ভালো আছো। আমি ভালো। অনেক দিন পর আবার দু-কলম লিখছি তোমাদের প্রিয় পত্রিকা কিশোরকণ্ঠে।
আজকে যে লেখাটি লিখবো সে বিষয়টি বেশি বড় সড়। বিষয়টির সাথে সবার কম বেশি ভাসা ভাসা পরিচয় থাকলেও গভীরভাবে তাকে তেমন কেউ জানি না। আবার কিছুটা জানলেও সেগুলো অনেকেই মানি না। এই না মানাটা তোমাদের চাইতে বড়রা মানে আমাদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়। যে কারণে অঘটনের যেন শেষ থাকছে না। যেহেতু তোমরাই একদিন বড় হবে তাই তোমাদেরকে এখন থেকেই এ বিষয়গুলো জানালে বা বুঝালে ভবিষ্যতে খারাপ সবকিছু ঘটার হার কমতে থাকবে। জাতি ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। বাঁচতে পারবে পরবর্তী বংশধরেরা। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বিষয়টি নিয়ে তোমাদের সাথে গল্পে গল্পে সময় পার করতে চাই। তাই কথা না বাড়িয়ে যে বিষয়টা নিয়ে আজকে সময় কাটাতে চাই- সে বিষয়টার কথা বলে ফেলি। বিষয়টা হলো পরিবেশ। বুঝতেই পারছো বিষয়টা যেমনি বড় তার চেয়ে বেশি সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর। তাহলে আমরা প্রথমেই জেনে নেই পরিবেশটা আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয় ‘আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তার সবগুলো নিয়েই গঠিত হয় পরিবেশ। চারপাশে কী কী আছে? গাছপালা, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, সমুদ্র, গ্রাম-গঞ্জ ও ইটের শহর-নগর। তাছাড়া রয়েছে আলো, বাতাস, মাটি, তাপ, আর্দ্রতা, চন্দ্র, সূর্য তারকারাজি ইত্যাদি। এগুলো দিয়েই গঠিত হয় পরিবেশ। তাহলে পরিবেশের গঠিত হওয়া উপাদানগুলো দু-রকম। একটি হলো, জীবজ উপাদান যেমন-মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড় ইত্যাদি। অন্যটি হলো অজীবজ উপাদান অর্থাৎ যাদের জীবন নেই যেমন, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, মাটি, পানি, বায়ু, আলো-বাতাস, তাপ, গ্রামগঞ্জ, শহর-নগর ইত্যাদি। আমাদের ওপর যেমনই রয়েছে পরিবেশের প্রভাব তেমনি পরিবেশের ওপর রয়েছে আমাদের প্রভাব।
প্রকৃতি তথা এই পৃথিবীর পরম প্রাণী হলো মানুষ। মানে আমরা। আমাদের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে পরিবেশ। মানুষের বেঁচে থাকায় প্রয়োজনীয় উপাদানের যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু দিয়েছে প্রকৃতি। এ প্রসঙ্গে সূরা কামারের ৪৯ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, আমরা পৃথিবীতে বা প্রকৃতিতে যা কিছু সৃষ্টি করেছি তা পরিমিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি। একটু বেশিও না একটু কমও না।
বেঁচে থাকতে যেয়ে আমরা পরিবেশকে নানাভাবে ব্যবহার করছি। সহনীয় মাত্রা ব্যবহার করলে ক্ষতি নেই কিন্তু এটাকে কখনো কখনো অতিমাত্রা ব্যবহার করছি। আর এই অতিমাত্রায় ব্যবহার করার ফলে পরিবেশের ঘটছে নানা পরিবর্তন। আর এ পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ ক্রমাগত দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে আমাদের শান্তি ও সুখের মধ্যে বেঁচে থাকাটা পৃথিবী তথা প্রকৃতিতে কঠিন হয়ে পড়ছে।
তা ছাড়া প্রতিনিয়ত যে হারে মানুষ বাড়ছে এবং যে হারে পরিবেশের নানা উপাদানকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে পরিবেশের দূষণের হারকে মারাত্মক ও উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়ে তুলছে।
তবে একটি কথা আগে বলেছি, আল্লাহপাক সব কিছু পরিমিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছেন। এগুলোকে যদি আমাদের মাথায় আল্লাহর দেয়া জ্ঞানকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যবহার করা যায় তবে পরিবেশের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। হবে না কোনো পরিবেশের মারাত্মক পরিবর্তন। আমরা ভালোভাবেই বাঁচতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেভাবে চলি না। সেভাবে পরিমিত পরিমাপে ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরিবেশের উপাদান গুলোকে ব্যবহার করি না, তাই ঘটছে পরিবেশের নানা ক্ষতিকর পরিবর্তন। ফলে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগে গোমা সাপের মতো ফুঁসে উঠছে প্রকৃতি তথা আজকের পৃথিবী।
আমরা বাতাসকে, পানিকে, মাটিকে অতিমাত্রায় দূষিত করে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মেরে যাচ্ছি। তোমরা জান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী ড. প্রাইস এ দূষণ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘পাছে ভয় হয়, হয়ত আমাদের পরিবেশ একদিন এমনভাবে দূষিত হবে যে মানুষ অধুনালুপ্ত ডাইনোসোর বা সরীসৃপের মত সেকেলে প্রাণীতে পরিণত হবে।’
সূরা রূমের ৪১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, স্থলভাগ এবং পানিত মণ্ডলে সকল বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কৃতকর্মের দরুন। এ কথার সত্যতা যে কতখানি তা একটু বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারবে।
ফ্রান্সের প্যারিসের ইউনেস্কো ভবনে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বড় বড় কয়েক শ’ বিজ্ঞানীর অংশগ্রহণে এক সম্মেলনে বলা হয়েছে- বিশ্বে তথা প্রকৃতিতে তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য মানুষই দায়ী। তাদের মতে আবহাওয়ামণ্ডল যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মহাসাগরের ব্যাপক উচ্চতা বৃদ্ধিসহ প্রকৃতির তাপমাত্রা এ শতাব্দীর মধ্যেই ১.৮ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়বে ৭-২৩ ইঞ্চি বা আরও বেশি। ফলে তলিয়ে যাবে অনেক দেশ। এর মধ্যে ভারত ও আমাদের বাংলাদেশ অন্যতম। তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি হ্যারিকেন, ঝড়-বৃষ্টি, সাইক্লোন, টাইফুন, সিডর, আইলার সাথে সম্পৃক্ত। (ইত্তেফাক, ফেব্রুয়ারি, ৩, ২০০৭; সমকাল ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭)।
কি তোমরা সব ভয় পেয়ে যাচ্ছো না তো! যারা সাঁতার জানো না তারা মনে হয় সত্যি সত্যি এখনই ভয় পেয়ে যাচ্ছো। তবে যাই বল, সাঁতার শিখে রাখলে নিজেদের জন্য ভালো। তাই যারা সাঁতার জানো না দ্রুত সাঁতার শিখে নাও।
সম্ভাবনার সূর্য আগামীর বিজ্ঞ বন্ধুরা, তোমরা তো জান জর্ডান নদী মাছশূন্য। এতে তোমরা অবাকও হবে না। কিন্তু যদি বলি এই বিশাল সমুদ্রই একদিন মাছশূন্য হবে তাহলে? তাহলে তো নির্বাক অবাক হতেই হবে। বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় এমনটাই বলা হয়েছে। আগামী ২০৪৮ সাল নাগাদ সমুদ্র সব ধরনের সামুদ্রিক মাছসহ অন্যান্য জীবশূন্য হয়ে যেতে পারে। সামুদ্রিক প্রাণী বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করা একটি আন্তর্জাতিক গবেষকদল এ তথ্য জানিয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে মানুষ এর দ্বারা অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, খাদ্যচাহিদা বৃদ্ধি ও অনুকূল আবাসের কথা বলা হয়েছে। (সমকাল ২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭)। এমনি করে পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই এভাবে মানুষ দ্বারা দূষিত হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে খাল কেটে কুমির এনে কুমিরের মুখে নিজেরাই পরে নিজেদের অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে পড়ে গেছে। পরিবেশের এই ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষমতা মানুষের প্রত্যক্ষভাবে নেই। সত্যিকারভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিবেশের জীবকুল। সবুজ গাছপালা, বনবনানী, পশু-পাখি, জলজ-প্রাণী, পোকা-মাকড়, এরা। আবার এদেরও পারার একটা সীমা-পরিসীমা আছে। তার পরও যদি এই জীবকুলকেই আমরা সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণ না করি তাহলে ভয়াবহ অবস্থার আর শেষ থাকবে না। তবে ভয়াবহ অবস্থা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। সেগুলোর ব্যাপারে একটু গল্প করেই সময় পার করে আজকের লেখাটি শেষ করবো। ঘুম পাচ্ছে তো? গা ঝাড়া দিয়ে বস। এবার একটি ছড়া বলি,
মানুষেরা দুই হাতে করে যাও নষ্ট
পরিবেশ ক্ষতি হলে পাও নাতো কষ্ট
জ্ঞান গ্যাছে কোমায়
কে সারাবে তোমায়
পরিবেশ প্রতিশোধ নেবে দেখ স্পষ্ট।

পরিবেশের প্রতিশোধ নেয়া শুরু হয়ে গেছে। আমরা প্রতিনিয়ত বায়ু তথা বাতাস দূষণ করছি অথচ এই বায়ুর মধ্যেই আমরা সদা হাবুডুবু খাচ্ছি।
কিভাবে করছি? বায়ু প্রধানত দূষিত হয় মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কলকারখানা ইটভাটা ও যানবাহনে কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ালে হয়। এসব জ্বালানি অপরিকল্পিত উপায়ে পোড়ানোর ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন কণা ও কার্বন-ডাই অক্সাইড মিশে প্রধানত বায়ু দূষিত হচ্ছে। তা ছাড়া অপরিকল্পিত উপায়ে বন উজাড়, বাসগৃহ নির্মাণ, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবর্জনা ও মলমূত্রের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায়ও বায়ু দূষণ হয়। অন্য দিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য পারমাণবিক বোমা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বোমায় বিস্ফোরণে বিভিন্ন রাসায়নিক ক্ষতিকারক মৌল বায়ুতে মিশে বায়ু দূষিত হয়।

বায়ুদূষণের ফলে কী হবে
বায়ুদূষণের ফলে প্রধানত যেটি হয়, সেটি হলো, বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই অক্সাইড বেড়ে যায়। এটি সূর্যের তাপ পৃথিরীতে আসতে কোনো বাধা দেয় না কিšুÍ পরবর্তীতে তাপকে আকাশে উঠে যেতে বাধা দেয়। অর্থাৎ তাপকে আঁকড়ে ধরে কাঁকড়ার মতো। তাই পৃথিবীর তাপ পর্যায়ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে আবহাওয়া তথা জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে যায়। জলবায়ু হলো কোন স্থানের বহু বছরের আবহাওয়ার গড় বা সামগ্রিক অবস্থা। যেমন গরমকাল, বর্ষাকাল, শীতকাল পরবর্তীতে আবার গরমই ফিরে আসে। এটা আমরা বহু বছর হলো প্রায় একই রকম দেখছি কিন্তু এটি এখন তাপমাত্রার বৃদ্ধির কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে পৃথিবী ধীরে ধীরে গরম হয়ে যাচ্ছে। এই গরম হয়ে যাওয়াকে বলে পৃথিবীর উষ্ণায়ন। এই উষ্ণায়নের ফলে বা তাপমাত্রার বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কী ঘটছে বা ঘটবে
ষ মেরু ও পর্বতের চূড়ায় বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়ে প্রধানত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রের পানিতে ডুবে যেতে পারে। ফলে বহু সংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে পথে বসবে।
ষ সমুদ্র থেকে নদী ও স্বাদু পানিতে নোনা জল প্রবেশ করে খাদ্যশস্য উপাদানকে বাধা দিয়ে জীবন জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ষ হিমালয়ের একাধিক তুষার প্রবাহসমূহ গলে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের নদ-নদী শীতকালে সম্পূর্ণ শুষ্ক হয়ে যাবে।
ষ বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি করে অথৈই বন্যা হবে।
ষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আইলা ও সিডরের মত ঝড় সাংঘাতিকভাবে বৃদ্ধি পাবে, বা পাচ্ছে।
ষ বিভিন্ন রোগ-শোক মহামারী বৃদ্ধি পাবে।
ছোট সোনামণিরা তাহলে বুঝতেই পারছোÑ পর্যায়ক্রমে বন উজাড় করে গাছপালা কেটে কলকারখানার ধোঁয়া থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি করে কিভাবে নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মেরে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনছি।
তবে একটি কথা না বললেই নয়। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির উপাদান কার্বন-ডাই অক্সাইড ও মিথেনসহ অন্যান্য গ্রিন হাউজ গ্যাস আমাদের চাইতে উন্নত দেশগুলোর মানুষেরাই বেশি উৎপাদন করছে। কিন্তু ফলভোগ করতে হবে আমাদেরই বেশি।
ছোট বন্ধুরা, আমরা যেমন বায়ুতে হাবুডুবু খাই তেমনি মাছসহ অন্যান্য সকল জলজ প্রাণী পানিতে বাস করে বা হাবুডুবু খায়। আমরা বায়ু থেকে অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকি আর মাছ ও জলজ প্রাণী পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে। তাই পানির মধ্যে যদি কোনো ক্ষতিকর পদার্থ মিশে যায় তখন পানি দূষিত হয়ে পড়ে। আর দূষিত পানিতে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
এখন আমরা দেখি মানুষেরা কিভাবে বা আমরা কিভাবে এই জলজ পরিবেশ দূষিত করছি।
ষ অধিক খাদ্য ফলানোর জন্য জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ও অবিজ্ঞান সম্মতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ। এগুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ডোবা, নদী-নালা, খাল-বিলের পানিকে দূষিত করে।
ষ কলকারখানার বর্জ্য ব্যাপকভাবে পানিতে মিশে ও ময়লা আবর্জনা পানিতে ফেলে দিয়ে পানিকে দূষিত করছে।
ষ কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর মলমূত্র, বিছানাপত্র, খাল-বিল, নদীর পানিতে ধুলে পানি দূষিত হয়।
ষ বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় গ্রাম ও নগর পানিতে ডুবে গিয়ে মানুষ ও পশু পানির মলমূত্র মিশে সাধারণ পানি ও খাবার পানি দূষণ ঘটে।
ষ ক্রমাগত সেচকার্য দ্বারা পানি উত্তোলন ও অপরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে পানির স্তর নি¤œমুখী হওয়ায় পানিতে আর্সেনিক মিশেও পানি দূষিত হচ্ছে।
পানি দূষণের ফলে সবচাইতে ক্ষতি হয় জলজ প্রাণীদের, সর্বোপরি মানুষেরও। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ২৬০ প্রজাতির মাছের কথা বলা হলেও আসলে এর পরিমাণ এই অংকে নেই। অনেক কমে গেছে। ইতোমধ্যে অনেক মাছ হারিয়ে গেছে।
ছোট ছোট মাছগুলো আগের মত আর পাওয়া যায় না। আমার জীবনেই যত রকমের মাছ দেখেছি, তার অনেকই নেই। এ বিষয়ে একটি ছড়া বলি,
ইলিশ মাছে কাঁটা বেশি একবারেই বাজে / বোয়াল মাছটা রাক্ষুসে যে খাই না আমি লাজে, / রুই মাছেরও স্বাদ কিছু নেই বলে বাজান ভেবে / আগের মত মাছের যে স্বাদ কেই বা এনে দেবে? / কই মাগুর আর জিয়ল ভেদা বর্জ্য ডোবায় থাকে / এই সবের বাজে মাছ ভাই ক’জন খায় আর লাখে? / আসল কথা বলি আমি দুঃখ কিছু নাই / এইসব মাছ কুইমা যাওয়ায় খাইবার নাতো পাই।
পানি দূষণ ছাড়াও মানুষ অতিমাত্রায় সময় অসময়ে মাছ আহরণের ফলে ও মাছের আবাসস্থল ধ্বংস করার ফলে মাছের ও জলজ প্রাণীদের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতে করে পানির পরিবেশ খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে। আমাদের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটা হুমকি হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণ ও পানিদূষণের মতো আমরা মাটিকেও সবসময় দূষিত করে ফেলছি। কৃষি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক অপচনশীল ময়লা আবর্জনা যেমন- পলিথিন, প্লাস্টিক, হাসপাতালের বর্জ্য ইত্যাদি মাটিতে মিশে মাটি দূষিত হচ্ছে। এতে মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। খাদ্য ঘাটতি শুরু হচ্ছে।
এসব দূষণ ছাড়াও শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। লোকালয়ে যত্রতত্র উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার, গাড়ির হাইড্রোলিক হর্নের ব্যাপক ব্যবহার ও গাড়ির শব্দ তা ছাড়া অপরিকল্পিত কলকারখানায় উচ্চশব্দ সৃষ্টি হয়ে শব্দ দূষণ করে পরিবেশ দূষিত করে আমাদের বেঁচে থাকাটা কষ্টসাধ্য করে তুলছে। শব্দদূষণের ফলে মানুষের শ্রবণশক্তি নষ্ট, উচ্চরক্তচাপ, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যথা, বিষণœতা ইত্যাদি রোগ হয়, যা আমাদের জন্য খুবই দুঃসংবাদ।
এসব উল্লেখযোগ্য দূষণ ছাড়াও আমরা অবাধে বনজঙ্গল কেটে এর পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছি। আবাসস্থল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিসাধনের জন্য যত্রতত্র কালভার্ট ব্রিজ ও জলকপাট নির্মাণ ও ভরাট দখল করে পুকুর ও দেশের আশীর্বাদ শত শত নদীগুলোকে মেরে ফেলছি। অন্য দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত আমাদের নদীগুলোকে পানি সঠিকভাবে না দেয়ায় আগামী ৩০ বছরে বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এ কথা বলেছেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. এস.আই খান (করতোয়া, ২৭ এপ্রিল, ২০১৪)। ফলে মৎস্য, পশুপাখি ও গাছপালা মরতে শুরু করেছে। কমতে শুরু করেছে।
আমরা নিজেরা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বন্যপ্রাণী, পশু-পাখি ও নানান প্রাণী মেরে ফেলছি। তাদের খাদ্যে স্থল ও আবাসস্থল ধ্বংস করে তাদের বেঁচে থাকাকে বাধাগ্রস্ত করছি। অর্থের লোভে প্রাকৃতিক সম্পদ নানা প্রাণীর অতিমাত্রায় আহরণ করে প্রকৃতি শূন্য করে ফেলছি। উপকারী নানা পোকামাকড়কে কীটনাশক দিয়ে ধ্বংস করছিÑ জলের ফিল্টার বলে খ্যাত শামুকগুলোকে আহরণ করে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসছি। পাহাড় কেটে শেষ করছি। ফলে শুরু হয়েছে পরিবেশের বড় বিপর্যয়। আর শেষমেশ পরিবেশের এ বিপর্যয়ের জ্বালার মালা মানুষের গলায় পরতে হচ্ছে এবং পরতে হবে। তাই এখন থেকে এগুলো বন্ধ করে সব কিছুকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা শিখতে হবে এবং ব্যবহার করতে হবে। তবেই ভালোভাবে বাঁচবো আমরা, আমাদের প্রজন্ম তোমরা, তোমাদের প্রজন্ম এবং তাদের প্রজন্ম এবং তাদের প্রজন্ম।
আমার নিরীহ নির্ভেজাল নির্মল ছোট বন্ধুরা, তোমরা এখন থেকেই পরিবেশের ব্যাপারে যতœবান হবে। পরিবেশকে দূষণের দানবীয় থাবা থেকে রক্ষা করার জন্য চোখ কান খোলা রেখে পথ চলে পরিবেশকে ভালো রেখে নিজেরা ভালো থাকবে, শুধুই ভালো থাকবে। পরিবেশের একটি ছড়া বলেই শেষ করছিÑ
চোখের মণি দেশের খনি
ছোট্ট সোনা যারা
এই পরিবেশ হবে না শেষ
দাও যদি সব সাড়া।
জানবে তাকে বাঁকে বাঁকে
আঁকবে ছবি তার
বুঝাও তাকে কাজের ফাঁকে
যে বোঝে না আর।
মাটি পানি বায়ু খানি
রাখবে সবি ভালো
বাঁচবে ভূমি হাসবে তুমি
ঝরবে চাঁদের আলো।

SHARE

Leave a Reply