Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী

দুর্গম পথের যাত্রী

আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

রেকানা লজ্জা ও অপমানে মাথা নত করল ঠিক, কিন্তু ওয়াদা মতো ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বসল।
‘এই শক্তি কোনো শারীরিক শক্তি ছিল না। খালিদ মরুদ্যানের খেজুর বাগানে শুয়ে শুয়ে নিজের মনেই বলতে থাকেন, রেকানাকে তিন-তিনবার আছাড় দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়! আরবের কোনো বীরই আজ পর্যন্ত এমনটি পারেনি।’
রাসূল (সা) এর সেই অভাবিত দৃশ্য, সেই দৃষ্টিনন্দন ছবি খালিদের স্মৃতিপটে ভাসছে এখন। খালিদ ভেবে পান না সেই চিরচেনা মানুষটা হঠাৎ কেমন করে এমন বদলে গেলেন। তিনি অনুভব করছেন, যে মুহাম্মদকে এতদিন চিনতাম আজকের মুহাম্মদ যেন তিনি নন, যেন অন্য কেউ। যাঁকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, জেনে আসছি, সে জানায় কত ফাঁক ছিল! নবুওয়তের দাবির পর রাসূলের (সা) সঙ্গে কথাবার্তা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে আর কয় দিনর কথা! অথচ এ কয়দিনে একটি মানুষ কোথা থেকে কোথায় উঠে গেছে! সাধারণ থেকে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ! গাছের ছায়ায় শুয়ে ভাবছেন খালিদ, মাঝে মাঝে মুহাম্মদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার ইচ্ছে তো আমারও জাগতো! কিন্তু আমি রেকানার মতো বীর ছিলাম না। আমি একজন সৈনিক। যুদ্ধের ময়দানে আক্রমণকারীর মুখোমুখি হওয়াই আমার কাজ, কুস্তি লড়া নয়। ফলে মুহাম্মদের মুখোমুখি কোনদিন দাঁড়ানো হয়নি আমার।
কিন্তু লড়াইয়েই বা কী অবস্থা হয়েছিল আমার! কোরাইশদের সাথে মুসলমানদের যখন প্রথম যুদ্ধ হলো, সে সময় এমন অবস্থা হয়েছিল আমার, আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণই করতে পারিনি। সে জন্য কতই না আফসোস ছিল আমার!
এ ছিল বদরের যুদ্ধ! যেখানে মাত্র তিন শ’ তেরো জন মুজাহিদ এক হাজার কোরাইশকে পরাজিত করেছিল! খবর পেয়ে সেদিন আমি দাঁতে দাঁত পিষেছিলাম। কিন্তু আজ? আজ এই খেজুর বাগানে শুয়ে মনে পড়ছে, সেদিন পরাজয় বরণ করে আসা এক কোরাইশকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মুসলমানদের মধ্যে এমন কী গুণ ছিল যার জন্য তারা বিজয় লাভ করল?’ সে আমার প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
খালিদ উঠে বসলেন এবং আঙুল দিয়ে বালুর ওপর বদর ময়দানের দৃশ্য, কোরাইশ ও মুসলমানদের অবস্থান এবং যুদ্ধের কৌশলগুলো রেখাচিত্রের সাহায্যে আঁকতে চেষ্টা করল। পিতার কাছ থেকে সে যুদ্ধের কলাকৌশল ও আঘাতের নিপুণতা ভালই শিখেছিলেন। শৈশবেই পিতা তাকে অশ্বচালনা, অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিয়েছিলেন। কী করে দ্রুতগামী ও উদ্ধত ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় অল্প সময়েই তা রপ্ত হয়ে গিয়েছিল তার। যৌবনে তার মত চৌকস অশ্বারোহী মক্কা শহরে কমই ছিল। কেবল ঘোড়া নয়, উট চালনায়ও তিনি ছিলেন অতিশয় নিপুণ, পিতাই ছিলেন তার উস্তাদ! তিনি তাকে শুধু সৈনিকের ট্রেনিংই দেননি, সেনাপতিত্ব করার কায়দা-কৌশলও শিখিয়েছিলেন। খালিদও যুদ্ধের ব্যাপারে বরাবরই ছিলেন প্রচণ্ড আগ্রহী। সব সময়ই তিনি যুদ্ধের পদ্ধতি ও কৌশল অতিশয় মনোযোগসহকারে লক্ষ করতেন। যৌবনে যখনই তিনি সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়েছেন তখনই যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন।
বদরের যুদ্ধে অংশ না নিতে পারায় তাঁর বিশেষ রকম আফসোস ছিল। কী করে এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া যায় দীর্ঘদিন এ চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে। কিন্তু এখন তাঁর চিন্তাধারা বইছে ভিন্ন দিকে, ভিন্ন গতিতে। এ পরিবর্তন শুরু হয়েছে মক্কা থেকে রওনা হওয়ার বেশ কিছু দিন আগে থেকেই। এ চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু রাসূলে আকরাম (সা)। যিনি বীর রেকানাকে তিন তিনবার পরাজিত করেছিলেন, যার নেতৃত্বে বদরের যুদ্ধে মাত্র তিন শ’ তেরো জন মুজাহিদ পরাজিত করেছিল কোরাইশদের এক হাজার দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকে। এটা যে কোনো মানবিক শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়, এর পেছনে কাজ করছে অন্য কোনো শক্তি, এ কথা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, খালিদ আজ তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করছেন।
বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা কোরাইশদের অনেক লোককে বন্দী করেছিল। এ জন্য কোরাইশদের মনে যে অসহনীয় দুঃখ ছিল তার একটা মন্দ প্রভাব খালিদকেও আচ্ছন্ন করেছিল। তার মনে পড়ছে, যখন বদরের যুদ্ধ চলছিল তখন মক্কার লোকেরা উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে ছিল বদরের পথের দিকে। কখন ধূলির ঝড় তুলে ছুটে আসবে কোনো অশ্বারোহী, শোনাবে বিজয়ের আনন্দময় বার্তা। পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মক্কাবাসীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ যুদ্ধে পরাজয়ের বার্তা শুনতে হবে এমন কোনো আশঙ্কা তাদের ছিল না, তারা শুধু পেরেশান ছিল এ জন্য যে, বিজয়ের বার্তা আসতে এতো দেরি হচ্ছে কেন!
অবশেষে ঘোড়া নয়, দূর থেকে দেখা গেল এক উটের আরোহী এগিয়ে আসছে বদরের দিক থেকে। জনগণ দৌড়ে গেল তার কাছে। আরোহী আরবের প্রথা অনুযায়ী তার জামা ছিঁড়ে ফেললো এবং সে ক্রন্দন করতে থাকল। দুঃসংবাদ বহনকারী কাসেদ এমন নিয়মই পালন করে থাকে। যখন সবাই সমবেত হলো, তখন সে কেঁদে কেঁদে বললো, ‘বড় রকমের বিপর্যয় ঘটে গেছে, কোরাইশরা পরাজিত হয়েছে।’
যাদের আপনজন, আত্মীয়-স্বজন যুদ্ধে গিয়েছিল তারা একে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পেছনে ফেলে আরোহীর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকল। অমুক কি বেঁচে আছে? অমুকের কী অবস্থা? কে কে আহত হয়েছে? কয়জন মারা গেছে? নানা প্রশ্নে ওরা ব্যতিব্যস্ত করে তুলল আরোহীকে।
যুদ্ধে নিহতদের মধ্যে সতের জন খালিদের বনু মাখজুম গোত্রের লোক ছিল। এদের সাথে ছিল খালিদের রক্তের সম্পর্ক। আবু জেহেল নিহত হয়েছে। খালিদের ভাই অলিদ বন্দী হয়েছে যুদ্ধে।
কোরাইশ সরদারদের প্রধান আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা সেখানে সকলের মাঝে উপস্থিত ছিল। সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হে সংবাদবাহক, আমার বাবা ও চাচাদের সম্পর্কে বলো।’
তোমার বাবা উতায়বা আলী ও হামজার হাতে নিহত হয়েছে। আর তোমার চাচা শায়বাকে হামজা একাই হত্যা করেছে। তোমার বেটা হানজালা আলীর হাতে নিহত হয়েছে।’ কাসেদ সবিস্তারে বললো।
আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার চেহারা রাগে, ক্ষোভে বিবর্ণ হয়ে গেল। সে আলী ও হামজাকে উচ্চস্বরে গালি দিতে দিতে চিৎকার করে বললো, আমি আমার বাবা, চাচা ও আমার সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নেবোই নেবো।’ আবু সুফিয়ান স্ত্রীর পাশে নীরব পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শুনছিল তার সম্প্রদায়ের নিদারুণ দুর্ভাগ্যের কাহিনী।
এ খবর শুনে খালিদের রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিলো। এই যুদ্ধে কোরাইশদের সত্তরজন নিহত আর প্রায় সমপরিমাণ বন্দী হয়েছিল।
খালিদ উঠে দাঁড়ালেন। বিছানার চাদর ঝেড়ে গুছিয়ে ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চড়ে বসলেন ঘোড়ায়। ঘোড়া ছুটলো মদীনার দিকে।
খালিদ চিন্তা থেকে তার মাথাকে মুক্ত করতে চাইলেন কিন্তু আবেগের ঘোড়া এসে তার চিন্তাস্রোতকে উড়িয়ে নিয়ে চলল ঝড়ের বেগে। তাঁর হৃদয়ের মরুভূমিতে শুরু হলো সাইমুম ঝড়। কখন আমি মদীনা পৌঁছবো! কখন দেখা পাবো প্রেমের নবীর! ইয়াসরেব! না, না, মদীনা! যেখানে রয়েছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। যে মাটি আজ পরিণত হয়েছে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রভূমিতে।
হুজুর (সা)-এর কথা মনে পড়তেই তার স্মৃতি আবার পলকে চলে গেল অতীতের জীবন্ত সব দৃশ্যের দিকে। তাঁর সামনে ভেসে উঠল সেইসব দৃশ্য, যেসব দৃশ্যের স্রষ্টা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)।
মনে পড়ল স্বামী আবু সুফিয়ানকে বলছে হিন্দা, ‘আমি আমার বাবা ও চাচাকে ভুলতে পারি না। তুমি কি আমার কলিজার টুকরা হানজালাকে ভুলে যেতে বল? মা তার আপন সন্তানকে কেমন করে ভুলে যাবে? আল্লাহর কসম! আমি আমার ছেলের খুনের বদলা নেবোই। মুহাম্মদকে আমি কোনদিন ক্ষমা করব না। এর বদলা তাকে দিতেই হবে, কারণ এ যুদ্ধ সে-ই বাধিয়েছে। আর হামজা ও আলীর পাওনা আমি কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দেবো। ওদের নিস্তার নেই। কখনও ওরা ক্ষমা পেতে পারে না, কারণ ওরা আমার বাপ, চাচা এবং সন্তানকে খুন করেছে। হিন্দার হৃদয়ে খুনির জন্য কোনো রহম নেই।’
‘আর আমার রক্ত গরম হয়ে উঠছে আমার সন্তান হত্যার প্রতিবাদে।’
আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমার সন্তানের খুনের বদলা নেয়া আমার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। সবার আগে আমি মুহাম্মদের বিরুদ্ধে বিরাট এক বাহিনী গড়ে তুলতে চাই, যে বাহিনী আগামীতে এই বিপর্যয়ের ক্ষতি সুদাসলে আদায় করতে পারবে।’
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও লেখক আল ওয়াকেদি লিখেছেন, আবু সুফিয়ান দেশের সব সরদার ও নেতাদের ডাকলেন পরামর্শের জন্য। এই সরদারদের বেশির ভাগই ছিল যারা কোনো কোনো কারণে বদরের যুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি, কিন্তু তাদের কোনো না কোনো আত্মীয় ও আপনজন বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তাদের বুকে তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। সে আগুনকে আরো উস্কে দেয়ার উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ান এ বৈঠকের আয়োজন করেছিল, যেন সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তারা আরো বলিষ্ঠ ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘এরপরও কি আমার আর বেশি কথা বলার প্রয়োজন আছে?’ আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমার এক তরুণ ছেলে মারা গেছে। যদি আমি তার প্রতিশোধ না নিতে পারি তবে আমার এ বেঁচে থাকার কী মানে আছে?’
‘কোরাইশদের এমন বেইজ্জতির পরও কি আমরা চুপ করে বসে থাকবো?’
খালিদের চাচাতো ভাই আবু জেহেলের ছেলে আকরামা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘সাফওয়ান বিন উমাইয়ারা কি কোরাইশদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা চিন্তা করবে না? স্বজাতির এ দুর্দিনে আল ওয়ালিদের সন্তানেরা কি চুপ করে থাকবে?’
‘আমরা এখানে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে আসিনি।’
আবু সুফিয়ান বললেন, ‘খালিদ! তোমার এমন কথা বলা উচিত হয়নি যাতে অন্য কেউ অপমান বোধ করে।’
‘আমাদের মধ্যে আজ আর কোনো সম্মানিত ব্যক্তি বেঁচে নেই।’ খালিদ বললেন, ‘আমরা কেউ সে পর্যন্ত সম্মানিত হতে পারব না, যে পর্যন্ত মুহাম্মদ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নির্মূল না করতে পারি। আমার ঘোড়ার লাগামের কসম! কসম আমার টকটকে লাল রক্ত আর রক্তিম চক্ষুদ্বয়ের, কেবল মুসলমানদের রক্তই এই চোখ শীতল করতে পারে।’
খালিদ আরো বললেন, ‘আমি জানি, এ অপমানের প্রতিশোধ নিতে নেতারা এখন এগিয়ে যাবেন। যুদ্ধের ময়দানে আমি কোথায় থাকব তা-ও আমি জানি। আমি ওয়াদা করছি, এ যুদ্ধে সেনাপতির আদেশ আমি মেনে চলব, কিন্তু যদি মনে করি, সেনাপতি আমাকে যে আদেশ করছেন তাতে আমাদের ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তাহলে সে আদেশ আমি অমান্য করতে দ্বিধা করব না।’
বৈঠকে সবাই একমত হয়ে আবু সুফিয়ানকে সরদার মনোনীত করলো।
কয়েকদিন আগের কথা। ফিলিস্তিন থেকে মক্কাবাসীদের একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা মক্কায় ফিরে আসে। এই কাফেলায় মক্কাবাসী বিশেষ করে কোরাইশদের সকল বংশেরই মালামাল ছিল। কাফেলায় ছিল কমপক্ষে এক হাজার উট ও এসব উটে বোঝাই ছিল বিপুল অর্থের মালামাল। কাফেলার সরদার ছিলেন আবু সুফিয়ান।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply