Home প্রতিবেদন কুমিরের মায়াকান্না

কুমিরের মায়াকান্না

মৃত্যুঞ্জয় রায়

কেউ যদি সত্যি না কেঁদে চোখের পানি ফেলে তবে সেই কান্নাকে বলে মায়াকান্না। কুমির নাকি সেই মায়াকান্না কাঁদে। সত্যিকার দুঃখ ছাড়াই কুমির কাঁদে। অনেকেই বিশ্বাস করে কুমির যখন কোনো মানুষ বা প্রাণীকে খেতে থাকে তখন তার চোখ থেকে পানি পড়ে। কুমির হয়তো ভাবে, আহারে, বেচারা প্রাণীটা মরে যাচ্ছে! ভাবখানা এমন যে প্রাণীটার শোকে সে কাতর। কুমির তাকে নিজেই মেরে চোখ থেকে পানি ফেলে বলে হয়তো কুমিরের কান্নাকে বলে মায়াকান্না। আমাদের অনেকেও এ রকম লোক দেখানো কান্না কাঁদতে পারে। আসলে কি কুমির কাঁদতে পারে? ওদের কি সুখ-দুঃখের কোনো অনুভূতি আছে? বিশ্বাস করো বা নাই করো, তবে এ কথা সত্যি প্রাণীদের খাওয়ার সময় তার চোখ থেকে পানি পড়ে। এটা তার কান্নার জন্য না। খাওয়ার সময় কুমিরের চোখে বুদবুদ তৈরি হয়। চোখের সাইনাসের মধ্য দিয়ে এ সময় বাতাস চাপ দেয় ও তা অশ্রুগ্রন্থি বা ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডের অশ্রুর সাথে মিশে চোখ দিয়ে টপটপ করে পড়তে থাকে যাকে কান্না বলে ভুল হয়। আসলে কিন্তু কুমির কাঁদে না।
নাইল কুমির বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরীসৃপ প্রাণী। কুমির আর সাপ একই ধরনের প্রাণী, তাই ওদের রক্ত ঠা-া। কুমিরের দাঁত খুব ধারালো। কুমিরের প্রত্যেক চোয়ালে আছে ২৪টি দাঁত। কোনো দাঁত পড়ে গেলে আর একটা নতুন দাঁত ওঠে। একবার কাউকে কামড়ে ধরলে আর রক্ষা নেই। কুমিরের মতো আর কোনো প্রাণী এতো জোরে কামড়াতে পারে না। তাই বলে ভেবো না, ওদের চোয়াল খুব শক্ত। যে কোনো মানুষ চোয়াল দুটোকে একবার চেপে ধরতে পারলে ও আর তা খুলতে পারে না। এমনকি দুটো চোয়াল একটা রশি বা রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকে রাখলেও আর তা খুলতে পারে না।
কুমির না খেয়েও অনেক দিন বাঁচতে পারে। বেশির ভাগ কুমির থাকে নদী বা হ্রদের মিঠা পানিতে। লবণ পানিতেও কিছু কুমির আছে। সেসব কুমির অনেক বড়, দৈর্ঘ্যে ৭ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বড় কুমিরের ওজন ১২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু অবাক ব্যাপার কি জানো? কুমির এতো বড় প্রাণী হলেও ওদের ডিম কিন্তু রাজহাঁসের ডিমের চেয়ে বড় না! এতো ছোট্ট ডিম থেকে এতো বড় একটা প্রাণী কি করে হয়? একটা মা কুমির ২০ থেকে ৮০টি ডিম পাড়ে। হায়েনা, সারস এমনকি কোনো কোনো মানুষও কুমিরের ডিম খায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন মাছ, গুইসাপ, হিরণ ইত্যাদি প্রাণীরা প্রায় ৯৯ শতাংশ বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে। এ জন্য কুমির বালুর মধ্যে গর্ত করে বা লতাপাতা ও ডালপালা দিয়ে বাসা বানিয়ে তার মধ্যে ডিম লুকিয়ে রাখে ও তা দেয়। তা দেয়ার সময় মা কুমির কিছুই খায় না। ডিম পাড়ার পর প্রায় ৩ মাস পর্যন্ত মা কুমির সেগুলোকে চোখে চোখে রাখে। কখনো কখনো কোনো কোনো কুমির নিজের বাচ্চাকেও খেয়ে ফেলে। কুমির ভালো শুনতে পায়। এমনকি ডিমের ভেতরে থাকা বাচ্চার ডাকও কুমির শুনতে পায়। কুমিরের বাচ্চারা ডিম ফুটে বের হওয়ার আগেই ডিমের ভেতরে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। বাচ্চাদের মুখের সামনে এক ধরনের ডিম-দাঁত থাকে। এই দাঁত দিয়ে গুঁতো মেরে ডিমের খোসা ফাটিয়ে বাচ্চারা বাইরে চলে আসে। ডিমের ভেতরে বাচ্চারা ডাকাডাকি শুরু করলে মা কুমির তাড়াতাড়ি বাসা ছেড়ে চলে আসে। এমনকি সে সময় যদি কোনো ডিম ফুটতে বাকি থাকে তাহলে কখনো কখনো সেগুলো সে মুখে করে সরিয়ে নেয়। মা কুমির ডিম থেকে ফোটার পর বাচ্চাদের পানিতে যেতে সাহায্য করে। সদ্য ফোটা কুমিরের একদল বাচ্চাকে বলে পড।
কুমিরের চামড়াকে সবচেয়ে মসৃণ আর উত্তম বলে বিবেচনা করা হয়। এ জন্যই বোধ হয় কুমিরের চামড়া দিয়ে বানানো একটা পার্স বা ছোট্ট ব্যাগ বিক্রি হয় ১৫ হাজার ডলারে! একটা কুমিরের কত দাম ভাবো তো? কিন্তু কি মনে হবে ওদের চামড়া এতো সুন্দর? বরং উল্টোটাই মনে হবে। কেননা, ওদের চামড়া এতো শক্ত আর কাঁটাময় অমসৃণ যে তাতে খোঁচা দিলে কোনো কাঁটা ফুটবে না, তীর ছুড়লেও ফুটবে না। এমনকি পিস্তলের বুলেটও ফিরে আসে। তবে সেটি হলো কুমিরের পিঠের চামড়া। পিঠের চামড়া খুবই শক্ত। কিন্তু পেটের চামড়া খুব মসৃণ ও উত্তম মানের। অনেকে কুমিরের চামড়া ঘরে রাখে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। চামড়ার লোভে অনেকেই কুমির ধরে ও মেরে ফেলে যা অন্যায়।
কুমির খুব ভালো সাঁতরাতে পারে। ওরা ওদের লেজের সাহায্যে দ্রুত সাঁতরাতে পারে। ঘণ্টায় কুমির ৪০ কিলোমিটার বেগে সাঁতরাতে পারে। কুমির অল্প দূরত্বে খুব দ্রুত চলতে পারে। পানির মধ্যে ওরা ২-৩ ঘণ্টা ডুবে বা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এমনকি পানির উপরে লাফ দিয়ে ওরা কয়েক মিটার দূরে যেতেও পারে। কাঁটাওয়ালা লেজের ঝাপটা দিয়ে ওরা সহজে শিকারকে ঘায়েল করতে পারে। কুমির বিভিন্ন ধরনের মাছ, পাখি ও প্রাণী শিকার করে খায়। বছরে এরা সাধারণত ৫০ বার খায়। কুমির সাধারণত নদীর মোহনায় বেশি থাকে। সুন্দরবনের নদীতে অনেক কুমির আছে। কুমির ৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচে! কুমির এক বিপন্ন প্রাণী। এখন অনেক দেশেই কুমির পোষা হচ্ছে, কুমিরের খামার গড়ে তোলা হয়েছে।

SHARE

Leave a Reply