Home স্বাস্থ্য কথা জলবসন্ত হলে কি করবেন?

জলবসন্ত হলে কি করবেন?

ডা. মো: শহীদুর রহমান খান

গরম শুরু হওয়ার সাথে সাথে অস্বস্তিকর পরিবেশের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। চিকেনপক্স, হাম জাতীয় অসুখ-বিসুখ তাদের আগমন বার্তা জানানো শুরু করেছে। সেজন্য ভীষণ রকম ছোঁয়াচে এই রোগগুলো থেকে আগে থেকেই আমাদের সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। এই মৌসুমে যেসব রোগ সবচেয়ে বেশি হতে দেখা যায় তার মধ্যে চিকেনপক্স বা জলবসন্ত অন্যতম। শীতের শেষে ও বসন্ত ঋতুতে এই রোগ বেশি হতে দেখা যায়।
চিকেনপক্স বা জলবসন্ত কি
ভেরিসেলা জোস্টার নামক এক ধরনের ভাইরাস দিয়ে এই রোগ সংক্রমিত হয়। অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগ গরমের দিনে বেশি হয়। নারী-পুরুষ যে কারো যে কোনো বয়সে পক্স হতে পারে। তবে শিশুদের অর্থাৎ ১০ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি হতে দেখা যায়।
যেভাবে এই রোগ ছড়ায়
চিকেনপক্স সাধারণত ১. আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশির মধ্য দিয়ে ছড়ায়, ২. চিকেনপক্সের ফলে সৃষ্ট ফোসকা ফেটে গিয়ে যে পদার্থ নির্গত হয় তা অন্যের সংস্পর্শে এলে এই রোগ সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাস দেহে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই উপসর্গ দেখা যায় না। রোগটির সুপ্তিকাল ২ থেকে ৩ সপ্তাহ। তবে সাধারণত জীবাণু দেহে প্রবেশের ৮-১০ দিনের মধ্যে কিছু না কিছু লক্ষণ দেখা যায়।
লক্ষণ
প্রথমে সমস্ত শরীরে ব্যথা ও অস্বস্তি হয়ে থাকে। তারপর জ্বর, দানা বা ফোসকা হয়- জ্বর ১০০০ থেকে ১০১০ বা ১০২০ পর্যন্ত উঠতে পারে। দানা বা ফোসকা প্রথমে মুখে, বুকে, গলায় ও পিঠে দেখা যায়, আকারেও ছোট থাকে। পরে শরীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে। দানাগুলোও আকৃতিতে একটু বড় হয় এবং তার ভেতরে পানি জাতীয় পদার্থ জমে ফোসকারীর মতো দেখা যায়। এই পানি ভাইরাস দ্বারা পূর্ণ থাকে। বাদামি রঙের এই ফোসকা পরবর্তীতে কিছুটা কালছে বর্ণ ধারণ করে। দানা কারো ক্ষেত্রে কম কারো ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। শরীরে ব্যথার সাথে চুলকানিও থাকতে পারে। পক্স অনেক সময় ভেতরে হতে দেখা যায়। তখন গলায় ব্যথা হয়, ঢোক গিলতে ও খাবার খেতে খুব কষ্ট হয়।
চিকিৎসা
ভাইরাস ইনফেকশন এই চিকেনপক্সের কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী এই রোগের চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল সাসপেনশন খাওয়ানোই ভালো। সিরাপের চেয়ে সাসপেনশন নিরাপদ। কারণ এটা তৈরিতে ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল নামক উপাদান-এর প্রয়োজন হয় না, যেটা কিনা সিরাপ তৈরিতে প্রয়োজন হয়। ভালো কোম্পানির সাসপেনশন নিশ্চিন্তে খাওয়ানো যায়। চুলকানির জন্য এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। এই ওষুধগুলো ট্যাবলেট ও সিরাপ দুই ভাবেই পাওয়া যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে সিরাপ বেশি উপযোগী।
এই রোগ থেকে অন্য কোনো ইনফেকশন বা সংক্রমণ যাতে না হয় সেজন্য এন্টিবায়োটিক খাওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে। ৫-৭ দিনের মধ্যে ফোসকাগুলো শুকাতে আরম্ভ করে। শুুকানোর পর আক্রান্ত চামড়া পড়ে যায়। এই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি রোগ সংক্রমিত হয়। কারণ পড়ে যাওয়া চামড়া থেকে ভাইরাস ছড়ায়। তাই অবশ্যই খেয়াল রাখা প্রয়োজন যাতে করে আক্রান্ত চামড়া যেখানে সেখানে না পড়ে। চোখের ভেতরে পক্স হলে চোখে ইনফেকশন হয়ে চোখের সাদা অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অনেকের ধারণা, এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে দানা ওঠা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে আবার চিকেনপক্স হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। যার একবার জলবসন্ত হয়ে থাকে, তার জীবনে আর এই রোগ হওয়ার ভয় থাকে না। কারণ তার শরীরে চিকেনপক্স এর আজীবন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
রোগীর খাবার
এই সময়ে রোগী সব ধরনের স্বাভাবিক খাবারই খেতে পারবে। তবে এলার্জি যাতে না হয় সেজন্য সেইসব খাবার যেমন ডিম, বেগুন, ইলিশ মাছ, গরুর গোশত, চিংড়ি মাছ রোগীকে না দেওয়াই ভালো। তাছাড়া এ সময় রোগীর এমনিতেই চুলকানি হয়ে থাকে। দুধ, মুরগির গোশত, স্যুপ, ফল-মূল, শাক-সবজি এসব খাবার রোগীকে পরিমিতভাবে খাওয়াতে হবে।
সতর্কতা
যেহেতু এই রোগ অত্যন্ত ছোঁয়াচে তাই রোগীকে আলাদা করে মশারি টাঙিয়ে রাখতে হবে। রোগীর ব্যবহার্য সমস্ত দ্রব্য যেমন- প্লেট, গ্লাস, কাপড়, তোয়ালে, বিছানার চাদর, বালিশের কভার সমস্ত একদিকে যেমন আলাদা রাখতে হবে। তেমনি নিয়মিত গরম পানি ও স্যাভলন দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। দানাগুলো যাতে নখ দিয়ে না চুলকায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এতে করে দাগ হতে পারে। এ সময় গোসল না করিয়ে প্রথমে ভিজে তারপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে খুব সাবধানে রোগীর গা মুছিয়ে দিতে হবে, যাতে গুটিতে ছোঁয়া না লাগে। যদিও পক্সের দাগ কিছুদিন পর আপনা আপনি মিলিয়ে যায়, তবুও সুস্থ হয়ে যাবার পর দাগের জায়গাগুলোতে কোনো ভালো ক্রিম বা লোশন লাগালে আরাম ও উপকার দুই-পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত সেবা যতœই এই রোগের আসল চিকিৎসা।
জটিলতা
চিকেনপক্স আক্রান্ত ব্যক্তি বা শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি খুবই কম। যেটুকু আছে তাও সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি হতে দেখা যায় এবং সেটাও পক্সের জটিলতার কারণে। পক্স থেকে শিশু ও কিশোররা অনেক সময় যে সকল জটিলতায় ভুগে থাকে সেগুলো হচ্ছেÑ
ষ নিউমোনিয়া
ষ মায়োকার্ডইটিস (হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশির সমস্যা)
ষ গ্লোমেরু লোনেফরাইটিস (কিডনির সমস্যা)
ষ এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের সমস্যা)
প্রতিরোধ
চিকেনপক্স প্রতিরোধের জন্য কোনো প্রতিষেধক বা টিকা এখনো নেই। তাই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। রোগীকে বাড়িতে আলাদা করা সম্ভব না হলে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্ক বেশি হতে হবে। যারা আক্রান্ত তাদের প্রতি কোনো বিশেষ যতœ নিতে হবে আর যারা সুস্থ আছে তাদেরকে আক্রান্তদের থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ শিশুরা খুব সহজেই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

SHARE

Leave a Reply