Home ফিচার হ্রদ ‘লেক ন্যাট্রন’, জীবন্ত প্রাণী মমি হয় যেখানে!

হ্রদ ‘লেক ন্যাট্রন’, জীবন্ত প্রাণী মমি হয় যেখানে!

মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

Featureপূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার উত্তর প্রান্তে কেনিয়া আর তানজানিয়া সীমান্তের মাঝে অবস্থিত লবণাক্ত হ্রদ ‘লেক ন্যাট্রন’। একবার দেখলে বার বার দেখতে মন চাইবে। সৌন্দর্যের কারণে অনেকে লেকটিকে বেহেশতের সাথেও তুলনা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে একেবারে ভিন্ন। লালবর্ণের এই লেকটিতে উচ্চমাত্রার লবণ এবং সোডার উপস্থিতি রয়েছে। আরো আছে নানা রাসায়নিক যৌগ। তাপমাত্রা ভয়াবহ রকমের বেশি। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, লেকের আশপাশে প্রায়ই এমন সব মৃত পশুপাখির দেহ পাওয়া যায়, যেগুলো অনেকটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, লেকের বিচিত্র রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবেই এমনটা হয়।
নয় দশমিক আট ফুট গভীর হ্রদটির পানির উৎস্য পাশের অনেকগুলো পাহাড়। প্রশস্ততা পানির তলের উচ্চতা অনুযায়ী হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। এক হাজার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকাব্যাপী এই হ্রদটি দেখতে আর দশটি সাধারণ হ্রদের মতো হলেও এর রয়েছে ভয়াবহ কিছু বৈশিষ্ট্য। এর পানির তাপমাত্রা ভয়াবহ রকমের বেশি। প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। মাঝে মাঝে এটি ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করে। এছাড়া এই হ্রদের পানিরpH-এর মাত্রা ৯ থেকে ১০.৫, যা সমুদ্রের পানির pH থেকেও বেশি। আর ক্ষারত্ব অ্যামোনিয়ার কাছাকাছি। হ্রদ এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টির পরিমাণ মাত্র ৪০০ মিলিমিটার। হ্রদটি বেশির ভাগ প্রাণীই এড়িয়ে চলে।
ন্যাট্রোন এক ভয়াল লেক যেখানে জীবন্ত প্রাণী মমি হয়ে যায়! হ্রদের তলদেশের মাটিতে রয়েছে সোডিয়াম কার্বনেট আর সোডিয়াম বাইকার্বনেট যা সৃষ্ট করে অতিরিক্ত তাপমাত্রার। অতিরিক্ত এই তাপমাত্রার কারণে হ্রদের পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে থাকে। এর ফলে পানিতে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে। এরকম লবণাক্ত পরিবেশে জন্ম নেয় এমন কিছু অণুজীব, যাদের পুষ্টির উৎস হচ্ছে লবণ। খুবই উত্তপ্ত বলে এখানে কোনো বন্যপ্রাণীর বসবাস নেই। তবে কিছু বিশেষ প্রজাতির শৈবাল আর ফ্লেমিঙ্গো পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হচ্ছে এই হ্রদ। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হচ্ছে, পূর্ব আফ্রিকার দুই দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির একমাত্র আবাসস্থল বা জন্মস্থান হচ্ছে এই হ্রদ। লবণাক্ততা বাড়ার সাথে সাথে হ্রদে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামের শৈবালও জন্মাতে থাকে। ফ্লেমিঙ্গো পাখিগুলো মূলত স্পিরুলিনা নামে নীলাভ-সবুজ শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে। আর এই হ্রদে তাদের বাচ্চাগুলো অন্য প্রাণীদের থেকে সুরক্ষিত থাকে। অন্য প্রাণী এ হ্রদের তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফ্লেমিঙ্গো বা অন্য প্রাণীগুলো হ্রদের পানিতে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মারা যায়। তাদের দেহের টিস্যুগুলো ক্যালসিয়ামে পরিণত হয়। এর ফলে তারা ক্যালসিয়ামের মূর্তিতে পরিণত হয়। একে বলে ক্যালসিফিকেশন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আজো জানেন না, কেন ফ্লেমিঙ্গো পাখিগুলো হ্রদের পানিতে পড়ে যায়। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, হ্রদের পানিতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হলে সেটা ফ্লেমিঙ্গো পাখিকে আকৃষ্ট করে। এর ফলে তারা পানিতে ঝাঁপ দেয়, যার পরিণতি হয় করুণ। হ্রদের তীরজুড়ে ফ্লেমিঙ্গো, স্টার্লিং, হর্নবিল, ঘুঘুসহ অনেক পাখির মৃতদেহ এমনভাবে পড়ে থাকে, দেখলে মনে হয় যেন তাদের মমি করে রাখা হয়েছে।
আশার কথা হচ্ছে লেকটি নিয়ে গবেষণা চলছে। বছরের কিছু কিছু সময় মৌসুমি ফসলও এখানে হয়। হ্রদটির পাশে ইওয়াসো কেনিয়া সীমান্তের এনজিরো নদীতে হাইড্রোইলেক্ট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তবে লেকটি পর্যটকদের জন্য এখনো নিরাপদ নয়।

SHARE

Leave a Reply