Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন মোরা বড় হতে চাই

মোরা বড় হতে চাই

আহসান হাবীব ইমরোজ
Dayআস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। সুপ্রিয় বন্ধুরা ভালো আছ নিশ্চয়ই? তোমাদের সাথে দ্রুত একটি ঘটনা শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না। ভণিতা ছাড়াই বলে ফেলি কেমন?
৩১ জানুয়ারি, ২০১৪। রাত সাড়ে ৮টা ছুঁই ছুঁই।
নাকি সুরে নোকিয়া টোন বেজে উঠলো। আড়চোখে দেখলাম স্যামসাংয়ের স্ক্রিনে একটি ‘রবির আন-নুন নাম্বার। চকিতে চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ধরবো কী, ধরবো না …। বছর চারেক আগে সাত-পাঁচ না ভেবেই একটি আন-নুন নাম্বার ধরে বসি, ওপার থেকে বলে কি না; হ্যালো, আমি জিন বলছি : …। জিনের সাথে সেই মধ্যরাতের মধুর আলাপনের গল্প না হয় আরেকদিন করবো। আজ এই ফোনের কথাই বলি; Ñ হ্যালো, ভাইয়া কেমন আছেন? আমি মহিউদ্দীন বলছি। ইত্যাদি, দেখুন; আমার অনুষ্ঠানটা দেখাবে, …।
কে এই মহিউদ্দীন? গত ২৯ নভেম্বর, ২০১৩; টিভির সামনে বসা। হাজারো জরিপের ভিড়ে আমজনতার মতামতের এ জরিপটি নজরে আসেনি কিন্তু নিজের আত্মপর্যালোচনার এক্সরেতে ধরা পড়ে বারবার; নানা কারণেই মাসে একবারের বেশি বিটিভির সামনে বসা হয় না। আবার এই একবার যে কারণে বসা, সেটি হচ্ছে ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠান। সাধারণত মানুষ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি বলে বা লিখে সবশেষে আর বিরক্তি না বাড়াতে যোগ করেÑ ইত্যাদি। অথচ মজার বিষয় বিটিভির এক নাম্বার অনুষ্ঠান হচ্ছে ইত্যাদি। হা: হা: হা: … ।
গত ২৯ নভেম্বর, প্রিয় ইত্যাদি; যথারীতি নিয়মিত মানবিক রিপোর্টের মতো সেদিনও চট্টগ্রামের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন শরীফ আর লক্ষ্মীপুরের মহিউদ্দীনকে দেখালো। শরীফের গল্প আগেই বলেছি; এবার মহিউদ্দীন। গল্পটা কি আমিই বলবো নাকি তার থেকেই শুনবে বন্ধুরা? ৩০ বছরের এই সংগ্রামী মহিউদ্দীন কিশোরকণ্ঠের পাঠকদের জন্য মেইল করে পাঠিয়েছেন নিজের সংগ্রামের সেই স্বর্ণোজ্জ্বল কাহিনী।

আমার জন্মদিন ২৭ সেপ্টেম্বর। ১৯৮০ সাল থেকে এ দিনটি বিশ্বে ‘ডড়ৎষফ ঞড়ঁৎরংস উধু’ বা ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নিশ্চয়ই আমার জন্মদিন তাই এ অধমের প্রতি স্পেশাল খাতির দেখিয়ে জাতিসংঘ এটি পালন করছে না।

কেনইবা তারা এ দিনটি বেছে নিলো এ ব্যাপারে আমার তথ্যের ঝুলি একদম ফকফকা। হতে পারে তালগাছে কাক বসা মাত্রই তাল পতনের মতোই কাকতালীয়। তাই ফাল্গুনের এই ফজরে নিজের ফখর দেখিয়ে ফক্করের মতো ফচফচ কথা বলার ফন্দি-ফিকির না ফাঁদাই ভালো।
অনেকের উড়–ক্কু মাছের মতোই সবসময় কেমন উড়– উড়– একটা ভাব থাকে। এদের জন্য ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ বলে একটা কথা আছে। অভিধান বলে, ভ্রমণ শব্দটা এসেছে সংস্কৃত ‘ভ্রম’ থেকে। তবে এ ‘ভ্রম’ অর্থ ভ্রান্তি বা ভুল নয় বরং ঘূর্ণি বা আবর্ত। তবে আমার মনে হয় ভ্রমণের সাথে বোধ হয় ভ্রমরের কোনো সম্পর্ক আছে।
যাকগে, আমার শিক্ষক-বন্ধু সিকান্দার আলীর সৌজন্যে সেদিন গিয়েছিলাম বাংলাদেশে ভ্রমণের রেকর্ডে যার নাম সর্বশীর্ষে সেই আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলের বাসায়। তিনি হচ্ছেন প্রথিতযশা শিক্ষক বদরুজ্জামান স্যারের ছেলে। মন্ত্রমুগ্ধের মতোই প্রায় ৩ ঘণ্টা শুনে গেলাম সেই স্কুলজীবন থেকে এ পর্যন্ত তার ৫৪টি দেশ ভ্রমণের রোমাঞ্চকর কাহিনী। যার অধিকাংশই তিনি ভ্রমণ করেছেন বাইসাইকেলে। সত্যি মানুষ সাধনা করলে কী না পারে। শুধু গল্প শুনেই নিস্তার পাওয়া গেল না। তার সেই বলিষ্ঠ ও বহু গুণধর হাতে স্বাক্ষর করে তিনি আমাদের উপহার দিলেন তার সম্পাদিত, ৬৭ জন ভ্রমণ পিয়াসীর ৬৭টি অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী সংবলিত ২৯৬ পৃষ্ঠার ‘ভ্রমণের খেরোখাতা’ এক কথায় এ যেন ভ্রমণ বিশ্বকোষ। আর এখানেই শেষ নয়, নিপুণ হাতে তিনি খাওয়ালেন রাতের মজাদার খাবার।
আমি ছিলাম বড় খালার ভ্রমণমন্ত্রী। কোথায় যাওয়া হচ্ছে অথচ আমি নেই এ হতেই পারে না। একবার হলো কী, কোনো কারণে আমাকে রেখেই সবাই হাওয়া। আর যায় কোথায়, রাগে দুঃখে বেচারা নিজ আঙুলগুলোকেই জবাই করে দিচ্ছিলাম প্রায়। এর সাথে যোগ হয়েছে আমার জন্মদিন ২৭ সেপ্টেম্বর যেদিন নাকি ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ সুতরাং জোয়ারের টানতো থাকবেই। যেন সেই খাঁটি গ্রামীণ গল্পের গন্ধ ‘এমনিতেই নাচুনে বুড়ি তার ওপর ঢোলের বাড়ি’।
গত জানুয়ারির ২৬ তারিখ। পিচগলা রোদে দাঁড়িয়ে আছি, লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের জকসিন বাজারে; শোনা যায় ব্রিটিশ আমলেরও আগে এখানে জ্যাকসন নামে এক ইউরোপিয়ান থাকতো তার নাম ভেঙেই হয়েছে এ নাম। যেমন, মি. কক্সের নামে কক্সবাজার। কালো বাটা জুতার সুখতলি ভেদ করে লাগছে পিচের উত্তাপ। পা যুগল কিছুটা ডিঙিমার্কা হওয়াতে এমনিতেই জুতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক খুঁজে পেলেও আমার হাঁটাহাঁটির তোড়ে ওদের প্রাণ হয় প্রায় ওষ্ঠাগত। মুখ থাকলে ওরা (মানে জুতার কথা বলছি) আলবত চিৎকার দিত ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। দুই পাটির তলা দু’টিই ক্র্যাক (একটু ভিন্ন ভাষায় বললাম, না বুঝলেও চলবে) হয়ে গেছে। এয়ার কন্ডিশনতো বটেই বরং বলা যায় ওয়াটার কন্ডিশন; রাস্তায় একটু কাঁদাপানি থাকলে আলবত সেই ক্র্যাক গলিয়ে মোজার সাথে মাখামাখি করতে পারে। তাতে লাভ শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলির কাঁদাপানির সেই অকৃত্রিম ছোঁয়া পেলেও বারবার অজু করতে হয়, এই যা। বেশ চিন্তায় ছিলাম; যদি হঠাৎ দুই পাটির কোনটির তলা ‘ধরণীর মায়ার বাঁধনে’ জুতা থেকে আলগা হয়ে যায়। হাশিখুশি সুজন নামক চর্মকার মাত্র ১৫ টাকায় রফা করে দিলো।’Ñ ‘স্যার ঢাকায় যাওন পর্যন্ত আর কিছু হইবে না।’ এরপরও দুই মাস হলো এখনও সে বাটার ওপরই সওয়ার আছি। ধন্যবাদ! সুজন তোমাকে।
শেখ সাদী, ডেলকার্নেগির বাণী চিরন্তনী স্মরণ করে নিজকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আসল সান্ত্বনা পেলাম যখন খুঁজে পেলাম লক্ষ্মীপুর পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের সেই ‘জাতীয় হিরো’ মহিউদ্দীনকে। বুকে জড়িয়ে ধরলাম; যেন তার হৃদয়ের উত্তাপে আমি উদ্দীপ্ত হলাম। আমার জুতা নিয়ে যন্ত্রণা দূর হয়ে গেল যখন দেখলাম, কব্জির ওপর হতে তার দু’টি হাত এবং হাঁটুর নিচ থেকে দু’টি পা একদম নেই। তার তড়িৎকর্মা রূপ দেখে ভাবলাম। তার দ্রুত হাতের কব্জির ওপরের দুই অংশ দিয়ে কলম ধরে হাতের লেখা আর নকল পায়ে সাইকেল চালনা দেখে যে কেউ বলবে, হায়রে ! আমরা যে হাত পা-ওয়ালা পঙ্গু। নিজ হাতে আমার দশ টাকা দামের সানফ্লাওয়ার খাতায় তিনি স্বর্ণাক্ষরে লিখলেন তার ঠিকানা। ঢাকায় এসে গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকে আবেদনকৃত এবং মিডিয়ায় বহুল আলোচিত প্রায় ৬৮০ প্রকারে লিখনে পারদর্শী এবং ‘থ্রি ফিংগারস’ নামক সুন্দর হস্তাক্ষর শেখানোর পারদর্শী প্রতিষ্ঠানের প্রধান এইচ এম জারিফের অফিসে বসে তাকে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা ভাইয়া আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘থ্রি ফিংগারস’ আর আমরা জানি লিখতেও কমপক্ষে তিন আঙুল লাগে তাই না? সে বললো হ্যাঁ। আমি বললাম তাহলে এই দুই কব্জি আর দশ আঙুল ছাড়া ‘জাতীয় হিরো’ মহিউদ্দীনের সুন্দর লেখার কী বিশ্লেষণ করবেন? সদা হাশিখুশি সদা সবুজ শার্ট আর লাল টাই পরা জারিফ একটু থেমে বললেন, শুধু চর্চা আর চর্চা। আমি বললাম, ‘অবশ্যই, তবে এর সাথে যোগ করতে হবে একটি সুন্দর মন।’ পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের বাইরে বাগানে বসে ক্রাচ-ক্রাচ করে ডজনখানেক ছবি তুললাম। মহিউদ্দীনের অতিমানবীয় যোগ্যতার সাথে নিজেকে একাত্ম করার ক্ষীণ আশায়। আমাদের সফরের সার্বিক সহযোগিতায় রাহবার হিসেবে ছিলেন কামরুল ও মামুন নামে দুই প্রাণবন্ত যুবক। আর সৌভাগ্যক্রমে তারা আমার খালু ও মামাশ্বশুর। সুতরাং কী মজা; সারাটা পথ, সব আয়োজন ১০০ শতাংশ জামাই আদরের লালগালিচায়।

SHARE

Leave a Reply