Home গল্প মৎস্যকন্যার সাগর অভিযান

মৎস্যকন্যার সাগর অভিযান

মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস

Kuddusমৎস্যকন্যা টেংরি। হাড্ডিসার শরীর পাতলা লিকলিকে গড়ন। যেন তালপাতার সেপাই। টেংরা ওর সহোদর। মোটা তরতাজা জোয়ান। চেহারা সুরতে ভিন্ন হলেও দু ভাই-বোনের মধ্যে ভীষণ ভাব। একজন আরেকজন ছাড়া থাকতে পারে না। পিতা-মাতাকে হারাবার পর আরো গভীর হয় ওদের সম্পর্ক।
টেংরি তখন ছোট। ওকে বাসায় রেখে খাবার আনতে যায় পিতা-মাতা। কিন্তু আর ফেরেনি। সেখানে এক জেলের জালে আটকা পড়ে তারা। এতিম হয়ে যায় টেংরা-টেংরি। অল্প বয়সে পিতা-মাতাকে হারিয়ে বড়ই অসহায় হয়ে পড়ে ওরা। সেই থেকে টেংরি জেলেদের ওপর ভীষণ ক্ষ্যাপা। দুচোখে দেখতে পারে না ওদের।
টেংরা টেংরির বসবাস একটা মরা নদীতে। এক সময় এই নদীতে বড় বড় মাছ ছিল। শোল, বোয়াল, রুই, কাতলা কত কী। অথৈ পানিতে ওরা মনের সুখে ঘুরে বেড়াতো। বর্ষা মওসুমে স্রোতের কলকল শব্দে বয়ে যেতো আনন্দের বন্যা। খুশিতে শোল-বোয়াল নাচানাচি করতো। শিং, মাগুরা ধরতো গান। আনন্দ উৎসবের কোন কমতি ছিল না নদীতে। এতো কিছুর পরও সেখানে টেংরা টেংরি ছিল অবহেলিত। বড় মাছেরা ওদের খোঁজ-খবর পর্যন্ত রাখতো না। সুযোগ পেলে তাড়া করতো। আছড়ে পিছড়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতো। এখন আর সেই দিন নেই। নদী শুকিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু পানি। কোথাও মাজা পানি। ওপারের মানুষ পায়ে হেঁটে এপারে আসে। এপারের মানুষ ওপারে যায়। নদী পারাপারে আর নৌকা লাগে না। শোল-বোয়াল, রুই, কাতলা কোন কিছুই আর নদীতে নেই। কিভাবে যেন হাওয়া হয়ে গেছে। এখন টেংরা, টেংরির রাজত্ব। নদী জুড়ে দুই ভাই-বোনের একচ্ছত্র আধিপত্য। তারপরও ওদের মনে সুখ নেই। আগে অবহেলিত থাকলেও মনের ভেতর ছিল বিরাট বলÑ রুই, কাতলা অভিভাবক, রাজাধিরাজ। কোন বহির্শত্রু আক্রমণ করে সহজে কাবু করতে পারবে না।
এখন সঙ্গী নেই, সাথী নেই। নেই কোনো অভিভাবক। ওদিকে শিকারিরা বসে আছে ওঁৎ পেতে। সুযোগ পেলেই ওরা জাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে নদীতে। বড়ই অসহায় মনে হয় টেংরা টেংরির। এতো কষ্ট আর এতো নিরাপত্তাহীন জীবন আর সহ্য হয় না। একদিন টেংরি বিনয়ের সাথে বলে-
: ভাইয়া এভাবে আর থাকা যায় না। চলো আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।
: কোথায় যাবি?
: এই নদীইতো সাগরে চলে গেছে। সেখানে ইয়া বড় মাছ। জাহাজের মতো জলজ প্রাণী। এক সাথে থাকলে কেউ আমাদের ওপর চোখ রাঙাতে পারবে না। টেংরির কথা শুনে টেংরা মিছিমিছি হাসে। বলে-
: তার মানে তুই সাগরে যেতে চাস?
: হ্যাঁ, সাগরে যাওয়াই নিরাপদ। চারদিকে চেয়ে দেখ মানুষ নামের রাক্ষুসে শিকারিরা কিভাবে জাল নিয়ে বসে আছে। ওই জালে আটকা পড়ার চেয়ে সাগরে বড় ভাইদের সাথে মিলে মিশে থাকাই ভালো।
টেংরা ভেংচি কেটে বলে-
: এই চেহারায় রুব্বানের পাঠ! তালপাতার সেপাই হয়ে বোয়াল মাছের সাথে মিতালি !
: ভাইয়া, আমার চেহারা খারাপ বলে উপহাস করছো?
: একটা কথা সব সময় মাথায় রাখবি- সাগর হলো বড় মাছের জন্যে। আর আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের জন্য খাল-বিল, মরা নদী।
: কিন্তু জীবন বাজানো ফরজ যে। এখানে তো বেঁচে থাকার কোন গ্যারান্টি নেই।
: যেখানেই যাই মৃত্যু একদিন হবেই। সেই মৃত্যুর ভয়ে আমি মাতৃভূমি ছাড়তে রাজি নই। যেখানে জন্মেছি, সেখানেই মরতে চাই।
: তাহলে তুমি সাগরে যাবে না?
: না, না, কক্ষনো না।
টেংরা সিদ্ধান্তে অনড়। মুখ ভার করে বসে আছে টেংরি। দু’জনই চুপচাপ। কোন দিশে না পেয়ে মনের দুঃখে স্থান ত্যাগ করে টেংরি।
দিন যায় রাত যায়। একে একে পার হয়ে যায় দু সপ্তাহ। কিন্তু টেংরি আর ফেরে না। একমাত্র বোনকে না পেয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে টেংরা। এখানে ওখানে সবখানে খোঁজে। তখনো নদী পাড়ে শিকারিদের ভিড়। তাহলে কি কারো জালে আটকা পড়েছে টেংরি। এক অজানা আতঙ্কে গার লোম শিউরে ওঠে টেংরার।
না, টেংরি মরেনি।
স্বাস্থ্য শরীর খারাপ হলেও ভীষণ জেদি ও। ভাইয়ার কাছ থেকে অপমানিত হয়ে মনে মনে সাগরে যাবার জিদ ধরে টেংরি। যেই ভাবা সেই কাজ। মরা নদীর আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটে চলে সাগরের দিকে। দিন রাত অবিরাম চলার পর টেংরি ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে হাজির হয় সাগরে। প্রবেশমুখে বিশাল আকৃতির একটা বোয়াল মাছ হাঁ করে ছিল। তার পেটে ঢুকে পড়ে টেংরি।
বিরাট পেট। যেন ফুটবল খেলার মাঠ। সেখানে মনের সুখে ছুটোছুটি করে, খেলা করে। ভাবে- এতদিন যে সাগরের গল্প শুনেছে, এটাই সেই সাগর। কিছুক্ষণ পর বোয়াল মাছটি মুখ বন্ধ করে। আর নিঃশ্বাস নিতে পারে না টেংরি। বন্ধ হয়ে আসে দম। জীবন যায় যায় অবস্থা, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য বারবার আল্লাহকে স্মরণ করে। হঠাৎ মনে পড়ে যায়, ইউনুস নবীর কথা। একটা দোয়া পড়ে তিনি এমন একটা মহাবিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। টেংরি বারবার সেই দোয়াটি পড়তে থাকে। এবার বোয়াল মাছ হাঁ করে। স্বস্তি পায় টেংরি। নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। ফুড়–ৎ করে বেরিয়ে আসে বোয়ালের পেট থেকে। বিরাট বিপদ থেকে উদ্ধার পায় টেংরি। বাইরে এসে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারে, ওটা সাগর নয়-বোয়াল মাছ। আর দেরি করে না। দুহাতে কান ধরে শপথ করে আবার পিছন ফেরে। উল্টো যাত্রা শুরু করে সেই নদীপথে মাতৃভূমির উদ্দেশ্যে।
এদিকে, বোনকে হারিয়ে টেংরার চোখে ঘুম নেই। নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ। দিনরাত শুধু ভাবে আর নিজকে ধিক্কার দেয়- নিশ্চয়ই ‘ও’ আমার জন্যে নিরুদ্দেশ হয়েছে। তার ভাবনার মধ্যে হাফাতে হাফাতে এসে পার কাছে হুমড়ি থেয়ে পড়ে টেংরি। টেংরা ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। নিজের চোখ দুটোকেও বিশ্বাস করতে পারে না। টেংরিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-
: বোন আমার, এখনো বেঁচে আছিস? তোর চেহারা এমন বিধস্ত কেন?
: আমি ভুল করেছি ভাইয়া। আমাকে ক্ষমা করো।
: পাগলি মেয়ে। কি ভুল করেছিস?
: তোমার ওপর অভিমান করে আমি সাগরে গিয়েছিলাম।
: সাগরে! তারপর?
: সেখানে এক বোয়াল মাছের পেটে আটকা পড়েছিলাম।
: ওরা তোকে বন্ধু করে নেয়নি।
: বন্ধু ! দম আটকে প্রায় মেরে ফেলেছিল। দোয়া ইউনুস পড়ে মুক্তি পেয়েছি। সত্যি ভাইয়া, ওরা সাগরের মাছ। আমাদের মতো চুনোপুটিদের ওরা কেয়ার করে না।
: সে কথাতো আগেই বলেছিলাম, এটা আমাদের মাতৃভূমি। পরদেশে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজ দেশের মৃত্যু অনেক ভালো।
ভাইয়ার কথার কোন উত্তর দিতে পারে না টেংরি। মাথা নিচু করে বোবার মত বসে থাকে। টেংরা আবার শুরু করে-
: একটা কথা বলবো টেংরি?
: অবশ্যই। তুমি যা বলবে, আমি মাথা পেতে নেব।
: আল্লাহ আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন জানিস?
: তুমিই বলো ভাইয়া ।
: মাছেরা মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। তাদের খাদ্য তালিকায় স্থান পেলে আমাদের জীবন সার্থক। আর সেটাই আমাদের ইবাদাত। কাজেই মরতে যখন হবেই সাগরে যাবো কেন। আল্লাহর হুকুম মতো মানুষের হাতে মরবো।
: ভাইয়া, সত্যিই আমি ভুলের মধ্যে ছিলাম। তোমার কথায় আমার চোখ খুলে গেছে। এখন আর মৃত্যুর ভয় নেই। মানুষের কল্যাণ করে জীবনকে সার্থক করতে চাই।
বোনের কথায় খুশিতে বাগবাগ টেংরা আনন্দের আতিশয্যে আবার ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

SHARE

Leave a Reply