Home উপন্যাস বিজ্ঞানীর কবলে বিজ্ঞান

বিজ্ঞানীর কবলে বিজ্ঞান

এনায়েত রসূল

গত সংখ্যার পর

Uponnashআমি বললাম, ঠিক আছে স্যার। তো কেন ডেকেছেন সে কথা বলুন।
ডক্টর তুশো বললেন, বলছি। একটু অপেক্ষা করো।
টেবিলের ড্রয়ার ঘেঁটে ছোট একটা টেলিস্কোপিক স্টিক বের করলেন ডক্টর তুশো। তারপর একটা মানচিত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। মানচিত্রটার গায়ে নানা রঙের পিট সাঁটা ছিলো। লাল-নীল পেন্সিল দিয়ে বেশ কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করা ছিলো। টেলিস্কোপিক স্টিক তুলে তেমন একটি চিহ্নিত জায়গা দেখিয়ে তিনি বললেন, এই যে জায়গাটা ছুঁয়েছি, আমরা এখন ঠিক এখানে আছি। জাপানের সমুদ্র সীমা ছাড়িয়ে এসেছি সাত দিন আগে।
: এ জায়গাটির নাম কি স্যার?
জিজ্ঞেস করলাম আমি। ডক্টর তুশো মানচিত্রের দিকে একটু ঝুঁকে দেখে নিলেন জায়গাটির নাম। তাকালেন নিজের ঘড়ির দিকে। তারপর বললেন, ঠিক এ জায়গাটার নাম তোমাকে বলা যাবে না। তবে এ মুহূর্তে ল্যাবরোমেরিন ফিলিপিনসের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে চলছে। আমরা মিনডোরা দ্বীপে অভিযান চালাবো। ঠিক করেছি তোমাকে সেখানে পাঠাবো।
ডক্টর তুশোর কথাগুলো আমার কাছে রহস্যময় মনে হলো। প্রথমত এখন আমরা কোন জায়গায় রয়েছি তা তিনি আমাকে জানাতে চাইছেন না। দ্বিতীয়ত তিনি একটি ভিন্ন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অভিযান চালাবার পরিকল্পনা করেছেন, কোনোভাবেই তা সমর্থনযোগ্য নয়।
আমি বললাম, মিনডোরো তো ফিলিপিনসের একটি দ্বীপ, তাই না স্যার? আর ফিলিপিনস একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেখানে অভিযান চালানো কি উচিত হবে?
আমার কথা শুনে ডক্টর তুশোর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, কোনটা উচিত আর কোনটা অনুচিত, তা নিয়ে তোমাকে না ভাবলেও চলবে। তুমি শুধু আমার কথা মতো কাজ করবেÑএই আমার অনুরোধ তোমার কাছে।
বললাম, স্যরি স্যার। বলুন আমাকে কি করতে হবে।
ডক্টর তুশো কিছুটা সময় থম ধরে বসে রইলেন। সম্ভবত আমার কথায় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর যেনো হঠাৎই মনে পড়েছে এমন করে বললেন, ও হ্যাঁ, যা বলছিলামÑআমরা ফিলিপিনসের মিনডোরা দ্বীপে অভিযান চালাবো। এ অভিযানে ওয়াংলি একটা গোপনীয় দায়িত্ব পালন করবে। বিন্দু বোস অপারেট করবে বিশেষ ধরনের অটো বোট। টিম্বাকুকে তোমাদের সার্ভিস বয় হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। আর তুমি যাবে সবার দেখভাল করার জন্য। বলতে পারো অভিযানের কমান্ডার হবে তুমি। সম্ভব হলে মিনডোরা থেকে অপরিচিত পোকামাকড়ের নমুনা নিয়ে আসবে। এখন বলো, এমন একটি রোমাঞ্চকর অভিযানে অংশ নিতে তোমার আপত্তি নেই তো?
আমি জানি এ কথাটা ডক্টর তুশো শুধু শুধুই জানতে চাইলেন। কারণ তিনি কারো কোনো আপত্তি শোনার মতো মানুষ নন। যা বলেছেন তা ভেবেচিন্তেই বলেছেন। তার চেয়েও বড়ো কথা, এ অভিযানে গেলে অন্য এক বাঙালির সঙ্গে আমি পরিচিত হবার সুযোগ পাবো, সে হলো বিন্দু বোস।
আমি আর সময় নষ্ট না করে ঝটপট জবাব দিলাম, না না, আপত্তি থাকবে কেন! এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভার দিয়ে পাঠাচ্ছেন, সে তো আমার সৌভাগ্য।
আমার জবাব শুনে ডক্টর তুশোর চোখেমুখে প্রশান্তির ভাব ছড়িয়ে পড়লো। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন ড্যাস বোর্ডের সামনে। তারপর বললেন, মানুষের জীবনে বয়সটা একটা বিরাট ফ্যাক্টর। আমার যদি তোমাদের মতো বয়স হতো, কোনো কিছুকেই তাহলে পরোয়া করতাম না। যা হোক, তোমাদের মিশন শুরু হবে আজ রাত দুটোয়। আমরা এখন সমুদ্রের পাঁচ হাজার তিনশো ফ্যাদম নিচে থাকবো। তোমাদের মতো ইয়াংম্যানদের জন্য এ গভীরতা নিশ্চয়ই কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
আটচল্লিশ বছর বয়সে অন্যের মুখে ইয়াংম্যান বলতে শুনে মনের মাঝে সুখ সুখ অনুভূত হলেও বুকের ভেতর শিরশির করে উঠলো। তবুও যান্ত্রিক পুতুলের মতো ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বললাম, অতো গভীরে যাবার অভিজ্ঞতা তো নেই স্যার। তবে আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না।
ডক্টর তুশো এ কথার জবাবে আর কোনো কথা বললেন না। শুধু একবার আমার দিকে তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

২৫ জুলাই ১৯৫২
ফিলিপিনো উপকূলের মিনডোরা থেকে লিখছি। টিম্বাকু জন্মের পর থেকেই বন-জঙ্গলের সঙ্গে পরিচিত। বনের পরিবেশ আর আচরণ ওর নখদর্পণে। সেই টিম্বাকু মিনডোরোতে পা দিয়েই বলেছিলো, সাবধানে থাকবেন স্যার। এ ধরনের দ্বীপে বাঘ-ভালুকের মতো অনেক হিংস্র জীবজন্তু থাকে। সুযোগ পেলেই ওরা মানুষজনকে আক্রমণ করে। সে কথা শুনে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি বাঘ-ভালুকের চেয়েও হিংস্র স্বভাবী এখানকার রাক্ষুসে মশা আর রক্তলোভী জোঁকগুলো। মিনডোরোর মশার হুল এতো তীক্ষè যে, সুচের মাথাও মনে হয় তার কাছে হার মানবে। আর জোঁকগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো গাছের ওপর থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ে। এ দ্বীপ সম্পর্কে যদি আমার সামান্যতমও ধারণা থাকতো, তাহলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতাম এখানে না আসার জন্য।
রাত দুটো সাতাশ মিনিটে আমরা মিনডোরা এসে পৌঁছেছি। দ্বীপের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াংলি এসে বললো, আপনি সম্ভবত জানেন স্যার, আমাকে একটা গোপনীয় কাজের দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠানো হয়েছে?
বললাম, হ্যাঁ, ডক্টর তুশো আমাকে সে কথা জানিয়েছেন।
ওয়াংলি বললো, যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। তো স্যার, আমাকে এক্ষুনি সেই দায়িত্ব পালনে যেতে হবে। আমাকে যেতে অনুমতি দিন।
আসলে ওয়াংলির এতোটা বিনয় প্রকাশ করে কথা বলার কোনো দরকার নেই। কারণ ওর মতো বদরাগী ভয়ঙ্কর একটি যন্ত্রের সঙ্গে বিরোধ বাধানোর মতো সাহস আমার নেই। আমি তাই সহজভাবে বললাম, আচ্ছা যাও। তবে একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে ছাড়া নিজেদের অরক্ষিত মনে হবে।
আমার কথা শুনে ওয়াংলি খুব খুশি হলো। সে বললো, তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে চেষ্টা করবো স্যার। তবে যদি না আসতে পারি তাহলে…
কথা শেষ না করে নিজের ব্যাগে হাত ঢুকালো ওয়াংলি। কয়েক সেকেন্ড খোঁজাখুঁজি করে একটা ইনভেলাপ বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী?
ওয়াংলি বললো, ধরুন স্যার। এটা আমাদের প্রভুর চিঠি, আপনার জন্য।
: আমি পড়বো?
না না স্যার, এখন নয়। যদি আগামীকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে ফিরে না আসি, তখন এ চিঠি পড়ার অধিকারী হবেন। মানে, আপাতত চিঠি পড়ার কোনো দরকার নেই। মনে থাকবে তো?
আমি চিঠি হাতে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আর ওয়াংলি আবার দেখা হবে বলে বনের ভেতর ঢুকে পড়লো।
আসার সময় আমরা প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই সঙ্গে এনেছিলাম। অথচ তাঁবু আনার কথা কারো মনেই পড়েনি। কিন্তু মাথার ওপর তো একটা আচ্ছাদন দরকার। বাধ্য হয়েই ছিমছাম একটা গুহাকে বেছে নিয়েছিলাম।
ওয়াংলি চলে যাবার পর থেকে সেখানে বসে বিন্দু বোস আর আমি গল্প করছি। কথায় কথায় বিন্দু বোস বললো, তাই জীবনটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। এমন একজন পাগলের অধীনে কাজ করার চেয়ে রান্নাঘরে বসে ভাত রাঁধাও ভালো।
বললাম, পাগল মানে? তুমি কার কথা বলছো?
বিন্দু বোস বললো, কার কথা আর বলবো! যার অধীনে কাজ করছি তার কথাই বলছি। বিশ্বাস করুন ডক্টর নিপু, এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না। কবে যে দেশে ফিরে যেতে পারবো!
বিন্দু বোসের চোখ দুটো ছলছল করছিলো। সেদিকে তাকিয়ে বললাম, দেশের জন্য মন খারার লাগছে?
কেন লাগবে না বলুন? এখন যে জীবন কাটাচ্ছি, তেমন জীবন কাটাবার জন্য তো বাবা-মাকে ছেড়ে এতো দূর আসিনি। আমার বাবা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। মা চিকিৎসক। তাদের একমাত্র সন্তান আমি। বেথুন কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে বিশাখাপত্তম মেরিন একাডেমিতে এডমিশন নিই। শিক্ষাজীবন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ন্যাশনাল সিকিউরিটি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার নজরে পড়ে যাই। তারা আমাকে হিন্দুস্থান মেরিন অ্যান্ড এ্যারোনটিক্যাল অথোরিটিতে নিয়োগ করে। জাপানে আসার আগে আমি সাবমেরিনের আধুনিকীকরণের ওপর কাজ করেছিলাম। একদিন অফিসে গিয়ে দেখতে পাই টেবিলের ওপর একটি চিঠি পড়ে আছে। ওটা পড়ে জানতে পারি জাপানের একটি সাবমেরিন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লোভনীয় বেতন আর আধুনিক সুযোগ সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য আামকে অনুরোধ জানিয়েছে। প্রস্তাবটি তখন খুব সম্মানজনক মনে হয়েছিলো। তাই একদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোক্কাইডুতে চলে আসিÑসেই যে এসেছি, তারপর থেকেই ডক্টর তুশোর ল্যাবরোমেরিনে বন্দী হয়ে আছি। এখানে কাজ করছি। প্রচুর টাকাপয়সা পাচ্ছি। কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না। জানেন তো, গত দু বছরে ল্যাবরোমেরিন এমন কোনো বন্দরে ভিড়েনি যেখান থেকে বাবা-মার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারি। এসব কারণে পাগল হয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছে আমার। আর এ জন্য ডক্টর তুশোই দায়ী।
ডক্টর তুশোকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাই তাকে কেউ ত্চ্ছু-তাচ্ছিল্য করে কথা বললে তা আমাকে আহত করে। তাই বললাম, ডক্টর তুশোর ওপর রেগে আছো তুমি। অথচ তিনি হয়তো তোমার সমস্যার কথা জানেন না। জানলে ব্যবস্থা নিতেন।
বিন্দু বোস অবাক দুটি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো। তারপর বললো, কী বললেন নিপুদা, উনি ব্যবস্থা নিতেন? জানি না বিশ্বাস করবেন কিনা, আমি চারবার তার কাছে ছুটির জন্য আবেদন করেছি। প্রতিবারই তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আসলে কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতে চান না তিনি। কিন্তু আমার তো বাবা-মা আছেন। আত্মীয়স্বজন আছেন। ছোট্ট একটা কেবিনের ভেতর দিনের পর দিন শুয়ে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। দেশে ফিরে যাবার জন্য মন পাগল হয়ে উঠেছে।
কথা শেষ করে দু হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো বিন্দু বোস। কী বলে ওকে সান্ত্ব¡না জানাবো তা ভেবে পেলাম না আমি। শুধু অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

২৬ জুলাই ১৯৫২
অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে অবশেষে ল্যাবরোমেরিনে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ আগে টিম্বাকুকে ওর কেবিনে রেখে এসেছি। দুপুরে ওর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তার ধকল সামলাতে টিম্বাকুর আরো কয়েক দিন লেগে যাবে। জ্বরে বেচারার শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
ঘটনার শুরু হয়েছিলো আজ সকালে। টিম্বাকুকে গুহার পাহারায় রেখে বিন্দু আর আমি দ্বীপের ভেতরটা ঘুরে দেখার জন্য বের হয়েছিলাম। কিছু দূর যাবার পর হঠাৎ মনে হলো কোথা থেকে যেনো একটা আর্তনাদ ভেসে আসছে। থেমে থেমে কে যেনো মরণ যন্ত্রণায় চিৎকার করছে।
আমার মতো শব্দটা বিন্দু বোসও শুনতে পেয়েছিলো। সে জিজ্ঞেস করলো, শুনতে পাচ্ছেন নিপুদা? কেমন একটা শব্দ ভেসে আসছে। টিম্বাকু কোনো বিপদে পড়েনি তো?
কী অবাক কাণ্ড, এ কথাটা আমার মনেই পড়েনি! এ দ্বীপে মানুষ বলতে তো এসেছি আমরা তিনজনÑআমি, বিন্দু আর টিম্বাকু। বিন্দু আমার সঙ্গেই রয়েছে। সুতরাং কোনো বিপদ হলে তো হয়েছে টিম্বাকুর। কেউ আর্তনাদ করলে তা করছে টিম্বাকু। আরো আগেই এ কথাটা আমার মনে পড়া উচিত ছিলো।
এ সময় আবার সেই আর্তনাদের শব্দ ভেসে এলো। সেই শব্দ শুনে বিন্দু বললো, কে এমন করে চিৎকার করছে? গলার স্বর শুনে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আমার মন বলছে টিম্বাকু কোনো বিপদে পড়েছে। চলুন নিপুদা, আমরা ফিরে যাই।
আমারও আর এগোতে ইচ্ছে হলো না। তাই আবার উল্টো পথ ধরলাম। অনেকটা  পথ আসার পর আবার শুনতে পেলাম সেই মরণ চিৎকার। আর তা খুবই কাছ থেকে এবং স্পষ্ট।
এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলো না। বিন্দুকে পেছনে রেখে আমি দ্রুত এগোতে লাগলাম সামনের দিকে। সামনেই একটা ঝোপের মতো ছিলো। সেই ঝোপ বাঁয়ে রেখে দু পা এগোতেই যে দৃশ্য আমার চোখে পড়লো, তা না দেখতে হলেই যেনো ভালো ছিলো আমার জন্য। আমি দেখতে পেলাম বিরাট একটা পলিপাস গাছ তার সাপের মতো লিকলিকে লতা দিয়ে টিম্বাকুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে তুলে নিয়েছে টিম্বাকুকে। সেখান থেকেই সে মাঝেমধ্যে চিৎকার করছে।
আমি শুনেছি পলিপাস নামের এই রাক্ষুসে গাছগুলো কিছুক্ষণের মধ্যে একটি হাতিকেও নিঃশেষ করে দিতে পারে। লিকলিকে লতার গায়ে লেগে থাকা শুঁয়োগুলো  চোখের পলকে শরীর থেকে রক্ত টেনে নিয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
টিম্বাকুর অবস্থা দেখে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। সে সময় টিম্বাকুর চোখ পড়লো আমার ওপর। অমনি ওর চোখের তারায় আশার আলো ছলকে উঠলো। অনেক কষ্টে জড়িয়ে জড়িয়ে সে বললো, স্যার! আমাকে বাঁচান…
এ সময় বিন্দু বোস এসে দাঁড়ালো আমার পাশে। টিম্বাকু তখনো উহ্ আহ করে ককাচ্ছিলো। সেদিকে তাকিয়ে বিন্দু বললো, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন নিপুদা? ওকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। গাছটা তো ওকে মেরে ফেলবে।
বললাম, তা তো বুঝতে পারছি। কিন্তু কেমন করে টিম্বাকুকে উদ্ধার করবো, তা বুঝতে পারছি না।
বিন্দু বললো, আপনি এখানে থাকুন, আমি আসছি।
কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে তা জিজ্ঞেস করার সুযোগও পেলাম না। চোখের পলকে বিন্দু চোখের আড়ালে চলে গেলো।
পলিপাসের লতাগুলো সাপের মতো এঁকেবেঁকে আমার দিকে এগোচ্ছিলো। আমি অবশ্য তা খেয়াল করিনি। আমার চোখ ছিলো উপর দিকে টিম্বাকুর ওপর। কিন্তু উপর থেকে এ জিনিসটি টিম্বাকু লক্ষ্য করলো। আর লক্ষ্য করতেই চিৎকার করে বললো, স্যার সরে যোন, সরে যান। লতাগুলো আপনাকে ধরার জন্য এগোচ্ছে।
এবার আমি ঘুরে তাকালাম নিচের দিকে। দেখতে পেলাম টিম্বাকু ঠিকই বলেছে, পলিপাসের কয়েকটি লতা তিরতির করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
এ দৃশ্য দেখার পর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো বোকামি করলাম না। এক লাফে কয়েক হাত পিছিয়ে এলামÑতারপর আরো কয়েক হাত। সে সময় মাঝারি আকৃতির একটা কাটারি নিয়ে ছুটে এলো বিন্দু। আমার হাতে ওটা তুলে দিয়ে বিন্দু  বললো, এই কাটারিটার কথা মনে পড়ায় ছুটে গিয়ে নিয়ে এলাম। ভীষণ ধারালো। এটা দিয়ে লতাগুলো কেটে ফেলুন। এ ছাড়া টিম্বাকুকে বাঁচানোর কোনো পথ নেই।
আমি বললাম, মেনে নিচ্ছি তোমার কথা। কিন্তু লতা কাটতে হলে তো আমাকে গাছের কাছাকাছি যেতে হবে। আমি তো এগোতেই পারছি না! আমাকে ধরার জন্য লতাগুলো নিসপিস করছে।
বিন্দু বললো, তাহলে আপনি এক কাজ করুন। গাছের ডালের সঙ্গে কাটারি বেঁধে লতাগুলো কেটে দিন। যা করার তাড়াতাড়ি করুন।
তখন আর ভেবে দেখার মতো সময় ছিলো না। এদিক-ওদিক তাকাতেই একটা শুকনো ডাল দেখতে পেলাম, যেটা ভেঙে মাটিতে পড়ে ছিলো। ডালটাকে তুলে নিয়ে দ্রুতহাতে কাটারিটাকে ওটার সঙ্গে বেঁধে নিলাম। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে পলিপাসের লতাগুলোর ওপর প্রাণপণে কুপিয়ে চললাম।
গুহা থেকে আসার সময় কি মনে একটা পেট্রল লাইটারও নিয়ে এসেছিলো বিন্দু বোস। ওটা দিয়ে শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন ধরালো সে। আর সেই আগুন পলিপাসের দিকে ঠেলে দিলো। তার মানে একসঙ্গে আমরা দুদিক থেকে পলিপাসের ওপর আক্রমণ চালিয়ে গেলাম। তাতে দারুণ কাজ হলো। আগুনের সেঁক লাগার সঙ্গে সঙ্গে পলিপাসের লতাগুলো চঞ্চল হয়ে উঠলো। ওদের বাঁধনগুলো আলগা হয়ে আসতে লাগলো। আমিও প্রাণপণে সেই লতাগুলো কেটে চললাম। ফলে পলিপাস টিম্বাকুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। প্রায় আট ফুট উঁচু থেকে আছড়ে পড়লো টিম্বাকু। সঙ্গে সঙ্গে আমি ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আর চোখের পলকে টিম্বাকুকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিলাম।
আমরা দুজন টেনে হিঁচড়ে টিম্বাকুকে যখন গুহার ভেতরে নিয়ে গেলাম তখন ওর অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক ছিলো। পলিপাসের পাচক রসের বিক্রিয়ায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দগদগে ঘা হয়ে গিয়েছিলো। আর গায়ে জ্বর উঠেছিলো কম করেও একশো দুই অথবা তিন ডিগ্রির মতো।
সারাদিন পর সূর্যের আলো যখন ম্লান হয়ে এসেছে তখন তাকালাম ঘড়ির দিকেÑবিকেল চারটা বেজে আটান্ন। ওয়াংলি এখনও ফিরে আসেনি। ও বলেছিলো পাঁচটার মধ্যে ফিরে না এলে আমার জন্য রেখে যাওয়া চিঠিটা আমি পড়তে পারবো। তার মানে আর দু মিনিট পরেই চিঠি খুলবো আমি।
এখন কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটা বাজে। আমাকে তাই ইনভেলপের ফ্ল্যাপ খুলতেই হলো। ইনভেলপের ভেতর রয়েছে একটি চিঠি। ছোট্ট এক টুকরো নীল কাগজের ওপর ডক্টর তুশো লিখেছেন :
ল্যাবরোমেরিন
২৫.৭.৫২
সুপ্রিয় নিপু,
আশা করছি নিরাপদেই আছো। তুমি যখন এ চিঠি পড়ছো ওয়াংলি তখন আমার পাশে রয়েছে। সুতরাং ওর জন্য অপেক্ষা না করে এক্ষুনি ফিরে এসো।
নিত্যশুভার্থী
তুশো
আমি চিঠি পড়ছিলাম আর চিঠিতে কী লেখা আছে তা জানার জন্য বিন্দু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। তাই চিঠিটা আমি বিন্দুর হাতে তুলে দিলাম। বললাম, ডক্টর তুশোর প্রেমপত্রÑপড়ে দেখো।
মুচকি হেসে চিঠিটা হাতে নিলো বিন্দু। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, বুড়োটার সবকিছুই রহস্যময়।
: কী রকম?
জানতে চাইলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে বিন্দু জবাব দিলো, কেন রহস্যময় বলছি বুঝতে পারছেন না? এই যে চিঠি লিখেছেন তিনি, এ চিঠি থেকে একটি কথা তো নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াংলি যে পাঁচটার আগেই ল্যাবরোমেরিনে ফিরে যাবে, তা তিনি জানতেন। পুরোটাই ডক্টর তুশোর প্ল্যান মতো হয়েছে, তাই না?
: তা তো নিশ্চয়ই।
: তাহলে? তিনি যখন জানতেনই ওয়াংলি একা একা ফিরে যাবে, তাহলে আমাদের এমন বিপজ্জনক দ্বীপে পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলার মানে কি? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে যা আমরা জানি না। আপনার কি মনে হয়?
বললাম, হ্যাঁ, আমরা তো তার প্ল্যানের অনেক কিছুই জানি না।
: জানি না, কারণ প্ল্যান করার সময় ডক্টর তুশো সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন না। শুধু যাকে দিয়ে যে কাজটুকু আদায় করতে হবে তাকে সেটুকু জানিয়ে দেন। একটা ব্যাপার ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে।
: কোন ব্যাপার?
: ওয়াংলির একাকী ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা। কেমন করে অমন একটা জবরজং ভারী যন্ত্রমানব ল্যাবরোমেরিনে ফিরে গেলো? যদি বলেন সে সাঁতার কেটে গেছে, আমি বলবো তা সম্ভব নয়। একটা বিশাল জাহাজের পক্ষে ভেসে থাকা সম্ভব কিন্তু একটি লোহার রোবটের পক্ষে মানুষের মতো সাঁতার কাটা সম্ভব নয়। সম্ভবত ওকে নিয়ে যাবার জন্য পরবর্তী সময় ডক্টর তুশো অন্য কাউকে পাঠিয়েছিলেন, আমাদের কাছে তা গোপন রাখা হয়েছে। সে জন্যই বলেছি লোকটার সব কিছুই রহস্যময়।
আমি আসলে ডক্টর তুশোকে নিয়ে এমন ভাবে চিন্তা করিনি। তবে তার কোনো কোনো আচরণ তো একটু বেখাপ্পা, একটু অস্বাভাবিক লেগেছেই। সে কথাটা বললাম বিন্দুকে। বললাম, সব মানুষের মধ্যে কমবেশি রহস্যময়তা রয়েছে। ডক্টর তুশোর মধ্যে হয়তো তার পরিমাণ একটু বেশি। সে যা হোক, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমাদের এক্ষুনি অটোবোটে উঠতে হবে। সবকিছু গুছিয়ে তৈরি হয়ে নাও।

অসুস্থ টিম্বাকুকে নিয়ে কিছুক্ষণ আগে ল্যাবরোমেরিনে ফিরে এসেছি। মিনডোরা থেকে বেশ কয়েক প্রজাতির পোকামাকড় তুলে এনেছিলাম। ওগুলো ডক্টর তুশোকে দেয়া হয়েছে। তিনি সে জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ওয়াংলির সঙ্গে দেখা হয়েছে। কোনো কথা হয়নি। চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত পাশের এক কেবিনে ঢুকে পড়েছে সে।

২৭ জুলাই ১৯৫২
আমাদের অগোচরে পৃথিবীর আনাচে-কোনাচে এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটে চলেছে, যা কল্পনার চেয়েও চমকপ্রদ। আজ টিম্বাকু এমন একটি ঘটনার কথা শোনালো, যা শুধু চমকপ্রদই নয়, ভয়ঙ্করও। ঘটনাটা ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে টিম্বাকুর কেবিনে গিয়েছিলাম। প্রায় বারো ঘণ্টা পর ওর সঙ্গে দেখা হলো। এ সময়ের ভেতর ডাক্তার সুন-চুংতাই ওর ক্ষতস্থানগুলোতে মলম লাগিয়ে দিয়েছেন। সে কারণে হোক বা রেস্ট নেয়ার কারণেই হোক, গতকালের চেয়ে আজ টিম্বাকু অনেকটা সুস্থ বোধ করছে।
দরজা খুলে কেবিনে পা রাখতেই টিম্বাকু ঘুরে তাকালো আমার দিকে। আমাকে দেখে ওর চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। আমি ওর নাকের ডগা ছুঁয়ে আদর করে বললাম, খুব দুষ্টু ছেলে তুমি। আমার কথা না শুনে গুহা থেকে বের হয়েছিলে কেন?
টিম্বাকু বললো, ইচ্ছে করে বের হইনি। গুহা থেকে বের হতে বাধ্য হয়েছিলাম।
অবাক হলাম টিম্বাকুর কথা শুনে। সে নাকি গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলো! কে তাকে বাধ্য করেছে?
সে কথাটা জানতে চাইলে টিম্বাকু বললো, আপানারা চলে যাবার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো গুহার ভেতরে অন্য রকম একটা শব্দ হচ্ছেÑএই টুংটাং খুটখাট ধরনের শব্দ। সেই শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি তখন চোখ খুলে উঠে বসি। সে সময় দেখতে পাই চুল দাড়িতে একাকার মানুষ আকৃতির দুটি প্রাণী গুহার ভেতর ঢুকে খাবারে টিনগুলো নাড়াচাড়া করছে।
মাত্র কয়েক হাত দূরে অমন অদ্ভুত প্রাণী দুটোকে দেখে তো আমার রক্ত জমে যাবার মতো অবস্থা হলো। কি করবো ভাবছি, এরই মধ্যে ওদের একজন একটি পাউরুটি নিয়ে বাইরের দিকে ছুড়ে দিলো। ছুড়ে দেয়ার ধরন দেখে মনে হলো ফেলে দেয়ার জন্য নয়, কাউকে দেয়ার জন্য সে পাউরুটি ছুড়েছে।
সত্য ব্যাপারটা কি তা দেখার জন্য সাহস করে তাকালাম গুহার মুখের দিকে। সে সময় চোখে পড়লো আরো একটি প্রাণীকে। দেখতে পেলাম রাইফেলের বাঁটে হেলান দিয়ে সে আয়েশ করে পাউরুটি খাচ্ছে।
প্রাণীগুলোকে দেখে প্রথম দিকে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু রাইফেলঅলা প্রাণীটাকে দেখে ভয় দূর হয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম, দেখতে ওরা যতোই কিম্ভূতকিমাকার হোক না কেন, আসলে ওরা মানুষ। হয়তো বহুদিন ধরে এই দ্বীপে বসবাস করছে বলেই চুল-দাড়ি কাটার সুযোগ পায়নি। চেহারা তাই অমন দেখাচ্ছে।
প্রাণী দুটো আমাকে দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু আমাকে দেখার পরও তাদের ভেতর কোনো চাঞ্চল্য দেখতে পেলাম না। নিশ্চিত মনে তারা পাউরুটি খেয়েই চললো। এতে নিজের ভেতর আস্থার জন্ম হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম ওদের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করবো। তারপর ভাগ্যে যা আছে তা হবে।
আমি সাহসে বুক বেঁধে প্রাণী দুটোর দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পেলাম না। আমাকে এগিয়ে যেতে দেখেই ওরা ছুটতে শুরু করলো। আমিও ওদের পিছু নিলাম। ওরা গাছপালার পাশ কাটিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হরিণের মতো ছুটে পালাতে লাগলো। বুঝতে পারলাম ওদের সঙ্গে পেরে উঠবো না। আমার থেমে যাওয়াই উচিত।
কিন্তু ভাগ্যে ভোগান্তি থাকলে যা হয় আমারও তাই হলো। ছোটা থামাবার আগেই কোনো  একটা লতার সঙ্গে পা জড়িয়ে গেলো। আর আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম রাক্ষুসে গাছটার ওপর। সে গাছের লতাগুলো মহাউৎসাহে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। চোখের পলকে এক হ্যাঁচকা টানে দশ হাত উপরে তুলে ফেললো। হয়তো আমাকে পিষে মেরেই ফেলতো। তার আগেই আপনারা এসে বাঁচিয়েছেন। এ জন্য আমি মন থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি স্যার।
টিম্বাকুর কাহিনী রূপকথার মতো চমকপ্রদ মনে হচ্ছে। অনেকেই হয়তো বলবে এসব ওর কল্পনাপ্রসূত গল্প। কিন্তু আমি টিম্বাকুর কথাগুলোকে এতো সহজে উড়িয়ে দিতে পারছি না। কারণ বাবার কাছে শুনেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার বহু বহু বছর পরেও বন-জঙ্গলের ভেতরে অনেক ভীত-সন্ত্রস্ত সৈনিককে খুঁজে পাওয়া গেছে। এমনও হতে পারে এরাও তেমন কোনো আত্মগোপনকারী সৈনিক। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কবল থেকে মিনডোরা দ্বীপটিও মুক্ত ছিলো না।

১ নভেম্বর ১৯৫২
প্রায় দু সপ্তাহ পর ডক্টর তুশোর সঙ্গে দেখা হলো।
এসপিপিÑথ্রি ইনসুলিনের চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত থাকতে হয়েছিলো যে, ডক্টর তুশোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলা সম্ভব হয়নি।
গত রাতে প্রাণীকোষ সঙ্কুচিত করার কাজটি সফলতার সঙ্গে শেষ করেছি। আপাতত আমার হাতে এমন কোনো কাজ নেই যা নিয়ে আরো কিছুদিন ব্যস্ত থাকতে পারি। তাই চেয়ারের ব্যাকরেস্টের সঙ্গে শরীর ছেড়ে দিয়ে ভাবছিলাম কেমন করে সসয় কাটাবো, সে সময় ডক্টর তুশোর ডাক এলো।
হাতে তেমন কোনো কাজ ছিলো না। তাছাড়া সব সময়ই ডক্টর তুশোর প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়েছি। তাই ডেকেছেন জানতে পারার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। টেবিলের ওপর রাখা একগাদা বই। সেগুলোর আড়াল থেকে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার রিসার্চের খবর কি? আমার জন্য কি কোনো সুখবর আছে?
সুখবর ছিলো। তাই উৎসাহে ভেঙে পড়ে বললাম,আপনার আশীর্বাদে সুখবর দেয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছি স্যার। সাইট্রিক অ্যাসিড, পেনিসিলিন নোটাটাম আর পাইথন ভেনোয়ামের সংমিশ্রণে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ উদ্ভাবন করেছি। পদার্থটির নাম রেখেছি এসপিপিÑথ্রি। ওটা ইনসুলিন হিসেবে ব্যবহার করে আমি আশাতীত সুফল পেয়েছি।
তোমার সুফল আমার কাছে সুফল বলে মনে নাও হতে পারে। এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল সংক্ষেপে বলো।
আমি বললাম, এসপিপিÑথ্রির সফলতা নিয়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। এমন একটা আশঙ্কা ছিলো যে, এই রাসায়নিক পদার্থটি জিন বা প্রোটোপ্লাজমের ক্ষতি করবে। কিন্তু…
: কিন্তু? কিন্তু কি?
: কিন্তু এসপিপিÑথ্রি অ্যাপ্লাই করে আমি সুফল পেয়েছি। এটি প্রাণিকোষকে সঙ্কুচিত করে ঠিকই, তবে তার জিন, প্রোটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়ার মেমব্রেইনের আকৃতিগত কোনো পরিবর্তন ঘটায় না।
ঘটায় না? উহ্ ইউনিক! ইউনিক!!
উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন ডক্টর তুশো। আদুরে ভঙ্গিতে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে তিনি বললেন, তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে পৃথিবীর ইতিহাস বদলে যাবে। তার সঙ্গে সঙ্গে স্মরণীয় ব্যক্তি হবে তুমি।

১৭ নভেম্বর ১৯৫২
কখনো কখনো ডক্টর তুশো এমন সব কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন, যার জন্য তাকে সুস্থ মানুষ ভাবতে কষ্ট হয়। দুপুরে বাবার পুরানো চিঠিপত্রগুলো খুলে খুলে পড়ছিলাম। এখন সময় টিম্বাকু এসে জানালো ওর প্রভু আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
চিঠিগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে ডক্টর তুশোর স্টাডিরুমে ছুটে গেলাম। তিনি তখন ছোট্ট সেই কেবিনটির ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন। আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে সোজাসুজি তাকালের আমার দিকে। তার দৃষ্টির সামনে থমমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে ডেকেছেন স্যার?
সরাসরি সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ডক্টর তুশো উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, নিপু! তুমি কি ডারউইনের দ্যা অরিজিন অব স্পেসিজ নামের বইটি পড়েছো?
এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে একটু বিব্রতই বোধ করলাম। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বললাম, না স্যার, এ বইটি পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। তবে ডারউইনের ডিসেন্ট অব ম্যান পড়েছি। ভালো লেগেছে খুব।
: কি বললে, ভালো লেগেছে?
: জ্বি স্যার, ভালো লেগেছে। ভালো লাগার মতো বই। তবে আমার দুর্ভাগ্য যে এখনো পর্যন্ত দ্যা অরিজিন অব স্পেসিজ পড়া হয়ে ওঠেনি। অনুগ্রহ করে ওটা আমাকে পড়তে দেবেন।
ডক্টর তুশো কটমট করে তাকালেন আমার দিকে। পরক্ষণেই কঠিন স্বরে বললেন, নো মাই সন, ইউ হ্যাভ নেভার গেট দ্যা বুক। অন্তত আমি তোমাকে ওই রাবিশ বইটি পড়তে দেবো না।
একজন অকৃত্রিম ডারউইনপ্রেমীর মুখে অমন উল্টো কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। অবাক হয়ে বললাম, ওটা রাবিশ বই? এ কথা বলছেন কেন স্যার?
: তুমি তো জানো নিপু, ডারউইনের মূল বক্তব্য হলো প্রাণীরা প্রাকৃতিক বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আধুনিক রূপ লাভ করেছে, তাই না?
: জ্বি স্যার, প্রায় সব বইয়েই তিনি এ সত্যটিকে নানাভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমিও ডারউইনের সেই মতবাদ বোকার মতো গোগ্রাসে গিলেছি। কিন্তু তোমার এসপিপিÑথ্রি আমার চোখ খুলে দিয়েছে। এখন দেখতে পাচ্ছি প্রাণিকুল প্রাকৃতিক বিবর্তনের কাছে বন্দি নয়। ওটা কাগুজে ফুলের মতো মূল্যহীন কথা। বরং মানুষ ইচ্ছে করলে প্রাণীর মাঝে বিবর্তন ঘটাতে পারে।
: কি করে স্যার?
কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম আমি। সেই প্রশ্ন শুনে ডক্টর তুশোর চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। তিনি বললেন, কি করে সম্ভব? সম্ভব এসপিপিÑথ্রি কাজে লাগিয়ে। যা হোক, এসপিপিÑথ্রি আবিষ্কৃত হবার পর ডারউইনের মতবাদ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আমি তাই তার সমস্ত বই ছিঁড়ে ফেলেছি।
এতোক্ষণ ডক্টর তুশোর সঙ্গে কথা বলায় এতো ব্যস্ত ছিলাম যে, অন্য দিকে তাকাবার সুযোগ পাইনি। এবার সে সুযোগ পেতেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠলো। দেখতে পেলাম সারাটা মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ডারউইনের ক্ল্যাইম্বিং প্ল্যান্টস, ফার্টিলাইজেশন ইন দ্যা ভেজিটেবল কিংডম আর অরিজিন অব স্পেসিজের মতো মূল্যবান সব বই।
এ দৃশ্যে উপভোগ করার মতো কিছু ছিলো না। বরঞ্চ একটু খারাপই লাগছিলো আমার। আমি তাই এক এক করে ছেঁড়া-ফাটা, দুমড়ানো বইগুলো তুলে নিলাম।
আমার দিকে কিছুটা সময় অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে পরম øেহে একটি হাত রাখলেন তিনি আমার পিঠে। তারপর বললেন, ডারউইনের প্রতি তোমার শ্রদ্ধা রয়েছে, আমি তা জানি। তার মতো বড়ো মাপের তাত্ত্বিকের প্রতি আমারও দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু ডারউইনের বিবর্তনবাদ মেনে নিলে সব কাজ থেমে যাবে। গতি শ্লথ হয়ে পড়বে। এ জন্যই আমি চাই না অন্য কেন ডারউইনের ফাঁদে পড়–ক। যা হোক, আমার ব্যাবহারে কিছু মনে করো না। বয়স হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
ডক্টর তুশো কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।
সত্য কথা বলতে কি, এসপিপিÑথ্রি আমার আবিষ্কৃত একটি পদার্থ। এ পর্যন্ত এটির সফলতা সম্পর্কে সন্দিহান হবার মতো কোনো কারণ ঘটেনি সে কথাও সত্য। কিন্তু ডক্টর তুশো এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যতোটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, আমি তার কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।

১২ ফেব্র“য়ারি ১৯৫৩
ঘুম ভাঙার পর বাবাকে মনে পড়ায় এতোটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম যে, অনুমতির অপেক্ষা না করেই ডক্টর তুশো চেম্বারে ঢুকে পড়েছিলাম। ডক্টর তুশো তখন এসপিপিÑথ্রি ইনসুলিনের চূড়ান্ত ফর্মুলাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলেন। আমাকে দেখেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন তিনি। পরক্ষণেই ফর্মুলাটি ড্রয়ারের ভেতর রেখে বললেন, ব্যাপার কি নিপু? হঠাৎ এ সময়?
বললাম, গতরাতে বাবাকে স্বপ্নে দেখেছি। তারপর থেকে মনটা অস্থির লাগছিলো। তাই অনুমতি না নিয়েই এসে পড়েছি।
ডক্টর তুশো বললেন, হ্যাঁ, তুমি তাই করেছো। অনুমতি নেয়া উচিত ছিলো। তো কি যেনো বলছিলেÑবাবাকে স্বপ্ন দেখেছো? এ তো ভালো কথা। তোমার মন অস্থির লাগছে কেন?
বললাম, অনেকদিন হয় বাবার সঙ্গে দেখা নেই। স্বপ্ন দেখার পর বাবাকে খুব বেশি করে মনে পড়ছে। ইচ্ছে হচ্ছে দেশে চলে যাই।
আমার কথা শুনে হঠাৎ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। চশমাটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে বললেন, দেশে চলে যেতে চাইছো? দেশই কি তোমাদের সব? এ পৃথিবীর প্রতি, ঈশ্বরের সৃষ্টির প্রতি তোমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?
বললাম, অবশ্যই দায়িত্ব আছে। সাধ্য মতো তা পালন করতে চেষ্টাও করছি। কিন্তু দেশের প্রতি যে টান, তাকে কি করে অস্বীকার করবো?
ডক্টর তুশো বললেন, আমার ভীষণ করুণা হয় তোমাদের হোম সিকনেস দেখে। দেশটাই যেনো তোমাদের কাছে সব!
এবার আর প্রাতিবাদ না করে পারলাম না। বললাম, আপনি হয়তো জানেন না স্যার, দেশকে আমরা মায়ের মতো আপন জানি। তার চেয়েও বড়ো কথা, পাঁচ বছর ধরে বিদেশে রয়েছি। কেমব্রিজশায়ার ছেড়ে আসার পর বাবার আর কোনো চিঠি পাইনিÑপাবার উপায়ও নেই। সমুদ্রের গভীরে দিন কাটছে আমাদের। আপনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমি তা সততার সঙ্গে পালন করেছি। আমার সাফল্যের ফসল আপনার হাতে তুলে দিয়েছি। এর পরও বিদেশে পড়ে থাকার কোনো যুক্তি আছে, আমি তা মনে করি না।
একটানা কথাগুলো বলে থামলাম আমি। কথা শেষ হবার পরও কয়েকটি মিনিট চুপ করে বসে রইলেন ডক্টর তুশো। তারপর উঠে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, আমি দুঃখিত স্যার। উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করবেন।
ডক্টর তুশো বললেন, বুঝতে পারছি দেশে যাবার জন্য তোমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু আর কয়েকটা দিন তোমাকে অপেক্ষা করতেই হবে।
: আর কয়েক দিন কেন স্যার? আর কয়েক দিন পর কি বিশেষ কিছু ঘটবে?
জিজ্ঞেস করলাম আমি। ডক্টর তুশো বললেন, বলতে পারো ঘটবে। আশা করছি দু-চার দিনের মধ্যে আমরা ওকিনাওয়া দ্বীপে পৌঁছে যাবো।
ওকিনাওয়ার নাম শুনে রীতিমতো আঁৎকে উঠলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে এ দ্বীপটি আমেরিকানরা দখল করে রেখেছে। এখানে জাপানিদের কাজকর্ম প্রায় নিষিদ্ধ। সেই দ্বীপে যাবার কথা তিনি বলছেন কেনো?
জিজ্ঞেস করলাম, ওকিনাওয়া যাবেন কেন স্যার?
ডক্টর তুশো বললেন, প্রয়োজনের তাগিদেই যাবো। এ দ্বীপের দুর্গম এক বাঙ্কারে আমার একটা গোপন ল্যাবরেটরি আছে। সেখানে আমি চূড়ান্ত পর্যায়ের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবো। সেই দ্বীপ থেকেই আমার বিজয় রথের যাত্রা শুরু হবে। পৃথিবীর মানুষ নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখবে। তোমরা যারা আজ আামকে সহযোগিতা করছো, ওকিনাওয়া থেকে সবাইকে ছেড়ে দেয়া হবে। তখন তোমরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে। কেউ তোমাদের বাধা দেবে না। অন্তত আমার দিকে তাকিয়ে সেই কয়টি দিন অপেক্ষা করতে পারবে না?
ডক্টর তুশো এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে অস্বীকার করা যায় না। তাই একান্ত বাধ্যগতের মতোই বললাম, ঠিক আছে স্যার, আর কয়েকটি দিন আমি থেকে যাবো।
ডক্টর তুশো মুচকি হেসে বললেন, এসেছিলে নিজের ইচ্ছায়, যাবার সময় কিন্তু অনুমতি লাগবে।
বললাম, আমি কি এখন যেতে পারি স্যার?
ডক্টর তুশো বললেন, হ্যাঁ, যেতে পারো। তবে আবার বলছি, আমার ব্যবহারে মনে কিছু করো না।
সত্য কথা বলতে কি, এতোক্ষণ মনের ভেতর যে সামান্য একটু ক্ষোভ ছিলো, ডক্টর তুশোর শেষ কথাটি শোনার পর আর তার লেশ মাত্রও অবশিষ্ট রইলো না।

৯ মে ১৯৫৩
পলিপাসের কবল থেকে আমিই টিম্বাকুকে রক্ষা করেছি, এ কথাটা ভালো মতোই টিম্বাকুর মনে গেঁথেছে। সম্ভবত তাই ইদানীং ছেলেটি আমার ভীষণ ভক্ত হয়ে উঠেছে। যে কোনো কাজের কথা বললে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়েই সে সেই কাজটি সমাধা করে। বলে, আপনার জন্য আমি জীবনও দিয়ে দিতে পারি।
কথায় কথায় একদিন টিম্বাকুর কাছে ডানহিলের কথা বলেছিলাম। পূর্ব পরিচিত এ বিজ্ঞানীও ডক্টর তুশোর ল্যাবরোমেরিনে রয়েছেন এবং তার সঙ্গে একবার অন্তত কথা বলা প্রয়োজনÑএ কথাটা জানিয়েছিলাম টিম্বাকুকে। সে তখন কথা দিয়েছিলো সুযোগ পেলেই আমার কথা ডানহিলকে জানাবে।
এসব বেশ কিছুদিন আগের কথা। নানা কাজের চাপে পড়ে সে কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু টিম্বাকুর মনে ছিলো। আজ সকালে টিম্বাকু এসে বললো, আপনার জন্য একটা সুখবর নিয়ে এলাম স্যার। গতরাতে ডানহিল স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ পেয়েছি। তখন তাকে আপনার কথা বলেছি। আপনিও এখানে আছেন কথাটা শুনে দারুণ অবাক হয়েছেন তিনি।
আমি বললাম, ডানহিল সাহেব এখানে আছেন তা জানতে পেরে আমিও অবাক হয়েছিলাম। তো সুখবরটা কি?
টিম্বাকু বললো, সব শুনে ডানহিল স্যার কথা দিয়েছেন রাতের যে কোনো সময় এসে তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। বোঝেন তো স্যার, কাজটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর তাকে আসতে হবে। আপনাদের সাক্ষাৎ আনন্দময় হোক।

কারো জন্য প্রতীক্ষায় থাকা যে কতো দুঃসহ, তা শুধু ভুক্তভোগীই জানেন। কিন্তু আমার ভাগ্য সুপ্রসন্নই ছিলো বলতে হবে, কারণ রাত বারোটা বাজার সাত মিনিট আগেই দরজায় টুকটুক শব্দ হলো। দ্রুতহাতে দরজা খুলতেই প্রফেসর ডানহিল সাহাস্যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি হ্যান্ডসেক করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভেতরে টেনে নিলাম।
কেবিনে একটাই চেয়ার ছিলো। নিজেই গিয়ে ওটায় বসলেন ডানহিল। তারপর বললেন, আপনাকেও যে এখানে বন্দী করে রাখা হয়েছে, সে কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
আমি বললাম, তার আগে বলুন আমি কি সত্য সত্যই রক্তে-মাংসে গড়া ডানহিলের সঙ্গে কথা বলছি? নাকি আমার সামনে তার প্রেতাত্মা দাঁড়িয়ে আছে?
: আপনার কি মনে হয়?
মুচকি হেসে প্রফেসর ডানহিল তাকালেন আমার দিকে। আমি বললাম, আমার তো মনে হচ্ছে ডানহিল সাহেবের প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলছি। কারণ ইন্টারপুলের জাঁদরেল জাঁদরেল গোয়েন্দা আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোকেরা চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিয়েছে হয় আপনি কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন, নয়তো স্বইচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন। এখন বলুন কোনটা সত্য।
আমার প্রশ্ন শুনে ডানহিল এতোটাই স্বতঃর্স্ফূত অট্টহাসিতে ভেঙে পড়লেন যে, আমি যদি দ্রুত হাতে তার মুখ চেপে না ধরতাম, তবে এ শব্দ অন্য কারো কানে পৌঁছে যেতো।
হাসতে হাসতে ডানহিল বললেন, তাহলে আপনিও স্বীকার করছেন যে আমি আপনাদের ভেল্কিবাজি দেখাতে সক্ষম হয়েছি। আসলে পুরো পরিকল্পনাটাই ছিলো ডক্টর তুশোর। আমি শুধু বাধ্যগত অনুসারীর মতো তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি।
কি করে, কেমন ভাবে ডক্টর তুশোর পরিকল্পনা মতো তিনি কাজ করেছেন, তা জানার খুব ইচ্ছে হলো। আমি বললাম, ইন্টারপোল আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ঝানু ঝানু লোকজন ঘোল-পানি খেয়েছে আপনার হাতে। এতো নিখুঁতভাবে সবকিছু সামাল দিলে কেমন করে? দারুণ রোমাঞ্চকর ব্যাপার কিন্তু।
ডানহিল তার রোমাঞ্চকর কাহিনী শুরু করার সুযোগ পেলেন না। তিনি মুখ খোলার আগেই কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো টিম্বাকু। কেবিনে ঢুকে সে হাঁপাতে লাগলো। চোখেমুখে একটা সন্ত্রস্তভাব সুস্পষ্ট।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার টিম্বাকু? কি হয়েছে?
টিম্বাকু ততোক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছিলো। সে বললো, আমি তো স্যার আড়ালে দাঁড়িয়ে আপনার কেবিনের দিকে লক্ষ্য রাখছিলাম। হঠাৎ দেখি ওয়াংলি এখান দিয়ে যেতে যেতে আপনার দরজার দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। জানি না সে কোনো কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে কিনা। তবে ডানহিল স্যার সে এখানে এসেছেন যে কথা জানতে পারলে সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়বে।
আমি বললাম, তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। ওয়াংলির খবরটা জানিয়ে আমাদের খুব উপকার করলে। ওয়াংলি কোন দিকে গেছে?
: রোবটটা ইয়ামামাটো স্যারের কেবিনে ঢুকেছে। আমি স্যার নিজের চোখে দেখেছি।
প্রায় ফিসফিস করে কথাটা বললো টিম্বাকু। সে কথা শুনে প্রফেসর ডানহিল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, পরিস্থিতি ভালো নয়। আমি আজ চলে যাই। আরেকদিন এসে সব বলবো।
আমি এ কথার কোনো জবাব দিলাম না। ডানহিলও জবাবের জন্য অপেক্ষা করলেন না। টিম্বাকুর পিছুপিছু কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আমি যখন এ কাহিনী লিখছি তখন নতুন এক দিনের শুরু হয়েছেÑএখন রাত বারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ। ডানহিল নিশ্চয়ই নিরাপদে তার কেবিনে পৌঁছে গেছেন। আমিও এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে পড়বো।

১০ মে ১৯৫৩
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিলো তারপর কেটে গেছে তিনশো বছর। এ সময়ের ভেতর নানান ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের যে উন্নতি ঘটেছে, তাকে বিস্ময়কর বললেও কম বলা হবে। তবে ইসুজু ইয়ামামাটোর রোবটে সে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, শুধু বিস্ময়কর নয়, রীতিমতো তা অবিশ্বাস্যও বটে।
ডক্টর তুশোর ল্যাবরোমেরিন প্রকৃতপক্ষে একটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন। নানা ধরনের যন্ত্রপাতি সচল রাখার জন্য এ সাবমেরিনে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিশাল আকৃতির পাওয়ার হাউস টাইপ ব্যাটারি। যেগুলোকে চার্জ দেয়ার জন্য সাবমেরিনটিকে মাঝেমধ্যে ভেসে উঠতে হতো। যখন ওটা সমুদ্রের ওপর ভেসে উঠতো তখন আমরা এর ছাদের ওপর উঠে আসতাম। মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে চাঙ্গা হতাম।
আজ বিকেলে ল্যাবরোমেরিন ভেসে ওঠার পর ব্রিজে দাঁড়িয়ে আমি সমুদ্র দেখছি, এমন সময় ইকুডা এসে বললো, হ্যালো দক্তর নিপু! হাউ দু ইউ দু?
বললাম, ওয়েল। হোয়াট অ্যাবাউট ইউ?
ইকুডা বললো, দেজ আর পাসিং। ওহ ইয়েস, মাই মাস্তার ডক্টর তুশো কলিং ইউ। নো লেত প্লিজ। ইউ হ্যাভ তু গো নাম্বার তুয়ান্তি সেভেনÑওকে?
ঠিক এ সময় ডক্টর তুশোর কাছ থেকে ডাক আসাটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আর এ ধরনের ডাক যে খুব সুখপ্রদ নয় তাও জানা হয়ে গিয়েছিলো আমার। তাই মনের শঙ্কা চেপে না রেখেই জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি? এসময় আমাকে ডেকেছেন কেন?
কাঁধ ঝাঁকিয়ে না জানার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ইকুডা বললো, আমি সামান্য এক ভৃত্য। তোমাদের মতো উচ্চ শ্রেণীর মানবকুলের খবর আমার জানার কথা নয়।

এর আগেও আমাকে কয়েকবার সাতাশ নম্বর কেবিনে যেতে হয়েছে। তখন গিয়েছি নির্ভয়ে। কিন্তু আজ যাচ্ছি শঙ্কিত পদক্ষেপে। পা চলতে চাইছে না। কারণ একটাই, গতরাতে আমার কেবিনে ডানহিল এসেছিলেন। কোনো ভাবে যদি সে কথাটা ডক্টর তুশো জেনে যান, তবে কি জবাব দেবো আমি?
কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। সাতাশ নম্বর কেবিনে পা রাখতেই থমথমে কণ্ঠে ডক্টর তুশো জিজ্ঞেস করলেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো। আশা করি সত্য সত্য জবাব দেবে।
আমি এ কথার কোনো জবাব দিলাম না। ডক্টর তুশোও জবাবের জন্য অপেক্ষা করলেন না। তিনি বললেন, গতরাতে কি তোমার কেবিনে কেউ গিয়েছিলো?
: হঠাৎ এ প্রশ্ন করছেন কেন স্যার?
পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু ডক্টর তুশো সরাসরি সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, ওয়াংলি জানিয়েছে, ডানহিলকে সে তোমার কেবিনে ঢুকতে দেখেছে।
ডক্টর তুশোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার অবস্থা হলো সাপের মুখে পড়া ব্যাঙের মতো। তবু সাহস করে বললাম, ডানহিলকে দেখেছে মানে? কোন্ ডানহিল, স্যার?
ডক্টর তুশো কণ্ঠটাকে যতোটা সম্ভব গম্ভীর করে বললেন, অ্যালবার্ট ডানহিল। যার সঙ্গে ভালোই জানাশোনা রয়েছে তোমার। তার সঙ্গে কি তোমার কথা হয়েছে?
বললাম, দেখা হওয়া না হওয়ার কথা তো স্যার পরে আসবে। আগে জানতে হবে ডানহিলও এখানে রয়েছেন কিনা। তিনি কি ল্যাবরোমেরিনেই আছেনÑআমাদের সঙ্গে? কই, এ কথা তো কোনোদিন বলেননি আমাকে!
: সব কাজই যে তোমাকে জানিয়ে করতে হবে, এমন তো কোনো প্রতিজ্ঞা করিনি নিপু! তিনি এখানে আছেন। আর ওয়াংলি জানিয়েছে ডানহিলকে তোমার কেবিনে ঢুকতে দেখেছে। তুমি কি বলবে এবারও ওয়াংলি তোমার নামে ভুল রিপোর্ট করেছে?
ডক্টর তুশোর এই কঠিন প্রশ্নের কি জবাব দেবো ভাবছি, এমন সময় টিম্বাকুর ওপর চোখ পড়লো। ইকুডার ডান পাশে সে দাঁড়িয়েছিলো।
টিম্বাকুকে সেখানে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় এক বুদ্ধি এসে গেলো। আমি বললাম, এবার আর ওয়াংলি ভুল রিপোর্ট করেনি স্যার, তবে বুঝতে ভুল করেছে।
: কথাটার অর্থ বুঝতে পারছি না।
বিরক্তি ঝরে পড়লো ডক্টর তুশোর কণ্ঠে। বললেন, দুটোর মধ্যে তফাত কি বুঝিয়ে বলো।
বললাম, তফাত একটু আছে স্যার। একটা চোখের দেখা আর অন্যটা মনের দেখা। মানে চোখে দেখেছে একজনকে। অথচ মনে মনে সন্দেহ করেছে অন্য আরেকজনকে। মনের ভেতর সন্দেহ পুষে রাখলে এমন ভুল হতেই পারে।
: তার মানে তুমি বলতে চাইছো তোমার কেবিনে গতরাতে অন্য কেউ ঢুকেছে। ওয়াংলি তা দেখেছে, তবে আসলে সে যে কে ছিলো তা বুঝতে পারেনিÑএই তো?
: একেবারে তাই স্যার।
: হুম। তো কে ঢুকেছিলো তোমার কেবিনে?
চোখ বড়ো বড়ো করে ডক্টর তুশো তাকালেন আমার দিকে। আমি তার দৃষ্টিকে আমল না দিয়ে অত্যন্ত সহজভাবেই বললাম, টিম্বাকু স্যার। ছেলেটা আমার কাছে ভূত-পেতœীর গল্প শোনে। জানেন তো স্যার, এসব গল্প আমাদের দেশে খুব প্রচলিত।
আমার ধারণা ছিলো না টিম্বাকুর মতো একটি কিশোর ছেলে উত্তরটাকে এমন করে লুফে নিতে পারবে। আমার কথা শেষ হতেই টিম্বাকু বললো, ওহ, এই কথা! আমি সেই তখন থেকে শুনছি কিন্তু বুঝতে পারিনি আপনারা কোন বিষয়ে কথা বলছেন। গতরাতে কেন, প্রতিরাতেই আমি ডক্টর নিপুর কেবিনে যাই। গা ছামছম করা মজার মজার গল্প বলেন নিপু স্যার। রাতে আমি যখন ঢুকছিলাম স্যারের কেবিনে, তখন ওয়াংলি আমার পেছনে ছিলো। অবশ্য স্যার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখেছিলো। তাই হয়তো চিনতে পারেনি।
টিম্বাকুর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াংলি প্রতিবাদে ফেটে পড়লো, মিথ্যে কথা মিথ্যে কথা। আমি ভুল দেখিনি। গতরাতে ডানহিল সাহেবই নিপু স্যারের কাছে গিয়েছিলেন।
: তোমার এ কথার কোনো প্রমাণ আছে?
জিজ্ঞেস করলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর তুশো বললেন, ঝামেলায় পড়ে গেলাম দেখছি। হ্যাঁ, তোমার কাছে প্রমাণ আছে যে তুমি যা বলছো তা সত্য?
ওয়াংলি বললো, আমার সঙ্গে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই স্যার। চোখে যা দেখতে পাই তা ম্যামোরি সেলে রেকর্ড হয়ে যায়। সেখান থেকে ডাটা কালেক্ট করে পরে আমি তা আপনাদের জানাই। রাতের ঘটনা আমি ইকুডাকে জানিয়েছি। অন্য আর কোনো প্রমাণ নেই।
: এবার তোমার বক্তব্য শোনা দরকার।
ডক্টর তুশো ইকুডার দিকে ঘুরে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে ইকুডা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। অযথা দুবার ঢোক গিলে সে বললো, ওয়াংলি আমাকে জানিয়েছে যে প্রফেসর ডানহিল নিপু স্যারের কেবিনে ঢুকেছেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি নিপু স্যারের কেবিনে গিয়েছি স্যার। এক সেকেন্ডও দেরি করিনি। কিন্তু সেখানে তখন ডানহিল স্যার ছিলেন না। দুজনই যার যার কেবিনে ঘুমোচ্ছিলেন। এখন স্যার আপনারা ভেবেচিন্তে বলুন কার কথা সত্য।
ইয়ামামাটোকেও সাতাশ নম্বর কেবিনে ডাকা হয়েছিলো। ডক্টর তুশো বললেন, এমন একেকটা ঝামেলা বাধায় রোবটটা! তোমার কি মনে হচ্ছে ইয়ামামাটো? এবারও কি ওয়াংলি ভুল করেছে?
ডানে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে ইয়ামামাটো বললো, অন্তত বিজ্ঞানী হিসেবে এ কথাটা আমি মেনে নিতে পারি না স্যার। ভুল ওয়াংলি করেনি বলেই আমার বিশ্বাস।
: আমারও।
বললেন ডক্টর তুশো।
ঘটনা ক্রমেই জটিলতার দিকে যাচ্ছে দেখে আমি কৃত্রিম রাগ প্রকাশ করে বললাম, আপনাদের সৃষ্টি আপনাদের সত্য বলেছে না মিথ্যা বলছে, একটা রোবটের কথায় কতোটুকু আস্থা রাখা যায় সেসব তর্কে আমি যেতে চাই না স্যার। তবে সে বারবার আমার বিরুদ্ধে আপনাদের কাছে রিপোর্ট দিয়ে যাবেÑএটা আমার জন্য মেনে নেয়ার মতো নয়। এমন হলে আমি আর কোনো কাজে সহযোগিতা করবো না। আপনারা যা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আমার এ অভিনয়ে দারুণ কাজ হলো। ইয়ামামাটো বোকার মতো চোখ বড়ো বড়ো করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আর ডক্টর তুশো ভড়কে যাওয়া কণ্ঠে বললেন, যাক, যা হবার হয়েছে। যে ঘটনার অকাট্য প্রমাণ নেই তা নিয়ে তদন্ত করার কোনো মানে হয় না।
আমি বললাম, এ কথাটা আগে ভাবা দরকার ছিলো স্যার। মুক্ত হাওয়া উপভোগ করছিলাম। বাজে একটা বিষয় নিয়ে তর্ক-ঝগড়া করে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।
ডক্টর তুশো ম্লান হেসে বললেন, এসব নিয়ে আর ভেবো না। একসঙ্গে কাজ করলে কতো ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। সব কি আর সিরিয়াসলি নিলে চলে। তোমরা নিজ নিজ কাজে যাও। আমি কিছুক্ষণ একাকী থাকবো।
আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সাতাশ নম্বর কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম।
কথায় বলে যে কোনো ঘটনার মধ্যে শিক্ষনীয় অনেক কিছু থাকে। কেউ তা বুঝতে পারে কেউ পারে না। আজকের ঘটনার মধ্য দিয়ে অন্তত একটি ব্যাপার স্পষ্ট হলোÑওয়াংলি সারাটা সময় আমার ওপর নজর রাখছে। সুতরাং এখন থেকে আমাকে আরো বেশি সতর্ক হয়ে চলতে হবে।

১৩ জুলাই ১৯৫৩
সৌভাগ্য বলতে হবে, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো আজ আবার দেখা হলো ডানহিলের সঙ্গে। আমার কেবিনে ঢুকে কোনো ভনিতা না করেই তিনি বললেন, সেদিন আত্মগোপন করার কাহিনীটা বলা হয়নি। আজ বলার জন্য এসেছি।
আমি বললাম, ভালো কথা। কিন্তু এলেন কেমন করে? ওয়াংলি তো অষ্টপ্রহর আমার কেবিনকে চোখে চোখে রাখে।
ডানহিলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটি উঠলো। তিনি বললেন, ওয়াংলিকে যদি মনে করো এক সের, তবে আমি সোয়া সের। আজ সতর্কতার সঙ্গেই এসেছি।
: তাহলে আর দেরি কেন! বলে যান আপনার অভিযান কাহিনী।
প্রফেসর ডানহিল বললেন, ঘটনার শুরু কেমব্রিজশায়ারে। এক বিকেলে বেড়াতে গিয়েছিলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানকার লেকের পাড় দিয়ে হাঁটছি আর হাঁসদের সাঁতারকাটা দেখছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম এক অপরিচিত কণ্ঠস্বরÑহ্যালো প্রফেসর ডানহিল!
চমকে উঠে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলাম ডক্টর তুশোকে। ভদ্রলোকের নাম আমি জার্মানিতেই শুনেছি। আর পত্রপত্রিকায় পড়েছি প্রতিভার কথা। কোন এক বিজ্ঞান সাময়িকীতে তাকে আইনস্টাইনের নতুন সংস্করণ বলেও প্রশংসা করা হয়েছে।
যা হোক, ডক্টর তুশো আমার মতো এক অতি সাধারণ মানুষকে নাম ধরৈ ডাকছেন শুনে আমি অভিভূত হলাম। নিজেকে ভীষণ সম্মানীত মনে হলো। আমি বললাম, আপনি নিশ্চয়ই স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী নিকিতা তুশো? আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে ভালো লাগছে।
ডক্টর তুশো বললেন, ধন্যবাদ। আমারও ঠিক একই কথাÑতোমার সঙ্গে কথা বলতে পেরে ভালো লাগছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অটো হানের আমন্ত্রণে আমি একবার জার্মানি গিয়েছিলাম। খুব উন্নত দেশ তোমাদের।
এই প্রশংসা বাক্যের জবাবে কিছু বলার আগেই ডক্টর তুশোর হাতের দিকে আমার চোখ গেলো। দেখতে পেলাম জোনাথন সুইফটের বিখ্যাত বই গ্যালিভার্স ট্রাভেল নামের বইটি রয়েছে তার হাতে।
এ ব্যাপারটি আমাকে এতোটাই চমৎকৃত করলো যে, আমি আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। বললাম, বিজ্ঞানী হয়ে এমন একটি উদ্ভট বই পড়ছেন, ভাবতেই অবাক লাগছে।
ডক্টর তুশো কথাটিকে সহজ ভাবে নিয়ে বললেন, জানো তো, ভ্রমররা ফুল থেকে বিষ সংগ্রহ করে। কিন্তু সেই একই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছি। বিজ্ঞানের যে বিষয়টি নিয়ে রিসার্চ করে চলেছি, তার সঙ্গে লিলিপুটিয়ানদের কিছুটা মিল রয়েছে। এ ব্যাপারটি আকৃষ্ট করেছে আমাকে।
: তাই নাকি?
অবাক হয়ে বলেছিলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর তুশো জবাব দিয়েছিলেন, অবশ্যই তাই। জানো, গত পাঁচ বছরে কম করে হলেও আমি পনেরোবার এ বইটি পড়েছি। প্রতিবারই নতুন মনে হয়েছে। সে যা হোক, মাঝেমধ্যেই এখানে আসো নাকি?
বললাম, হ্যাঁ, প্রায়ই চলে আসি। আসলে সবুজ আর সজীবতা আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। তাছাড়া বিদেশ বিভূইয়ে কোথাও যাবারও তো জায়গা নেই।
ডক্টর তুশো বললেন, এ কথাটা সত্য বলেছো। তাও তো যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিছুটা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছো। যুদ্ধের সময় তো এতোক্ষণে চেয়ে দেখতে চারপাশে সাদা পোশাকের পুলিশ আর গোয়েন্দারা গিজগিজ করছে।
একটু থেমে ডক্টর তুশো বললেন, তোমার গবেষণার বিষয়ে বলো।
আমি আমার গবেষণার বিষয়বস্তু, সমস্যা, সম্ভাবনা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ডক্টর তুশোকে খুলে জানালাম। সব শুনে তিনি বললেন, ব্রিলিয়ান্ট বয়। তোমাকে একটা প্রস্তাব দেবো। কিছুদিন তুমি আমার সহকর্মী হিসেবে কাজ করো। আমি যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর রূপ বদলে দেয়ার জন্য চেষ্টা করছি। এ কাজে তোমার মতো বিজ্ঞানীদের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তুমি কি আমার সঙ্গে কাজ করবে?
আমার মতো এক অতি নগণ্য বিজ্ঞানীর পক্ষে ডক্টর তুশোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব ছিলো না। তাছাড়া তিনি সেদিন এমন সব তাক লাগানো কথা বলেছিলো যে, সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আনন্দের সঙ্গেই ডক্টর তুশো গ্রহণ করেছিলাম। ডক্টর তুশোর পরামর্শেই আমি একদিন কেমব্রিজশায়ার থেকে উধাও হয়ে ডোভারে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে আমার জন্য একটা মাছ ধরার জাহাজ অপেক্ষায় ছিলো। সেই জাহাজে চড়ে আমি মাঝসমুদ্রে পৌঁছে যাই। সেখান থেকে সাবমেরিনে করে আমাকে জাপানে নিয়ে আসা হয়। এখানে এসে আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। ডক্টর তুশোর বক্তব্য এবং উদ্দেশ্য যে এক নয়, তা বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি আমার। কিন্তু জীবনের ভয়ে তাকে সহযোগিতা করে যেতেই হচ্ছে।
আপনার শেষের কথাগুলো একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে। তুমি কি ডক্টর তুশোর কাজকর্ম নিয়ে সন্তুষ্ট নন?
জিজ্ঞেস করলাম আমি। ডানহিল বললেন, আমাকে এ প্রশ্ন করছেন কেন? নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে দেখুন আপনি সন্তুষ্ট কিনা?
আমি বললাম, সব সময় তো সব মানুষের মেজাজ-মর্জি, মন-মানসিকতা একরকম থাকে না। কোনো কোনো সময় ডক্টর তুশোর কথাবার্তা আর আচরণ আমার কাছেও দুর্বোধ্য মনে হয়। আবার কোনো কোনো সময় তাকে খুব স্নেহপরায়ণ মনে হয়।
ডানহিল বললেন, আমি আমার কথা বলতে পারি, একান্ত বাধ্য হয়েই ডক্টর তুশোর সঙ্গ দিচ্ছি। কিন্তু এখান থেকে মুক্তি পাবার জন্য আমার মন ছটফট করছে। যেদিন সুযোগ পাবো, কর্পূরের মতো উবে যাবো। ডক্টর তুশো আমার টিকিটিও ছুঁতে পারবেন না।
একদমে কথাগুলো বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন প্রফেসর ডানহিল। আমি চমকে তাকালাম তার দিকে। দেখতে পেলাম তার চেহারাতে একটা অন্যরকম ভাব ফুটে উঠেছে। শরীরও অনেক ভেঙে গেছে। চুলে পাক ধরেছে। মেরুদণ্ডের হাড় বেঁকে যাওয়ায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। মাত্র দু বছরের ব্যবধানে একটি মানুষের এতো পরিবর্তন হতে পারে, আমার তা কল্পনারও বাইরে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি মনে হচ্ছে এখানে এসে আমরা ভুল করেছি?
: ভুল করিনি মানে? চরম ভুল করেছি। একটা জ্বলন্ত সিগারেটের মতো জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হচ্ছি সবাই। একটা লোকের কাছে বিবেক-বুদ্ধি তুলে দিয়ে অন্ধের মতো তাকে অনুসরণ করে চলেছি। কিন্তু কি দিয়েছে আমাদের ওই বুড়ো শয়তান? কিছু দেয়নি। বরং আমাদের প্রতিভা নিংড়ে নিচ্ছে। বিবেক কেড়ে নিচ্ছে। তা নিক, কতোদিন আর নেবে? এক মাঘে শীত যায় নাÑএ কথা নিশ্চয়ই ডক্টর তুশোও জানেন। তো আমি এখন যাই। সুযোগ পেলে আবার আসবো।
ডানহিল চলে যাবার পর থেকে বারবার শুধু মনে হচ্ছে বেচারা হয়তো মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছেন। নইলে ডক্টর তুশোর মতো একজন মহান বিজ্ঞানী সম্পর্কে তিনি যে সব কথা বলে গেলেন, কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে তা বলা সম্ভব নয়।

২ ফেব্র“য়ারি ১৯৫৪
কিছুক্ষণ আগে সিক্রেট কর্নার থেকে ফিরেছি।
এখন রাত তিনটা বেজে পাঁচ। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে হিসেব করে বলতে গেলে আমার বয়স এখন তেতাল্লিশ বছর দু মাস সাতাশ দিন। পেছনে ফেলে এসেছি জীবনের অনেকটা সময়। সে সব দিনে অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু আজ যে ঘটনা আমার চোখের সামনে ঘটে গেছে, তার সাথে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা হয় না।
গত জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা আমেরিকা অধিকৃত ওকিনাওয়া দ্বীপে এসেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানী সৈন্যদের পরিত্যক্ত একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ডক্টর তুশো তার গোপন ল্যাবরেটরি গড়ে তুলেছেন। সেখানেই গত এক মাস ধরে কাজ করছি আমরা।
আজ সকাল থেকেই ইকুডা আর ওয়াংলি আমার সঙ্গ এড়িয়ে চলছিলো। ওদের আচরণ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো সত্য, কিন্তু এই আচরণের আড়ালে ওরা যে ভয়ঙ্কর একটা ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা আমি ভাবতেও পারিনি।
তখন রাত দেড়টা। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর নিয়ে আসাড় হয়ে ঘুমিয়ে আছি। আচমকা এক চিৎকার এসে আমার সেই ঘুম ভেঙে দিলো। ব্যাপারটা কি বুঝে ওঠার আগেই আবার ভেসে এলো তীক্ষè চিৎকার আর সেই সঙ্গে গোঙানির শব্দ। এর পরপরই শুনতে পেলাম ডক্টর তুশোর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, জাপানী ভাষায় কার সঙ্গে যেনো রেগে রেগে কথা বলছেন তিনি!
শুধু বিজ্ঞানী হিসেবে নন, বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জনকারী হিসেবেও ডক্টর তুশো আমার শ্র্দ্ধা আদায় করে নিয়েছিলেন। যতোটুকু সম্ভব সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি যার যার মাতৃভাষায় কথা বলেন। তবে বাংলা জানেন না বলে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করেন।
জাপানী ভাষা শুনে বুঝতে পারলাম তিনি কোনো জাপানী সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলছেন। সমস্যা নেই, জাপানী ভাষা আমারও রপ্ত হয়ে গেছে। ভালো বলতে না পারলেও বুঝতে পারি। তবে একেবারেই লিখতে ও পড়তে পারি না।
যা হোক, ডক্টর তুশো এতোটা উত্তেজিত কণ্ঠে কার সঙ্গে কথা বলছেন তা জানার জন্য আমার কুঠুরি থেকে বের হলাম। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই আমাকে থেকে যেতে হলো। কারণ প্যাসেজ ছিলো আঁকাবাঁকা, অপ্রশস্ত। আর তাতে আলোর ব্যবস্থাও তেমন ছিলো না।
আমি থেমে যাবার কয়েক সেকেন্ড পর আবার ভয়ঙ্কর এক চিৎকার শুনতে পেলাম। সেই চিৎকার আমাকে প্রচণ্ডভাবে চমকে দিলো। বুঝতে পারলাম কাছাকাছি কোথাও কোনো ঘটনা ঘটছে। হয়তো ডক্টর তুশোর সঙ্গে বেয়াদবি করার কারণে তিনি কাউকে সাজা দিচ্ছেন। প্রকৃত ব্যাপারটা জানা প্রয়োজন। সুতরাং অন্ধকারের মধ্যেই পাথুরে দেয়াল ধরে ধরে, হাতড়াতে হাতড়াতে শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললাম। এভাবে পঞ্চাশ ফুট গিয়ে ওয়্যারলেস কুঠুরি পেরোতেই সামনে পড়লো সিক্রেট কর্নারÑ ডক্টর তুশোর গোপন গবেষণাগার। গবেষণাগারের নড়বড়ে কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো এসে কিছুটা জায়গা আলোকিত করে তুলেছে।
ধীরে ধীরে আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। জাপানি সৈনিকদের অপটু হাতে বানানো দরজার গায়ে অনেক ফাঁক-ফোকড় ছিলো। তেমন একটি ফুটোতে চোখ রেখে ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুটো চেয়ার আর একটা ভাঙা বাক্স ছাড়া  কিছুই চোখে পড়লো না। তবে ডক্টর তুশোর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, আর তা বেশ স্পষ্ট। শুনলাম কাকে যেনো তিনি বলছেন, অযথা মন খারাপ করো না। সবকিছু আমার পরিকল্পনা মতো চললে কয়েকদিনের মধ্যেই সারা পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। আজ যাদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে অসহায় ভাবছো, সেদিন তারাই তোমার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
: প্রভু! সত্যই কি তেমন সুদিন আসবে?
কণ্ঠস্বর যান্ত্রিক। তাই বুঝতে সমস্যা হলো  না ডক্টর তুশো ওয়াংলির সঙ্গে কথা বলছেন।
ওয়াংলির প্রশ্নের জবাবে ডক্টর তুশো বললেন, আসবে ওয়াংলি, অবশ্যই তেমন সুদিন আসবে। তবে সত্য কথা হলো, তেমন দিন আসবে কি আসবে নাÑএ নিয়ে আমিও দ্বিধায় ছিলাম। মনের ভেতর সংশয় ছিলো। তবে এসপিপিÑথ্রি ইনসুলিন আবিষ্কৃত হবার পর আমার সেই সংশয় দূর হয়ে গেছে।
: প্রভু! দৃষ্টতা নেবেন না। এক অনুগত ভৃত্য হিসেবেই জানতে চাইছি, এসপিপিÑথ্রি কেমন করে আপনার পরিকল্পনা সফল করবে? এক ফোঁটা ইনসুলিনের পক্ষে কেমন করে এতো বড়ো সফলতা এনে দেয়া সম্ভব, আমার মাথায় তা আসছে না।
ডক্টর তুশো বললেন, এটা তোমার দোষ নয়। তোমাকে যে বানিয়েছে, সেই ইয়ামামাটোর মাথায়ও এসব ঢুকবে না। শোনো মন দিয়ে কেমন করে কি হবেÑএসপিপিÑথ্রি ইনসুলিন পুশ করে আপাতত আমি একশো দম্পতিকে লিলিপুটিয়ান বানাবো।
: মানে খুদে মানুষ?
: না, খুদে মানুষ বলা ঠিক হবে না। বলতে পারো বেটে মানুষÑখর্বাকৃতির মানুষ। যা হোক, একশো মহিলা আর পুরুষকে খর্বাকৃতির মানুষ বানানোর পর তাদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবো। তারপর আমার আবিষ্কৃত এন্টি-হিউম্যান গ্যাস ছড়িয়ে দিয়ে মানবজাতিকে নিঃশেষ  করে দেবো।
: অহ্, চমৎকার। তারপর প্রভু?
সবাই নিঃশেষ হলেও পুরনো আকৃতির মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবো শুধু আমি। তুমি হবে আমার প্রধান সহকারী। আর যে সব খর্বাকৃতির মানুষকে আমি নিরাপদ স্থানে রেখে বাঁচিয়ে রাখবো, তাদের দিয়ে নতুন মানব জাতির গোড়াপত্তন করবো। গড়ে তুলবো নতুন সমাজÑনতুন সভ্যতা। আমি হবো ওদের একমাত্র ত্রাণকর্তা। ওদের মহাপ্রভুÑহা…হা…হা…
সৃষ্টিসুখের আনন্দে হেসে উঠলেন ডক্টর তুশো। আর সেই হাসির শব্দ আমার এতোদিনের চেষ্টায় গড়ে তোলা বিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো। আমার মনে হলো ডক্টর তুশো মানুষ নন, তিনি এক নরপিশাচ। নইলে কোনো মানুষ ঠাণ্ডা মাথায় এমন জঘন্য পরিকল্পনা করতে পারে? বর্তমান সভ্যতাকে সমূলে উচ্ছেদ করে তিনি নতুন সভ্যতার ভিত রচনা করতে চাইছেন! তা কি করে সম্ভব? এ জন্যই কি তিনি আমাকে দিয়ে প্রাণীকোষ সঙ্কোচনের ইনসুলির আবিষ্কার করিয়েছেন? অবশ্যই তাই। কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। যেমন করেই হোক, এ ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানীর হাত থেকে মানব জাতিকে বাঁচাতে হবে।
অধিক উত্তেজনার কারণে কোনো কোনো সময় মানুষ এমন সব কাজ করে বসে, স্বাভাবিক অবস্থায় যা তার দ্বারা করা সম্ভব নয়। ডক্টর তুশোর কথা শুনে আমার মনের ভেতর এতোটাই ক্ষোভ আর ঘৃণার সৃষ্টি হলো যে, আমার শরীরে যেনো দৈত্য দানোর শক্তি এসে ভর করলো। পরিণাম না ভেবেই দু হাত পিছিয়ে গিয়ে সিক্রেট কর্নারের দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সেই ধাক্কা নড়বড়ে দরজা সইতে পারলো না। দরজা সহ আমি সিক্রেট কর্নারের ভিতরে গিয়ে আছড়ে পড়লাম।
ভেঙে যাওয়া দরজার টুকরো কাঠ অথবা অন্য কিছুতে লেগে আমার ডান হাতের কনুই কেটে গিয়েছিলো। হাঁটুতেও সামান্য ব্যথা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার তখন সময় ছিলো না।
বাঙ্কারটাতে নানা দিকে গলির মতো ছিলো। সম্ভবত যুদ্ধের সময় সৈন্যরা দ্বীপের বিভিন্ন স্থান থেকে এ বাঙ্কারে আশ্রয় নিতো অথবা বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে যেতো। আমি অন্য কোনো গলিতে ঢুকে সময় নষ্ট না করে যেদিক থেকে আলো আসছিলো সেদিকে পা চালালাম। আর গজ পঁচিশেক এগোবার পরই আমি ডক্টর তুশোর মুখোমুখি হলাম। সম্ভবত দরজা ভাঙার শব্দ শুনে চমকে পেছনে তাকিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ শব্দ হলো কেন বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
আচমকা আমাকে দেখে ডক্টর তুশো ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। এক লাফে দু হাত পিছিয়ে গেলেন তিনি। সে সঙ্গে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো বিস্ময়ধ্বনিÑ নিপু তুমি?
সিক্রেট কর্নারের ভেতর একটা উৎকট গন্ধ ভুরভুর করছিলো। ভেতর থেকে বমি বেরিয়ে আসতে চাইছিলো। হয়তো বমি হয়েই যেতো, কিন্তু তার আগেই ওয়াংলি আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ওর ধাতব বাহুর চাপে আমার হাড়গুলো মটমট করে উঠলো। আমি দুঃসহ ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
ডক্টর তুশো আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে কেন, নিপু?
বললাম, প্রয়োজন রয়েছে বলেই এসেছি, এসপিপিÑথ্রি এ পৃথিবীর কোন কাজে লাগবে, আমাকে তা এখনও জানানো হয়নি। আমি তা জানতে চাই।
ডক্টর তুশো বললেন, বেশ তো, জানবে। কিন্তু জানার জন্য মাঝদুপুরে দরজা ভেঙে এখানে আসতে হবে?
ওয়াংলি তখনো আমাকে জাপটে ধরে রেখেছিলো। ওর বাহুবন্ধন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যেতে যেতে বললাম, দরজা ভেঙে আসিনি স্যার, দরজা নড়বড়ে ছিলো। চাপ সইতে না পেরে ভেঙে গেছে। যা হোক, দরজা ভেঙে যাওয়ার জন্য আমি দুঃখিত।
ডক্টর তুশো বললেন, যা জানতে চাইছো তা জানাটা কি খুবই প্রয়োজন?
: জ্বি স্যার, খুব প্রয়োজন।
দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দিলাম আমি। সে জবাব থমকে দিলো ডক্টর তুশোকে। এক মুহূর্ত কি যেনো ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, ওকে ছেড়ে দাও ওয়াংলি। ডেড চেম্বারের বাতিগুলো জ্বেলে দাও।
ওয়াংলির লাল বাতিটা হঠাৎ জ্বলে উঠে নিভে গেলো। সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে ডক্টর তুশোর পাশ কাটিয়ে পেছন দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। ডক্টর তুশো বললেন, এসো আমার সঙ্গে।
সিক্রেট কর্নারের ভেতরে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি সাজানো ছিলো। তার পাশ কাটিয়ে ওয়াংলিকে অনুসরণ করে আমরা এক অন্ধকার ঘরে গিয়ে থামলাম। ডক্টর তুশো বললেন, বাতি জ্বেলে দাও।
ওয়াংলি খটাস খটাস করে তিনটি সুইচ টিপলো। তিনটি বাল্ব জ্বলে উঠলো। আলোয় আলোয় ঝলমল করে উঠলো ছোট ঘরটি। সে আলোয় আমি যা দেখতে পেলাম তাতে আমার মাথার ভেতর যেনো আণবিক বোমার বিস্ফোরণ হলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ডেড চেম্বারের ভেতর দশ-বারোটি বিকৃত লাশ পড়ে আছে!
জ্বলেপুড়ে কুকড়ে গেছে ওদের শরীর। কারো একটি পা ছোট হয়ে দেড় ফুট আকার ধারণ করেছে। কারো শরীর অস্বাভাবিক ছোট হয়েছে অথচ সে তুলনায় হাত-পা ছোট হয়নি। তা আগের আকৃতিতেই রয়েছে। তবে সাবার চোখই খোলা। সেই খোলা চোখে অসহ্য যন্ত্রণার ছাপ ফুটে রয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আমি যে উৎকট গন্ধ পেয়েছিলাম, এখানেও তেমন গন্ধ ছড়িয়ে আছে।
বিকৃত পোড়া লাশগুলোর দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠলো ডক্টর তুশোর চোখেমুখে। ডক্টর তুশো বললেন, তুমি সম্ভবত আন-ইজি ফিল করছো। দেখলে তো সবকিছু। এবার চলো বাইরে যাই।
আমি বললাম, এদের এ অবস্থা হয়েছে কেন স্যার? সবার শরীর বিকৃত হয়ে গেছে।
ডক্টর তুশো বললেন, হ্যাঁ, হিসেব মতো সব কিছু হয়নি। তোমার এসপিপিÑথি এপ্লাই করে শতভাগ সফলতা পাইনি। চোখের সামনেই ফলাফল দেখতে পাচ্ছোÑসবাই বিকৃত হয়ে গেছে। তবে মন খারাপ করো না। যতোটুকু ফল পেয়েছি, তাতেই আমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এমন একটি মূল্যবান আবিষ্কারে জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি তোমাকে।
আমি বললাম, প্রয়োজন নেই অভিনন্দন জানানোর। এ অভিনন্দন আমার কাছে অভিশাপের মতো মনে হচ্ছে।
: কেন? তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন?
অবাক দুটো চোখ তুলে ডক্টর তুশো তাকালেন আমার দিকে। আমি বললাম, সন্তান বখাটে হয়ে গেলে বাবা-মায়ের বুকের ভেতরটা যেমন করে ওঠে, এসপিপিÑথির ফলাফল দেখে আমার তেমন লাগছে। আসলে আমি এমনটি চাইনি স্যার। মানব জাতির ক্ষতির হাতিয়াড় হিসেবে ব্যবহৃত হবো, আমি তা ভাবতেও পারিনি।
আমার কাঁধে হাত রেখে ডক্টর তুশো বললেন, মানুষ যা ভাবে সব সময় তা বাস্তবায়িত হয় না। হওয়ার চেয়ে বরং না হওয়ার সংখ্যাটাই বেশি। এসব নিয়ে ভেবে মন খারাপ করলে জীবন চলে না।
: কিন্তু আমি তো এমন চাইনি!
: মেনে নিলাম তুমি কখনো এমন চাওনি। তোমার-আমার চাওয়া মতো যদি সব কাজ হতো, তবে এ পৃথিবী অন্য রকম হতো। জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকতো না। হিংসা-দ্বেষ থাকতো না। পৃথিবীটা বেহেশতের মতো সুন্দর হতো। তেমন একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে চাই আমি। কিন্তু পারছি কই?

(চলবে)

SHARE

2 COMMENTS

  1. ‘বিজ্ঞানীর কবলে বিজ্ঞান’ উপন্যাসের এপ্রিল-২০১৪ (কিস্তি-৪) এর পরবর্তী অংশটুকু থেকে উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত লিঙ্ক চাই। অনুগ্রহ করে আমার ই-মেইলে দিবেন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply