Home তোমাদের গল্প ট্যাবলেশনের গল্প

ট্যাবলেশনের গল্প

আবদুস সবুর খান

Tableshoner-Golpoআমি কমল। থাকি ঢাকায়। বাবা সরকারি চাকরি করেন। আমি আমার পরিবারের সাথে ঢাকায় এসেছি দুই বছর হলো। আগে গ্রামে থাকতাম। গ্রামে আমার একজন ভালো বন্ধু ছিল। গতকাল সে আমাকে ফোন করেছিল। ফোন ধরেই আমি বললাম, হ্যালো, ট্যাবলেশন কী খবর?
চমকে গেলে বন্ধুরা, না? ট্যাবলেশন কেন বলেছি বুঝতে পারছো না। ঠিক আছে, গল্পের মূলে ঢুকে পড়ি। তাহলেই ট্যাবলেশনের ব্যাপারটা বুঝতে পারবে।
আমাদের গ্রামের নাম দৌলতকান্দি। আমি যখন গ্রামে ছিলাম তখন দৌলতকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তাম। সেবার আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের ক্লাসে সুমন নামে এক ছাত্র ছিল। সে সবসময় ক্লাসে দুষ্টুমিতে মেতে থাকত। আর ক্লাস ফাঁকি দিতো। টিফিন সময়ের পর সে ক্লাসে কমই উপস্থিত থাকত। এ জন্য তাকে কতবার কানে ধরতে হয়েছিল তার হিসাব নেই। মাঝে মধ্যে স্যারের হাতে মারও খেত সে। ছেলেটার ব্রেন খুব ভালো ছিল। কিন্তু লেখাপড়ায় ফাঁকি দিতো বলে রেজাল্টও খুব খারাপ হতো তার। সপ্তম শ্রেণীতে আমিই ছিলাম ফার্স্ট বয়। আমি সুমনের কল্যাণে লেগে পড়ি কিভাবে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যায়। প্রথমে আমি তার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলি। যেন সে আমার কথাগুলো মেনে চলে। আমি নিয়মিত তার সাথে চলাফেরা করতে থাকি। তাকে আমার সাথে স্কুলে প্রথম বেঞ্চে বসতে দিই। আমি তাকে অনেক বেশি  বোঝাতে থাকি। প্রথম প্রথম সে আমার কথাগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না। একদিন ক্লাসে ইংরেজি শিক্ষক বোর্ডে একটা শব্দ (ঞবষবারংরড়হ) লিখে এর ওপর ইংরেজিতে কিছু কথা বলছিলেন। সুমন ঐ সময় ক্লাসে দুষ্টুমি করছিল। স্যার তাকে দেখে দাঁড় করালেন এবং বোর্ডের শব্দটা (ঞবষবারংরড়হ) উচ্চারণ করতে বললেন। শব্দটি বোর্ডে তেমন একটা বোঝা যাচ্ছিল না। সুমন তাড়াহুড়ো করে স্যারের ভয়ে বলে উঠল ট্যাবলেশন। সারা ক্লাসে সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল পড়ে গেল। আমিও হাসি থামিয়ে রাখতে পারিনি। স্যার সুমনকে কষে একটা চড় মারলেন আর ভীষণ লজ্জা দিলেন। ক্লাস শেষে সুমনকে সবাই ট্যাবলেশন বলে ব্যঙ্গবিদ্রƒপ করতে লাগল। সেদিন স্কুল ছুটির পর সুমন আমাকে এসে বলল, তুমিও হাসতে পারলে?
আমি তাকে বললাম, প্লিজ, কিছু মনে করো না, সবার হাসি দেখে আমি আর থামিয়ে রাখতে পারিনি।
সে মাটির দিকে চেয়ে আমাকে বলল, আমি ভালো হয়ে যেতে চাচ্ছি কমল। লেখাপড়াতে ভালো করতে চাই।
সত্যি বলছো? অবাক হয়ে আমি জিজ্ঞেস করি। হ্যাঁ, সত্যি বলছি। তুমি আমাকে একটু সহায়তা করবে?
অবশ্যই। তুমি শুধু আমার কথাগুলো মেনে চলবে। ইনশাআল্লাহ ভালো তুমি করবেই।
এরপর থেকে সুমন আমার কথাগুলো মেনে চলতে শুরু করে। সে নিয়মিত স্কুলে যায়, পড়ায় ফাঁকি দেয় না, দুষ্টুমি বা আড্ডাতে মেতে থাকে না। প্রথম বেঞ্চে বসে শিক্ষকদের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শোনে। টিফিন পিরিয়ডের পর আর পালিয়ে যায় না। মোট কথা, সে ভালো হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সবই করা শুরু করে দেয়। সুমন গণিতে একটু কাঁচা ছিল। সে প্রতিদিন সময়মতো আমার কাছে আসত, আমি তাকে গণিতের সমস্যাগুলো বুঝিয়ে দিতাম। সে পড়ালেখায় এবার মজা পেতে লাগল। এভাবে অনেক মাস চলে যায়। শেষে বার্ষিক পরীক্ষা সন্নিকটে এসে পড়ে। একদিন পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। একে একে সব বিষয়ে পরীক্ষা শেষ হয়। পরীক্ষা শেষে সুমনকে আমি জিজ্ঞেস করি, কেমন পরীক্ষা দিলে এবার?
আনন্দের সাথে সে জবাব দেয়, খুব ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। আগের মতো এখন প্রশ্ন দেখে ভয় পাই না। সবই কমন পড়ে। আমি বলি, ভালো। আলহামদুলিল্লাহ।
আমি সুমনকে আগে থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার কথা বলেছিলাম। সে আমার সাথে একসময় নামাজও পড়া শুরু করে দেয়। আমরা নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ভালো ফলাফলের জন্য দোয়া করি। অবশেষে একদিন পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন এসে পড়ে। আমি ও সুমন স্কুলে যথাসময়ে উপস্থিত হই। সবার ভেতরেই দারুণ উত্তেজনা। প্রথম ঘোষণা করা হলো ষষ্ঠ শ্রেণীর ফলাফল। তারপরই ঘোষণা করা হলো আমাদেরটা। ফলাফল শুনে আমি আর সুমন আনন্দ নেচে উঠলাম। অবাক করা ফলাফল! আমি প্রথম আর সুমন দ্বিতীয়। আমাদের খুশি দেখে কে! ফলাফল ঘোষণা শেষ করে প্রধান শিক্ষক সুমনকে সামনে ডেকে নিলেন। তার এই অবাক করা ফলাফল সম্পর্কে কিছু বলতে বললেন। সুমন বলা শুরু করলÑ আর পুরো স্কুল মাঠে নির্জনতা নেমে এলো : প্রথমেই মহান প্রভুর দরবারে হাজার শুকরিয়া জানাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ। আমি নিজেই অনেক অবাক হচ্ছি যে কিভাবে আমি এতো ভাল ফলাফল করলাম। তবে একটি জিনিসকে আমি আজ উপলব্ধি করতে পারছি যে, পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই এই ফলাফল। আর আমাকে এতে সহায়তা করেছে কমল। সারা মাঠ শিক্ষার্থীদের হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠল।
প্রধান শিক্ষক আমাকে আর সুমনকে একটা বিশেষ পুরস্কার প্রদান করলেন। এরপর থেকে সুমন আর পিছিয়ে পড়েনি লেখাপড়ায়।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে ক্লাস এইটে কিছুদিন যাবার পর আমি ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হই। বাবা দৌলতকান্দি থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে যান। সরকারি চাকরিতে প্রায়ই এমন ঘটে। আমি চলে আসার দিন সুমন অনেক কেঁদেছিল। আমিও সুমনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। তার প্রতি আমার এক অদ্ভুত ধরনের টান রয়ে গেছে আজও। সে আমাকে মাঝে মধ্যে ফোন করে। আমি তাকে ট্যাবলেশন বলেই মজা করি। সে কিছু মনে করে না। আর ঈদের ছুটিতে আমি গ্রামে গিয়ে তার সাথে ঈদ উদযাপন করি। সে খুশি হয়। এভাবেই আমরা দু’জন চলছি, ফিরছি, সময় কাটাচ্ছি। বন্ধুরা, এবার বুঝলে তো ট্যাবলেশনের ব্যাপারটা?

SHARE

Leave a Reply