Home তোমাদের গল্প মনের বাঘে খায়

মনের বাঘে খায়

নিশাত তাসনীম স্বস্তি

Moner-Bage-Khaiকর্ণফুলী এক্সপ্রেস ভৈরব বাজার স্টেশন ছাড়ে ঠিক বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে। আজকে ট্রেনটা আসতে দেরি করেছে। ঘণ্টাখানেক ধরে স্টেশনে বসে আছে জামিল। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটাও কাউকে তোয়াক্কা না করেই টিক টিক টিক টিক করেই চলেছে। অবশ্য ওর কাজইতো এটা। তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে সেই টিকটিকি আর ঘড়ির গল্প। ছোট সময় যা পড়েছিলে।
জামিলও ছোটবেলায় সে গল্প পড়েছিল। সেই ছোট্ট জামিল আজ অনেক বড় হয়েছে। ভালো চাকরি করে।
চাকরির-ই একটা কাজে চট্টগ্রাম যাবে। যাহোক, বেশ অনেকটা দেরি করেই ট্রেন এলো। ট্রেনে উঠে নিজের সিট খুঁজে বসে পড়ল। বেশ খানিকক্ষণ স্টেশনে বসে থাকায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ও। তাই সিটে বসেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। বেশ খানিকক্ষণ পর ঘুম ভাঙল জামিলের। চট্টগ্রাম পৌঁছাতে অনেকটা সময় লাগবে।
ততক্ষণে হয়তো ভোর হয়ে যাবে। প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ছে। অনেক রাতও হয়েছে। যেতে যেতে সে বাইরের দিকে দেখতে লাগল। বাইরে সবই অন্ধকার। শুধুু রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের লাইটগুলোই এখন জ্বলছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা আর ট্রেনের অবিরাম ঝকঝক শব্দ পরিবেশকে আরো নির্জন করে তুলেছে। হঠাৎ করেই জামিলের মনে হলো কেউ যেন ওকে ডাকছে। কিন্তু পরেই মনে হলো, না তো এখানে আবার আমাকে কে ডাকবে?
যাহোক, প্রায় সাড়ে তিনটার সময় গাড়ি চট্টগ্রাম স্টেশনে থামলো। কিন্তু এতো রাতে রিকশা কোথায় পাওয়া যাবে। ওকে তো কেউ নিতেও আসবে না। ব্যাগ থেকে টর্চ লাইট বের করে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল জামিল। চারদিকটা খুব থমথমে অবস্থা। কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। ট্রেনের সব যাত্রীই কোথাও না কোথাও নেমেছে। জামিলের যাত্রাপথে ওদের কাউকে দেখা যায়নি। একা একা এতো রাতে হাঁটতে জামিলের একটু ভয় ভয় লাগছিল। ভয় লাগারই কথা, আশপাশের ঝিঁঝিঁ পাকাগুলোর গান ছাড়া রাস্তায় ও আর কোনো সঙ্গী পায়নি। আবার পাশপাশে ভূতপ্রেত আছে নাকি কে জানে। যদিও ও ভূতে ততটা বিশ্বাসী নয়। এসব ভাবতে ভাবতে যখন ও এগোচ্ছিল, তখন হঠাৎ কেউ যেন দৌড়ে গেল মনে হলো। হয়তো কোনো বিড়াল বা অন্য কিছু। আবার হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, কেউ যেন ওর কানে কানে বলছে, ঐ বাঁশঝাড়টায় ভূত আছে। চমকে উঠে সামনে তাকিয়ে দেখল সত্যিই একটা বাঁশঝাড়। বাতাসে কেমন দুলছে। আর পাতার সাথে পাতা লেগে শন শন শব্দ হচ্ছে। জামিল দ্রুত বাঁশঝাড়টা পেরিয়ে গেল।
সেই ছোটবেলা থেকেই ভূতকে ভয় পায় জামিল। এখনও সেই ভয় কাটেনি। যদিও নিজে জানে ভূত বলে কিছুই নেই। অবশ্য নিজেকে বোঝাতেও জানে।
একবার হয়েছিল কী, জামিলের যখন সাত বছর বয়স। তখন সে খুব বায়না ধরেছিল হাটে যাবার জন্য। জামিল তখন তার গ্রামের বাড়িতে। তখন এখনকার মতো শপিং মল বা বড় বড় গার্মেন্ট ছিল না। হাটেই বিক্রি হতো কাপড় চোপড়। ওর মামা যাচ্ছিল হাটে কাপড় কিনতে। আর অমনি ওর বায়না। মামা তো পড়লেন মহা ফ্যাসাদে একমাত্র ভাগ্নের বায়না ফেলে দিতে পারছেন না। আর মেনে নিতেও ভয় হচ্ছে। যদি হাটে গিয়ে আবার বাড়ি ফেরার জন্য কাঁদতে শুরু করে। অবশেষে তিনি রাজি হলেন। হাটে কিছুক্ষণ সময় যেতে না যেতেই জামিল তার মামার কাছে বলতে লাগল, মামা বাড়ি যাবো। মামাতো শুনেই রেগে আগুন। এতক্ষণ আসার জন্য কাঁদছিল আর এখন যাওয়ার জন্য। মামা রেগেই বলে দিলেন, তুই একাই বাড়ি যা, তোকে আসতে কে বলেছিল? জামিল ভাবল, মামা হয়তো সত্যি সত্যিই তাকে যেতে বলছে। ওমনি ও মামাকে না বলেই একা একা বাড়ির পথে পা বাড়াল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সামনে দেখল, মাঠে সাদা পাঞ্জাবি পরা একট ভূত দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তা আরো স্পষ্ট দেখাচ্ছে। জামিল তো সাথে সাথেই জ্ঞান হারাল। এ দিকে ওর মামা ওকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। শেষে নিরাশ হয়ে ওর মামা বাড়ির দিকে রওনা দিলো। তখনও এশার আজান দিতে বেশ কয়েক মিনিট বাকি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সামনে একজন কাউকে পড়ে থাকতে দেখল। এগিয়ে গিয়ে দেখল ওটা জামিল। চমকে গেল মামা। রাস্তার একজনের সাহায্য নিয়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে এলো। জামিলের মা তো কেঁদে অস্থির। অবশেষে যখন জামিলের জ্ঞান ফিরল, তখন সব ঘটনা খুলে বলল। ও বলল, গত রাতে ধানক্ষেতে ও নাকি একটা সাদা ভূত দেখেছিল। অমনি সবাই হেসেই কুটোকুটি। জামিল তো অবাক। ও ভূত দেখে ভয় পেয়েছে। এতে স্বাভাবিক একটা বিষয়ে হাসির কী আছে? হাসতে হাসতে ওর মামাতো ভাই অন্তু বলল, আসলে ওটা একটা কাকতাড়ুয়া। জামিলের এখনও সেদিনের কথা মনে আছে। কথাগুলো মনে করতে করতে এগোচ্ছিল জামিল। ভয়ে ওর পা দুটো যেন এগোচ্ছিল না। হঠাৎ করে যেন কার গলার আওয়াজ পেয়ে থমকে দাঁড়াল, পেছনে তাকিয়ে দেখল এক রিকশাওয়ালা। কিন্তু পরে ভাবল রিকশাওয়ালার কাজই তো রিকশা চালানো। সেটা যখনই হোক আর যেখানেই হোক। রিকশাওয়ালাকে জায়গার নাম বলে রিকশায় উঠে পড়ল জামিল। যেতে যেতে রিকশাওয়ালার সাথে নানা কথা বলল। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। আকাশে চাঁদের বদলে সূর্য এসে গেছে। আর জামিলের মনেও ভয়ের জায়গায় সাহস এসে গেছে। আসলে ভূত বলে কিছুই নেই। আমরা মনের ভয়েই ভীত। কথায় আছে না, বনের বাঘে খায় না মনের বাঘে খায়।

SHARE

Leave a Reply