Home বিজ্ঞান হিমালয় পেটে রাখতে পারে যে খাদ

হিমালয় পেটে রাখতে পারে যে খাদ

মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

Biganবিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম মাউন্ট এভারেস্ট। উচ্চতা আট দশমিক আট চার কিলোমিটার। এই মাউন্ট এভারেস্ট ধারণ করে আছে যে পর্বতমালা তার নাম হিমালয়। ছয়টি দেশে বিস্তৃত এই পর্বতমালা। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান। বিশাল এই হিমালয়কে পেটে রাখতে পারে এমন জিনিসও আছে পৃথিবীতে। যার নাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর প্রদেশ এটি। যার অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে।
মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের পূর্বদিকে জাপানের কাছে ১১”২১’ উত্তর অক্ষাংশ আর ১৪২”১২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এটি শুয়ে আছে দুই হাজার ৫৫০ কিলোমিটার (এক হাজার ৫৮০ মাইল) লম্বা আর ৬৯ কিলোমিটার (৪৩ মাইল) প্রশস্ত জায়গাজুড়ে। এর গভীরতা ১১ দশমিক শূন্য তিন কিলোমিটার। অর্থাৎ আট দশমিক আট চার কিলোমিটার উচ্চতার হিমালয় মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ঢুকে যাবে নির্দ্বিধায়। তারপরও দুই দশমিক এক নয় কিলোমিটার অথৈ পানি খেলা করবে হিমালয়ের মাথার ওপর।
হিমালয় যদি পৃথিবীর শীর্ষতম বিন্দু হয় তবে সর্বনিম্ন বিন্দু এই মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। ট্রেঞ্চ শব্দের বাংলা অর্থ খাদ বা পরিখা।
বিশ্বে এরকম ২২টি ট্রেঞ্চ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যার ১৮টিই প্রশান্ত মহাসাগরে। এই ট্রেঞ্চগুলো আর কিছুই নয় কেবল সাগর-মহাসাগরের তলদেশ থেকে নেমে যাওয়া সরু এবং বিস্তৃত ইংরেজি অক্ষর ‘ভি’ আকৃতির এক একটি ফাটল বা খাদ।
খাদটি কেন মরিয়ানা ট্রেঞ্চ? মারিয়ানা হলেন সতের শতকের স্পেনের রানী। স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপের বিধবা পতœী। ১৬৬৭ সালে স্পেনিয়ার্ডরা প্রশান্ত মহাসাগরের যে দ্বীপগুলো দখল করে কলোনি প্রতিষ্ঠা করেন, রানীর সম্মানার্থে তার অফিসিয়াল নামকরণ করেন ‘লা মারিয়ানাস’। আর এই ট্রেঞ্চটি মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের একদম কাছে বলে এর নামটিও হয়ে যায় ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’।
অন্যান্য সব ট্রেঞ্চের মতো এই ট্রেঞ্চটির জন্মও হয়েছে পৃথিবীর ভেতরের ‘টেকটোনিক প্লেট’গুলোর ধাক্কাধাক্কির ফলে। ভূমিকম্প হয় যে কারণে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে রয়েছে দু’টি সচল প্লেট। এর একটি পেসিফিক প্লেট। অন্যটি ফিলিপিন প্লেট। পেসিফিক প্লেটটি অনেকটা দৈত্যাকৃতির। এটি পশ্চিমে সরতে থাকে আর ইউরেশিয়ান পেটের সাথে সংঘর্ষ হয়। ফলে জাপানের পূর্বদিকে তৈরি হয় অসংখ্য আগ্নেয়গিরিসহ ডুবন্ত পাহাড়শ্রেণীর। আর দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে ফিলিপিন প্লেট। এই ফিলিপিন প্লেটের সাথে সংঘর্ষে নিচের দিকে চলে যায় পেসিফিক প্লেট। আর এই নিচে চলে গিয়েই জন্ম হয় অতিকায় এবং গভীর মারিয়ানা ট্রেঞ্চের। সাথে সাথে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জেরও। এ পর্যন্ত জানা পৃথিবীর গভীরতম অঞ্চল এই মরিয়ান ট্রেঞ্চ।
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতম অঞ্চল হলো গুয়াম দ্বীপের ২১০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’। যে নামটি এসেছে ব্রিটিশ অনুসন্ধানী নৌযান এইচএমএস চ্যালেঞ্জার টু-এর নামানুসারে। এই জাহাজের নাবিকরা ১৯৪৮ সালে ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ আবিষ্কার করেন।
১১ দশমিক তিন কিলোমিটার গভীর এই চ্যালেঞ্জার ডিপ পৃথিবীর শীতলতম স্থান হিসেবেও চিহ্নিত। এখানে আছে হাজার প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং মাছ। গভীরতার কারণে অঞ্চলটি যেমন হিমশীতল। তেমনি টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের কারণে এর আশপাশের জলীয় পরিবেশের তাপমাত্রা ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। এতে পানির বাষ্প হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এটি হয় না। কারণ চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা বিপুল হিমশীতল পানি। সমুদ্রপৃষ্ঠের বাতাসের চাপের চেয়ে এখানে পানির চাপ ১০০০ গুণ বেশি। পানির ঘনত্বও প্রায় পাঁচ শতাংশ বেশি। অতি ক্ষুদ্র কিছু ব্যাকটেরিয়ারও দেখা মেলে মারিয়ানা ট্রেঞ্চে। সাধারণত সমুদ্রতলের গভীরে মৃত প্রাণীর কঙ্কাল, খোলস জমা পড়তে থাকে। মারিয়ানার তলও আলাদা নয়। এখানকার পানির রঙ সে জন্যই কিছুটা হলুদ।
গভীর সাগরের তলদেশে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে এখনো রয়ে গেছে নানা সমস্যা। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা ট্রেঞ্চটির গভীরতা আরো বেশি হতে পারে।

SHARE

Leave a Reply