Home সাহসী মানুষের গল্প যে সাহসী প্রাণ জোগায় প্রেরণা

যে সাহসী প্রাণ জোগায় প্রেরণা

কায়েস মাহমুদ

Sahoshসেই এক সাহসী যোদ্ধা!
আল্লাহ ছাড়া কাউকে যিনি ভয় করেন না।
যেমন তাঁর সাহস তেমনি তিনি টগবগে।
নাম তাঁর হযরত ইয়াস (রা)।
ইয়াসের পিতার নাম আওস ইবন আতিক।
মদিনার আনসার গোত্র বনু আবদুল আশহালের লোক ছিলেন তিনি। এ কারণে তাঁকে আল-আশহালি বলা হয়।
হযরত ইয়াস (রা) উহুদ যুদ্ধের শহীদদের একজন।
বদর যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিক শক্তি শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। তারা মক্কায় ফিরে গিয়ে এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেয়।
পরবর্তী বছর হিজরি তৃতীয় সনে তারা বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মদিনা অভিমুখে যাত্রা করে উহুদের প্রান্তরে সমবেত হয়।
এবার তাদের সাথে যোগ দেয় বনু কিনানা ও তিহামার অধিবাসীরা।
রাসূল (সা) তাদের এ আক্রমণ প্রস্তুতির কথা অবগত হয়ে সাহাবায়ে কিরামের (রা) সাথে নিজেদের করণীয় নির্ধারণে পরামর্শে বসেন। তিনি নিজে মদিনায় অবস্থান করে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন : তোমরা যদি মদিনায় অবস্থান নাও এবং তাদেরকে সেখানেই থাকতে দাও যেখানে তারা অবতরণ করেছে, তাহলে ভালো হয়।
তারা যদি সেখানে অবস্থান করে তাহলে তা হবে খুব খারাপ অবস্থান।
আর যদি তারা অগ্রসর হয়ে আমাদের ওপর হামলা করে তাহলে এই মদিনাতেই তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।
রাসূলুল্লাহর (সা) এ প্রস্তাবে কিছু মুসলিম সন্তুষ্ট হলেন না। তাঁরা দাঁড়িয়ে গেলেন।
ইয়াস (রা) তাঁদের নিকটেই ছিলেন।
তাঁরা বলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদেরকে নিয়ে আপনি শত্রুর মুখোমুখি হোন। তারা যেন আমাদেরকে ভীরু ও দুর্বল ভাবতে না পারে।
তবে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল মদিনায় অবস্থান করে শত্রুকে প্রতিরোধ করার পক্ষে মত দেয়।
আনসার ও মুহাজিরদের যে দলটি কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সা) বার বার তাঁদের মতকে মেনে নেয়ার জন্য তাকিদ দিতে থাকেন।
এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে গিয়ে বর্ম ও যুদ্ধের পোশাক পরে বাইরে আসেন।
তাঁকে এ অবস্থায় দেখে ইয়াস ইবন আওস, তাঁর সঙ্গী আবদুল আশহাল গোত্রের অন্যান্য মুসলিমগণ ও তাঁদের পরিবারবর্গ ভীষণ লজ্জিত হলেন।
তাঁরা বলাবলি করলেন : আমরা খুব খারাপ কাজ করছি। আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করেছি যা করা আমাদের উচিত হয়নি। এমতাবস্থায় আমরা কি তাঁকে কোন কিছু করার জন্য বলতে পারি?
ইয়াস আল-আশহালি (রা) সহ অন্যরা সকলে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে গিয়ে নিজেদের কর্মের জন্য ক্ষমা চান এবং বলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ইচ্ছামতো আপনি কাজ করুন।
জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : কোন নবী বর্ম পরার পর যুদ্ধ না করে তা খোলা তাঁর জন্য শোভন নয়।
এক হাজার সৈনিক রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে সমবেত হলেন। তাঁদের মধ্যে বনু আল-আশহালের অন্যদের সাথে ইয়াস ইবন আওসও (রা) ছিলেন।
তাঁরা উহুদের দিকে চললেন।
উহুদ ও মদিনার মাঝামাঝি আস-শাওত নামক স্থানে পৌঁছে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবায় তার সঙ্গীদের নিয়ে মুসলিম বাহিনী ত্যাগ করে মদিনায় ফিরে আসে।
তাদের সংখ্যা ছিল মূল বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ।
আবদুল্লাহ ইবন উবায় বললো : কিসের জন্য আমরা এখানে জীবন দেব?
ইয়াস আল-আশহালি (রা) ও তাঁর সঙ্গীরা মোটেই দ্বিধাগ্রস্ত হলেন না। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে এগিয়ে চললেন।
রাসূল (সা) উহুদ প্রান্তরে পৌঁছে থামলেন।
পঞ্চাশ সদস্যের একটি তীরন্দাজ বাহিনীকে উহুদ পাহাড়ের একটি সুড়ঙ্গ পথে মোতায়েন করেন।
এই বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দান করেন আবদুল্লাহ ইবন জুবাইরকে (রা)।
দায়িত্ব দান কালে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে নির্দেশ দেন তীর মেরে শত্রু পক্ষের অশ্বারোহীদেরকে ঠেকিয়ে রাখবে যাতে তারা পেছন দিক থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ চালাতে না পারে। আমাদের জয় বা পরাজয় যাই হোক না কেন, তোমরা তোমাদের অবস্থানে অটল থাকবে। তোমাদের দিক থেকে তারা যেন আমাদের ওপর চড়াও হতে না পারে।
এই তীরন্দাজ বাহিনীর ঝাণ্ডাটি রাসূলুল্লাহ (সা) মুসআব ইবন উমাইরের (রা) হাতে তুলে দেন।
উহুদের দিনে এই গোত্রের বিরাট ভূমিকা ছিল।
এ গোত্রের প্রথম ব্যক্তি যিনি এ যুদ্ধে প্রাণ দান করেন তিনি হলেন আমর ইবন উকাইশ আল-আশহাল (রা)। এ যুদ্ধে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। উহুদ যুদ্ধের ডামাডোলের সময় তিনি মদিনার বাইরে ছিলেন।
মদিনায় ফিরে এসে দেখেন তাঁর গোত্রের লোকেরা কেউ বাড়িতে নেই।
গোত্রের নির্ধারিত সমাবেশস্থলে গিয়ে দেখেন সেখানেও কেউই নেই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গোত্রের লোকেরা মদিনা আক্রমণকারী কুরাইশ বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে উহুদে চলে গেছে।
আমর ইবন উকাইশ (রা) চুপচাপ যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হলেন, তারপর ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে উহুদের দিকে রওনা হলেন।
মুসলিমরা তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : আমর! তুমি কোথায় যাচ্ছো?
আমর (রা) বলেন : আমি ঈমান এনেছি।
যুদ্ধ শুরু হলো।
সে এক ভয়াবহ যুদ্ধ! এ যুদ্ধে আমর উবন উকাইশের (রা), বীরত্ব দেখে তাঁর সঙ্গীরা স্তম্ভিত হয়ে গেল।
কেউ কেউ বললো : সে তো ইসলাম গ্রহণ করেনি। তাহলে সে কি নিজের গোত্রকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করছে?
তখন সেখানে সাদ ইবন মুআয (রা) উপস্থিত হলেন। তিনি আমরের বোনকে বললেন : তুমি তাকে একটু জিজ্ঞেস কর, সে কি তার সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য, না আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করছে?
এ সময় আমর (রা) তাঁদের কাছাকাছি চলে আসেন। তাঁর বোন এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন : ভাই, আপনি কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করছেন, না কি আপনার গোত্র আবদুল আশহালকে রক্ষার জন্য?
তিনি জবাব দিলেন : আমি শাহাদাত বরণ করে জান্নাতবাসী হতে চাই।
রাফি (রা) তাঁর সে সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে : “আমি ও আমার ভাই আবদুল্লাহ ইবন সাহল রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে উহুদ অংশগ্রহণ করি এবং দু’জনই আহত অবস্থায় ফিরে আসেন। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) ঘোষক যখন হামরাউল আসাদের দিনে শত্রু সন্ধানের ঘোষণা দিলেন তখন আমি ও আমার ভাই বলাবলি করলাম : রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে একটি যুদ্ধে গমন থেকে আমরা চড়তে পারি।
হযরত ইয়াস (রা) উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
তুমুল যুদ্ধের পর পৌত্তলিক বাহিনীর পরাজয় হতে চলেছিল। তারা নিজ নিজ অবস্থান ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালাচ্ছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নিয়োগকৃত তীরন্দাজ বাহিনী নিজেদের অবস্থানস্থল ছেড়ে শত্রুবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই সুযোগে শত্রুবাহিনীর একটি দল পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এতে মুসলিম বাহিনী হতবাক হয়ে পড়ে। তাঁরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
গোটা বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে!
বহু হতাহত হয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) মারাত্মকভাবে আহত হন। এ কথাও ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূল (সা) শাহাদাত বরণ করেছেন।
এমনই এক নাজুক পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা করেন : আমাদেরকে রক্ষার জন্য কে তার জীবন বাজি রাখতে পারে?
এ কথা শোনার সাথে সাথে সাতজন আনসার সাহাবী একসাথে বলে ওঠেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা!
তাঁদের একজন ছিলেন ইয়াস আল আশহালি (রা)।
রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘিরে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
ইয়াস (রা) ছিলেন যিয়াদ ইবন আস-সাকানের (রা) পেছনে।
শত্রুদের প্রচণ্ড আক্রমণে ইয়াসের (রা) সামনেই যিয়াদ (রা) ক্ষত-বিক্ষত হয়ে লুটিয়ে পড়েন।
ইয়াস (রা) পাশে তাকিয়ে দেখেন তাঁর চাচাতো ভাই আতিক ইবন আত-তায়্যিহান আল-আশহালি (রা) শাহাদাত বরণ করেন। পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখেন রাসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়িয়ে আছেন।
অদূরেই আক্রমণে উদ্যত শত্রু সৈন্যরা রাসূলুল্লাহর (সা) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ অবস্থা দেখে তিনি গলা ফাটিয়ে আল্লাহু আকবর ধ্বনি দেন। সেই ধ্বনি শুনে শত্রু সৈন্যদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তারা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে দূরে সরে যায়।
এ পর্যায়ে ইয়াস সফল হন।
ইয়াস ইবন আওস (রা) ও তাঁর আরো ছয় ভাই বিভিন্ন যুদ্ধে সবাই শাহাদাত বরণ করেন। সাতজনের মধ্যে হযরত ইয়াস (রা) হলেন প্রথম শহীদ।
অন্য ছয় ভাই হলেন : আনাস ইবন আওস, উমাইর ইবন আওস, মালিক ইবন আওস, আমর ইবন আওস ও আল হারিছ ইবন আওস (রা)। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাঁরা সবাই জীবন দান করেন।
খন্দক যুদ্ধে আনাস ইবন আওস, ইয়ামামার যুদ্ধে উমাইর ও মালিক, জাসরে আবি উবায়দার যুদ্ধে আমর, আজনাদাইনের যুদ্ধে আল হারিছ এবং হারবার ঘটনায় আমর শাহাদাত বরণ করেন।
সুতরাং বলা যায়, হযরত ইবন আওসের (রা) পরিবারটি একটি শহীদি পরিবার। যে পরিবারের প্রতিটি ভাই-ই শহীদ হয়েছেন।
এমনি সাহসী দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।
বিরল এক ঈমানী পরীক্ষা।
যে ঈমানের পরীক্ষায় পাস করেছিলেন তাঁরা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের অনুপ্রেরণা ও সাহসের উৎস হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে তাঁদের সেই শাহাদাতের জীবন।
এমন সৌভাগ্যের জীবনই তো আমাদের কাম্য হওয়া উচিত।

SHARE

Leave a Reply