Home সায়েন্স ফিকশন খেজুর রস

খেজুর রস

মুহাম্মাদ দারিন

Darin‘না এটা খেজুরের রস’
‘তুমি পানির সাথে কী মিশিয়েছো?’
‘বললামতো, এটা পানি বা অন্য কিছু নয়। এটা খেজুর গাছের রস।’
‘খোকন সোনা সত্যি করে বল, তুমি পানির সাথে আর কী মিশিয়েছো?’
‘তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যাবাদী?’
‘সেটা মনে হচ্ছে না বলেই তো বার বার জিজ্ঞাসা করছি।’
‘শোনো, এটা একশত ভাগ খেজুরের রস।’ রাগ ঝরে পড়ে ওর কণ্ঠে। ‘এক ফোঁটাও পানি এতে মিশ্রণ নাই। আমি এই মাত্র গাছ থেকে পেড়েছি। হ্যাঁ, কিছু মানুষ অসৎভাবে রসের সাথে পানি মিশিয়ে বিক্রি করে বেশি টাকা পাবার আশায়। এদেরকে আমি চরমভাবে ঘৃণা করি। কিন্তু আমরা তো রস বিক্রি করিনে। তাই পানি মিশানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।’
‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু এটা তো পানি নয়। পানির সাথে অন্য কিছুর মিশ্রণ।’
‘আচ্ছা, তুমি কি ভিন গ্রহ থেকে নাজিল হয়েছো, নাকি এই মাত্র তোমার জন্ম হলো? খেজুরের রসকে তুমি পানির সাথে কিছুর মিশ্রণ বলছো। আজিব ব্যাপার!’
‘জন্মটা তোমার আগে এটা বলতে পারি। আর ভিন গ্রহ থেকে নাজিল বলছোতো, হ্যাঁ আমি পৃথিবীর বাসিন্দা নই।’
চমকে এক লাফে দু’হাত পিছিয়ে যায় বার বছরের কায়েদ। ওদের অনেকগুলো খেজুর গাছ আছে। যেদিন খেজুর গাছ কাটে সেদিন শীতের এই সকালে খেজুর রস পাড়া এবং বাড়িতে নিয়ে যাওয়া ওর একটা রুটিন হয়ে গেছে। অবশ্য এগুলো না করলেও হয়। গাছকাটা এবং রস পাড়ার জন্য মানুষ আছে। কিস্তু কায়েদ আব্বা-মাকে বলেছে সে এসব কাজ করতে চাই। নিজেদের কাজ করার মধ্যে কোনো লজ্জা বা অন্য কিছু নেই। ও অবশ্য সব গাছ থেকে রস পাড়ে না। নির্ধারিত কিছু গাছ আছে যেগুলো মাঝারি ও ছোট। এগুলো থেকেই ও রস পাড়ে এবং বাড়িতে নিয়ে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ও ওর নির্ধারিত গাছ থেকে রস পাড়ে। আজ যা সর্ব সাকুল্যে চার ভাড় হয়েছে।
দুই হাতে দুই ভাড়ের কানাস ধরে ও যখন উঁচু করতে যাবে তখনই লোকটি উদয় হয় ওর সামনে। চারিদিকে তখনও ভোরের আভা বিরাজ করছে। সূর্যিমামা এখনও উঁকি মারেনি আকাশে। এই সাত সকালে খেজুর বাগানে অপরিচিত এক লোক দেখে প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও নিজেকে সামলে নেয় কায়েদ। লোকটির গায়ে আজব এক পোশাক। এমন পোশাক কোথাও দেখেছে বলে মানে হয় না। কায়েদ জানেও না ওটা কোন দেশী পোশাক।
শীতে কায়েদ কিছুটা আড়ষ্ট হলেও লোকটির শীত লাগছে বলে মনে হচ্ছে না। শীত নিবারণের জন্য কায়েদের মতো তিন/চারটি পোশাক কিন্তু লোকটির পরনে নেই।
লোকটিকে দেখে দুই ভাড়ের কানাস থেকে হাত বের করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় কায়েদ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটি একটা ভাড় ধরে ঢক ঢক করে রস পান করতে থাকে কোনো ছাকা-ছাকি ছাড়াই।
পেট পুরে রস পান করে ভাড় মাটিতে নামিয়ে রেখে তৃপ্তির এক ঢেকুর তুলে আলহামদুলিল্লাহ বলে কায়েদের দিকে তাকিয়ে লোকটি স্পষ্ট বাংলায় বলে ওঠে, ‘পানির সাথে কী মিশিয়েছো ছোট্ট খোকা?’
রাগের সহিত কায়েদ বলে, ‘পানি না, এটা রস।’
সেই লোক কিনা এখন নিজেকে ভিন গ্রহের প্রাণী বলে দাবি করছে। হতেও পারে। লোকটির পোশাকই হয়তো তার প্রমাণ। কিন্তু ও এলো কী করে? কায়েদ জানে এলিয়েন বা ভিন গ্রহের প্রাণীরা ওদের যানবাহনে চড়ে পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে বা অন্য কোনো কাজে আসে বলে অনেকে মনে করে বা অনেকে দেখেছে বলে দাবিও করে। তাহলে যানবাহন ছাড়া ও এলো কী করে? যানবাহন কি অন্য কোথাও রেখে এসেছে, নাকি ছোট বলে ওকে লোকটি বোকা বানাতে চাচ্ছে?
কায়েদ কোমরে দু’হাত বেঁধে বলে, ‘আমার সাথে মশকরা হচ্ছে, তাই না? নিজেকে ভিনগ্রহের প্রাণী বলে দাবি করে একগাদা রস খেয়েছো। তা ভিন গ্রহের রস খেকো জোকার বলোতো তোমার বাড়ি কোন গাঁয়ে?’
ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় লোকটা। বোকার মতো তাকিয়ে থাকে কায়েদের দিকে।
‘ওভাবে তাকিয়ে কী দেখছো? আমার প্রশ্নের জবাব দাও।’ বলল কায়েদ।
আজব পোশাকওয়ালা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ছোট্ট সোনা, শোনো, সত্যি আমি পৃথিবীর কোনো মানুষ নই।’
‘দেখো, রস খেয়েছো আরো খাও। যদি খুব বেশি খেতে ইচ্ছে করে তবে এক দু’ভাড় নিয়েও যেতে পারো। টাকা লাগবে না। কিন্তু আজে-বাজে বোকো না। এই সাত-সকালে শীতে এমনিতে আমার হাত পা জ্যাম হয়ে গেছে। দয়া করে এবার আমার মাথাটা জ্যাম করো না।’
‘ছোট্ট বাবু, সত্যিই আমি পৃথিবীর মানুষ নই। কী করলে তুমি বিশ্বাস করবে এ কথাটা?’
‘তুমি যে ভিনগ্রহের প্রাণী তার কী প্রমাণ আছে?’
‘দেখো আমার পোশাকই তার প্রমাণ। পৃথিবীর কেউ এমন পোশাক পরিধান করে না। আমাদের এ পোশাকে না লাগে শীত না লাগে গরম।’
‘পোশাকে এটা প্রমাণ হয় না।’
‘প্লিজ, বিলিভ ইট।’
‘তা না হয় করলাম। কিন্তু তুমি এলে কী করে? মানে তোমার যানবাহন কোথায়?’
আজব পোশাকের লোকটা এবার যেন স্বস্তি পেল। দূরে পুকুরের ওপারে রাস্তা তার ওপারে নির্দেশ করে বলল, ‘ঐ দেখো আমার যানবাহন ওইখানে রেখে এসেছি।’
কায়েদ দেখলো রাস্তার ওপারে পূর্বদিকে যে বড় জাম গাছটা আছে তার পাশের ফাঁকা জায়গায় অদ্ভুত এক যানবাহন দাঁড়িয়ে আছে। শীতের এই সকালে ওটা স্পষ্ট দেখা না গেলেও কায়েদ বুঝতে পারলো অদ্ভুত এক যান দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। পৃথিবীর কোনো কিছুর সাখে ওর কোনো মিল নেই।
ভয় ভয় একটা ভাব কায়েদের ভিতর আসছে আবার পুলক একটা ভাবও মনে জাগছে। ভয়টা এই কারণে যে, ভিনগ্রহের প্রাণী ওর সাথে কোনো খারাপ আচরণ করবে কিনা জানা নেই এবং ওকে ধরে নিয়েও যেতে পারে। আর পুলক অনুভূত হচ্ছে এই কারণে যে,  ভিনগ্রহের প্রাণীর সাথে ও কথা বলছে এবং ওদের খেজুর রস ভিনগ্রহের প্রাণী খেয়েছে।
‘কি ছোট্ট খোকা, এবার বিশ্বাস হচ্ছে তো?’
‘তা না হয় করলাম। কিন্তু আমি তো জানি এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণীর আকার আকৃতি মানুষের মতো নয়।’
‘দেখো মানুষ খুব কল্পনাপ্রবণ। কেউ স্পষ্টভাবে এলিয়েনদের আকার আকৃতি বলতে পারেনি।’
‘তার মানে তোমরা আকার আকৃতিবিহীন!’ অবাক হয়ে জানতে চাই কায়েদ।
‘আকার আকৃতি আছে আবার নেই।’
‘তার মানে কী?’
‘বাদ দাও তো ওসব। তোমার এই ভাড়ের পানি আমাকে আর একটু খেতে দিবে?’
কায়েদ এবার সত্যি রেগে যায়। রাগত স্বরে বলে, ‘আবারও তুমি রসকে পানি বলছো?’
‘ওই হলো খেজুরের পানি।’
‘উঁহু, পানি নয়, খেজুরের রস।’
‘আচ্ছা বাবা খেজুরের রস। দেবে খেতে?’
‘প্রথম বার খাওয়ার সময় তো অনুমতি নাওনি। এখন নিচ্ছো কেনো?’ স্বভাবিকভাবে বলল কায়েদ।
‘তার মানে খেতে পারি।’
‘হুঁ। খেতে পারো। তবে খালি পেটে বেশি খেলে কিন্তু পেট ব্যথা করবে।’
‘ও নিয়ে তুমি ভেবো না।’
আজব পোশাকের ভিনগ্রহের প্রাণী আগের সেই ভাড়টা ধরে আবারও ঢক ঢক করে রস পান করতে লাগলো। পেট ভরে পান করে খান্ত দিলো লোকটি।
দুই ভাড়ের কানাস ধরে উঁচু করে কায়েদ বলল, ‘তুমি যাই হও এখন যাও। অনেক দেরি করে দিয়েছো তুমি আমার।’
কায়েদের কথার কোনো তোয়াক্কা না করে আজব লোকটি বলল, ‘সত্যি খেজুরের রসের তুলনা হয় না। তা ছোট্ট বাবু, তুমি বাকি দুই ভাড় নিবে কী করে?’
‘কেন প্রথমে এই দুই ভাড় একটু সামনে রেখে আসবো তার পর ঐ দুই ভাড় এসে নিয়ে আর একটু সামনে রাখবো পরে আবার এই দুই ভাড় নিয়ে আর একটু সামনে রাখবো। এসে আবার ঐ দুই ভাড় নেব। এভাবে আমি চার ভাড় রস বাড়ি নিয়ে যাব।’
‘ছোট হলে কী হবে তোমার বুদ্ধি আছে। উঁ, আমি যদি তোমাকে এই দুই ভাড় নিতে সহযোগিতা করি তবে তুমি কি রাগ করবে?’
‘দেখ তুমি কিন্তু অনুমতি ছাড়া প্রথমেই রস খেয়েছো। কিছু বলনি। আর সাহায্য করতে চাও করতে পারো।’
কায়েদ আগে আগে রসের ভাড় নিয়ে হাঁটা ধরে আর পিছে আজব মানুষ আসতে থাকে।
খেজুর বাগান খেকে রাস্তার উপরে উঠতেই লোকটি বলে ওঠে, ‘ছোট্ট বাবু শোন, আমি যদি তোমার এই দুই ভাড় রস নিতে চাই তুমি কি আমাকে দেবে?’
কায়েদ থমকে দাঁড়িয়ে ফিছে ঘুরে দেখে লোকটা হাওয়া। দূরে বড় জাম গাছের ওখানে একটা আলোর ঝলকানি আকাশের দিকে উঠে যায়। ঠিক তখনি সূর্যমামা উঁকি মারে পুব আকাশে। ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় কায়েদ। আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে রসের ভাড় হাতে দাঁড়িয়ে।
‘কিগো দাদাভাই, আজ এতা দেরি কেন? আর ওভাবে দাঁড়িয়ে বুঝি সুর্য ওঠা দেখছো?’
চমকে ওঠে কায়েদ। হাত থেকে রসে ভরা ভাড় পড়ে যাচ্ছিল। সামলে উঠে উল্টা ঘুরে দেখে দাদী ওর খোঁজে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে।
দাদী আবার বলে ওঠে, ‘কী হলো দাদাভাই, আজ দেরি হলো কেন?’
‘এমনি।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর কায়েদের।
‘তোমার রস কি আজ দু’ভাড়ই?’
‘না, চার ভাড় হয়েছিলো। একজনকে দুই ভাড় দিয়ে দিয়েছি।’
‘হুঁ। এক্ষেত্রে উদার হওয়া ভালো। তবে উপযুক্ত প্রার্থীকে না দিলে সেটা কিন্তু ঠিক নয়।’
‘দাদী আমার মনে হয় ভিনগ্রহের ঐ আজব ব্যক্তিই উপযুক্ত প্রার্থী।’
‘মানে?’ জানতে চান দাদী।
‘না, কিছু না। এক লোককে দিয়েছি দুই ভাড়।’ দাদীকে বললে বিশ্বাস করবে কিনা জানে না কায়েদ। তাই চেপে গেল ঘটে যাওয়া সমস্ত বিষয়। ‘চল বাড়ি চল।’
বাড়ির পথে হাঁটা ধরে কায়েদ ও তার দাদী। কায়েদের মনে তখন চিন্তার ঝড় বইছে। সত্যি কি লোকটি ভিনগ্রহ থেকে এসেছে? ভিন গ্রহে কি কোনো খেজুর গাছ নেই? নাকি অন্য কিছু? যায় হোক। একজন মানুষ পান করতে চেয়েছিলো ও পান করিয়েছে। নিতে চেয়েছিলো ও সঙ্গে দিয়ে দিয়েছে দুইভাড় খেজুরের রস।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply