Home তোমাদের গল্প মোবাইল

মোবাইল

নাহিদ জিবরান

Nahidআমার একটা মোবাইল ফোন থাকতো তাহলে আমি সবার সাথে কথা বলতে পারতাম। কিন্তু এখন কে আমাকে মোবাইল কিনে দিবে?
সেদিন গ্রামের বাড়িতে যাবার পর একটা ছেলে এসে একটা মোবাইল সেট দেখিয়ে বললো, এই মোবাইলটি বিক্রি করবো, নিবা নাকি?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কত!
সে বললো, বাইশশো টাকা। না না, দুই হাজার টাকা দিলে হবে।
আমি তখন খেলার মাঠে ছিলাম। এই কথা শোনার পর ঘোড়ার মত ছুট লাগালাম বাড়ির দিকে। ছোট চাচার কাছে হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে বললাম, বাবু, বাবু একজন মোবাইল সেট বিক্রি করবে, আমাকে কিনে দেননা একটা মোবাইল।
এই কথা শুনে আর আমাকে ওভাবে হাঁফাতে দেখে বাবু হেসে বললেন, কত টাকা?
বললাম, দুই হাজার টাকা।
বাবু বললেন, আটশো টাকায় দেয় কিনা দেখতো?
ধুর! আটশো টাকায় দেবে নাকি?
বাবু বললেন, কী সেট?
বললাম, ক্যামেরা সেট।
বাবু আবার একটু হেসে বললেন, পুরোনো মোবাইল না কিনে তোমার আব্বুকে বললে নতুন মোবাইল কিনে দেবে।
আমি বললাম, আব্বুজান আমাকে কিনে দেবে না। বিশ্বাস না হলে আপনি ফোন করেন।
বাবু এবার জিজ্ঞেস করলেন, এখন ক’টা বাজে।
সকাল দশটা। বললাম আমি।
সেকি! দশটা বাজে? চলো মাঠে চলো। একটু খেলে আসি।
আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম, আপনি যান, আমি যাব না।
কেন যাবি না?
আপনি আব্বুজানের সাথে আগে কথা বলেন, তারপর যাবো।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি ফোন করবো এবার চলো।
আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললাম, চলেন খেলতে যাই।
মোবাইলের জন্য রীতিমতো পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। তারপরও আনন্দটাকে চেপে রেখে খেললাম। কিন্তু খেলার দিকে আর মন থাকতে চাইলো না। শুধু মনে হচ্ছে বাবু কখন ফোন করবেন। আর কখন আমি মোবাইল পাবো।
খেলা শেষ হলো। দুপুর বেলা গোসল করে খেতে ডাকলেন বাবু। আমি বললাম, ফোন করেছেন?
বাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, এই দুপুরে কি ফোন করা যায়! রাতে ফোন দেবো কেমন।
আমার মনটা কেমন যেন করছিলো। খাওয়া-দাওয়া করে দোকানের দিকে গেলাম একটা খাতা কিনতে। খাতাও কিনে আনলাম। আমার চাচাতো ছোট ভাইটা জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া, খাতা দিয়ে কী করবেন?
আমি বললাম, আর কী করবো, গল্প লিখবো।
বিকাল বেলা ছোট ফুফুর সাথে পুকুর পাড়ে বসে আছি। ঠিক তখনই আব্বু ফুফুকে ফোন দিলেন। ফুফুকে বলে রাখলাম আমি আব্বুজানের সাথে কথা বলবো। তারপর আব্বুজানকে বললাম মোবাইল সেটটার কথা। আব্বুজান বললেন, বাবা পুরনো সেট দিয়ে কী হবে? তার চেয়ে তুমি ঢাকায় আসো তারপর দেখা যাবে।
আমি তো হাল ছাড়তে নারাজ! কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। মোবাইল সেট দেয়াই লাগবে।
গভীর রাত! চোখে ঘুম আসছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল মোবাইল কি পাবো, না পাবো না। মন বলছিল পাবো না। কিন্তু আমি হাল ছাড়বো না। দেখি কতদূর এগোয়।
সকাল বেলায় ঘুম ভাঙলো। বাবুকে অনুরোধ করলাম, আব্বুকে একটু বুঝিয়ে বলেন না!
বাবু বললেন, দেখা যাক কী হয়।
এরপর প্রতি রাতেই শুয়ে শুয়ে মোবাইলের ঘটনা লিখতাম। পুরো খাতাটাই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু মন আর স্থির হলো না। আমি ফুফুকে বললাম, চলেন ফুফু ঢাকায় যাই।
ফুফু বললেন, কেন, আর ভালো লাগছে না?
বললাম, না।
আর দু-একদিন থাকলে হয় না?
না হয় না।
অগত্যা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
ক্লান্তিতে আমার ঘুম আসছিলো, ঠিক তখনই ফুফু আমার সেই খাতাটা আব্বুজানকে দেখালো। আব্বুজান দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। আম্মু আব্বুজানকে বললেন, আপনি তো বলেছিলেন ঢাকায় আসলে কোন মতে বুঝালেই হবে। এখন দেখছেন তো কী অবস্থা?
পরের দিন সন্ধ্যায় আমাকে সাথে নিয়ে আব্বুজান মোবাইলের দোকানে ঢুকলেন। তখন আমি খুশিতে আত্মহারা। আমি একটা মোবাইল সেট পছন্দ করলাম। আব্বুজান কিনেও দিলেন।
তারপর পরিচিত প্রায় সবাইকে ফোন করে আমার খুশির খবরটা দিয়ে দিলাম।
বাবুকে ফোন করে জানালাম, বাবু, আব্বুজান আমাকে ফোন কিনে দিয়েছেন।
বাবু বললেন, এখন খুশিতো!
বললাম, হ্যাঁ, অনেক খুশি।
মোবাইল সেটটি নিয়ে আমি আবার ফুফুর সাথে বাড়িতে গেলাম। সবাইকে দেখালাম। সবাই দেখে বললো, অনেক সুন্দর হয়েছে।
মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে আমার অনেক মজা লাগে। কিন্তু আবার ভয়ও হয়। কেউ যদি মোবাইলটি নিয়ে যায় তাহলে তো কাজ সারা! এইতো এখন মোবাইলের ছড়াছড়ি। যে ছেলে এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তার হাতেও এখন মোবাইল ফোন দেখা যায়। কিন্তু আমি যখন কিনেছিলাম তখন ফোনের এত ছড়াছড়ি ছিলো না।
বর্তমানে মোবাইল ফোন না হলেই নয়। সব মানুষের হাতেই মোবাইল ফোন দেখা যায়। এমনকি, ছোট ছোট ছেলেদের কাছেও থাকে। আর এখনতো মোবাইলে অনেক সুযোগ-সুবিধাও আছে। বলতে গেলে এখনতো মোবাইলেরই যুগ। মোবাইল ছাড়া যেন কারোর একটুও চলে না।
মোবাইল ছাড়া জীবন চলা যেন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে মোবাইল সতর্কতার সাথে, একান্ত প্রয়োজনে ব্যবহার করা উচিত। যেমন আব্বু আমাকে প্রায়ই বলে থাকেন।

SHARE

Leave a Reply