Home খেলার চমক ক্রিকেটের অদ্ভুত আউটগুলো

ক্রিকেটের অদ্ভুত আউটগুলো

রাফিউল ইসলাম

Outইনজামামের অদ্ভুত সেই আউট। ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পায়ের ধাক্কায় ফেলে দিয়েছিলেন স্টাম্পের বেল। ফাইল ছবিপিঠে বল লাগার অপরাধে কেউ আউট হতে পারে? সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা-পাকিস্তান সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে যারা দেখেছেন, তাদের কারও কারও মনে এই প্রশ্নটি উঠতেই পারে। যখন দক্ষিণ আফ্রিকান এক ফিল্ডারের থ্রো আনোয়ার আলীর পিঠে লাগার পর প্রোটিয়াদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আউট দিয়ে দিয়েছেন আম্পায়ার। বেচারা আনোয়ার, ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নেমেই এমন এক আউটের শিকার হলেন, ওয়ানডে ইতিহাসে যে আউটটি তাঁর আগে হয়েছেন মাত্র চারজন! যে আউটের নাম অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ড।
ঘুরেফিরে আমরা সাধারণত পাঁচ-ছয় ধরনের আউটই দেখে থাকিÑ ক্যাচ, বোল্ড, এলবিডব্লু, রান আউট এবং স্টাম্পিং। হিট উইকেটও এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে ক্রিকেটে খুব বিরল কিছু আউটের নজিরও আছে। অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ডের মতো আছে হ্যান্ডল দ্য বল, টাইম আউট এবং হিট দ্য বল টোয়াইস। ক্রিকেট আইনে আউটের মোট সংখ্যা ১০টি। তবে রিটায়ার্ড আউট নামে আরেকটি আউটের কথা ক্রিকেট আইনে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়।

রিটায়ার্ড আউট
ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে বেশ কিছু নজির থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই আউটের ঘটনা ঘটেছে কেবল দুবার। একই ম্যাচে ঘটা এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী বাংলাদেশ। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে অন্য ব্যাটসম্যানদের ‘ব্যাটিং প্র্যাকটিস’ করার সুযোগ করে দিতেই যেন মারভান আতাপাত্তু ২০১ রান এবং মাহেলা জয়বর্ধনে ১৫০ রান করে রিটায়ার্ড আউট নিয়ে স্বেচ্ছায় সাজঘরে ফিরে যান। পরে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য যা নিয়ে বেশ সমালোচনাও হয়। কেননা, এই ধরনের ছেলেমানুষি সাধারণত দেখা যায় প্রস্তুতি ম্যাচ বা প্রীতি ম্যাচে। এই কৃতিত্বও কোনো বলারের প্রাপ্য নয়। এই আউট ক্রিকেট ম্যাচের চেয়ে ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং গড়ের হিসাব কষতেই বেশি প্রাসঙ্গিক।
ক্রিকেট আইনের ২.৯(বি) অনুযায়ী কোনো ব্যাটসম্যান আঘাতজনিত বা অন্য কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া যদি তাঁর ব্যাটিংয়ে অব্যাহতি চান, তবে তাকে রিটায়ার্ড আউট ঘোষণা করা হয়। তবে ১৯৮৩ সালে গর্ডন গ্রিনিজ ১৫৪ রানে রিটায়ার্ড আউট নিয়ে তার অসুস্থ মেয়েকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। দুদিন পর তার মেয়ে মারা যায়। পরে এই রিটায়ার্ড আউটকে রিটায়ার্ড নট আউট ঘোষণা করা হয়। তিনিই রিটায়ার্ড নট আউট একমাত্র ব্যাটসম্যান।

টাইম আউট
যদি একজন ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পর পরবর্তী ব্যাটসম্যান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রিজে পৌঁছাতে না পারেন, তবে তাকে টাইম আউট ঘোষণা করা হয়। ক্রিকেট আইনের ৩১তম ধারায় এই আউট সন্নিবেশিত আছে। এই ‘নির্ধারিত সময়’ পূর্বে দুই মিনিট থাকলেও বর্তমানে তা তিন মিনিট করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন পর্যন্ত এই আউটের সাক্ষী না হতে পারলেও ফার্স্টক্লাস ম্যাচে টাইম আউটের চারটি ঘটনা নথিবদ্ধ আছে। আগের দিন নট আউট থেকে পরের দিন ব্যাটিংয়ে নামার জন্য মাঠে আসতে নানা কারণে দেরি হওয়া বা ব্যাটিংয়ে নামতে তত্পর না হয়ে বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথোপকথনে বেশি মনোযোগী হওয়াÑ এসব কারণে এই চারটি আউট দেওয়া হয়েছে।
হ্যান্ডল দ্য বল
ক্রিকেট আইনের ৩৩ ধারা অনুসারে কোনো ব্যাটসম্যান ফিল্ডিং দলের অনুমতি ব্যতীত ব্যাট ছাড়া কেবল হাত দিয়ে বল স্পর্শ করে বা ধরে ফিল্ডারের কাছে ফেরত পাঠান, তবে ফিল্ডিং দলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে যে আউট ঘোষণা করা হয় তা-ই হ্যান্ডল দ্য বল আউট। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা হরহামেশাই ব্যাটসম্যানকে দেখি হাতে ধরে ফিল্ডার বা বোলারকে বল ফেরত পাঠাতে। এসব ক্ষেত্রে আউটের আবেদন জানায় না ফিল্ডিং দল। তবে বল ব্যাটে লেগে স্টাম্পের দিকে যাওয়ার পথে পা বা ব্যাটের বদলে হাত দিয়ে বলের গতি রোধ বা দিক পরিবর্তন করা হলে অবশ্যই আবেদন করেন ফিল্ডাররা। এই উইকেটের কৃতিত্ব রান আউটের মতো বোলারকে দেওয়া হয় না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে হ্যান্ডল দ্য বল আউট হওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা আছে কেবল নয়জন ব্যাটসম্যানের। একুশ শতকের ক্রিকেটে এমন ঘটনা দেখা গেছে মাত্র দুবার। টেস্টে এই ঘটনা ঘটেছে সাতবার। প্রথমটি ১৯৫৭ সালে এবং সর্বশেষটি ২০০১ সালে। সর্বশেষ দুই ব্যাটসম্যান হলেন স্টিভ ওয়াহ এবং মাইকেল ভন। ওয়াহ-ভন ছাড়াও এই দলে আরও আছেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্ড্রু হিলডিচ, ইংল্যান্ডের গ্রাহাম গুচ, দক্ষিণ আফ্রিকার রাসেল এনডিন ও ড্যারেল কালিনান, পাকিস্তানের মোহসিন খান, ভারতের মহিন্দর অমরনাথ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডেসমন্ড হেইনস।

হিট দ্য বল টোয়াইস
কোনো ব্যাটসম্যান যদি একাধিকবার শরীর বা ব্যাট দিয়ে বলকে আঘাত করেন, তাহলে তিনি হিট দ্য বল টোয়াইস আউট বলে বিবেচ্য হবেন। এখানে প্রথম শটটিকে প্রকৃত খেলার জন্য এবং দ্বিতীয় শটটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য করা হয়েছে বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত অবশ্য এই আউট হওয়ার ‘সৌভাগ্য’ কারও হয়নি।

হিট উইকেট
ব্যাটসম্যান তাঁর ব্যাট, ক্যাপ, হেলমেট বা অন্য কোনো ব্যবহার্য কিংবা শরীরের কোনো অঙ্গ দিয়ে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করে স্টাম্পের বেল ফেলে দিলে তাকে হিট উইকেট বলে।
২০০২ সালের ১৮ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান ম্যাচে জাস্টিন অনটংয়ের একটা বলে ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ইনজামাম ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পায়ের ধাক্কায় স্টাম্পের বেল ফেলে দিয়েছিলেন। ছয় রানের বদলে তাকে ধরতে হলো প্যাভিলিয়নের পথ!
অনেক সময়ই হিট উইকেট ট্র্যাজেডির চেয়েও যেন বেশি কমেডি। হিট আউট হয়ে ব্যাটসম্যান অনেক সময়ই সমর্থকদের বেদনার সঙ্গে কিছু আনন্দও দিয়ে যান। মন্টি পানেসারের বলে ইনজামামেরই হিট উইকেট বা অ্যামব্রোসের বলে স্যার ইয়ান বোথামের হিট উইকেটের মজার ভিডিওগুলো চাইলে ইউটিউব থেকে দেখে নিতে পারেন।

অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ড
ক্রিকেটের ৩৭তম আইন অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ড। কোনো ক্রিকেটার কথা বা কাজের দ্বারা ফিল্ডারদের কাজে বাধা সৃষ্টি করলে তাকে অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ডের দোষে আউট দেওয়া হতে পারে। ফিল্ডার ক্যাচ নেওয়ার সময়, রান আউট করার সময় বা বল থ্রো করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ফিল্ডারকে বাধা দিলে এই আউট হতে পারেন ব্যাটসম্যান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই আউটের সংখ্যা সাকল্যে ছয়টি। এর মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে একবার এবং এক দিনের সীমিত ওভার ম্যাচে দেখা গেছে পাঁচবার।
প্রথম আউটটি দেখা গিয়েছিল ১৯৫১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ড টেস্টে। আউট হয়েছিলেন লেন হাটন। হাটন ব্যাটের গুঁতোয় উইকেটকিপার রাসেল এনডিনকে একটি ক্যাচ নেয়া থেকে বঞ্চিত করার দায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে এই আউট হয়েছিলেন। দৈবক্রমে রাসেল এনডিনও এ রকম বিরল এক আউটের প্রথম শিকার। তিনি হ্যান্ডল দ্য বল হওয়া প্রথম ব্যাটসম্যান!
ওয়ানডেতে যে পাঁচবার এই আউটের শিকার হয়েছেন ব্যাটসম্যানরা, এর চারবারই ছিলেন পাকিস্তানের কোনো না-কোনো ব্যাটসম্যান! এই আউট হওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানিদের যে ‘প্রীতি’, সেটাই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে অটুট রেখেছেন আনোয়ার!

SHARE

Leave a Reply