Home ভ্রমণ সঞ্চিত হয়েছে বিপুল শিক্ষা

সঞ্চিত হয়েছে বিপুল শিক্ষা

মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্।

Vromonবিশাল বিচিত্র এ পৃথিবী। কত না তার রূপ, কত তার ঐশ্বর্য। দিকে দিকে ছড়িয়ে আছে কত অরণ্য-সমুদ্র-মরু-পর্বত। কত পশু-পাখি, জীবজন্তু, নিসর্গ প্রকৃতির কত অফুরান বৈভব। এর কতটুকুইবা দেখা হয় আমাদের চর্মচক্ষে? রুজি-রুটির অন্বেষায় কর্মক্লান্ত মানুষের অন্তরও একসময় হাহাকার করে ওঠে। সে প্রত্যক্ষ করতে চায় বিপুলা বিশ্ব।
অন্তরের এ হাহাকার নিবারণের জন্যই যেন প্রতি বছর চট্টগ্রাম সংস্কৃতিকেন্দ্র তার সদস্যদের নিয়ে বার্ষিক আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করে। সভাপতি আমীরুল ইসলাম ও সচিব ইকবাল করিম রিপনের আনন্দ বনভোজনের আমন্ত্রণপত্র পেয়ে কালবিলম্ব না করে সপরিবারে নাম নিবন্ধন করেছি। অবশ্য ভ্রমণের স্থান মেরিন অ্যাকাডেমি হওয়াতে তা আমাকে বেশ টেনেছে। কারণ আশির দশকের মাঝামাঝি আমার বড় শ্যালক ক্যাপ্টেন মহসিন চৌধুরী মেরিন অ্যাকাডেমিতে অধ্যয়ন করতো। তাকে দেখার জন্য বহুবার আমি মেরিন অ্যাকাডেমিতে গিয়েছি। আমার চেনা দুই যুগ আগের মেরিন অ্যাকাডেমির কী হাল তা নিজে দেখা এবং আমার পুত্র-কন্যা ও স্ত্রীকে দেখানো এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

গাড়ি নির্দয়ভাবে ছেড়ে যাবে
৩০ জানুয়ারি ২০১০ ভ্রমণ সূচিতে আমাদের সময়জ্ঞান সম্বন্ধে সচেতনতার লক্ষ্যেই স্পষ্টাক্ষরে লিখে দেয়া হয়েছিল ‘গাড়ি নির্দয়ভাবে ছেড়ে যাবে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে।’ যা আমার পরিবারের সদস্যদের হাসির খোরাক হয়েছিল। কারণ আমাদের সমাজে নির্ধারিত সময় রক্ষা করা প্রায় ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে ওঠে না। নাবিলার আম্মা তো যেন নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আমাদের নিয়ে সকাল সোয়া ৮টায় প্যারেড কর্নারে দণ্ডায়মান নির্দিষ্ট বাসে গিয়ে ওঠেন। যদিও বাস ‘দয়া করে সকাল ৯টায় ছেড়েছে!’

কথাবন্ধু মোসতাক খন্দকার
৩ নম্বর বাসের গাইড বিশিষ্ট আবৃত্তিকার, প্রশিক্ষক ও আইআইইউসির কর্মকর্তা মোসতাক খন্দকার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মিষ্টিমধুর কথা দিয়ে সারাদিন আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। তার প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আমাদেরকে ভ্রমণক্লান্তি একটুও স্পর্শ করতে দেয়নি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে গায়ক ও গিটারবাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ, কাজী মাহফুজুল হক ও মুহাম্মদ নাসির উদ্দীন; সর্বোপরি উপস্থাপনায় মোগল, বিশিষ্ট গীতিকার ও গায়ক, আইআইইউসির কর্মকর্তা চৌধুরী গোলাম মাওলার নাম প্রীতি ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাদের সুর ও ছন্দের মূর্ছনা আমাদের হৃদয়কে কানায় কানায় ভরিয়ে দিয়েছে।

বনভোজনে মা
মোসতাক খন্দকার অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিচিতি পর্বটি পরিচালনা করেন। তিনি শুধু সংস্কৃতিকেন্দ্রের সদস্যদের পরিচিতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তাদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের গুণাগুণ বর্ণনাসহ পরিচিতি পর্ব সম্পন্ন করেন। তার একমাত্র শিশুপুত্রের পরিচিতি প্রদানও ছিল আনন্দের।
প্রায় সব সদস্যই স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের ভ্রমণ সাথী করেছেন। তরুণ শিল্পী মুহাম্মদ নাসির উদ্দীনকে পরিচয় করে দেয়ার সময় আমরা সবাই জানতে পারলাম নাসির এ আনন্দ ভ্রমণে তার শ্রদ্ধেয়া আম্মাকে সাথী করেছে। অন্যরা যখন সপরিবারে সফর করছেন তখন সিঙ্গল পারসন নাসির কেন বাদ যাবে? তার প্রকৃত সফরসঙ্গী গর্ভধারিণী জননী। সত্যি চমৎকার সিদ্ধান্ত। বিদায়ের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত নাসিরের আম্মাকে আমরা সম্মানের চোখে রেখেছি। মাতৃভক্তিতে নাসির একদিন বড় কিছু হবে। ধন্যবাদ শিল্পী নাসিরকে।

মেরিন অ্যাকাডেমির সুন্দর সবুজ চত্বরে
আমার চেনা মেরিন অ্যাকাডেমি আগের চেয়ে আরও প্রশস্ত আরও সুন্দর হয়েছে। বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয় জ্ঞান-গরিমায়। অত্যাধুনিক সুইমিংপুল, অ্যাকাডেমিক ভবন, লাইব্রেরি, ছাত্রাবাস, প্রশাসনিক ভবন, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, নটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট, মসজিদ, সিনিয়র ক্যাডেট স্টাফ হোস্টেল; এমনকি মেরিন অ্যাকাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজও সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ষাটের দশকে নৌপরিচালন বিদ্যা হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানে এটি সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। করাচিতে হয়েছে তারও অনেক পরে। অবিভক্ত ভারতে শুধুমাত্র বোম্বাইতে মেরিন অ্যাকাডেমি ছিল। শুধু বাংলাদেশী নয়, বিদেশী ছাত্ররাও এখান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। দেশী-বিদেশী অনেক অভিজ্ঞ ইনস্ট্রাক্টর আছেন যাঁরা ক্যাডেটদের শিক্ষা দেন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় যখন আমরা মেরিন অ্যাকাডেমিতে পৌঁছি তখন এর সব বিভাগ বন্ধ। পাহাড়, টিলা আর সবুজ মাঠ পরিবেষ্টিত মেরিন অ্যাকাডেমিকে খুবই প্রশান্ত দেখাচ্ছিল। বন-বনানীতে, পাখ-পাখালির কলতান ছাড়া অন্য কোনো শব্দই কানে আসেনি। মাঝ নদী পর্যন্ত প্রলম্বিত মেরিন অ্যাকাডেমির নিজস্ব জেটিটি আমাদের খুবই টানছিল। আমাদের ছেলেমেয়েরা গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দ উচ্ছলতায় ক্ষণিকের জন্য নিজেদের যেন হারিয়ে ফেলেছিল। সুদীর্ঘ জেটি ব্রিজ, সবুজ চত্বর আর উঁচু-নিচু টিলায় দৌড়ঝাঁপ দিয়ে সমুদ্র আর কর্ণফুলীর নির্মল বায়ু সেবন করে নিজেদের সতেজ করেছে। আমরাও কম যাইনি। তাদের চোখে চোখে রাখতে হয়েছে সর্বক্ষণ।

সাফল্যের স্বর্ণদুয়ার
বন-বনানী পরিবেষ্টিত মেরিন অ্যাকাডেমি ক্যাম্পাস সদলবলে ঘুরে দেখার আগে আমরা সবাই মিলিত হয়েছিলাম সিনিয়র ক্যাডেট স্টাফ মেস চত্বরে। সংস্কৃতিকেন্দ্রের সদস্যদের ও তাদের সন্তানদের কবিতা-গানে মুখরিত স্বল্প সময় পরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেন সভাপতি আমীরুল ইসলাম। বনভোজন যে প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষারও একটি চমৎকার বাহন হতে পারে চট্টগ্রাম সংস্কৃতিকেন্দ্র তা প্রমাণ করলো। ৫ গাড়ি সদস্য ও তাদের পোষ্যদের সামনে আমীর ভাই উপস্থাপন করলেন মেরিন অ্যাকাডেমির ইংরেজির অধ্যাপিকা জিনাত আরাকে। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় মেরিন অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্বন্ধে আমাদের জানালেন। তুলনামূলকভাবে বুঝিয়ে বললেন, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নের চাইতে মেরিন অ্যাকাডেমির পাঠগ্রহণ শ্রেষ্ঠ কেন; জানালেন এখানকার একটি সনদ কেন একজন সফল শিক্ষার্থীর জীবনে সাফল্যের স্বর্ণ দুয়ার খুলে দেয়।
তিনি বললেন, ‘এ দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরও অনেককে বেকার বসে থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের ৪-৫ বছর আর বেকারত্বের ২-৩ বছরসহ কর্মজীবনের জন্য নির্দিষ্ট বিপুল সময় ও অর্থ বিনষ্ট হয়। অথচ মেরিন অ্যাকাডেমি হতে মাত্র দু’বছরে সাফল্যের সাথে কোনো ক্যাডেট পাস করতে পারলেই দেশে-বিদেশে তার চাকরি সুনিশ্চিত। আমাদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারগণ যখন দেশী টাকায় সামান্য বেতন পান তখন মেরিন অ্যাকাডেমি হতে পাস করে ছাত্ররা স্বর্ণমুদ্রাসম ডলার-পাউন্ড আয় করে। এ ছাত্রদের হাতের তালুতে গোটা বিশ্ব। তারা শুধু একজন চাকুরে নয়, জাতীয় পতাকাধারী বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের এক একজন দূত।’

আহা আজি কী আনন্দ আকাশে বাতাসে
জুমার নামাজ ও খাবার শেষে শুরু হয় সাংস্কৃিতক অনুষ্ঠান।
এখানে বলে রাখা ভালো জুমার নামাজ চলাকালীন দু’টি আলাদা কক্ষে মেয়েদের জোহর নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। নামাজের পর পরই মহিলা ও শিশুদের খাবার দেয়া হয়। পুরুষরা জুমার নামাজ পড়ে আসার আগেই তারা শান্তি ও স্বস্তির সাথে খাদ্য গ্রহণ করেন।
আমরা নামাজ পড়েই খাবার ঘরে গিয়েছিলাম। বনভোজন তো বনেই মানায় কিন্তু এবারের সফরে ভোজনের আয়োজন করা হয়েছে সিনিয়র ক্যাডেট স্টাফ ডাইনিং হলে। পঞ্চ তরকারিতে রসনা ব্যঞ্জন। সুসজ্জিত চেয়ার-টেবিলে জামাই আদরে খানা। মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী, মাহবুবুল মাওলা রিপন, মামুন ইলাহী, মাহাফুজুল হক চৌধুরী, আবু জাফর আলম ও সুলতান মাহমুদ ইয়াছিনদের খাদ্য পরিবেশনা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। অন্য বনভোজনে খাবার নিয়ে যখন নানা হৈ-হল্লা, অনুযোগ, অভিযোগ সেখানে চট্টগ্রাম সংস্কৃতিকেন্দ্রের ব্যবস্থা ছিল খুবই সুশৃঙ্খল ও পরিশীলিত। ভ্রমণের জন্য বাসে ওঠার পর থেকে বাসায় ফেরার আগ পর্যন্ত চা-নাশতা-পানি পানের কোনো ত্রুটি হয়নি। এত খাবার, ফল-ফ্রুট সরবরাহ করা হয়েছে যে, না খেতে পেরে অবশিষ্টাংশ কারো কারো বাসায়ও পৌঁছেছে।
বলছিলাম সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার কথা; সংস্কৃতিকর্মী জয়নুল আবেদীনের উপস্থাপনায় এবং অভিনেতা ও চিত্রনির্মাতা কাজী ইসমাঈলের কৌতুক; ব্যাংকার মঞ্জুর আহমদ মঞ্জুর নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার কৌতুক, জয়নুলের চাটগাঁর কৌতুক আমাদের হাসিয়ে পেটের ভাত হজম করেছে। আর মন ভরিয়ে দিয়েছে আবদুল্লাহ আল মাসউদ, কাজী মাহফুজুল হক, যুবায়ের হোসাইন ভুঁইয়া, নাসির উদ্দিন, ইকবাল চৌধুরী ও মুহাম্মদ জামালুদ্দীনের গানে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০ আমাদের জীবনের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এ আনন্দ ভ্রমণ সত্যি আমাদের আনন্দ দিয়েছে। আমাদের পুত্র-কন্যাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সঞ্চিত হয়েছে বিপুল শিক্ষা।

SHARE

Leave a Reply