Home বিশেষ রচনা আমাদের প্রিয় নবী

আমাদের প্রিয় নবী

নসির হেলাল।

nadiআজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। আরব দেশ। চারদিকে বালু আর বালু। মাঠের পর মাঠ বিরান মরুভূমি, ধু ধু প্রান্তর। সুবজ-শ্যামলিমা তো দূরের কথা মাঝে মাঝে দুই একটি খেজুর আর বাবলা গাছ ছাড়া অন্য কোনো গাছ নেই। এরই মাঝে মক্কা শহর। পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন শহর। আরবের সর্বশ্রেষ্ট বংশ কুরাইশ বংশ এই মক্কা শহরেরই বাসিন্দা। আবদুল মুত্তালিব কুরাইশ সরদার। মানে মক্কা এমনকি আরবের শাসনকর্তা। তারই ছোট ছেলে আবদুল্লাহ হঠাৎ করেই মাসছয়েক আগে ইন্তেকাল করছেন। এই আবদুল্লাহর বিধবা স্ত্রী আমেনা ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউর আউয়াল সুবহে সাদিকের সময় একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। দাদা আবদুল মুত্তালিব খুশি হয়ে নাম রাখেন মুহাম্মদ। অভিনব নাম। আরবের এমন নাম এই প্রথম।
এই মুহাম্মদই হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম। আরবের নিয়মানুযায়ী মুহাম্মদ (সা)-কে মক্কা শহরের পার্শ্ববর্তী এক বেদুঈন পল্লীতে হালিমা না¤œী এক ধাত্রীর দায়িত্বে দেয়া হলো। দুধমাতা হালিমা তাঁকে আপন সন্তানের মতো ৬ বছর লালন-পালন করার পর মা আমিনার কোলে ফেরত দিয়ে যান।
যুগে যুগে মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভুলে নানা রকম অসৎকাজ, পাপ কাজ ইত্যাদির মধ্যে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলতো তখনি মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর মহব্বতের সৃষ্টি, সখের সৃষ্টিকে সঠিক পথে, সোজা সরল পথে আনার জন্য নবী এবং  রাসূল পাঠাতেন। আমাদের প্রিয় হযরত মুহাম্মদ (সা)-কেও আল্লাহ একই উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন।
এখানে একটা কথা মনে রাখা জরুরি যে, অন্য নবী-রাসূলদের পাঠানো হয়েছিল তাদের স্ব স্ব জাতি বা এলাকার জন্য। কিন্তু রাসূল (সা)-কে পাঠানো হয়েছে দুনিয়া তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য। কারণ তাঁর পরে আর কোনো নবী-রাসূলের আগমন ঘটবে না। তিনিই শেষ নবী ও রাসূল।
প্রিয় নবী (সা)-এর জন্মের সময সমগ্র আরবের সামাজিক অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, ইতিহাসে ওই সময়টি আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। এ সময় মানুষ পশুর চেয়েও নি¤œস্তরে নেমে গিয়েছিল। সামান্য কারণে তারা খুনাখুেিত মেতে উঠত। দুর্ভাগ্যবশত কোনো বিশেষ বংশের কেউ যদি খুন হতো তো বদলা নেয়ার জন্য বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এমনকি বংশ পরম্পরায় এর প্রতিশোধের চেষ্টা চলত। সামান্য ঘটনা ভয়াবহ যুদ্ধেরও জন্ম দিত। মেয়ে সন্তান জন্ম নিলে মান-সম্মানের ভয়ে পাষণ্ড পিতা ওই মেয়েকে জীবন্ত কবর দিতেও কুণ্ঠাবোধ করত না।
এ সময় আরবে দাস-ব্যবসা প্রচলিত ছিল। হাটবাজরে পশু-পাখির মতো মানুষ বিক্রি হতো। পরিশ্রম করাত। বেশির ভাগ লোকই ছিল মাতাল, গুণ্ডা, বদমাশ আর লম্পট প্রকৃতির। তারা প্রকাশ্যে মদের আদান প্রদান করত। এমনকি তারা উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করত। এমনি এক অসভ্য অমানবিক এবং অনৈতিক পরিবশে রাসূল (সা) বেড়ে উঠতে থাকেন। ছয় বছর বয়সে দুধ-মা হালিমা নবীজীকে মায়ের কাছে যখন ফিরিয়ে দিয়ে যান তখন মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদীনায় বেড়াতে যান। যদিও মদীনায় ছিল মা আমিনার বাপের বাড়ি, তবু আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বামী আবদুল্লাহর কবর জেয়ারত।
মদীনার সব কাজ ঠিকঠাক মতো সেরে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন মা আমিন। সঙ্গে শিশুপুত্র ও দাসী উম্মে আয়মন। কিন্তু তাঁর আর মক্কায় ফেরা হলো না। পথিমধ্যেই ইন্তেকাল করলেন মা আমিনা। আল্লাহর কী লীলা! যিনি হবেন নিখিল বিশ্বের রাসূল, সর্ব মানবতার কাণ্ডারীÑ সেই মানুষটির জন্মের ছয় মাস আগেই তাঁর পিতাকে তুলে নেয়া হলো, দুঃখিনী মা-ই ছিলেন একমাত্র অবলম্বন তাঁকেও মাত্র ছয় বছর বয়সে তুলে নেয়া হলো তাও আবার আত্মীয়-পরিজনহীন মরু প্রান্তরে। মাত্র একজন দাসীর আশ্রয়ে রেখে। উম্মে আয়মান পিতৃমাতৃহীন শিশুটিকে নিয়ে মক্কায় ফিরে দাদা আবদুল মুতালিবের দায়িত্বে দিলেন। দাদা ইয়াতিম নাতিকে খুব আদর-যতœ করতেন। কিন্তু বছর দুই পর তিনিও পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরকালে চলে গেলেন। এবার চাচা আবু তালিবের ওপর পড়ল মহানবীর (সা)-এর লালন-পালনের ভার।
আবু তালিব গরিব হলেও ভাতিজাকে খুবই স্নেহ করতেন। চাচার আদর-যতেœ মুহাম্মদ (সা) বেড়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর ব্যবহারে সবাই খুশি। কোনো কারণে কেউই তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট নয়। তাঁর মিষ্টি মিষ্টি কথায় যেন মধুর ঝরে। তাই তো যে-ই তাঁর  সোহবতে আসত সে-ই তাঁকে ভালোবাসত। তিনি খেলাধুলা না করে সব সময় কী যেন ভাবতেন। তিনি ভুলেও কখনো মিথ্যা বলতেন না। এ কারণে এক সময় তিনি আরবের ওই জাহেলী সামাজেই আল আমিন (বিশ্বাসী) উপাধিতে ভূষিত হন। এ সময় তাঁর নেতৃত্বে যুবকরা মিলে একটি সেবাসংঘ গঠন করেন, যার নামকরণ করা হয় ‘হলফ-উল-ফুযুল’। ফলে চারদিকে মেশকে আম্বারের মতো তার সুনাম যশ ছড়িয়ে পড়ে।
খাদিজা নাম্নী কুরাইশ বংশের এক ধনাঢ্য মহিলা ব্যবসায়িক কারণে একজন সৎ ও কর্মঠ লোক খোঁজ করছিলেন। ঠিক সে সময়ে তাঁর কানে মুহাম্মদ (সা)-এর সততা ও কর্মকুশলতার কথা পৌঁছলো। তিনি লোক মারফত মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে তাঁর ব্যবসায়ের ভার নেয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। মুহাম্মদ (সা)  কৈশোর বয়সেই চাচার সাথে দুই একবার বাণিজ্যে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। তাই এ প্রস্তাব পাওয়ার পর চাচার সাথে আলোচনা করে রাজি হয়ে গেলেন। সেবার বাণিজ্যে প্রভূত মুনাফা হলো। তাছাড়া খাদিজার ক্রীতদাস মায়সারা সে বাণিজ্য-সফরে রাসূল (সা)-এর সাথেই ছিলেন, তিনি এসে তাঁর চরিত্র, ব্যবহার ইত্যাদি সম্বন্ধে অত্যন্ত উঁচু ধারণা দিলেন। তাঁকে সবদিক বিবেচনা করে খাদিজা বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। চাচা আবু তালিব খাদিজা সম্বন্ধে আগে থেকেই জানতেন তাই এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন এবং ভাতিজাকে খাদিজার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
খাদিজা (রা) বিয়ের পর তাঁর সব অর্থসম্পদ স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। মুহাম্মদ (সা) তাঁর স্বভাব অনুযায়ী দুই হাতে সে অর্থবিত্ত গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে লাগলেন। এখন তাঁর কোনা অভাব নেই, কিন্তু তবুও তিনি সর্বদা কিসের যেন চিন্তা করেন।
চল্লিশ বছর বয়সে মুহ্ম্মাদ (সা) খুব বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন। চিন্তাশীল হয়ে গেলেন। মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে হেরা গুহায় মাঝে মাঝে গিয়ে রাত কাটাতে লাগলেন। নীরবে নিভৃতে রাতের অন্ধকারে তিনি ধ্যানমগ্ন হতেন। একদিন এই গুহাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল ফেরেশতার আগমন হলো। তিনি নবুয়্যত প্রাপ্ত হলেন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে নবীজীর কাছে প্রথম যে বাণী আসে তা ছিলÑ
“পড়! তোমার প্রভুর নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞানদান করেছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।”
নবুয়্যত প্রাপ্তির পর তিনি গোপনে গোপনে ইসলামের দাওয়াত আপন আত্মীয়-স্বজনের কাছে পেশ করতে লাগলেন। প্রথমেই ইসলাম কবুল করলেন বিবি খাদিজা (রা)। এরপর কিশোর আলী (রা) এরপর  হযরত আবু বকর (রা)। এমনিভাবে তিন বছরে ৪০ জন লোক মুসলমান হলেন। তার পরই আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু করেন মুহাম্মদ (সা)। ইসলাম প্রচারের শুরুতেই মুহাম্মদ (সা) বললেন, “আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। দেবদেবী মিথ্যা, তাদের পূজা করা মহাপাপ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বা উপাসনা করা যাবে না। অমি সেই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সবাই ঘোষণা করোÑ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”
রাসূল (সা)-এর এ ঘোষণা শুনে কুরাইশ বংশের নেতৃবৃন্দ ও মক্কার অন্যান্য গোত্রের লোক প্রচণ্ড ক্ষেপে গেল। কিন্তু যেহেতু মুহাম্মদ (সা)ও কুরাইশ বংশের সন্তান, আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আবু তালিরেব ভাতিজা তাই তারা প্রথম তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ইসলাম প্রচার থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করল। কিন্তু যখন দেখল তাঁকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, তখন নানা ধরনের লোভ দেখাতে লাগল। তারা বলল, হে মুহাম্মদ, তুমি কি আরবের নেতা হতে চাও? তুমি কি অনেক অনেক টাকা, সম্পদ চাও অথবা তুমি কি খুব সুন্দরী কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চাও? তুমি যা চাও আমরা তোমাকে সব দেবো। তবু তুমি তোমার ইসলাম প্রচার থেকে বন্ধ থাক। রাসূল (সা) তাদেরকে উত্তরে বললেন, “আমি কিছুই চাই না।  এমনকি এ সত্য ধর্ম প্রচার করা থেকে বিরত হবো না।”
এবার কুরাইশগণ আর বসে রইল না, তারা মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে দিল। পথে-ঘাটে, এখানে-সেখানেই ঠাট্টা বিদ্রƒপ করে, পথে কাঁটা বিছিয়ে  রাখে। কখনো কখনো মুহাম্মদ (সা)-কে একাকী নামাজ পড়তে দেখলে ময়লা-আবর্জনা, নাড়িভুঁড়ি ইত্যাদি মাথার ওপর ছুড়ে মারে, পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে টানতে থাকে। এমন কি তাদের আল আমিনকে তারা পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলেও মশকরা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। দিন দিন কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা এতই বাড়তে থাকল যে, মক্কাতে মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর শিষ্য বা সাহাবাদের তিষ্টানো কঠিন হয়ে পড়ল। ঠিক এ সময় মদীনা থেকে একদল লোক এসে মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে দেখা করলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। পরের বছর আরো একদল লোক মদীনা থেকে এসে রাসূল (সা)-এর সাথে দারুল নদওয়া নামক স্থানে গোপনে সাক্ষাৎ করে ইসলাম কবুল করলেন। আল্লাহর রাসূল (সা) দাওয়াত কবুল করলেন।
কী অভূতপূর্ব ঘটনা! যেখানে মক্কার কুরাইশগণ তাদেরইে বংশের, তাদের রক্তের সন্তান মুহাম্মদ (সা)-কে নবী হিসেবে বিশ্বাস করতে পারল না সেখানে সুদূর মদীনাবাসী তাঁকে শুধু বিশ্বাসই করল না, তাঁকে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে গেল। কুরাইশদের অজান্তেই ইসলাম মক্কার বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।
একে একে সাহাবাগণকে রাসূল (সা) মদীনায় পঠাতে লাগলেন। একদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সা)-এর ওপর নির্দেশ আসল মদীনায় হিজরত করার।
সাহাবীদের মদীনা গমনের বিষয়টি এক পর্যায়ে কুরাইশরা টের পেয়ে গেল। তারা বুঝতে পারে মুহাম্মদও হয়তো কবে না কবে মদীনা পড়ি জমায়। তখন তারা মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যাা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক রাতে তাঁর বাড়ি ঘিরে অবস্থান নিল। টার্গেট সকালে তাঁকে হত্যা করবে। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। তিনি জিবরাইল ফেরেশতাকে দিয়ে সেসব কিছুই রাসূল (সা)-কে জানিয়ে দিলেন এবং মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর হুকুম অনুয়ায়ী রাসূল (সা) হযরত আলীকে (রা) তাঁর বিছানায় শুইয়ে দিয়ে প্রিয় সহচর হযরত আবু বকরকে (রা) নিয়ে পা বাড়ালেন মদীনার দিকে। এদিকে, ভোর হয়ে গেলেও অন্যদিনের মতো মুহাম্মদ (সা)-কে বের হতে না দেখে কুরাইশ দুর্র্বৃত্তরা জোর করেই ঘরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু যা দেখল তাতে তাদের চক্ষু চড়কগাছ! বিস্মিত কুরাইশরা দেখল রাসূল (সা)-এর বিচানায় হযরত আলী (রা) নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছেন।
এ দৃশ্য দেখে রাগে কাঁপতে কাঁপতে কুরাইশরা হেঁচকা টানে হযরত আলীর গায়ের চাদর তুলে জিজ্ঞেস করল, বল, মুহাম্মদ কোথায়? আলী (রা) নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর দিলেন, খুঁজে দেখ না! আমি তাঁর কী জানি। ক্ষিপ্ত আবু জেহেল আলীর গালে একটা চড় বসিয়ে দলবলসহ বের হয়ে পড়ল।
মুহাম্মদ (সা) এবং আবু বকর (রা) সারারাত চলার পর ভোর হতে দেখে সওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন। পরদিন আবার সন্ধ্যার পর রওয়ানা হলেন। এমননিভাবে তিনদিন পর তাঁরা মদীনায় পৌঁছলেন। মদীনাবাসী অগেই খবর পেয়েছিলেন রাসূল (সা)-এর আগমনের। তাই তারা তাঁকে বিপুল আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে বরণ করলেন। ছোট্ট বাচ্চারা নেচে গেয়ে, দফ বাজিয়ে আল্লাহর রাসূলকে স্বাগত জানাল। এই যে, মক্কা থেকে রাসূল (সা) মদীনায় গেলেন এটাকেই হিজরত বলে। আর এই তারিখ থেকে আরম্ভ হয় হিজরী সন গণনা। মক্কার লোকেরা রাসূল (সা)-কে গ্রহণ না করলেও মদীনার লোকের তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে গ্রহণ করলেন। তারা কালেমা পড়ে মুসলমান হলেন। মক্কা থেকে আগত সাহাবীদেরকে মদীনার সাহাবীরা ভাই বলে গ্রহণ করলেন। তাঁদের সাহায্যের জন্য নিজেদের জমি-জমা, বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা ভাগ করে দিলেন। রাসূল (সা) খুশি হয়ে তাই মদীনার সাহাবীদের নাম দিলেন আনসার। আনসার মনে সাহায্যকারী।
মদীনার আনসার সাহাবীদের উদার সাহায্যে রাসূল (সা) বাস্তবে একটি ছোট্ট ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলেন। দিনদিন মুসলমানদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে লাগল। হাওয়ার বেগে সে খরব মক্কার কুরাইশদের কানে পৌঁছল।
মুসলমানরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে, তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। নবী মুহাম্মদও বহাল তবীয়তে তাঁর দ্বীন প্রচার করছেনÑ এসব খবরে কুরাইশরা আবারো জ্বলে উঠল। নবীজীর হিজরতে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করছিল এই ভেবে যে, বালাই তো দূর হলো। কিন্তু যখন দেখল হিতে বিপরীত হয়েছে তখন তারা আর স্থির থাকতের পারল না। তারা ভাবল মুহাম্মদকে আর বাড়তে দেয়া যায় না। এবার এর একটা ফয়সালা সত্যি সত্যিই করতে হয়। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মদ (সা) তথা মদীনাবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এক হাজার জনের সুশিক্ষিত একটি সেনাদল নিয়ে কুরাইশরা মদীনায় নিকটবর্তী বদর নামক স্থানে তাঁবু ফেলল। এ সংবাদে রাসূল (সা) মাত্র তিনশত লোকের একটি অদক্ষ দল নিয়ে কুরাইশদের মুখোমুখি হলেন। বদর প্রান্তরে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হলো। অবাক ব্যাপার, মুসলমানদের ছোট্ট দলটিই তাদের ঈমানের জোরে জিতে গেল। এ যুদ্ধে কুরাইশদের ১৪ জন নেতাসহ ৭০ জন বীরযোদ্ধা নিহত হয় এবং ৭০ জন মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়। অপরপক্ষে মুসলমানদের ১৪ জন বীর যোদ্ধা শহীদ হন। এই বদর যুদ্ধে ইসলামের সবচেয়ে জঘন্য দুশমন আবু জেহেলও নিহত হয়।
বদরের পর একে একে ওহুদ, খন্দক, তাবুক প্রভৃতি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নিজেদের ভুলের কারণে রাসূলের (সা) নির্দেশ না মানার কারণে ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা আপাত দৃষ্টিতে পরাজিত হয়। তবে অন্য  সব যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়।
একদিন মুসলমানরা রাসূল (সা)-এর নেতৃত্বে মক্কা বিজয় করেন। মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে কুরাইশরা সম্পূর্ণ হেরে যায়, আর ইসলাম দুনিয়ার বুকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মক্কা বিজয়ের পর মানবতার মহত্তম বন্ধু মুহাম্মদ (সা) কুরাইশদের সবাইকে ক্ষমা করে দেন। ইচ্ছে করলে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারতন, কিন্তু তিনি তা চিন্তাও করলেন না। কত বড় মহৎপ্রাণ রাসূল ছিলেন তিনি!
কাবা শরীফে আগে থেকেই কুরাইশরা ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে দীর্ঘকাল পূজা-অর্চনা করে আসছিল। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা) কাবা শরীফে ঢুকে সব মূর্তি ভেঙে ফেললেন। প্রতিমামুক্ত হলো আল্লাহর ঘর। হযরত বেলালের (রা) সুমধুর কণ্ঠে ঘোষিত হলো ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। আরবে আল্লাহর রাজ প্রতিষ্ঠা হলো। মক্কা বিজয়ের পর হিজরী ১০ সালে প্রায় সোয়া লাখ মুসলমান হজ করার জন্য একত্রিত হলেন। হজ শেষে আরাফাতের ময়দানে হাজীদের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা) একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। এ ভাষণে মুসলমানদের জন্য নানা দিকনির্দেশনা ছিল। যেহেতু এই হজই ছিল রাসূল (সা)-এর জীবনের শেষ হজ এবং ভাষণটিও ছিল শেষ ভাষণ, তাই এ ভাষণকে বিদায় হজের ভাষণ বলা হয়।
হজের সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে মদীনায় ফিরে এসে রাসূল (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৬৩ বছর বয়সে হিজরী ১১ সনের রবিউর আউয়াল মাসের ১২ তারিখে ইন্তেকাল করেন। হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরের ভেতর রাসূল (সা)-এর লাশ দাফন করা হয়। বর্তমানে তাঁর রওজা মুবারক মসজিদে নববীর মধ্যে একীভূত হয়ে গেছে।

SHARE

Leave a Reply