Home স্মরণ সবার প্রিয় মোহাম্মদ নাসির আলী

সবার প্রিয় মোহাম্মদ নাসির আলী

শরীফ আবদুল গোফরান।
muhammad-nasirঢাকা জেলার বিক্রমপুরের একটি গ্রাম দাহদা। লোকমুখে উচ্চারণ হয় ধাইদা। এই ধাইদা গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা ছিলেন মোহাম্মদ ইজ্জত আলী। তাঁর এক পুত্র হায়দার আলী ব্যবসা উপলক্ষে গোয়ালন্দের রাজবাড়ী শহরে বাস করতেন। সেখানে তাঁর একটি জুতার দোকান ছিলো।
হায়দার আলীর স্ত্রীর নাম কসিমুন্নেসা। তাঁদের দুই মেয়েসহ এগারটি সন্তান ছিলো। কিন্তু পুত্র সন্তানদের দু’জন ছাড়া বাকিরা অকালে মৃত্যুবরণ করে। ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁদের কোল জুড়ে আসে একটি পুত্রসন্তান। পুত্রের দিক থেকে তিনি তৃতীয়। বাবা-মা আদর করে নাম রাখলেন মোহাম্মদ নাসির আলী। জন্মের সময় তার গায়ের রং ছিলো খুব ফর্সা। এ জন্য বাবা-মা আদর করে ডাকতেন কফুর অর্থাৎ কর্পূর।
জন্ম ধাইদায় হলেও নাসির আলীর শৈশব কেটেছে বাবার বাসস্থান রাজবাড়ী শহরে। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরুও সেখানেই। তবে কিছুদিন পর তিনি চলে আসেন গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরে। সেখানে থেকে পড়াশোনা করতে থাকেন।
হায়দার আলীর আয়ের একমাত্র উৎসই সেই জুতার দোকান। দোকান থেকে যা আয় হতো তা দিয়েই চলতো তাঁর সংসার। পরিবারের এক অংশ ধাইদায় এবং এক অংশ রাজবাড়ীতেই থাকতো। এ কারণে এক সঙ্গে দুই জায়গায় সংসার চালানো তাঁর পক্ষে কঠিন ছিলো। কিন্তু হিসেবি হায়দার আলী তাতেও অসুবিধায় পড়েননি। যার ফলে বাবার চরিত্রের মিতব্যয়িতা পরবর্তীতে নাসির আলীর চরিত্রে পড়েছিলো। বাবা লেখাপড়া না জানলে কী হবে, শিক্ষার মূল্য তিনি ভালোভাবে বুঝতেন। ফলে তিনি সন্তানদের শিক্ষিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন।
সেই ছেলেবেলা থেকেই নাসির আলী ছিলেন ব্যতিক্রমী।
চারদিকের প্রতিটি ছন্দপতনই তাঁর অনুভূতিকে ছুঁয়ে যেতো। দক্ষিণ পাড়ার গরিব কৃষক ইয়ার আলীর ছেলেটি যখন উদোম গায়ে মাঠে যেতো, হরিহরের রুগ্ণ ছেলেটি যখন মাটি কেটে ক্লান্ত হতো, কিশোর নাসির আলী তখন কেমন যেন উদাস হয়ে যেতেন। ওরা কেন তার মতো বই হাতে পাঠশালায় যায় না, সেই প্রশ্ন খুঁজে খুঁজে ব্যাকুল হতেন তিনি।
পদ্মার বুকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে যখন লাল-নীল পাল তুলে অজানা বন্দরের উদ্দেশে মাঝিরা নৌকা ভাসাতো, বালক নাসির আলীর মন তখন পাখির মতো চঞ্চল হয়ে উঠতো। ইচ্ছে করতো সপ্তডিঙা ভাসিয়ে দিয়ে অচিন দেশে হারিয়ে যেতে।
তোমাদেরকে আগেই বলেছি, তাঁর হাতে খড়ি হয় বাবার কাছে রাজবাড়ীতে থাকতেই। কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনার সূচনা হয় আরো পরে। তখন তিনি একটু বড় হয়েছেন, বাবা তাঁকে গ্রামে নিয়ে এলেন। কালী মোহন দুর্গামোহন ইনস্টিটিউশন নামে একটি হাইস্কুলে তাঁকে ভর্তি করে দিলেন। স্কুলটি ছিলো তেলিরবাগ গ্রামে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বাড়িতে। এই স্কুল থেকেই নাসির আলী ১৯২৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তাঁর পরীক্ষার ফল দেখে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি স্বর্ণপদক পুরস্কার দেন।
এবার উচ্চশিক্ষার নেশায় পেয়ে বসলো নাসির আলীকে। চলে এলেন ঢাকায়। ভর্তি হলেন জগন্নাথ কলেজে। পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই আর। লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন।
১৯২৮ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে আইএ পাস করেন। তারপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম ডিগ্রি নিয়ে বের হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি দু’বছর মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি ভোগ করেন।
বাংলা ১৩৮০ সালের আশ্বিন মাসে নাসির আলীর সংসার জীবন শুরু হয়। বাবা স্থির করলেন ছেলেকে বিয়ে দিতে হবে, তবে মেয়েকে গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। কিন্তু নাসির আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে বের হলেন জীবিকার সন্ধানে। চলে এলেন কলকাতায়। সেখানে তিনি ওঠেন কলিন্স স্ট্রিটের একটি মেসে। এই মেসে থাকতেন বিক্রমপুরের নওয়াপাড়া গ্রামের এক ভদ্রলোক। তাঁর নাম আবদুল খালেক চৌধুরী।
এক সময় এই আবদুল খালেক চৌধুরীর সাথে নাসির আলীর গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খালেক চৌধুরী মনস্থির করেন নাসির আলীর কাছে মেয়ে মেহেরুন্নেসাকে বিয়ে দেবেন। নাসির আলীও এতে রাজি হলেন। কিন্তু বাঁধ সাধেন বাবা হায়দার আলী। তিনি রাগ করেন ছেলের ওপর। মেয়েটি রোগা ছিলো বলে, এই মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দেবেন না। কিছুতেই বাবাকে রাজি করাতে পারলেন না নাসির আলী। কিন্তু কী অলৌকিক কাণ্ড দেখো, যেদিন বিয়ের গায়ে হলুদ সেদিনই হঠাৎ হায়দার আলী মারা যান। লোকের ভয় ছিলো এই বিয়ের ফল ভালো হবে না। কিন্তু লোকে যাই ভাবুক, নাসির আলী মেহেরুনকেই বিয়ে করেন। সারা জীবন সুখেই কাটান।
কলকাতায় এসে নাসির আলী একটি টিউশনি জোগাড় করেন। বেতন পেতেন ৪০ টাকা। অবশ্য দুই বছরের মাথায় তিনি একটি চাকরিও পেয়ে যান। তা ছিলো অনুবাদকের। পরবর্তীতে হাইকোর্টে আরো একটি চাকরি নিয়ে চলে আসেন। তা-ও অনুবাদকের। ভারত বিভাগের পর তিনি বদলি হয়ে চলে এলেন ঢাকা হাইকোর্টে। সরকারি চাকরি জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবশ্য এর মধ্যেই তিনি অনেক দৈনিক পত্রিকাতেও কাজ করেন।
ধীর স্থির এবং সদা কর্মব্যস্ত এই মানুষটি সকল দিকেই দৃষ্টি রাখতেন। সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ থেকে শুরু করে চরিত্র গঠন ইত্যাদি সব বিষয়েই তিনি ছিলেন সচেতন। পরিবারের কর্তা এবং স্নেহশীল পিতা হিসেবে তিনি পুত্র-কন্যা সবাইকে এমনভাবে গড়ে তোলেন, যাতে তারা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
ছোটবেলা থেকেই নাসির আলী ছিলেন সাহিত্যের একজন ভক্ত পাঠক। তাঁর সাহিত্য পাঠের অভ্যাস গড়ে ওঠে ছাত্রজীবনের সূচনা থেকেই। তিনি যখন প্রথম শ্রেণীর ছাত্র, তখন স্কুলের এক ছেলের হাতে এক কপি ‘সন্দেশ’ পত্রিকা দেখতে পান।
পত্রিকাটি তাঁর মন কেড়ে নেয়। কিন্তু বড় বড় ছাত্রদের ভিড়ে পত্রিকাটি পড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি একদিন সন্দেশের মালিক ছেলেটির বাড়ি গিয়ে পত্রিকাটি দেখে আসেন।
সেই দেখা থেকেই তাঁর জীবনে সন্ধান মেলে সাহিত্যের রাজপথের, এরপর তিনি পত্রিকাটির গ্রাহক হলেন। কৈশোরেই গ্রাহক হলেন আরো কয়েকটি পত্রিকার। সেগুলোর মধ্যে ছিলো সেকালের কলকাতার অতি উন্নত মানের সাপ্তাহিক ‘নবযুগ’।
নাসির আলী স্কুলজীবনের গোড়ার দিকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি গদ্য চর্চার সাথে সাথে কবিতা চর্চাও শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনাটি ছিলো বড়দের জন্য লেখা, নাম ‘পটলা’। একটি কিশোরকে নিয়ে লেখা এই গল্পটি ছাপা হয় ‘নবযুগ’ পত্রিকায়। তিনি তাঁর প্রথম লেখাটি লিখেছেন শ্রীমতি নীহার বালা দেবী নামে (ছদ্মনাম)। তোমাদের মনে হয় তো প্রশ্ন জাগতে পারে এ আবার কেমন কথা। মেয়েদের নাম দিয়ে ছদ্মনামে লিখতে হবে কেন? হ্যাঁ সেটাই তো জানতে হবে। ঐ সময় শুধু নাসির আলীই নয়, নজরুল, ফররুখসহ অনেক বড় বড় কবিও ছদ্মনামে লিখতেন। কারণ ঐ সময় পত্রপত্রিকা ছিলো খুব কম। যা-ও দু-একটি ছিলো তা-ও চালাতো হিন্দুরা। এসব পত্রিকায় তাদেরই বেশির ভাগ লেখা ছাপা হতো। মুসলমান নাম পেলে হিন্দু সম্পাদকেরা আস্তে করে তা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতো, এ কারণে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মুসলমান লেখকেরা বঞ্চিত হতেন, তাই নাসির আলীও নীহার বালা দেবী ছদ্মনামে লিখতেন। নবযুগ পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা গল্প পটলা পাঠালেন ছদ্মনামে। তিনি এর আগে নাসির আলী নামে অনেক গল্প নবযুগে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু ছাপেনি। লেখা পাঠানোর দুই-তিন সপ্তাহ পর দেড় পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হলো তাঁর গল্প। এভাবেই সাহিত্যের প্রকাশ্য আসরে প্রবেশ করলেন নাসির আলী। এরপর থেইে তাঁর বিভিন্ন আঙ্গিকের লেখা কলকাতার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। স্বনামে নাসির আলীর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে।
নাসির আলীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা কতো জানো? একচল্লিশ। তাঁর লেখা গ্রন্থসমূহের মধ্যে একটি ছাড়া আর বাকি সবই শিশুতোষ গ্রন্থ। বাংলাদেশে একমাত্র কবি বন্দে আলী মিয়া ছাড়া এককভাবে তোমাদের মতো শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা আর কোনো লেখকের এতগুলো শিশু-কিশোর উপযোগী বই প্রকাশিত হয়নি।
মোহাম্মদ নাসির আলী ছিলেন জীবনের সকল ক্ষেত্রেই মিতাচারী। পোশাক পরতেন অতি সাধারণ। গরমকালে পায়জামা-পাঞ্জাবি, শীতকালে এসবের ওপর একটি শেরোয়ানি পরতেন। খাওয়ার টেবিলে বসলে তিনি আমাদের দেশীয় রুচির সাধারণ খাবার খেতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, অমায়িক এবং সদালাপী। তাঁর মহৎ চিন্তা ও কাজের অপূর্ব সামঞ্জস্য ছিলো, যার দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। কী শিশু সাহিত্যে, কী শিল্পে,
কী ব্যক্তিগত আচরণে তিনি সততার যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবে।
১৯৭৪ সাল থেকেই তিনি বুকের ব্যথায় ভুগছিলেন। এই সময়টা তিনি বড় একটা বাইরে যেতেন না। শেষের দিকে ব্যথা আরো বৃদ্ধি পায়। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। সেদিন তিনি নিজের হাতে বালিশ উঠিয়ে উত্তর দিকে রাখেন। তারপর দক্ষিণ দিক থেকে ঘুরে উত্তর দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
এই দেখে তাঁর স্ত্রী বললেন, আপনি এমন করছেন কেন? নাসির আলীর রসপ্রিয়তা তখনও যায়নি। তিনি জবাব দেন, যারা মহাপুরুষ, তাঁরা তো মরবার সময় উত্তর দিকেই মাথা রাখেন। ওই দিনই অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান পরজগতে।

SHARE

Leave a Reply