Home ফিচার শিশির ও কুয়াশার কথা

শিশির ও কুয়াশার কথা

মাসুম কবীর।

featureভোরের শ্যামল বাংলা এখন কুয়াশার চাদরে মোড়া। সকাল-সন্ধ্যায় ঘাসের সবুজ গালিচায় বিন্দু বিন্দু শিশির পড়তে শুরু করেছে। দুয়ারে কড়া নাড়তে নাড়তে চলে এসেছে শীত। ষড়ঋতুর এই দেশে শীত আসে উৎসবের আমেজ নিয়ে।
শীতের দিনে শিশির এবং কুয়াশার সাথে আমাদের সবার পরিচয় ঘটছে নতুন করে। আজ তাই এই শিশির ও কুয়াশার ব্যাপারগুলোই খানিকটা জেনে নেবো।

শিশির বলে শীত এসেছে
কী অপরূপ পত্রপল্লবের এই শিশিরগুচ্ছ। শীতের বিনম্র শীতল বার্তা নিয়ে প্রকৃতির দুয়ারে শীত এসেছে তার রূপের ডালি সাজিয়ে। গভীর রাতে টিনের চালে বাজে টপটপ শিশিরের শব্দ। সকালে ঘাস ও গাছের পাতায় দেখা মেলে টলমলে শিশির। শিশিরের ভেজা ধানের পাতা বাতাসে নুয়ে পড়েছে। শীতের স্নিগ্ধ, সতেজ ও মায়াবী প্রকৃতি চারপাশে অপরূপ মায়াজাল ছড়িয়েছে। শিশিরে ভিজে লাল টকটকে হয়ে উঠছে বাসার ছাদের টবের লাল গোলাপটাও। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে নানা রঙের গাঁদা ফুলের গাছও যেন সতেজ হয়ে উঠছে। শিশির স্নিগ্ধতায় কলাপাতার রঙও হয়ে ওঠে উজ্জ্বল। ফুটতে শুরু করে বুনোফুল। সারা বছর যে ছাতিম গাছটি ফুলহীন থাকে, এখন তাতেও ফুল এসেছে। এ ফুলের মৌ মৌ গন্ধেও মিশে আছে শীতের আমেজ।
শিশিরের ফোঁটায় পাতার ভাঁজ খুলে সবুজ ঘাসের দেশ হয়ে উঠছে প্রকৃতির বিশাল প্রান্তর। রাতভর শিশির মেখে হাজারো বৃক্ষের পাতার রঙ আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
শিশির কী : শিশির হলো কোনো শীতল বস্তুর ওপর জলীয় বাষ্প জমা হয়ে সৃষ্ট বিন্দু। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাতাস একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে যেমন ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি তাপমাত্রা কমলে ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। শীতের সময় সাধারণত সন্ধ্যার পরে তাপমাত্রা কমে যায় এবং বাতাস জলীয়বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। যদি তাপমাত্রা আরো কমে যায়, তখন বাতাস আর জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে না এবং তা শীতল বস্তুর ওপর পানির কণা হিসেবে জমা হয়। এ পানির বিন্দু শিশির বিন্দু নামে পরিচিত। যেমন, ঘাসের ওপর শিশির বিন্দু জমা হয়।

শীত যেন কুয়াশার চাদর
কুয়াশা হলো ভূমির সংস্পর্শে থাকা মেঘমালা। মেঘকেও আংশিকভাবে কুয়াশা বিবেচনা করা যায়, মেঘের যে অংশটুকু মাটির ওপরে বাতাসে ভাসমান থাকে তা কুয়াশা হিসেবে বিবেচিত নয়। তবে মেঘের ভূমির উঁচু অংশের সংস্পর্শে থাকা মেঘকে কুয়াশা বলা হয়। কুয়াশা আর ধোঁয়াশার মধ্যে পার্থক্য হলো এদের ঘনত্বে, যা কিনা এদের ফলে সৃষ্ট দর্শনযোগ্যতার হ্রাস দ্বারা হিসাব করা হয় কুয়াশার কারণে দর্শনযোগ্যতা ১ কিলোমিটারের কম হয়, যেখানে ধোঁয়াশার দর্শনযোগ্যতা ২ কিলোমিটারের বেশি হ্রাস করে না। পৃথিবীর সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন স্থান হলো নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের গ্রান্ড ব্যাংকস, যেখানে উত্তর দিক থেকে আসা শীতল লাব্রাডর প্রবাহ ও দক্ষিণ দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ গালফ প্রবাহ মিলিত হয়। সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন ভূমি অঞ্চলের মধ্যে আছে পয়েন্ট রেয়েস, ক্যালিফোর্নিয়া। আর্জেন্টিনা, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড ও লাব্রাডর, যেখানে বছরের ২০০ দিনই কুয়াশায় ঢাকা থাকে। এমনকি এমনিতে উষ্ণ দক্ষিণ ইউরোপের নিম্নভূমি ও উপত্যকা অঞ্চলে ঘন কুয়াশা পড়ে, বিশেষত শরৎ ও গ্রীষ্মে।
কুয়াশা কী : আগেই বলেছি কুয়াশা হলো ভূমির সংস্পর্শে থাকা মেঘমালা। কুয়াশা গাঢ় হতে পারে, আবার পাতলাও হতে পারে। সাধারণভাবে কুয়াশাকে আমরা দেখতে পাই যখন তাতে অসংখ্য ছোট ছোট জলকণার উপস্থিতি থাকে। শুধুমাত্র গ্যাস হলে কুয়াশা আমরা দেখতে পেতাম না। কিন্তু কুয়াশার মধ্যে দৃশ্যমানতা খুবই কম। ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন-এর মতে কুয়াশার মধ্যে দৃশ্যমানতা এক কিলোমিটারের কম থাকে। তবে খুব গাঢ় কুয়াশার ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা কখনও কখনও প্রায় শূন্যে পৌঁছে যায়।
যেভাবে তৈরি হয় কুয়াশা : অনুকূল পরিস্থিতিতে যেমন দ্রুত কুয়াশা তৈরি হয় তেমনি প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে নিমেষেই কুয়াশা উধাও হয়ে যেতে পারে। সবটাই নির্ভর করে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার আপেক্ষিক অবস্থার ওপর। সাধারণত ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তর শীতল থাকলে বায়ুতে মিশে থাকা জলীয়বাষ্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। একে বলে ঘনীভবন। অনেক সময় বায়ুতে ভাসমান খুব ছোট ছোট ধূলিকণা, লবণের কণা ইত্যাদি আশ্রয় করে এসব জলকণা ভেসে থাকে এবং কুয়াশা সৃষ্টি করে। রাতের আকাশ পরিষ্কার এবং বায়ুপ্রবাহ শান্ত থাকলে, দিনের বেলা সূর্যতাপে তাপিত ভূ-পৃষ্ঠ রাতে দ্রুত তাপ বিকিরণ করে ঠাণ্ডা হয়ে পড়লে, ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তর ঠাণ্ডা ও আর্দ্র হয়ে পড়ে এবং কুয়াশা তৈরির উপযুক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই সময় সাধারণভাবে আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ দাঁড়ায় একশো শতাংশে। আমাদের চারপাশে এই ধরনের কুয়াশাই আমরা দেখতে পাই। তবে, সমুদ্রের উপকূলভাগে, উষ্ণতর বায়ু, শীতল সমুদ্রের পানির সংস্পর্শে এলেও কুয়াশার সৃষ্টি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কোনো কোনো অংশে এই ধরনের কুয়াশা দেখা যায়। তবে সাধারণত শীতকালে ভয়ঙ্কর কুয়াশা তৈরি হয় কোনো কোনো পাহাড়ি উপত্যকায়। চারদিক পাহাড় ঘেরা জায়গায় শীতল-ভারী বায়ু কোথাও বেরোতে না পেরে এই ধরনের জমাট কুয়াশা তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, ভূ-পৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুস্তর যখন তার ঠিক ওপরের বায়ুস্তরের থেকে বেশ খানিকটা বেশি ঠাণ্ডা হয়ে যায় তখন কুয়াশা সব থেকে স্থায়ী হয়। উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে, স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা অ্যান্টার্কটিকায় কুয়াশার জলকণাগুলি জমে তুষারকণায় পরিণত হয় এবং উঁচু-নিচু ভূ-পৃষ্ঠের সর্বত্র যেন তুষার চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।
কুয়াশার রকমারি : পৃথিবীর সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন অঞ্চল হলো কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের গ্র্যান্ড ব্যাঙ্ক নামক অঞ্চল। বছরে ২০০ দিনেরও বেশি সেখানে ঘন কুয়াশা চারদিক থেকে ঢেকে রাখে। প্রায় একই রকম কুয়াশাপ্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার পয়েন্ট রিয়েস, দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার চিলির দক্ষিণ উপকূল, আফ্রিকার নামিবিয়ার উপকূলভাগ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে, বিশেষত আমাদের উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও কুয়াশার ঘেরাটোপে চলে যায়, ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয় জনজীবন। মন্থর হয়ে পড়ে সমস্ত রকম বাহন।
বিমানবন্দরের রানওয়েতে দৃশ্যমানতা ৬০০ মিটারের কম হয়ে গেলে সাধারণত কোনো বিমানকে ওঠা বা নামার অনুমতি দেয়া হয় না। ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ সাম্প্রতিক তাদের এক গবেষণা থেকে জানাচ্ছে মজার তথ্য কুয়াশার কাছে শুধু বিমান নয়, মশাও কুপোকাত! বৃষ্টির মধ্যেও মশা উড়তে পারে কিন্তু কুয়াশা যত গাঢ় হতে থাকে কিছুতেই আর উড়তে পারে না।
বন্যার মত কুয়াশার সবটাই যে খারাপ, এমনটা কিন্তু বলা যাবে না। পৃথিবীর কিছু শুষ্ক অথচ কুয়াশাপ্রবণ অঞ্চল যেমন পেরুর একটি অংশের মানুষ কুয়াশা থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে। কারণ সেখানে পানির উৎসের অভাব রয়েছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয় বিশাল এক ধরনের বিশেষ পর্দা। যেখানে কুয়াশার জলকণাগুলোকে সংগ্রহ করে নিচে একটি পাত্রে জমা করা হয়। এই ধরনের একটি পর্দার সাহায্যে একদিনে ১০০ গ্যালনেরও বেশি পানি সংগ্রহ করা যায়।

শীতকালে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয় কেন
শীতের সকালে আমাদের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। কথা বললে বা ফুঁ দিলে মুখের সামনে ধোঁয়ায় ভরে যায়। শুধু যে আমাদের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয় তা নয় গরু, ছাগল, কুকুরের মুখ দিয়েও ধোঁয়া বের হয়। এখন জেনে নাও এমনটি কেন হয়।
শীতের সময় বাতাস খুব ঠাণ্ডা থাকে। এ সময় বাতাসে লক্ষ লক্ষ পানির কণা ভেসে বেড়ায়। বাতাসের তুলনায় আমাদের শরীরের তাপ তখন বেশি থাকে। কথা বলার সময় তাই মুখ দিয়ে গরম বাতাস বের হয়। মুখ দিয়ে বের হওয়া ওই বাতাস বাইরের ঠাণ্ডা পানিকণার সাথে মিশে ঘন পানিকণায় পরিণত হয়। এই ঘন পানিকণাগুলোকে তখন ধোঁয়ার মতো দেখায়।
এ জন্য মনে হয় নাক, মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আসলে এগুলো ধোঁয়া নয়, ঘন পানির কণা।

SHARE

Leave a Reply