Home তোমাদের গল্প মীম

মীম

আবদুল্লাহ আল মামুন (সুজন)।

Golpoটুং টাং ঢং ঢং ছুটির ঘণ্টা বাজার পর মীম এক দৌড়ে এসে আম্মা সালমা বেগমকে জড়িয়ে ধরল। বলল জানো আম্মু কাল থেকে আমাদের স্কুলে ঈদের ছুটি। কী মজা, কী মজা। মীম কে জি ওয়ানে পড়ে, বয়স পাঁচ বছর। মা ছোট্ট আদরের এক মাত্র মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে রিকশায় উঠলেন। অন্য দিন মীম চুপ করে বসে থাকত কিন্তু আজ সে চুপ করে বসে নেই। বলছে জানো আম্মু আজ বাসায় গিয়ে বাসাটা সুন্দর করে সাজাবো এবং আমাদের বারান্দার ময়লাগুলো পরিষ্কার করবো। আব্বু বাড়িতে এসে যেন সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখেন। আব মীমের আব্বু আবদুর রহমান চার বছর আগে মালয়েশিয়াতে গিয়েছিলেন। এবার ঈদে বাড়িতে আসবেন এবং আম্মুকে যেন অনেক ভালোভাবে কথা বলে। এভাবে কথা বলতে বলতে তাদের বসায় চলে এল।
বাসায় এসে মীম সত্যিই বসে নেই কাজের মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেছে আঙিনায় পরিষ্কার পরিছন্নতার কাজে। এবং কাজের ফাঁকে দৌড়ে চলে আসল আম্মুর কাছে। বলছে আচ্ছা আম্মু আব্বু দেখতে কেমন, খুব লম্বা না খাটো, কালো না সাদা, না ছবিতে যেমন দেখেছি তেমন আব্বা। আব্বু বাড়িতে এসে আমাকে আদর করবে তো? জানো আম্মু আমার স্কুলের বন্ধুদের যখন তাদের আব্বু আনতে যায় তাদের কত্তো আদর করে, কোলে পিঠে চড়ে, তারা মজা করে। আমার না অনেক রাগ হয় তোমার ওপর। তুমি কেন আব্বুকে বিদেশ যেতে দিলে। এবার এলে আর কোথাও যেতে দেবে না। আর গেলে পিছু ডাকবোই না। এভাবে চলতে থাকে হাজারও কথা হাজারও স্বপ্ন আঁকা। এবং বাসা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ।
২৭ রমজান রাত সাড়ে এগারোটা। হঠাৎ মীমের ঘুম ভেঙে গেল। আম্মু আম্মু আম্মু ডাকতে লাগল। কী হয়েছে মীম।
আম্মু আমি এইমাত্র একটা স্বপ্ন দেখলাম যে, আব্বু এসেছে, অনেক কিছু এনেছে আমার জন্য। লাল টুকটুকে জামা, পাজামা, শাড়ি, হার ঘড়ি, খেলনা আরো অনেক কিছু। যেই আমি ঐগুলো নিতে গেলাম অমনি আব্বু চলে গেলেন। আমার ঘুমও ভেঙে গেল।
Ñ আচ্ছা তুমি এখন ঘুমাও। তুমি যা চাইবে তোমার আব্বু সব আনবে।
২৮ রমজান সকালবেলা সালমা বেগমের মোবাইলে কল এল। আ: রহমানের কণ্ঠ বলছে এইমাত্র বিমানের টিকিট করলাম সকাল সাড়ে ৬টায় আমাদের বিমান ঢাকাতে ল্যান্ড করবে। মীম চিৎকার শুরু করল আমাকে দাও। আব্বুর সাথে কথা বলব। হ্যালো মীম তোমার জন্য কী আনতে হবে। মীম বলল, জামা, পাজামা, চুড়ি, নাকফুল, হার। কাল রাতে যেগুলো দেখেছিল সব বলল।
আব্দুর রহমান ভাবছেন চারটা বছর পার হয়ে যাচ্ছে দেশ ছাড়া। ছোট্ট মীমকে দেখে আসছিলাম আজকে কেজি ওয়ানে পড়ে। নিশ্চয়ই সুন্দর হয়েছে মেয়েটি। কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা চলে গেল বাড়ির আঙিনায়। বিচলিত হয়ে উঠল মন। তার যেন আর তর সাইছে না। আবার ভাবলো এ-তো কয়েক ঘণ্টা, এরপর সোজা বাড়ি।
মীম আব্বুর সাথে কথা বলার পর থেকে মীমের সময় যেনো আর যাচ্ছে না। শুধু কথা বলছে আম্মু আব্বু আসতে আর কত দেরি। আব্বু বাসায় কিভাবে আসবে। মাইক্রো, সিএনজি, নাকি রিকশায়। একটু পড়ে আবার বলছে আমার নিজ হাতে বাসা বাগান পরিষ্কার করা হয়েছে তো। আব্বু এসে খারাপ বলবে নাতো ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাতে ঘুম নেই মীমের চোখে। শুধু আব্বুকে নিয়ে ভাবনা। কাল সকালে আব্বুকে দেখতে পাবে। ঈদের দিন আব্বুকে নিয়ে কী করবে সব স্বপ্নের মতো যেন দেখতে পাচ্ছে। আম্মুকে বলছে, জানো আম্মু আব্বুর হাত ধরে আমি ঈদের মাঠে যাব, পার্কে যাব, চিড়িয়াখানায় যাব, মামাবাড়ি যাব, আরো অনেক জায়গায় যবো।
সকাল সাড়ে ৬টায় মীমের ঘুম ভাঙল। চোখ মুছতে মুছতে আম্মুকে যেয়ে বলছে আম্মু আব্বু কি এসেছে?
না এখনই এসে পড়বে।
মীম বলে, দেখি ফোন করি। কোন পর্যন্ত এসেছে। আম্মু আব্বুর ফোন বন্ধ কন?
সালমা বেগম বললেন, দেখি আবার কল দাও তো। হ্যাঁ তাইতো ফোন বন্ধ। বলল হয়তো মোবাইলে ব্যাটারিতে চার্জ নেই অথবা চাপ লেগে বন্ধ হবে গেছে। অন করতে ভুলে গেছে। সমস্যা নেই ঠিক সময়েই চলে আসবে।
মা আর মেয়ে বুকভরা আশা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেÑ কখন আসবে তাদের স্বপ্নের মানুষ। হঠাৎ একটা প্রাইভেট কার তাদের বাসার দিকে আসতে দেখল। মীম চিৎকার করে উঠল এইতো আমার আব্বু আসছে। দৌড় দিল গেটের দিকে। কিন্তু না এটা তাদের পাশের বাসার হাসানদের গাড়ি।
হতাশায় ভরে গেল মীমের ছোট্ট বুকখানা।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে মা এবং মেয়ে। একটা গাড়ি যখন বাসার দিকে আসে, অমনি ভাবে এই বুঝি তার আব্বু আসবে। এদিকে সালমা বেগম শত চেষ্টা করেও মোবাইলের লাইন পাচ্ছেন না। চিন্তার ভাঁজ তার কপালে। কেন এমন হচ্ছে? যে মানুষটার ল্যান্ড করার কথা সাড়ে ৬টায়। বাসায় আসতে সর্বোচ্চ ১০টা বাজুক কিন্তু এখন তো ১২টা বেজে গেছে তবুও কেন আসছে না। মীম আম্মুর চিন্তিত মুখ দেখে বলল, আম্মু চিন্তা করছো কেন? আব্বু ঠিক চলে আসবে। দেখ হয়তো জ্যামে পড়েছে এ জন্য আসতে দেরি হচ্ছে।
সালমা বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়তে চাইছে। কেন এমন হচ্ছে?  বেলা দেড়টা বেজে গেছে তবুও তার কোনো দেখা নেই। মনকে আর ধরে রাখতে পারছে না। মীমকে বলল, চলো আমরা বিমানবন্দরে যেয়ে দেখি তোমার আব্বু কোথায়।
মা ও মেয়ে অপেক্ষার পালা শেষ করে ঘরে ঢোকা মাত্র গেটে কলিং বেলের শব্দ পেল। চঞ্চল হয়ে উঠল যেন দু’টি প্রাণ। দৌড় দিল গেটের দিকে কিন্তু একি এতো প্রাইভেট কার নয়। এটা অ্যাম্বুলেন্স, সালমা বেগম বললন, কী চাই?
অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে আব্দুর রহমানের ছোট ভাই আবদুর রহিম ছিল। সে এসে বলল, ভাবি ভাইয়াকে নিয়ে এসেছি। সালমা বেগমের পা যেন আর উপরে উঠছে না। চঞ্চল মন অবশ হয়ে এখনই মাটিতে লুটাতে চাচ্ছে। অ্যা¤ু^লেন্সের কাছে যেয়ে দেখে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে আব্দুর রহমানকে। আল্লাহ একি হলো! এক চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
মীম ভাবছে কী হয়েছে আব্বু এলো আর আম্মু এভাবে কাঁদছে কেন? দৌড় দিল আম্বুর কাছে। আম্মু আম্মু না? আম্মু কথা বলছ না কেন?
কাকু আম্মু এমন করছে কেন?
– তোমার আব্বু এসেছে। দেখবে এসো। কই, কই আমার আব্বু এইতো গাড়িতে শুয়ে আছে। আব্বু, ও আব্বু কথা বল না আব্বু। জানো আব্বু তোমার জন্য বাড়িটা কত সুন্দর করে সাজিয়েছি।
একবার ওঠো, বস, দেখ কেমন হয়েছে উঠোন। আব্বু আম্মু তোমার জন্য কাঁদছে আর তুমি শুয়ে আছ? ও, তোমার ঘুম পেয়েছে বুঝি। এ জন্য ঘুমিয়ে আছো। আচ্ছা বাসায় চলো ঘুমাবে।
মীমের আব্বু কথা বলছে না। কাকুকে বলল, কাকু আব্বু কথা বলছে না কেন? আমার দিকে তাকাচ্ছে না কেন? আম্মুকে ডাকছে না কেন?
তোমার আব্বু কখনো তোমার কথা শুনবে না। কখনো তোমাকে মীম বলে ডাকবে না। তোমার আব্বু এ জগতে নেই। তোমার আব্বু সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইন্তেকাল করেছেন।
আর কথা না। মীম হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। চঞ্চল মেয়েটি বোবা হয়ে গেছে। যেন চোখ দিয়ে ঝরছে অশ্রুধারা তার ছোট্ট হৃদয় বলছে আয় আল্লাহ তার মত পিতাহারা যেন কেউ না হয়। আর কোন মায়ের সন্তানকে যেন মীমের মতো স্বপ্নকে সন্ত্রাসী দ্বারা বিঘিœত না হয়।
মীমের স্বপ্নেরা হারিয়ে গেল দিগদিগন্তে, দূরে বহু দূরে।

SHARE

Leave a Reply