Home স্মরণ ইমাম মুসলিম (রহ)

ইমাম মুসলিম (রহ)

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম|
Muslim-Shorifইমাম মুসলিম (রহ)-এর নাম তোমরা শুনেছ নিশ্চয়ই। ইমাম মুসলিম (রহ) হাদিসশাস্ত্রে বিরাট ও বিরাট জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। নাম মুসলিম, উপনাম আবুল হুসাইন। তাঁর পূর্ণনাম আল ইমাম আল হাফেজ হুজ্জাতুল ইসলাম আবুল হুসাইন আসাকেরউদ্দিন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল কুরায়শী আন নিশাপুরী। ২০৪ হিজরিতে তিনি ইরানের খোরাসানের অন্তর্গত নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজ্জাজ বিন মুসলিম। অতি শৈশব থেকেই তিনিই ছিলেন সচ্চরিত্র, কোমলমতি এবং অনন্য সাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন।
বাল্যকালেই ইমাম মুসলিমের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিশাপুরের এক আদর্শ বিদ্যালয়ে। এখানে ভর্তি হয়ে তিনি অপূর্ব জ্ঞান সাধনার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। তাফসীর, তারীখ ও হাদিস শাস্ত্রের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে তিনি অতি শৈশবেই শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নিশাপুরের মাদ্রাসায় তখন প্রধান উস্তাদ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন সে যুগের খ্যাতনামা মুহাদ্দিস ইমাম মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া আল যুহলী। তাঁর কাছে বালক মুসলিম অনন্যসাধারণ একাগ্রচিত্তে হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ইমাম বুখারী (রহ) যখন নিশাপুরে আগমন করেন তখন ইমাম মুসলিম (রহ) তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে হাদিস শিক্ষা করেন। তাঁর কাছ থেকে ইমাম মুসলিম একাগ্রচিত্তে হাদিস শ্রবণ করতে থাকেন। উস্তাদদের মুখ থেকে শ্রবণ করা ছাড়াও তিনি হাদিস লিখে রাখতেন। হাদিস লেখা শেষ হলে তিনি সহপাঠীদের মসলিশে শোনাবার চেষ্টা করতেন। এভাবে অতি অল্প সময়ে ইলমুল হাদিসে জ্ঞান ও পান্ডিত্য অর্জন করেন।
হাদিস শিক্ষার উদ্দেশে ইমাম মুসলিম তদানীন্তন ইসলামী বিশ্বের সবকটি কেন্দ্রেই গমন করেন। তিনি বাগদাদ, হেজাজ, দামেশক, মিসর প্রভৃতি স্থানে উপস্থিত হয়ে তথায় অবস্থানকারী হাদিসের বড় বড় উস্তাদ ও মুহাদ্দিসের নিকট হতে হাদিস শিক্ষা ও সংগ্রহ করেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন : ১. ইমাম আবু বকর ইবন আবি কাযরাহ ২. ইমাম বুখারী (রহ) ৩. কুতাইবা ইবনে সাঈদ ৪. হারামালাহ ৫. ইয়াহইয়া ৬. মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া নিশাপুরী ৭. আহমদ ইবন ইউনুস প্রমুখ। সরাসরি উস্তাদদের নিকট হতে শ্রুত তিন লক্ষ হাদিস থেকে ছাটাই বাছাই ও চয়ন করে রচনা করেন সহীহ মুসলিম শরীফ। দীর্ঘ পনেরো বছরের অবিশ্রান্ত সাধনা, গবেষণা ও যাচাই পরিচালনার পর মুসলিম শরীফের পান্ডুলিপি তৈরি করা হয়। এ গ্রন্থে মোট বারো হাজার হাদিস সন্নিবেশিত হয়েছে। তাঁর প্রখ্যাত শাগরিদদের মধ্যে ইবরাহীম ইবন আবি তালিব, ইবন খুযাইমা, আবু হাতিম আর রাবী, সরারাজ, আবু আওয়ানা, আবু হামেদ ইবন শারকী, আবু হামেদ আহমদ ইবন হামাদান, ইবরাহীম ইবন মাখলাদ, মুহাম্মদ ইবন মাখলাদ, ইমাম তিরমিযী, মুসা ইবন হারুন, আহমদ ইবন সালমা, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে সময়ের বড় বড় মুহাদ্দিসগণ তাঁর কাছ থেকে হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
ইমাম মুসলিমের হাদিস গ্রহণের শর্তাবলী ছিল : ১. তিনি সে সকল হাদিস গ্রহণ করেছেন যা মহানবী (সা) থেকে অবিচ্ছিন্ন বর্ণনা পরম্পরায় বর্ণিত হয়েছে। ২. হাদিসের উৎস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। ৩. বর্ণনাকারী বিদয়াতী না হওয়া। ৪. বর্ণনাকারী পূর্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া। ৫. বর্ণনাকারী আমানতদার, সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া। ৬. সনদের বলিষ্ঠতা যাচাইয়ের মাধ্যমে হাদিস গ্রহণ।
মুসলিম শরীফ ছাড়াও ইমাম মুসলিম রচিত আরও যেসব গ্রন্থের পরিচয় পাওয়া যায়Ñ ১. আল মুসনাদ আল কবীর ২. কিতাব আল জামি আল আবওয়াব ৩. কিতাব আল আসমা ওয়া আল কুনা ৪. কিতাব আল তাময়ীয ৫. কিতাব আল ইলাল ওয়া কিতাব আল ওয়াহদান ৬. কিতাব আল ইকরাদ ৭. কিতাব আল আরকান ৮. কিতাবু সুওয়ালাতিহি আহমদ ইবন হাম্বল ৯. কিতাব হাদিসে আমর ইবন শুয়াইব ১০. কিতাব আল ইনকিতাবি উহুব আল সিবা ১১. কিতাবু মাশায়িখ মালিক ওয়া কিতাবু মাশায়িখ আল সাওরী ১২. কিতাবু মাশায়িখ শুবা ১৩. কিতাবু মান লায়সা লাহু ইলা রাব্বিন ওয়াহিদ ১৪. কিতাবু আল মুখাদরামীন ১৫. কিতাব আওলাদ আল সাহাবা ১৬. কিতাবু আওহাম আল মুহাদ্দিসীন ১৭. কিতাব আল তাবাকাত ১৮. কিতাবু আকরাদ আল শামিয়্যিন ১৯. আল জামেউল করিজ। তিনি সাহাবীদের জীবনীবিষয়ক আল মুসনাদ আল কাবীর রচনায় হাত দিলেও তা শেষ করে যেতে পারেননি।
ইসলামী উম্মাহ ইমাম মুসলিম (রহ) সঙ্কলিত ‘সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থখানির প্রতি অপূর্ব ও অতুলনীয় গুরুত্ব প্রদান করেছে। সহীহ মুসলিম বিশুদ্ধ হওয়ায় এর মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত। আবু আলী এ গ্রন্থের বিশুদ্ধতার স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, আকাশের নিচে হাদিসশাস্ত্রে মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজের কিতাব অপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ কোনো গ্রন্থ নেই। এ প্রসঙ্গে হাফিজ যাহাবী বলেন, এটি একটি উত্তম গ্রন্থ। এর ভাব ও অর্থের জন্য গ্রন্থখানি একটি পরিপূর্ণ মর্যাদা লাভ করেছে।
ইমাম মুসলিমের যশ ও খ্যাতি তাঁর এ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তিনি হাদিস সম্পর্কে বিরাট ও বিশাল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
ইমাম মুসলিম (রহ) ২৭৫ হিজরির ২৫ রজব ৫৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মাতৃভূমি নিশাপুরেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply