Home গল্প মটর ফুলের হাতছানি

মটর ফুলের হাতছানি

শরিফুল ইসলাম|
golpoএকটু আগে বুয়া চলে গেল। যাবার সময় বাইরের দরজায় তালা লাগানোর আগে প্রতিদিন তার দুটো কাজ থাকে। প্রথমে বলবে, ‘দ্যাকেন ভাইজান সঙ্গে কইলাম কিছু লই নাই।’ পরে বলবে, ‘খায়া দায়া ঘুমায়া থাহেন। ফকিরে ভিক্কা চাইলে জানালা দিয়া ভিক্কা দিয়েন। হ্যারা গরিব মানুষ।’ তারপর বুয়া তার টিফিন ক্যারিয়ার খুলে মিথুনকে প্রতিটা বাটি দেখাবে। ওতে কী কী খাবার নেয়া হলো সেটা বলবে। মিথুন এসব দেখতে চায় না-শুনতেও চায় না। তবুও বুয়া যাবার সময় ওরকম করবেই। অবশ্য মিথুনের আম্মুই মিথুনকে বলেছে, বুয়া যখন চলে যায় তখন মিথুন যেন খেয়াল রাখে।
বাইরে পৌষ মাসের দুপুর ১২টার কাঁচাসোনা রোদ ঝলমল করছে। মিথুনদের বাসার সামনে গেটের পাশে কয়েকটা গাঁদাফুলের গাছ নাদুস-নুদুস সন্তানাদি নিয়ে সুখী সুখী দৃষ্টিতে মিথুনের দিকে চেয়ে থাকে। মিথুনও গাঁদাফুলের গাছটার সাথে অনেক কথা বলে। কতরকম ইশারায় গাঁদাফুলের গাছটা যে মিথুনকে ডাকে! গাঁদাফুলের পাপড়িগুলো কী পবিত্র! সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকতে মন চায় মিথুনের। পারে না। কারণ বাসার কলাপসিবল গেট বাইরে থেকে তালা দেয়া থাকে।
মিথুনের আব্বু-আম্মু দু’জনেই চাকরি করেন। আগে তারা অফিসে যাবার সময় মিথুনের কাছে চাবি দিয়ে যেতেন। এখন রেখে যান পাশের বাসার মণি আন্টির কাছে। কারণ বাসাবাড়িতে ছিনতাইকারীরা নাকি ধমক দিয়ে চাবিও চেয়ে নেয়। ছেলেধরা লোকেরাও নাকি বাসায় একা পেলে চাবি চেয়ে নেয়। এসব কারণে এখন মিথুন বাসায় থাকলেও তার কাছে চাবি থাকে না।
বাসায় টেলিফোন আছে। জরুরি প্রয়োজন হলে মিথুন আব্বু-আম্মুর কাছে টেলিফোন করতে পারে। মিথুন এখন সুন্দর করে আস্সালামু আলাইকুম বলতে পারে, টেলিফোন রিসিভ করতে পারে। লেখাপড়াতেও মিথুন খুবই ভালো। ছুটির দিন ছাড়া মিথুনের আব্বু-আম্মু কেউ দুপুরে বাসায় থাকেন না। মিথুন এ সময় বাসায় একদম একা। পাশের বাসা থেকে মণি আন্টি প্রায়ই মিথুনের খোঁজ খবর নেন। খিদে পেয়েছে কি না, হোম টাস্ক করছে কি না এসব।
মিথুনের এখন খিদে না পেলেও তৃষ্ণা পেয়েছে। ফ্রিজ খুলে মিথুন সারি সারি পানি-পেপসি-কোকাকোলার বোতলের মধ্য থেকে একটা পানির বোতল বের করে দু’চুমুক দিয়ে বোতলটা আবার যথাস্থানে রেখে দেয়। মিথুনদের একতলা বাড়িটা জুড়ে এখন গভীর নিস্তব্ধতা। সে বাসার সব রুমে ঘুরে বেড়ায় একা একা।
মিথুনের সামনে বাসার সব আসবাবপত্র ভৃত্যের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মিথুন চাইলেই ওরা মিথুনের সাথে কথা বলে, সাড়া দেয়। এই যে ফ্রিজটা এতক্ষণ অপরাধীর মতো মিথুনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মিথুন চাইতেই ফ্রিজটা দরজা খুলে তাকে ঠাণ্ডা পানি খাওয়ালো। মিথুন ফ্রিজটাকে ধন্যবাদ জানালো।
ফ্রিজের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে মিথুনের চোখে পড়ে সবজি রাখা বক্সের মধ্যে দুই আঁটি মটরের শাক। মিথুন শাকগুলো ছুঁয়ে দেখলো, শুঁকেও দেখলো। ভালোলাগার অনুভূতিতে মিথুনের মনটা ভরে গেল। সম্পূর্ণ মটরগাছই তুলে আনা হয়েছে। সবুজ মটরের গাছে দুই একটা ফুলও আছে। সাদা ও মেজেন্টা কালারের মিশেল দেয়া মটরের ফুলগুলো কী অপূর্ব!
গত বছর মিথুন আব্বু-আম্মুর সাথে দাদাবাড়ি গিয়েছিল। দাদাবাড়ির পাশেই মটরের ক্ষেতে মিথুন প্রতিদিন বিকেলে ওর ছোট চাচার সাথে বেড়াতে যেতো। মটরের ক্ষেতের আইল ছেড়ে মিথুন কখনো বা ক্ষেতের মধ্য দিয়েই হাঁটতো। মিথুনের ছোট্ট নরম পা যেন মটরের গাছের মতোই কোমল। ক্ষেতের মধ্যে পা রাখতেই শীতের বিকেলে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা ভালোলাগা মিথুনের সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতো।
মিথুনের সাথে বড়চাচার মেয়ে পরীও বেড়াতে যেতো। পরী কখনও শহরে যায়নি, রেলগাড়ি, বাস এসব দেখেনি। পরীর কথার সূত্র ধরেই মিথুন জানতে পেরেছে মোটর আর মটর এক নয়। যেটা যানবাহন সেটাকে মোটর বলে। মিথুনের দাদু পরী ও মিথুনকে এ দুটো প্রায় সমুচ্চারিত শব্দের অর্থের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আচ্ছা মটরগাছেরা কি ব্যথা পায়? পরী যে বারবার বলছিল, মটরগাছ পাড়াতে নেই। ওরা ব্যথা পায়। পরীর কথা শুনে অবশ্য মিথুন মটরক্ষেতে খুব সাবধানে পা ফেলে চলছিল। মটরগাছেরা ব্যথা পেয়েছিল কি না সেটা অবশ্য মিথুন বুঝতে পারেনি।
মিথুন গত বছর দাদুবাড়ি যেয়ে শুধু কি মটরশুটির ক্ষেতেই হেঁটেছে? হলুদ হলুদ ফুলে ভরা রাজকন্যাদের মতো সর্ষে ক্ষেতের পাশেও কি মিথুন হেঁটে বেড়ায়নি? এখনও মিথুন স্বপ্নে কত রাতে দেখে সে সর্ষে ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওর গায়ের জামায় সর্ষে ফুলের রেণু ছড়িয়ে যাচ্ছে। মিথুন মাঝে মাঝে ভাবে কী করে সর্ষেফুলেরা অমন হলুদ হয়?
মিথুনের মনে হয় গাঁদাফুলেরা নিশ্চয়ই সর্ষেফুলেদের আত্মীয়। তা না হলে ওরা একইরকম হলুদ রঙের হয় কেন? মিথুন জানালার ফাঁক দিয়ে গেটের কাছের স্বাস্থ্যবতী গাঁদা ফুলগাছটার দিকে আবারো তাকালো। মিথুন মাঝে মাঝে ভাবে মণি আন্টির কাছে বলে, ‘আন্টি! দরজাটা খুলে দাও! আমি গাঁদা ফুলগুলো একটু ছুঁয়ে আবার ঘরে চলে আসবো। একটা গাঁদা ফুলও ছিঁড়বো না।’ আজো এ কথা মণি আন্টিকে বলা হয়নি।
মিথুনের ইচ্ছে হয়েছিল আরো কিছুদিন সে গ্রামে দাদাবাড়িতে থাকে। কিন্তু মিথুনের স্কুল ছুটি থাকলেও আব্বু-আম্মুর অফিসের কারণে মাত্র পাঁচদিনের মাথায়ই মিথুনকে দাদাবাড়ি থেকে চলে আসতে হয়েছিল।
ওই পাঁচদিন মিথুনের জীবনের উল্লেখযোগ্য দিন ছিল। মিথুন ছোটচাচার সাথে বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিল। ছোটচাচাসহ গ্রামের অনেকেই পৌষ মাসের বিলের অল্প পানিতে হাতিয়ে মাছ ধরছিল। মিথুন খালুই নিয়ে বিলের ধারে ধারে যাচ্ছিল। ছোটচাচা মাছ পেলেই ডাঙায় মিথুনের কাছে ছুড়ে দিচ্ছিল। মিথুন তা খালুইতে রাখছিল। হাতের মধ্যে তাজা মাছের নড়া মিথুনের সমস্ত শরীরে বারবার শিহরণ তুলছিল। শুধু কি তাই? সন্ধ্যাবেলা দাদাদের বাড়ির পাশের খেজুরগাছ থেকে রস নামিয়ে খাওয়ার মজাটাই ছিল অন্যরকম।
দাদাজানের বাড়ির পাশেই আখ মাড়াইয়ের জন্য ‘খোলা’ তৈরি হয়েছিল। খোলায় আসা আখ বেছে বেছে ছোটচাচা মিথুনকে খেতে দিতো। খোলায় গুড় তৈরির পরে প্রায় প্রতিদিনই শেষ গুড়ের পাটালি তৈরি হতো। গরম গুড়ের পাটালি যে না খেয়েছে সে এর মজা বুঝবে কী করে? নতুন গুড়ের সে কী সুগন্ধ! সারাটা পাড়া নতুন গুড়ের ঘ্রাণে মৌ মৌ করতো। দাদাবাড়ির সেই স্বপ্নপুরীতে আবার যে কবে যাওয়া হবে কে জানে! দাদাবাড়িতে সামান্য ক’দিনে মিথুন যে আনন্দ পেয়েছিল তা এখনো মিথুনের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে। গ্রামের এমন মধুময় জীবন রেখে কেন যে মানুষ শহরে এসে বাস করে! বিশেষ করে এই অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে!
রাজধানীর কোলাহলের মাঝে মিরপুরের এই শেষ সীমানায় মিথুনদের এই একতলা বাড়িটা নিজেদের। তিনদিন আগে মিথুনের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও মিথুন ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে। গ্রামের বাড়ি থেকে দাদাজানের আসার কথা আছে। মিথুন স্কুলের শীতকালীন ছুটিটা এবার দাদাবাড়িতেই কাটাবে বলে স্থির করে রেখেছে। আব্বু-আম্মু না গেলেও ক্ষতি নেই। বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্টের পর স্কুলে শীতকালীন ছুটি শুরু হয়েছে।
মিথুনের বন্ধুদের অনেকেই এখন নানিবাড়ি-দাদিবাড়ি বেড়াতে গেছে। আব্বু-আম্মুর ছুটি নেই বলে মিথুনের এখনও কোথাও যাওয়া হয়নি। মিথুনের এখন অনেক অবসর। বাসার প্রাইভেট টিউটর জব্বার স্যারও কোথায় যেন বেড়াতে গেছেন। সবাই বাইরে ঘুরছে, আনন্দ করছে। শুধু মিথুনই এ সময় ঢাকা শহরের এই বাসা নামক চার দেয়ালের মাঝে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে।
স্কুল খোলা থাকলে বুয়া তাকে স্কুলে দিয়ে আসে। তারপর স্কুল শেষে বেলা ১১টায় বুয়া আবার তাকে বাসায় নিয়ে আসে। তারপর বুয়া মিথুনকে বাসায় রেখে বাসার কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে যায়। স্কুল খোলা থাকলেও তাই মিথুনের এভাবেই জীবন কাটাতে হয়। মিথুনকে বাধ্য হয়েই বন্দিজীবনকে বেছে নিতে হয়েছে। সন্ধ্যায় আব্বু-আম্মু বাসায় ফিরলেও মিথুন কোথাও খেলতেও যেতে পারে না। কারণ তখন বাসায় জব্বার স্যার আসেন। আম্মু বলেছেন মণি আন্টির কাছে চাবি থাকার কথাটা যেন মিথুন কাউকে না বলে। মিথুন আজো কাউকে বলেনি।
বুয়া চলে যাবার পর মিথুন আজো অন্যান্য দিনের মতো সব ক’টা রুমে একা একা রাজপুত্রের মতো ঘুরে বেড়ায়। বাড়ির সমস্ত আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশন, সোফাসেট, শোকেস, ড্রেসিং টেবিল, ওয়্যারড্রোব সবাই মিথুনকে মহারাজার মতো সম্মান জানায়।
শুধু ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার বড্ড বেয়াড়া। সে মিথুনকে মোটেও সম্মান করে না। কাছে গেলে কিংবা হাত দিয়ে ধরলে বা বসতে গেলে চেয়ারটা একটা পা নিচু করে দেয়। বেয়াদব চেয়ারটাকে এ জন্য মিথুন শাস্তি দিয়েছে। স্যালাইনের পাইপ দিয়ে মিথুন একটা চাবুক বানিয়েছে। বেয়াড়া-বোকা চেয়ারটা প্রতিদিনই ওই স্যালাইনের চাবুকের আঘাত সহ্য করে। চেয়ারটার স্বভাবই বোধহয় ওরকম প্রতিদিনই মার খায় তবু স্বভাব বদলায় না। কাছে গেলে আবার ওর একটা পা নিচু করে ফেলে। তখন মেঝেতে ঠকাশ করে একটা শব্দ হয়। বোকা চেয়ারটার কাছে মিথুন তাই সহজে এখন যায় না।
বাড়িময় ঘুরতে ঘুরতে কতবার যে মিথুন বারান্দায় আসে তার ঠিক নেই। বারান্দায় এসে সে রাস্তার যানবাহন-লোকজনের চলাচল দেখে। কোন বৃদ্ধ মানুষকে রিকশায় যেতে দেখলে কিংবা বাসার সামনে দিয়ে যেতে দেখলেই মিথুন ভাবে বুঝি দাদাজান এলেন। তারপর কাছাকাছি এলে সেই বৃদ্ধ লোকটাকে দেখে মিথুনের ভুল ভাঙে। তখন ছোট্ট মিথুনের বুক জুড়ে কান্না আসে। একসময় সে কান্না আবার হারিয়েও যায়।
বাড়ির পেছনের দিকের বরান্দায় এক সময় দুটো মুরগি পোষা হতো। সারাদিন মুরগি দুটো বাড়ির ছোট্ট উঠোনে ঘুরে বেড়াতো। মিথুন মুরগি দুটোকে ঘর থেকে চাল এনে খেতে দিতো। মুরগি দুটোর একটা ডিমও দিয়েছিল কিছুদিন। দুপুর হলেই মুরগি দুটো খাবারের জন্য ঘরের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে ক্ব-ক্ব-ক্ব করে ডাক দিতো। মুরগি দুটোকে মিথুন ধমক দিলে দূরে সরে যেতো। আবার তি তি করে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে হাজির হতো।
ঘরদোর নোংরা করে বলে মিথুনের আব্বু একদিন মুরগি দুটোকে আর রাখা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। বাড়িতে মেহমান এলে একদিন মুরগি দুটো বিরিয়ানির রোস্ট হয়েছিল। সেই মুরগি দুটো না থাকলেও ওদের সেই ছোট্ট ঘরখানা এখনও বারান্দায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে ওই ঘরের মধ্যে একটা হোঁতকা-মোটা বিড়াল কোথা থেকে এসে শুয়ে থাকে। বেশ ভারিক্কি চালের সুখী সুখী চেহারা বিড়ালটার। মিথুনের আম্মু বলেছে ওটা নাকি পুরুষ বিড়াল বা হুলো বিড়াল। হুলো বিড়ালেরা নাকি কোথাও স্থিরভাবে বসবাস করে না।
মিথুন বিড়ালটার সাথে ভাব জমাতে চায়। কিন্তু বিড়ালটা মিথুনের ভাবে সাড়া দেয় না। বরং চোখ দুটো স্থির করে মিথুনের দিকে অনেকক্ষণ বিরক্তি নিয়ে চেয়ে থাকে। মিথুন বেশ ক’দিন মিটসেফ থেকে মাছ এনে বেড়ালটাকে খেতে দিয়েছে। বিড়ালটা জমিদারের মতো নজরানা পেয়ে তা সাবাড় করেছে কিন্তু যে এটা এনে দিলো তার দিকে একবারও কৃতজ্ঞচোখে তাকায়নি। বরং খেয়ে দেয়ে ভারিক্কি মেজাজে বাড়ির বাইরে উধাও হয়ে গিয়েছিল। বিড়ালটার সাথে মিথুনের আজো আদৌ কোন ভাব হয়নি। শহরের বিড়ালও কি তবে ভাব জমানোর আগে স্বার্থের হিসেবটা আগে করে নেয়?
আজকাল কয়েকটা টিকটিকি মিথুনের বন্ধু হয়েছে। ঘরের বাল্ব জ্বালানো হলেই ওরা কোথা থেকে যেন এসে বাল্বের পাশে-নিচে চুপ করে থাকে। তারপর নাগালের মধ্যে মশা-মাছি কিংবা কোন পতঙ্গ এলই টিকটিকিগুলো তাদেরকে খাবার বানিয়ে ফেলে। সামনে জিহ্বাটা বাড়িয়ে দিয়ে শিকার ধরে ওরা। তারপর কী মজা করেই না খায়! মিথুন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
তবে প্রতিরাতেই মিথুনের আম্মু মশা মারার জন্য মশা মারার তরল ওষুধটা ¯েপ্র করে দিলে টিকটিকিগুলো আর আসে না। ¯েপ্র করার পর মিথুনের আম্মু দরজা জানালা ভালো করে বন্ধ করে দেন। মিথুনকে তখন দশ-পনেরো মিনিট পাশের ঘরে থাকতে হয়। এরপর মিথুন ঘরে প্রবেশ করেই ঘরের দরজা-জানালা আবার খুলে দেয়। ¯েপ্রর অ্যাকশন কেটে যাবার পর ঘরের মধ্যে বাতাস স্বাভাবিক হলে আবার টিকটিকিগুলো আসে। মিথুন শুয়ে শুয়ে টিকটিকিদের দেখে। দেখতে দেখতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।
বুয়া চলে যাবার পর মিথুন দিনের বেলাতেই ঘরের বাল্বটা জ্বেলে দেয়। টিকটিকিদের কাউকে দেখা গেল না। ওরা কি তবে দিনের বেলা কোথাও ঘুমায়? কোথায় ঘুমায়? মিথুন অনেক চেষ্টা করেও টিকটিকিদের ঘুমানোর স্থান খুঁজে বের করতে পারে না।
টিকটিকিরা ভালোভাবে খেতে পারবে ভেবে মিথুন একদিন দেয়ালে সুপার গ্লু লাগিয়ে তার সাথে কয়েকটা মাছি আরি একটা তেলাপোকা সেঁটে দিয়েছিল। কিন্তু দিনের বেলাতে তো খেলোই না এমনকি রাতেও টিকটিকিগুলো সেই মাছি ও তেলাপোকার কাছে ঘেঁষলো না। দুই একবার কোন কোন টিকটিকি মাছি ও তেলাপোকার কাছে এসে মুখ লাগিয়ে শুঁকে শুঁকে চলে গেল। সুপার গ্লু থাকাতেই কি ওরা মাছি ও তেলাপোকাকে অখাদ্য ভাবলো? মিথুন প্রতিদিনই ভাবে টিকটিকিদের তবে কী খেতে দেয়া যায়? আজকাল তো টেলিভিশনে পশু-পক্ষী ও কীট-পতঙ্গের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে মানুষ অনেক আলোচনা করে। টিকটিকিদের খাদ্য সম্পর্কে কোন টিভি চ্যানেলে কি আলোচনা-টনা হয়?
মিথুন খাটে শুয়ে টিভিটা ‘অন’ করলো। মিথুনের প্রিয় চ্যানেল ‘কার্টুন নেটওয়ার্ক’ আর ‘জিওগ্রাফি’। ‘টম এন্ড জেরি’ হচ্ছে। এটা মিথুনের ফেবারিট। অল্প সাউন্ডে কার্টুন ছবির সংলাপ ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিস্তব্ধ বাসায় কেমন একটা ঝিম ঝিম ভাব আনে। সেই ভাবে মিথুনের চোখে ঘুম নেমে আসে। একসময় মিথুন ঘুমিয়ে পড়ে।
কতক্ষণ সে ঘুমিয়েছিল বলতে পারবে না। হঠাৎ কোন কিছুর শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার পরে মিথুন বুঝতে পারে না কিসের শব্দে তার ঘুম ভেঙেছে। তবে ক্ষণিক পরেই তার কানে ভেসে আসে নিকটস্থ মসজিদ থেকে জোহর নামাজের আজান। মিথুন ভাবে আজানের শব্দেই বোধ হয় তার ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু মিথুনদের বাসার কলিংবেলটা বেজে উঠতেই সে বুঝতে পারে আজান নয় কলিংবেলের শব্দেই তার ঘুম ভেঙেছে। কেন না এখনও তো আব্বু-আম্মুর অফিস থেকে ফেরার সময় হয়নি। তবে কে কলিং বেল বাজালো? ফকির-টকির নয় তো? যে-ই হোক কেউ যখন দরজায় দাঁড়িয়ে তখন মিথুনকে উঠতেই হয়।
দাদাজান এসেছেন! দাদাজানকে দেখেই মিথুন চিৎকার করে ওঠে। তারপর সে যেভাবে ‘মণি আন্টি চাবি দিয়ে যাও’ বলে চিৎকার করে উঠেছে সেটা শুনে মণি আন্টি কোনো বিপদ ভেবে তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছিলেন। বুঝি বা মিথুনের কণ্ঠ শুনে দাদাজানও চমকে উঠেছিলেন। তবে চমকে তিনি সত্যিই উঠলেন যখন দেখলেন বন্দী মিথুনকে মুক্ত করার জন্য পাশের বাসা থেকে মণি আন্টি এসে কলাপসিবল গেট খুলে দিলেন।
দাদাজান কৌতূহল দমন করতে না পেরে মণি আন্টি চলে যাবার সাথে সাথে মিথুনের কাছে জানতে চায় কেন তাকে এভাবে তালা দিয়ে আটকে রাখা হয়। মিথুন এর জবাব দিলে দাদাজান ‘হায় আল্লাহ!’ বলে খাটের ওপর বসে পড়েন। দাদাজান আপন মনে বলতে থাকেন, একটা মাসুম বাচ্চাকে একা একা ঘরের মধ্যে বন্দিজীবন কাটাতে হয়। এ কেমন সভ্যতা-কেমন দেশ! দাদাজান রাগে গজগজ করতে থাকেন। দাদাজান মিথুনকে কোলে নিয়ে ওর গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে খুব কষ্টে ভেতরের কান্না গোপন করলেন।
দাদাজান বারবার আফসোস করে বলতে থাকেন, ছেলেকে বাসায় বন্দী করে রেখে মায়ের চাকরি করার কী দরকার! এত টাকা কী হবে?… সূর্যের আলোয় শিশুরা খেলবে না, বৃষ্টিতে ভিজবে না, আকাশ দেখবে না, ফুলের সৌন্দর্য দেখবে না… কেন তবে শিশুরা জীবনের বোঝা বইবে? কাদের জন্য, কেন শিশুদের এভাবে বড় হতে হবে?
মিথুন দাদাজানের সব কথা বোঝেনি। আর অন্তত আজ সে কিছু বুঝতেও চায় না। আজ যে তার দাদাজান এসেছেন। দাদাজানের সাথে সে যে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাবে! মিথুনের দু’চোখে ভেসে ওঠে দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষেক্ষেত। যে সর্ষেক্ষেতের সবগাছ ধরণীর সবাইকে সংবর্ধনা জানাতে হলুদ ফুলের ঝাণ্ডা নাড়ে। সর্ষেক্ষেতের পাশেই মটরশুটির ক্ষেত! পৌষের ভোরবেলা মটরশুটির ক্ষেতে খালি পায়ে হাঁটলে পায়ের তলায় যেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব শরীরে কাঁপন তোলে, মিথুনের সারা শরীরে এখন সেই কাঁপন।
সেই কাঁপন মিথুনকে জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখায়। মিথুন যেন আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পরীদের মতো। সে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। একে একে তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে বিলের পানিতে শির উঁচু করে রাখা ধানক্ষেত, মহিষের পিঠে চড়ে বিলে যাওয়া রাখালরাজা, নদীতে পালতোলা নৌকার বহর, হলুদ পরীদের মতো সর্ষেফুলের ক্ষেত আর দিগন্তজোড়া মটরশুটির ক্ষেত। মিথুন যেন দাদাজানের হাত ধরে শীতের পড়ন্ত বিকেলে মটরশুটির ক্ষেতে হাঁটছে। মিথুনের খালি পায়ে মটরশুটির গাছেরা সুড়সুড়ি দিচ্ছে! মিথুন হাসতে হাসতে দাদাজানের হাত ধরে সামনে এগিয়ে চলছে। তাদের সামনে পেছনে ডাইনে বায়ে সীমাহীন ফসলের মাঠ…!

SHARE

Leave a Reply