Home তোমাদের গল্প নাফিসের ফিরে আসা

নাফিসের ফিরে আসা

মো: রফিকুল ইসলাম|

Toma-golpoদুরন্ত এক ছেলে নাফিস। তার সুন্দর আচরণ ও মায়াবী চেহারায় কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারে না। পিতামাতার স্বপ্ন নাফিস লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে। শুধু সার্টিফিকেটের জন্য নয় বরং জ্ঞানার্জেনর জন্য লেখাপড়া করবে। ¯েœহের নাফিস হবে একজন আদর্শ মানুষ। তাকে দেখে মানুষ আলোকের সন্ধান পাবে। সে হবে বাতিলের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, মজলুমের আশ্রয়স্থল। পৃথিবীর আদর্শ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা, বীজগণিতের জনক আল খাওয়ারিজমি, রসায়নবিদ আল ফারাবি এরা সবাইতো মানুষই ছিলেন। তাহলে নাফিস কেন পারবে না! অবশ্যই পারবে।
নাফিসের মা-বাবা চিন্তার গভীরে ডুবে যান। নাফিস এখন বড় হয়েছে। গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হলো। মেধাবী ও ব্যবহার ভালো হওয়ায় অল্প দিনের মধ্যেই শিক্ষকদের মন জয় করে ফেলল সে। এখন স্কুলের সকল ছাত্র-শিক্ষক তার ভালো বন্ধু। পরীক্ষায় হোল স্কুলে ফার্স্ট হলো। নাফিসের আব্বু-আম্মুর খুশির অন্ত নেই। খুশি হলে কী হবে? সে যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান!
নাফিসকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন পূরণের বুকভরা আশা নিয়ে টাকা উপার্জনের জন্য বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমালেন। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা উপার্জন করে দেশে পাঠাতে লাগলেন। দেখতে দেখতে নাফিসও দিন দিন বড় হতে লাগল। ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। এখন কোনো লেখা পড়ার চাপ নেই শুধু খেলাধুলা আর আত্মীয় বাড়ি বেড়ানো। কয়েকদিন পরই ক্লাস ফাইভের বার্তা নিয়ে নতুন বছর আগমন করবে। এ দিকে মা চিন্তা করলেন ছেলেকে শহরের কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দেবেন। তাই উপজেলা সদরে আরামবাগে একটি বাসা ভাড়া করে সেখানে চলে গেলেন। নাফিসকে ভর্তি করে দিলেন শহরের এক নামকরা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে। এখানেও তীক্ষè মেধা ও সুন্দর ব্যবহার দিয়ে সবার মন জয় করে ফেলল নাফিস। আশপাশের সকল বাসার লোকজনও তাকে স্নেহ করে। দেখতে দেখতে নাফিস এখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। কিন্তু নাফিসকে নিয়ে মা এখন কেমন যেন সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। ক্লাস এইট থেকে ছেলে কেমন যেন হয়ে গেছে। এখন আর মায়ের কথা শুনে না। বাবা যে বুকভরা আশা নিয়ে এত কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে দেশে পাঠাচ্ছেন শুধুমাত্র ছেলেকে মানুষ করার জন্য, তা যেন নাফিস বুঝতেই চায় না। সারা দিন খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, টেলিভিশন দেখা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। লেখাপড়ার কোনো খবরই নেই। ক্লাস এইটে এ প্লাসও পায়নি। মা চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছেন। এত ভালো ছেলে কিভাবে এমন খারাপ হয়ে গেল? তাহলে কি এতদিনের স্বপ্নগুলো ধুলায় মিশে যাবে? অতীত স্মৃতিগুলো মনে করে মা শুধু এখন নিভৃতে কান্না করেন। আর মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করেন-মহান আল্লাহ যেন নাফিসকে সঠিক পথের দিশা দান করেন।
নাফিসের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তার প্রিয় শিক্ষক আব্দুল্লাহ স্যার। শিক্ষকবৃন্দ হতবাক এ কেমন রেজাল্ট করল নাফিস! বিছানা থেকে উঠে অজু করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ে মহান আল্লাহর দরবারে নাফিসের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করলেন। দিনের বেলায় লক্ষ করতে লাগলেন নাফিস কাদের সাথে চলাফেরা করে। তিনি দেখতে পেলেন তারা একদল উচ্ছৃঙ্খল কিশোর। স্কুল পালানো, পড়ায় ফাঁকি দেয়া যাদের নিত্যদিনের কাজ। তাদের মাঝে কেউ কেউ ধূমপানও করে। নতুন প্রজন্ম কিভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাদের কিভাবে ভালো পথে ফিরিয়ে আনা যায় চিন্তা করতে করতে আব্দুল্লাহ স্যার ঘুমিয়ে গেছেন। পরদিন নাফিসকে ক্লাস শেষে স্যারের বাসায় দেখা করতে বললেন।
নাফিস ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরে দেখতে পেল মায়ের চোখে পানি। মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। মা এমন শুকিয়ে গেছেন কবে, এমন রোগা দেখাচ্ছে কেন? এতদিন তো খেয়াল করিনি। মা চোখের পানি মুছে খাবার প্লেট রেডি করে নাফিসকে ডাকলেন।
নাফিস চিন্তার গভীরে ডুবে থাকায় মায়ের ডাক শুনতেই পেল না। নাফিস, নাফিস এই নাফিস খেলতে যাবি না? ডাকতে ডাকতে বন্ধুরা ব্যাট, বল নিয়ে বাসায় হাজির। তোর জন্য কখন থেকে অপেক্ষা করছি, একটু পরে সন্ধ্যায়ই হয়ে যাবে। নাফিসের চিন্তায় ছেদ পড়ল। বিরক্তির সাথে বলল তোরা যাতো, আজকে মন খারাপ।
বন্ধুরা সবাই হতাশ হয়ে চলে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে চারটা বেজে গেছে। না খেয়েই সাইকেল নিয়ে চলে গেল স্যারের বাসায়, কলিং সুইচ চাপ দিতেই দরজা খুলে দিলেন আব্দুল্লাহ স্যার। আসসালামু আলাইকুম স্যার।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। নাফিস আসছ! মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নাফিসকে স্যার পাশে বসালেন। নাফিসের আব্বু-আম্মু এবং তার লেখাপড়ার অবস্থা জানার চেষ্টা করলেন। জানতে চাইলেন নাফিস তোমার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কী, তুমি কী হতে চাও?
আমি লেখাপড়া করে চাকরি করব স্যার।
কী চাকরি করবে? স্যার জিজ্ঞাস করলেন।
কোন সরকারি চাকরি অথবা কোম্পানি চাকরি। জবাব দিলো নাফিস।
নাফিস, বাবা শোন, এইম ইন লাইফ রচনা শুধু পরীক্ষায় নাম্বার পাওয়ার জন্য শিখলে হবে না বরং তোমার নিজের জীবনের লক্ষ্য আগে নির্ধারণ করতে হবে। মাঝিবিহীন নৌকা যেমন লক্ষ্যহীন জীবনও তেমন। কেউ যদি ডাক্তার হতে চায় তাকে ক্লাস নাইন থেকে জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়তে হবে, আবার কেউ যদি ক্যাডেট হতে চায় তাকে ক্লাস সেভেনে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে হবে। আমাদের দেশে দেখ কত মানুষ অনার্স-মাস্টার্স করে বেকার অবস্থায় ঘরে বসে রয়েছে! নাফিস, তুমি কি জান কেন এমন হয়েছে। এর কারণ হলো তারা লক্ষ্যহীনভাবে লেখাপড়া করেছে, শুধু সার্টিফিকেটের জন্য লেখাপড়া করেছে, জ্ঞানার্জনের জন্য পড়েনি। এখন কোথায়ও ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরিও পায় না, আবার জ্ঞান না থাকা নিজেও কোন আয়ের উৎস উদ্ভাবন করতে পারে না। এখন তারা দেশের সম্পদে পরিণত না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়েছে। আমরা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। অথচ উন্নত রাষ্ট্রগঠনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই আমাদের দেশে রয়েছে। রয়েছে প্রচুর খনিজসম্পদ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হতাশার শ্বাস ছেড়ে বললেন, অভাব শুধু জ্ঞানী মানুষের, যারা এগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে আমাদের দেশকে সোনার দেশে পরিণত করবে। অভাব আদর্শ রাজনীতিবিদের। ৪২ বছরেও আমরা পারিনি উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে।
নাফিস গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনছিল স্যারের কথাগুলো।
এখন থেকে তোমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার জন্য। নিজেদেরকে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গঠন করতে হবে। কী পারবে না নাফিস? তোমাদের পারতেই হবে।
ইনশাআল্লাহ পারব স্যার, বলল নাফিস।
তাই এখন ক্লাস ফাইভ থেকে আমাদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। এবং শুধু জ্ঞানার্জনের জন্যই বাস্তবমুখী, গবেষণাধর্মী লেখাপড়া করা উচিত। নাফিস, তুমি কি কখনো খেয়াল করেছ তোমার আব্বু তোমাকে কতো ভালবাসতেন, কতো আদর করতেন। লেখাপড়া করে তুমি আদর্শ মানুষ হবে, অনেক বড় চাকরি করবে, দেশের সেবা করবে, তোমার আব্বু-আম্মুকে সুখে রাখবে, বুকভরা আশা নিয়ে আজ তোমাদের রেখে একাকী বিদেশের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কত কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করছেন। তোমার আম্মু তোমাকে কত ভালোবাসেন! তুমি ডাক্তার হবে এই স্বপ্ন নিয়ে সবাইকে গ্রামে রেখে ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য শুধু তোমাকে নিয়ে শহরে থাকেন।
স্যারের কথাগুলো শুনে নাফিস জীবনে কত ভুল করেছে, আব্বু-আম্মুকে কত কষ্ট দিয়েছে আজ তা বুঝতে পারল। অতীত স্মৃতিগুলো মনে হয়ে চোখের পানিতে বুক ভেসে গেল। স্যার নাফিসকে সান্ত্বনা দিলেন এবং দোয়া করলেন সে যেন আব্বু-আম্মুর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
নাফিসও স্যারকে কথা দিল এখনই বাসায় গিয়ে আম্মুর কাছে ক্ষমা চেয়ে ভালো হয়ে যাবে। আর আব্বু-আম্মুর মনে কষ্ট দেবে না। আর খারাপ ছেলেদের সাথে চলবে না। ভালোভাবে লেখাপড়া করে আব্বু-আম্মুর স্বপ্ন পূরণ করবে, ইনশাআল্লাহ।

SHARE

Leave a Reply