Home ভ্রমণ ক্যাঙ্গারুর দেশ কোয়ালার দেশ

ক্যাঙ্গারুর দেশ কোয়ালার দেশ

দিলারা মেসবাহ
দূরে কোথায় দূরে দূরে
আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে
যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে সেই বাঁশিটির সুরে সুরে
যে পথ সকল দেশ পেরিয়ে
উদাস হয়ে যায় হারিয়ে
সে পথ বেয়ে কাঙাল পরান
যেতে চায় কো অচিনপুরে।

আমরা ১০ মে ২০১৩ সিঙ্গাপুর এয়ালাইন্সের ডানায় উড়াল দিয়ে অচিনপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম, আমাদের ছেলে তানভীর আহমেদ তমালের বারংবার অনুরোধ উপরোধে। আমাদের মনও উদাসীন হয়েছিল নাতি মাহরুস সাফির আহমেদ ও বৌমাকে দেখার জন্যে। মনে মনে নতুন দেশ অস্ট্রেলিয়া দেখার ইচ্ছাটাতো ছিলই।
১১ মে বিকেলে নরম রোধে সিডনির এয়ারপোর্ট মায়াবী মনে হল। অবশ্য সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্ট খুব সুন্দর আকর্ষণীয়। যা হোক আমরা প্রথমবারের মতো অ্যাসিসট্যান্ট নিয়েছিলাম। পথে কোন হেনস্থা হয়নি। এয়ারপোর্টে আমাদের মালসামানা একজন সুদর্শনা হাস্যময়ী মেয়ে ট্রলিতে ঠেলে নিয়ে গেল। একটু এগুতেই দেখি তমাল দাঁড়িয়ে আছে। হাসিমুখে। বাসায় এসেই মাহরুসকে কোলে নিয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দিলাম। একটু পরে দাদাভাইয়ের কোলে গেল দাদুভাই।
খাবার টেবিলে বসে নানা বিষয়ে কথা হল। তমালের বাড়িটা কোয়াকারস হিল, নিউ সাউথ ওয়েলসে। সুন্দর পরিবেশ।
ডুপ্লেক্স বাড়িটার আলো হাওয়া খেলানো ঘরটি আমাদের জন্যে বরাদ্দ করে রেখেছে তমাল বৌমা তামিমা। তমাল আমাদেরকে নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরবে তার নীলনকশা করতে শুরু করে দিল।
অস্ট্রেলিয়া গাঢ় সবুজ গাছগাছালি মায়াবী পাখপাখালি আর বিরল অদ্ভুত জীবজন্তুর দেশ। চাক্ষুষ না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না। এখানকার গরু, ঘোড়া বিখ্যাত। বিখ্যাত মেরিনো ভেড়ার পশম থেকেই এখানে গরম পোশাক কার্ডিগান সোয়েটার ইত্যাদি তৈরি হয়। বিদেশে রফতানি হয়। আমাকে বিমুগ্ধ করল ঐ বিশাল নীলাকাশ। স্বচ্ছ অপূর্ব জলরঙের ফিরোজা রঙের আকাশ। পূর্ণিমার চাঁদ তেঁতুল মাজা কাসার থালার মতো ঝকঝকে। আমি বিমোহিত হয়ে দেখতাম আর বিশ্ববিধাতার সৃষ্টি নৈপুন্যের কথা স্মরণ করে শুকরিয়া আদায় করলাম। চকচক হয়ে আসছে দুইচোখ আনন্দে কৃতজ্ঞতায়।
এই সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় তমালদের বাড়িতে বসে ঘুঘুর ডাক শুনে প্রাণমন জুড়িয়ে যেত। নস্টালজিক উদাসীন হয়ে উঠত গহীন অন্তর। ঢাকায় বসে ঘুঘুর ডাক শুনিনি। কখনও। কালভদ্যে কোকিলের কুহু শুনেছি অবশ্য। ঘুঘুর ঐ করুণ উদাস ‘ঘু-উ ঘু-উ’ আমার খুবই প্রয়। কিছুদিনের মধ্যে সিডনি আমার প্রিয় হয়ে উঠল। মে মাসে আবহাওয়া ছিল চমৎকার। এরপর জুনের শেষ দিকে একটু ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করল। তমালরা অভ্যস্ত। এই ঠাণ্ডা ওদের কাবু করে না। ঘরে অবশ্য হিটার চলে। মেসবাহ সাহেব কানটুপি হ্যান্ডগ্লাভস মাফলার ভারী সোয়েটার ইত্যাদি পরে মনিং ওয়াকে বের হতেন।
সিডনি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী। সবচেয়ে প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম ব্যস্ত শহর। সিডনি হারবার বা পোতাশ্রয়ের জন্য পৃথিবী-বিখ্যত। এখানকার হারবার ব্রিজটিও দেখার মতো। এই তিনতলা ব্রিজটি তৈরি করতে লেগেছিল আট বছর। এই ব্রিজের উপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় পনেরো হাজার যালবাহন চলাচল করে।
সমুদ্রের তীরে অসংখ্য গাঙচিল বুনোহাঁস ম্যাগপাই পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে। আমরা যেদিন ফ্রেশ ফিস মার্কেটে ফ্রেশ গলদা চিংড়ি ও অন্যান্য আইটেম খেতে গেলাম সেদিন দেখলাম বাইরে ছাউনির নিচে যাঁরা দেখতে বসেছেন তাদের প্লেট থেকে খাবার টুক করে খাচ্ছে গাঙচিলগুলো। খুব মজার সে দৃশ্য। ওদের প্রাণে একটুও ভয়ডর নেই। পাশের বাড়িতে এত বেশি কবুতর আনাগোনা করত সে ওরা একটা নকল বাজপাখি ঝুলিয়ে রেখেছে। যাতে কবুতরগুলো ব্রাকইয়উটা না নোংরা করে। তবু দেখেছি পাশের বাসায় কার্নিশে কয়েকটি কবুতর ‘বাকুম বাকুম’ করছে।
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশেটি আটটি অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত। ভিক্টোরিয়া কুইনস্ল্যান্ড, নিউ সাউথ ওয়েলস, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া, মধ্য অস্ট্রেলিয়া, নর্দান টোরিটেরি  ও তাসমানিয়া।
বড় বড় শহরগুলো হল সিডনি দ্য মেলবোর্ট, ব্রিসবেন, এডেলেইড, তাসমানিয়া ডারউইন পার্থ, গোন্ডকোস্ট।
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা। অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ। শতকরা ৮০ ভাগ লোক বাস করে শহরে। সেখানে প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ২ জন লোক বসবাস করে। এখানকার গ্রামঅঞ্চলে যতলোক বাস করে তার তুলনায গবাদি পশু আর ভেড়ার সংখ্যা বেশি।
অস্ট্রেলিয়ায় তমালের সঙ্গে কাঁচা বাজারে গিয়েছিলাম বারকয়েক। সবজিগুলো তাজা। সুন্দর করে সাজানো। তিন চার রঙের ক্যাপসিকাম দেখলেই কিনতে ইচ্ছে করে।
আপেল, কলা, পিচ, চেরি, স্ট্রবেরি, পারসিমন, আঙুর আরও কত কী! ভারত থেকে আসে উন্নতমানের গরম মশলা। তমাল আমাকে ৬০ ডলার দিয়ে এক কেজি সবুজাভ এলাচি কিনে দিল। দূর থেকে ওর সুগন্ধ পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেযে বড় নদী মারে ডালিং। ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। ডিভাইডিং পর্বতমালার পশ্চিম ঢালের আলবাস পাহাড়ের কোশিয়াযুস্কো থেকে এই নদীর উৎপত্তি। পর্বতমালার পশ্চিম দিকে রয়েছে এই নদীর বিরাট অববাহিকা অঞ্চল। মহাদেশের প্রধান শস্যভাণ্ডার রয়েছে সেখানে। গম, ভুট্টা, সূর্যমুখী আর যবের আদিগন্ত বিস্তৃত শস্যক্ষেত। সেখানে উর্বর জমিতে চড়ে বেড়ায় বিখ্যাত মেরিনো ভেড়ার দল। এই ভেড়ার পশম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি করা হয়। এ এলাকার রফতানি দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে দুগ্ধজাত খাদ্যসামগ্রী মাখন ইত্যাদি। অস্ট্রেলিয়ার আরো দুটি উপনদী হচ্ছে লাচৎলান ও মুরামভিজি। এখানে নানা অঞ্চল নানা ধরনের খনিজ সম্পদে ভরা।
পর্বতমালার পুব ঢালে অবিরত বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এই প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানে সৃষ্টি হয়েছে জধরহ ভড়ৎবংঃ বা বৃষ্টিধোয়া অরণ্য।
স্যাঁতসেতে গহীন বনাঞ্চল। বহু ধরনের বিরল প্রাণী আর পাখির অভয়াশ্রম। সেখানে ফলে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল, কলা, আম, লিচু। অন্যান্য বৈচিত্র্যপূর্ণ অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী আর উদ্ভিদের জগৎ। জীববিজ্ঞানীদের কাছে এই মহাদেশ এক কৌতূহলের জায়গা।
আমরা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে এখানকার বিভিন্ন জাদুঘর, চিড়িয়াখানা ও পার্কে গেছি। সিডনি ন্যাশনাল মিউজিয়ামে ঢুকে আমার মন আনন্দে আনন্দে ভরে গেল। বিশাল ডাইনোসরের ফসিল থেকে শুরু করে আরো বিচিত্র দ্রব্যাদির সমারোহ। আধিবাসী বা অ্যাবরজিনদের জীবনাবসানের বিভিন্ন চিত্র দেখলাম আগ্রহ ভরে।
ওদের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র এক ধরনের বাঁশি, নিত্যদিনের ব্যবহার্য ঠুকরি, ঝুড়ি এবং আর্টে এক অপূর্ব আমেজ খুঁজে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বহু প্রবাল, রতœ ও পাখির ফসিল যতœ সহকারে সাজানো আছে।
এবার আসি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত অপেরা হাইজের কথায়। প্রথম দর্শনেই মন মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে যেন। এই অপূর্ব অপেরা হাউজে আর্কেস্ট্রাবাদন শোনার জন্য ছেলে টিকেট কেটে আসল। সারি সারি গ্যালারি ঝুড়ে অসংখ্য শ্রোতা। আমরা নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসলাম। শুধু হল অপূর্ব সুরলহরী। সারা স্টেজ জুড়ে বাদ্য যন্ত্র নিয়ে সান্ত্রীরা বসেছেন। বাজাচ্ছেন অপূর্ব সুরে একই ছন্দে একই লয়ে। ম্যাজিক যেন। যে কেউ বিমোহিত হবেন। আমরা বিমুগ্ধ। অপেরা হাউজটির স্থাপত্য অসাধারণ। মনে হয় পাটির উপর ভাসমান কয়েকটি নৌকার সফেদ পাল। আবার মনে হতে পারে শ্বেতশুভ্র বিশাল রাজহাঁসের ঝাঁক। অলৌকিক হংসের সমষ্টি যেন। এর তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে আর শেষ হয় ১৯৭৩ সালে। তেইশ তলা সমান উঁচু এই অপূর্ব ভবনটিতে দুই হাজার ছয়শ নব্বইটি আসনসহ একটি কনসার্ট হল, একটি ড্রামা থিয়েটার ও একটি প্লে-হাউজ আছে। বাইরের চত্বরটিও বিস্তৃত, সুদৃশ্য। এখানে কৃত্রিম ঝর্ণধারা, চমৎকার ভাস্কর্য, বিপণী বিতান, রেস্তোরাঁ আছে।
একদিন আমরা জাহাজে করে আলোকিত ম্যাজিকে অপরূপ অপেরা হাউজ ও সুদৃশ্য আলোকময় উজ্জ্বল হারবার ব্রিজ দেখলাম। ওখানেই ডিনার করলাম। আমি, মেসবাহ সাহেব, তমাল, বৌমা তামিমা ও মাহরুস সবাই ছিলাম সে যাত্রা। খুবই উপভোগ্য ছিল সে যাত্রা। চমৎকার লাইটিং-এ অপূর্ব কৌশলে মনটাও অলোময় হয়ে উঠল যেন।
এ পর্যন্ত সেখানেই যাই সেখানেই যেন জপানীদের ভীড়। হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত বয়স্কা জাপানীরাও দারুণ কৌতূহলী। হাতে হাতে ক্যামেরা, দলে দলে হে হৈ করে উপভোগ করছে।
২৯ মে আমরা সকাল ১০টায় বেরিয়ে পড়লাম মাদাম তুসোর মোমের মিউজিয়াম দেখতে। লন্ডনে মাদাম তুসোর মিউজিয়ামটি দেখতে পায়নি সময়ের অভাবে। মনে একটা অতৃপ্তি ছিল। যাহোক, সৌভাগ্য হল অস্ট্রেলিয়া এসে। সেদিন মোমের মিউজিয়াম, ওয়াইল্ড লাইফ, অ্যাকুইরিয়াম দেখলাম। চমৎকার, অত্যন্ত চমৎকার মিউজিয়ামে ঢুকতেই অস্ট্রেলিয়া নামের এই সুন্দর দ্বীপটির আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন কুকের মোম মূর্তি। পুরো কক্ষজুড়ে জাহাজের মোটা দড়ি-পাল, কাঠের বিশাল স্টিয়ারিং সাজানো। মনে হয় এইমাত্র ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়ার অস্তিত্ব আবিষ্কার করলেন। তমাল ক্যাপ্টেন কুকের পাশে রাখা চেয়ারটিতে আমাকে ও ওর বাবাকে বসিয়ে ছবি তুললো। দর্শনার্থীদের জন্যে এ ব্যবস্থা। ভিতরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, রানী এলিজাবেথ, অড্রে হেপবার্ন এরকম আরো অনেক জগৎবিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মোম মূর্তি। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। প্রতিটি মূর্তির পাশে সংক্ষিপ্ত পরিচিত্রি লেখা আছে। এরপর আমরা অ্যাকুইরিয়ামে ঢুকলাম। বিস্ময় আর বিস্ময়। শার্ক, বিশাল হাতির কানের সমান স্পটেড মাছ, এছাড়াও নানা বর্ণের নানা আকৃতির ছোট ছোট মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে। একেক অ্যাকুইরিয়ামে বিশেষ বিশেষ প্রজাতির মাছ দৃশ্যমান। কোরাল শোভিত অ্যাকুইরিয়ামও আকর্ষণণীয়। অক্টোপাস, জেলিফিস আরো কত নাম না জানা মাছের বর্ণাঢ্য মিছিল। সব মাছগুলোর পাশে নামধাম লেখা ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে ভালো করে পড়া হল না। কয়েকজন কর্মী ডুবুরির পোশাক পরে অ্যাকুইরিয়াম পরিষ্কার করছিলেন ব্রাশ দিয়ে। ছোট ছোট ডলপুতুলের মতো জাপানী বাচ্চা ও তাদের অভিভাবকদের কলকাকলিতে আধো আলো আধো অন্ধকার শিহরণ জাগানো পরিবেশ বেশ জমে উঠেছিল।
অঁংঃৎধষরধহ ৎবঢ়ঃরষব ঢ়ধৎশ-এ ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে গেলাম এক সকালের দিকে। কী যে মজার পার্কটি! এ যেন আর এক বিস্ময়কার ভুবন। কী নেই এই রাজ্যে। সাপখোপ, বিশাল অলস কুমির, গুইসাপ, গিরগিটি, মাঠময় বিচরণ করছে এমু পাখি, ক্যাঙ্গারুÑ অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত প্রাণী। আর গাছের ডালে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে লাজুক কোয়ালা, কচি পাতা খায় আর জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে ভীতু ভীতু চোখ মেলে। বাচ্চারা বুড়োরা ক্যাঙ্গারুকে খাবার দিচ্ছে। একদিকে দেখলাম ক্যাঙ্গারুদের বিশ্রামঘর।
এখানে ওদের বিরক্ত করা নিষিদ্ধ। বিশাল কাঁটাভরা কুমিরটি পুরো শরীর পানিতে ডুবিয়ে মাথা তুলে রেখেছে পানির উপরে। তমাল অনেক কসরত করেও পুরো শরীরখানার ছবি তুলতে পারল না। অবশ্য স্বচ্ছ পানিতে আমরা তার খসখসে শরীর লেজ পা আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম।
মধ্যে মধ্যেই তমাল আর তামিমার আগ্রহে বাইরের নানা ধরনের খাবার খেয়েছি। ৩০ মে সন্ধ্যায় আমরা মহারাজার হাভেনাতে ইন্ডিয়ান খাবার খেতে গেলাম। ভেতরে অভিনব কায়দায় সাজানো রিকশা, ট্রাক, ঘোড়ার গাড়ি, কর্মরত রমনী আলোকমালায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী মসল্লা দোসা আলি মিল খেলাম। দোসার আকৃতি ত্রিকোণাকার পাখার সাইজের। শেষ পাতে রসগোল্লা মসল্লা চা মিষ্টি পানে।
একদিন বাহাই স্টোরে যেয়ে মনটা শান্তিতে ভরে গিয়েছিল। এই স্টোরের মূলমন্ত্র হল ড়হবহবংং ড়ভ এড়ফ – বিশ্ববিধাতা একজনই। সর্বধর্মের মূল সারসত্য। এখানে চারদিকে সবুজ চত্বর। গাছভরা প্রস্ফূটিত ফল। অপূর্ব শান্তি ছায়া বাহাই স্টোর। এখানে হাস্যমুখী বিনয়ী মহিলা কর্মীরা আমাদের সাদরে আহ্বান জানালেন। আমরা ১৮ মিনিটের ডকুমেন্ডারি ভিডিওচিত্র দেখলাম।
একদিন প্ল্যান হল আমারাবরু মাউন্টেন দেখতে যাব। আল্লাহর সৃষ্টি এ বিশ্বভুবন কত না মনোহর। মন আনন্দে টইটম্বুর হয়ে উঠল। যেন এ অবারিত নীলাকাশ তার ঘড়া ভরা নীলাভ রং উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে। দূরে নীল নীল আভাময় ব্লু মাউন্টেন। কবিগুরুর কয়েকটি পঙ্ক্তি মনে পড়ল-
এ আকাশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণে
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছিলাম স্থান,
বিস্ময় তাই জাগে আমার গান
ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে।
ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান

এখানে আছে তিনটি পাথরের খাড়া স্তুপ। ‘থ্রি সিস্টারস’ নামে বিখ্যাত। নিচে বিশাল খাদ। ফার্ণ ও নানাজাতীয় গাছগাছড়া লতাগুল্ম। এখাানকার অনড়ৎড়মরহ বা আদিবাসীরা এটাকে আধ্যাত্মিক সাধন ক্ষেত্রের মর্যাদা দিয়ে থাকে। আমরা ঝশুধিু পধনষব পধৎধ-এ উঠলাম টিকেট কেটে। পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাত্রা। নিচে গহীন খাদ। তাকালে গা ছম ছম করে। কী দারুণ অভিজ্ঞতা! আল্লাহকে হাজার শুকরিয়া সহি-সালামতে এই ভ্রমণ শেষ হল। আমাদের সঙ্গে গেরুয়া পোশাক পরা একদল বুড্ডিস্ট ছিল। হাসিখুশি মেজাজে তারাও উপভোগ করছিল। এরপর টয়ট্রেনযাত্রা। একবার একেবারে নিচে আবার উপরের দিকে। ভয়ে উত্তেজনায় গা ছম ছম করা অনুভূতি। সবচেয়ে দ্রুতগতি এবং অসম্ভব খাড়া ওই টয়ট্রেনভ্রমণ। দুপামে রেইন ফরেস্ট। নোটিশ আছে গাছ গাছড়ার যেন কেউ কোনরকম অনিষ্ট না করে।
আনন্দভরা মন নিয়ে সামনে গিফট শপ এবং গার্ডেনের দিকে ঘুরে ফিরে দেখরা মত। একটা পাম গাছের গায়ে লেখাÑ ডোড্রোনডন। আচমকা মনে পড়ল রবিঠাকুরের পঙ্ক্তি উঋত যত শাখার শিখরে রাজাড্রোনডন গুচ্ছ। আনন্দভরা মন নিয়ে ঘরে ফিরলাম।
মে মাসেই আমরা গেলাম ডড়ড়ষড়মড়হম ংবধ ইবধপশ-এ। অপূর্ব সাগরের অথৈ নীল জলরাশি। মাথার ওপর আটামের দিগন্ত বিস্তৃত নীলাকাশ। সাদা মেঘমালা ভেসে বেড়াচ্ছে। পেঁজা তুলোর মতো। তমাল সমুদ্র সৈকত থেকে একটু দূরে লেকের ধারে একটা সরাইখানায় আয়োজন করলো স্যালমন ফিস সবজি কাবাব আর নান রুটি। শীতার্ত দিনের রোদ পিঠে ফেলে আমরা খেলাম। এক ঝাঁক সীগাল উড়ে এল আমাদের দিকে। জলকবুতরগুলো একটুও ভয় পায় না। দূরে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। অসংখ্য বাড়িঘর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে। এখানে সব ধনাঢ্য ব্যক্তিরা থাকে।
বিয়ামা নিচে অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পাথরের বড় ছিদ্রপথে সমুদ্রের ঢেউ অনেক দূর পর্যন্ত উঠে নেমে যাচ্ছে। দুধের মতো সাদা ফেনা ছড়িয়ে। স্বর্গীয় অসাধারণ সে দৃশ্য। রুনু আমাদের সফরসঙ্গী হয়েছিল। ও আমার প্রিয় বোন।
এখানে শান্ত সুন্দর টেম্বল দেখলাম। ঘধহঃরবহ ওহংঃবঃঁঃব. দোতলায় বুদ্ধদেবের বিশাল মূর্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। সুগন্ধি ধূপকাঠ জ্বলছে। নিচে মখমল কোমল সবুজ চত্বর। গাছে গাছে ফুলের বাহার। মনে হয় এইমাত্র কোন শিল্পী তার জলরঙের শেষ টানটি দিয়েছেন। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের উপর পড়াশুনা ও গবেষণা হয়।
বলাবাহুল্য সিডনিতে অনেক সী-বিচ আছে। আমরা বেশ কয়েকটিতে গিয়েছিলাম। সিডনি শহরে ২০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে প্রায় ৩০টির মতো সী-বিচ আছে। বিচের ধারে পাহাড়ের গায়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি।
আমরা ডারলিং হারবারে নীতিসে বৌমাসহ গিয়েছিলাম। জায়গাটি খুব সুন্দর। চাইনিজ গার্ডেনে যেয়ে আমরা মুগ্ধ। এত সুন্দর রকি গার্ডেন। ঝিরিঝিরি পানির ফোয়ারা। নানা বকম গাছগাছালি, কী যে সুন্দর। ভাষা এখানে বাক্যহারা যেন। চীনা কিছু কিছু স্থাপনাও আছে দেখার মতো।
৩১ মে আমরা গেলাম এক রোমাঞ্চকর অভিযানে। এ নৌযানে সমুদ্রে বিস্ময়কর উত্তেজনাকর ভ্রমণ। প্রথমে কিছুই টের পাইনি ভেবেছিলাম। এমনি সহজ আনন্দে ভাসতে ভাসতে তিমি মাছের লম্ফ দেখে আসব। আমি আনন্দিত মনে সমুদ্রের ঢেউ দেখছি। দেশী বিদেশী বৃদ্ধ যুবক শিশু অনেক পর্যটক। খানিকক্ষণ বাদে শুরু হল দুলুনি। ক্যামেরা দূরবীণ ইত্যাদি হাতে সবাই দুলছে। কখন যে নীতিমিন দর্শন ঘটে? জলজ্যান্ত তিমি স্বচক্ষে দেখা বলে কথা।
তমালও তার দুটি ক্যামেরা ঝুলিয়ে অপেক্ষায় আছে। একটু পরে শুরু হল মধ্য সমুদ্রের প্রচণ্ড দুলুনি। উৎক্ষিপ্ত জলরাশি ছিটকে পড়ছে শরীরে। এরমধ্যে গার্ড ডোমিটিঙ ব্যাগ ঝুলিয়ে দিয়ে গেলেন। তখন ভাবছি আমি ভালই আছি। আমি নির্বিকার তিমি দর্শনের জন্যই উৎগ্রীব। খানিকবাদে ঐ ব্যাগগুলোর সদ্ব্যবহার শুরু হল। কম বেশি সকলেই নাকাল অবস্থা। মেসবাহ সাহেব সুস্থ আছেন চিৎকার করছেন ঐ যে ঐ যে তিমি। ফটো তুলছেন। ইয়ং কোরিয়ান ক’জন যুবকও টলেনি। বাচ্চাগুলোকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমে ছোট সাইজের দু’তিনটে তিমি দেখা গেল। পরে বিশাল এক তিমি অনেকটা পানিতে আলোড়ন তুলে ডিগবাজি খেল। সবাই নাকাল অবস্থা সত্ত্বেও উত্তেজিত চঞ্চল। আমি একবার চোখ খুলি আর একবার বন্ধ করি। ভয়ানক বমি। তমাল আমাকে জাপটে ধরে আছে। ছেলেটা মজা করে তিমি দেখতে পারছে না আমার জন্যে, সে জন্যে কষ্ট হচ্ছিল। আমার দি ওল্ডম্যান এন্ড দি সি’র কথা মনে কেন যেন পড়ল। অবশেষে ফিরে এলাম। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। দুইদিন সেই দুলুনির ঘোর যেন কাটতেই চায় না। খানিক রেস্ট নিয়ে মঞ্জুর সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে যেতে হল। উপভোগও করলাম। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাসায় দাওয়াত খেয়ে বেড়িয়েছি। রুনু, মঈন, সালেকিন সাহেব, রাশেদ, ইমতিয়াজ এদের আন্তরিক আপ্যায়নে খাওয়া-দাওয়া ও আড্ডায় ভুলে গেছি অস্ট্রেলিয়ায় বসে আছি। মনে হয় এ আমার চিরচেনা বাংলাদেশ। আমাদের ক্যাবেরা যাবার হোটেল বুকিং করেছিল তমাল। কিন্তু আমার ও নাতিটার অসুস্থতার জন্য তা হলো না। ডলারগুলো গচ্ছা গেল।
আর একদিন সিউনি ওয়ার দেখতে গেলাম। উঁচু টাওয়ার থেকে সিডনি শহর দেখার রোমাঞ্চই অন্যরকম। এরপর আমরা প্যাডিস মার্কেটে গেলাম। আমরা ছোট ইয়রিং করা যায় এমন কতগুলো ওপার কিনলাম। একটা সাদা বাকিগুলো ফিরোজা। এখানে চাইনিজ মার্কেটেং কিছু গিফট কেনাকাটা করলাম।
অস্ট্রেলিয়ার ঘরবাড়িগুলো বৃক্ষলতায় ছায়াচ্ছন্ন। অর্কিড, ক্যাকটাস, কাঠগোলাপ, জবা, আরো কত চেনা অচেনা ফুলে ঘরবাড়িগুলো ছেয়ে আছে। মনে হয় দরজায় যেয়ে কড়া নাড়ি। বাড়ির মানুষগুলো কেমন জীবনযাপন করে একবার দেখি।
অস্ট্রেলিয়ার  আকাশ জুন-জুলাইয়ে কখনও মেঘলা কখনও আলো ঝলমলে। তমাল গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদের যতগুলো দর্শনীয় জায়গা দেখালো তা যেন মনের খাতায় ছবি হয়ে রইল। অনিন্দ্য সুন্দর সিডনি শহর। ছেলেবৌ-এর আদর-যতœ, নাতি মাহরুজের মায়া পেছনে ফেলে ১২ জুলাই ২০১৩ আমরা ফিরে এলাম আপন ভেড়ায়।
বাংলাদেশ ফরমালিনের দেশ, গিজগিজ মানুষের দেশ, নানা অস্থিরতার দেশ। তবু ঘরে ফিরে একটা ভাললাগার শ্বাস পড়ল। নাড়ির টান বুঝি একেই বলে। সকল দেশেল সেরা সে যে আমার জন্মভূমি- এ সুরটি মগজে গেঁথে গেছে যে!

SHARE

Leave a Reply