Home স্মরণ ইমাম বুখারী (রহ)

ইমাম বুখারী (রহ)

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

ইমাম বুখারীর (রহ) না তোমরা শোননি এমনটি হতেই পারে না। বিশ্বখ্যাত মনীষীদের মাঝে ইমাম বুখারী এক অতুজ্জ্বল নাম। তিনি একাধারে ইলমে হাদিসের সঙ্কলক, ব্যাখ্যাকারী, গবেষক, উস্তাদ, ইসলামী ফিকহের রচয়িতা, উসুলবিদ, অলঙ্কারশাস্ত্রবিদ এবং আরবি সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধানকারী ছিলেন। ইমাম বুখারীর আসল নাম মুহাম্মদ। কুনিয়াত আবু আব্দুল্লাহ। তাঁর পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বিন ইবরাহিম বিন মুগীরা ইবনুল আহনাফ আল জুফি আল বুখারী। ইমাম বুখারী নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। মুহাদ্দিসীনরা তাঁকে আমিরুল মুনিনীন ফিল হাদিস, নাসেরুল আহাদিসীল নববিয়্যাহ, মাওয়াবিসীল মুহাম্মদিয়্যাহ উপাধিতে স্মরণ করে থাকেন। তিনি অনেক বড় মুসতাজাবুদ্দাওয়াত ছিলেন। এ পৃথিবীতে যে সমস্ত পণ্ডিত ও মুহাদ্দিসের অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতে মহানবী (সা)-এর হাদিস লালন ও চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, ইমাম বুখারী তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। তাঁর পিতার নাম আবুল হাসান ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুগীরা ইবনে বয়যয়রা। তাঁর পিতা একজন বড় মুহাদ্দিস ও মুজর্গ ছিলেন। ইমাম বুখারী হিজরি ১৯৪ সনের ১৩ শাওয়াল জুমআর দিন উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিত নগরী বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কালেই তাঁর পিতা ইহলোক ত্যাগ করেন। মায়ের স্নেহময় ক্রোড়ে তিনি আশেশব লালিত পালিত হন। তাঁর মাতা ছিলেন পরহেজগার, বুদ্ধিমতী এবং স্বামীর রেখে যাওয়া অগাধ বিত্তসম্পদের অধিকারিণী।
পাঁচ বছর বয়সেই মুহাম্মদকে বুখারার এক মাদ্র্রাসায় ভর্তি করে দেয়া হয়। শৈশবেই তাঁর অদ্ভুত মেধা ও স্মৃতিশক্তি সবাইকে চমৎকৃত করে। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি কুরআন হেফজ করেন। মক্তবে যখন তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করছিলেন, সে সময়েই তাঁর মরে হাদিস শিক্ষা লাভের আগ্রহ জন্মে। এ সম্পর্কে ইমাম বুখারী নিজেই বলেছেন, মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যস্ত থাকার সময়ই হাদিস মুখস্থ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমার উপর ইলহাম হয়।
বয়স দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই তিনি কয়েক হাজার হাদিস মুখস্থ করে ফেলেন। ষোল বছর বয়সে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ও ইমাম অকী সংগৃহীত সমুদয় হাদিস কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ শহর বুখারাতে সমসাময়িক প্রথিতযশা মুহাদ্দিসদের নিকট হাদিস শিক্ষা সমাপ্ত করে ২১০ হিজরিতে বিদেশ গমন করেন। তিনি সর্বপ্রথমে স্নেহময়ী মা ও বড়ভাই আহমদের সাথে ১৬ বছর বয়সে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা মুকাররমায় উপনীত হন। মা ও ভ্রাতা হজকার্য সম্পাদন করে বুখারায় চলে আসেন। কিন্তু তিনি হাদিস শিক্ষার জন্য মক্কায় থেকে যান। এ নগরী ছিল তৎকালীন খ্যাতনামা মুহাদ্দিসগণের মিলনস্থল। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি খ্যাতিমান হাদিস বিশারদ আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র আল হুমায়দীর দরবারে হাদিস শিক্ষা লাভের জন্য উপনীত হন। এ সময় তিনি ছিলেন ১৮ বছরের যুবক। ইমাম বুখারী মক্কায় অবস্থান কালে আল হুমায়দী ছাড়াও আবুল ওয়ালিদ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল আরযাকী, আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ আল মুরকী, ইসমাইল ইবনে সালিম আল সায়েগ প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের নিকট হাদিস শিক্ষা করেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হজ পালনের উদ্দেশ্যে আগত মুহাদ্দিসদের নিকট থেকেও হাদিস শ্রবণ করেন।
মক্কা নগরীতে বেশ কিছুদিন অবস্থান করার পর ইমাম বুখারী মদিনায় গমন করেন। তৎকালীন মদিনাতেও মক্কার ন্যায় হাদিস চর্চার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। তিনি এখানে এসে যে সমস্ত জ্ঞান-তাপসের নিকট হাদিস শিক্ষা করেন তাঁরা হলেন : ইবরাহিম ইবনুল মুনযির আল হিযামী, আবরাহিম ইবন হামযাহ, আবু ছাবিত মুহাম্মদ ইবন উবায়দুল্লাহ, আবদুল আযীয ইবন আবদিল্লাহ উয়ারযী এবং ইয়াহইয়া ইবন কুযাআহ প্রমুখ।
ইমাম বুখারীর জীবনীকার বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল মুবারকপুরী উল্লেখ করেন যে, ইমাম বুখারী মক্কা, মদিনা, তায়িফ তথা আরব উপদ্বীপে সর্বমোট ছয় বছর অবস্থান করে হাদিস শিক্ষা করেন। ইমাম বুখারী হাদিস শিক্ষার জন্য একাধিকবার বাগদাদ নগরীতে গমন করেন। কোনো কোনো জীবনীকার উল্লেখ করেন যে, তিনি সর্বমোট আটবার বাগদাদে পদার্পন করেন। তিনি যতবার বাগদাদে এসেছেন ততবার তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইমাম আহমদ ব্যতীত ইমাম বুখারী বাগদাদে যে সমস্ত মুহাদ্দিসের নিকট হাদিস শ্রবণ করেন তাঁদের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য হলেন মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আল তাব্বা, মুহাম্মদ ইবনে সাবিক, শুরাইহ ইবন নুমান আল সাদদী, আবু বকর ইবনুল আসওয়াদ, ইসমাইল ইবনুল খলীল আল কুফী, আবু মুসলিম আল মমতামলী প্রমুখ। এ ছাড়াও হাদিস শেখার জন্য তিনি সিরিয়া, মিসর, খোরাসান, ইরাকের বসরা, কুফা ও হেজাজ সফর করেন। আঠারো বছর বয়সে তিনি গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। তিনি প্রায় এক হাজার উস্তাদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁদের থেকে হাদিস শোনেন। বুখারীর ব্যাখ্যাকার শায়খ শিহাবুদ্দীন আহম্মদ আল কাসতালানীর মতে, তিনি ৬ লক্ষের মতো হাদিস সংগ্রহ করেন। বুখারী শরীফ রচনার প্রেরণা তিনি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহার কাছ থেকে পান। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘একদিন ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়ার মজলিসে বাস ছিলেন। ইমাম বললেন, তোমরা কেউ যদি হাদিসের এমন একটি গ্রন্থ রচনা করতে, যাতে শুধুমাত্র সহীহ হাদিসগুলোই সন্নিবেশিত হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো।’ ইমাম ইসহাকের এ কথা মজলিসের সবাই শুনলেন। কারোর সাহস হলো না এ কাজে অগ্রসর হওয়ার। কিন্তু ইমাম বুখারীর মনে এ কথা দাগ কেটে বসল গভীরভাবে। সেদিন থেকেই তিনি মনস্থির করলেন এ মহান দায়িত্ব পালনের জন্য। এ কাজ সম্পাদনের জন্য তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় চলে আসলেন। মসজিদে নববীতে বসে তিনি সহীহ হাদিসগ্রন্থ সঙ্কলনের কাজ শুরু করলেন। ১৬ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি সহীহ বুখারী রচনারকাজ সম্পন্ন করেন। সমকালীন শত শত হাজার হাজার মুহাদ্দিস ও হাদিস বিশেষজ্ঞ এ গ্রন্থ চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। এ জন্যই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আলেমগণ ঐকমত্যে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আল্লাহর কিতাব কুরআনুল করীমের পরে দুনিয়ার বুকে মানুষের লেখা সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো সহীহুল বুখারী। সহীহ বুখারীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব আজো অক্ষুণœ রয়েছে।
গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা অনুমান করার জন্য শুধু এতোটুকু বলাই যথেষ্ট যে, ইমাম বুখারী (রহ) থেকে প্রায় ৯০ হাজার মুহাদ্দিস গ্রন্থটি শ্রবণ করেন। সহীহ বুখারী ব্যতীত তাঁর অন্যান্য অনেকগুলো রচনাবলী রয়েছে। এর মধ্যে আল আদাবুল মুফরাদ, আত তারীখে কাবীর, তারীখে সগীর, কিতাবুল ইলাল, কিতাবুল মাবসুত, রিসালাহ প্রভৃতি অনবদ্য গ্রন্থ।
ইমাম বুখারী ২৫৬ হিজরির ১ শাওয়াল শনিবার ৬২ বছর বয়ষে উজবেকিস্তানের খারতাংগ ণামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

SHARE

Leave a Reply