Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন মোরা বড় হতে চাই দশ বছরের ঘানি

মোরা বড় হতে চাই দশ বছরের ঘানি

আহসান হাবিব ইমরোজ

‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’, ‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া’, এমনকি ‘হে ধরণী দ্বিধা হও’ এমন সকল প্রবাদবাক্য পুরনো ব্যাকরণ বই ঘেঁটে ধুয়ে মুছে তুলে এনে একত্রে যদি কারো ওপর বর্ষণ করা হয়। তাহলে…?
সুপ্রিয় বন্ধুরা, আস্সালামু আলাইকুম। আশা করি ভালো আছো। পুরনোরা এতক্ষণে চিনতে পারলেও নতুনেরা নিশ্চয়ই ‘খাবি খাচ্ছো?’- ‘এ আবার কোত্থেকে এলো রে?’ কেউ কেউ নিশ্চয়ই মুখ ফসকে বলেই ফেলেছো, সেই বিখ্যাত ডায়ালগ, ‘পুরান পাগলে ভাত পায় না, আবার নতুন…।’ বন্ধুরা, তোমাদের আশ্বস্ত করছি, আমিও এক পুরনো পাগল, আর কী!
সে যাকগে, এই শেষ আশ্বিনে এসে আষাঢ়ে গল্প বরং রাখি। অবশ্য প্রকৃতির যে হালচাল আশ্বিনেই যে আষাঢ়ে বৃষ্টি ঝরছে তার কী হবে? তাই চাইলেই কি গল্পের গাড়ি থামে? এ ছাড়া সেই অনেক অনেক দিন পর তোমাদের সাথে কথা, তাই না?
অনেকটা ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনোমার অ্যাডমন্ড হ্যালির বিখ্যাত ধূমকেতুর মতো অবস্থা আর কী! ৭৫-৭৬ বছর পর পর না হলেও এত সপ্তাহ বা দিন পর পরতো দেখা হয়, নয় কি?
শুরুতে ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ … বলে তোমাদের বসিয়ে রেখেছি, সে পর্বটা আগে সারি। তখন আমার এইচএসসি রেজাল্ট হয়েছে। তখনতো ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়নি; তাই পরদিন এক্কেবারে আজান দেয়া ভোরেই আট কিলোমিটার দূর থেকে লোক মারফত ফলাফল জেনে একেবারে কুপোকাত। আমার লেখার শুরুতে উল্লিখিত প্রবাদগুলোর মতোই অবস্থা হয়েছিল আমার। যেন এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ে তারপর ধপাস করলাম। কী, কী সেই রেজাল্ট? বলে হইচই বাধিয়ে দিয়ো না, সোনারা। এতদিন পর কি এতকিছু মনে থাকে! আর মনে থাকলেই বা কী, সব কিছু কি বলা যায়। তবে বিশ্বের সেরা কুৎসিত কুকুরের যেমন প্রতিযোগিতা হয় আমার ফলাফলটাও তার কাছাকাছি বলতে পারো। কেঁদে কেটে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সেই বয়সেই কলেজে খুব পরিচিত মুখ আমি। ১৫ হাজার ছাত্রের অনেকেই চেনে। ওদিকে আব্বা জেলা বয়েজ স্কুলের হেডমাস্টার, আর আম্মাও পরবর্তীতে জেলা গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। লজ্জায় বের হতে পারি না। সেই আধো-আলো ভোর কিংবা রাত ১০টার পর সরীসৃপের মতো আমার চলাচল। কঠিন এক পণ করলাম আর কী। একেবারে ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন, ‘আইদার থ্রোন অর গ্যালোজ’, কিংবা ‘ডু অর ডাই’ মার্কা প্রতিজ্ঞা। প্রথমেই ঢাকা, টাঙ্গাইল চষে কিনে ফেললাম গোটা বিশেক বই, না না পাঠ্যবইয়ের কথা বলছি না। ‘কিভাবে ভালো ফলাফল…’, ‘কিভাবে ভালো ছাত্র…’, ‘সফল জীবন…’ ইত্যাদি গোছের বই। বাসার অগোছালো লাইব্রেরি, আর স্কুলজীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে হাজার খানেক বই পড়া ছিল এর মরচে ধরা ঝাঝতো কিছুটা আছেই। সুতরাং শুরু হলো অপারেশন ‘ব্লুমিং হোপ’। মাত্র তিন মাসেই খেল খতম। মোটামুটি ঝকঝকে রেজাল্ট বলা যায়। এরপর ট্রেনের গতি বাড়তেই থাকে, বুলেটের গতিতে। অনার্স সাবসিডিয়ারি (তোমাদের কাছে ভিনগ্রহের অদ্ভুত বস্তুর মতো) পরীক্ষায় সমগ্র কলেজের সব বিভাগের ১৪০০ ছেলেমেয়ের ভেতর প্রথম হলাম। চূড়ান্ত অনার্সের রেজাল্ট নিয়ে খুবই মজা হয়েছিল। ভয়ে ভয়ে ভোরে রেজাল্ট দেখতে গেলাম। ‘পড়বিতো পড় মালীর ঘাড়ে…’ নজরুলের বিখ্যাত লিচুচোর কবিতার মতো হঠাৎ দেখি ওমা! বিভাগীয় প্রধানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। উনি সর্বদা মাথাটা ভূমি বরাবর লম্ব রেখে আড়চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। উনি আবার আমার ‘নানা স্যার’ মানে আমার আম্মারও শিক্ষক ছিলেন। সুতরাং একেবারে অ্যাটেনশন হয়ে গেলাম। মুচকি হেসে স্যার জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি আমাদের বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়েছিলে?’ সিসিমপুরের ইকরি মিকরির মতো মাথা উঁচু নিচু করে উত্তর দিতেই উনি দ্বিতীয় প্রশ্নের শেল ঝারলেন, ‘পাস করেছ বাপু?’ ওনার প্রশ্নগুলো খুবই সঙ্গত ছিল, কেননা অনার্সের ৩-৪ বছরে সাকুল্যে তিন দিনের বেশি ক্লাস করেছি এই অপবাদ আমার জানি-দুশমনেরা কস্মিনকালেও দিতে পারবে না। প্রাইভেট পড়া, সাজেশনস, নোট নেওয়াতো দূরের কথা তোমাদের কানে কানে বলছি, বই কিনেছি চূড়ান্ত পরীক্ষার পাঁচ দিন আগে। উনি ‘নানা স্যার’ তাই দয়া করে আমাকে চিনেছেন। অন্য স্যাররা কিন্তু চিনতেও পারতেন না। এরপর তো রেজাল্ট দেখা হলো। যাকে কেবল, ‘হাটে বোমা মারা’র সাথেই তুলনা করা যায়। হয়তো বোমা মারার মতো গুড়–ম গুড়–ম শব্দ হয়নি। কিন্তু আলবৎ সবার ‘আক্কেল গুড়–ম’। কারণ আমি ২৪০ জন ছাত্রছাত্রীর ভেতর ফার্স্ট হয়েছি। যে সেকেন্ড হলো, সারাটা বছর পড়তে পড়তে বেচারা মাখনের মতো সাদা হয়ে গেছে। আমার চেয়ে ২৮ মার্ক কম। মানে ধারে কাছে নেই। এরপর মাস্টার্স, এমফিলের ফাইন্ডেশন পরীক্ষা সর্বত্র শুধু গোল আর গোল। ভেবো না গোল মানে শূন্য, নাহ এটা ম্যারাডোনার মতোই গোল। তোমরা বলার আগেই ভাবছি হঠাৎ এ আত্মগল্পের ঝাঁপি খুলে উদ্বাহু হুল্লোড় কেন। কারণ আমার নিজের সেই পরীক্ষার অভিজ্ঞতা আর স্টাইল নিয়েই যে বইটি লিখেছিলাম তার নামই ‘মোরা বড় হতে চাই’। যার আজ দশ বছর পূর্তি হলো। সে জন্যই প্রাককথন হিসেবে এই পটভূমির বয়ান দিলম। বইটির নাকি এ পর্যন্ত ২৫-৩০ বার প্রিন্ট হয়েছে সার্কুলেশন নাকি কমপক্ষে পাঁচ লাখের উপরে। এই বার বার নাকি নাকি করে তথ্যগুলো দিচ্ছি কারণ যারা এই তথ্যগুলো সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন তারা শত চেষ্টা করেও তা সংরক্ষণ করতে পারেননি। আমার মতো একজন নগণ্য লেখকের জন্য এটিই কম কী?
আল্লাহর রহমতে গত ১৫ আগস্ট এক কন্যাসন্তানের জনক হলাম। হিসাব কষে দেখালাম বাংলাদেশের ১ কোটি মানুষের ভেতর প্রায় ২,১৯,১৭৮ জন মহিলা ইতোমধ্যেই গড় হিসাবে এই দিনে জন্ম নিয়েছে। সুতরাং…।
নাম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নামবিষয়ক এক মজাদার খাঁটি বাঙালি কৌতুক পেয়ে গেলাম; যে যা খুঁজে আর কী। পশ্চিমবঙ্গে এক লোকের তৃতীয় সন্তান হলে হাত ঝেড়ে নাম রাখলেন, সমাপ্ত। ভাবলেন এই শেষ। বছর খানেক পরে আরেক সন্তান। মহাবেকায়দা। এবার কী নাম রাখবেন। অনেক বুদ্ধির মারপ্যাঁচ করে অবশেষে নাম রাখলেন পুনশ্চ।
সুতরাং সেই ভদ্রলোক পিতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিশোরকণ্ঠের কিছু লেখা পুনশ্চ দিয়ে আজকের মতো শেষ করছি।
একজন অদক্ষ লেখক হওয়ার কারণে এত কষ্টের সাগর পাড়ি দিলেও মাঝে মাঝে কিছু আনন্দের পশলা বর্ষণ সকল কষ্টের ক্লেদ ধুয়ে মুছে ছাফ করে দেয়। এ রকম জ্বলজ্যান্ত চারটি ঘটনা বলছি :
এক. কুষ্টিয়া ডিএসপি ভবন। একটি পাতলা হ্যাংলা ছেলে এগিয়ে এলো, হাতে একটি প্যাকেট মতো, মুখে চাঁদের হাসি। বলল, আপনি বেশ আগে এসএসসি দাখিল ফলপ্রাপ্তদের জন্য এক লেখায় লিখেছিলেন- ‘তোমরা যারা ভালো রেজাল্ট করেছো তাদের কাছে দাবি তোমার এলাকার নামকরা মিষ্টি খাওয়াবে।’ তখনতো আপনাকে পাইনি। আজ পেয়েছি সুতরাং এখন খেতে হবে। তার হাতে কুষ্টিয়ার বিখ্যাত মিষ্টি। এখন বুঝো ঠ্যালা।
দুই. এই গত বছর গিয়েছি দিনাজপুর শহরে, এক কোচিং সেন্টারের কৃতীদের সংবর্ধনায়। তখন অনুষ্ঠানের ঢের দেরি। সে শহরের কোনায় এক দোতলা বাসায় খাটে বসে আছি। এসএসসি লেভেলের হাসি খুশি একটি ছেলে। ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে পাশে বসলো। প্রোগ্রামের সভাপতিকে বললো, আজকের প্রোগ্রামে এসেছি ইমরোজ ভাইয়ের সাথে পরিচিত হবো তাই।
অচেনা আগন্তুক হিসেবে তার পাশে বসে এ রকম কথা শুনতে বলো কেমন লাগে? তার পরের ঘটনা আর নাই বা বললাম। তবে আমি কিন্তু বোকার মতো শার্টের কলার নেড়ে বলে বসিনি ‘আরে ভায়া আমিই তো সেই ইমরোজ ভাই।’
তিন. রাজশাহীতে কৃতী ছাত্রছাত্রীদের প্রোগ্রামে আমার আলোচনা শেষ। দু’জন নবম শ্রেণীর হাসি খুশি মেয়ে এগিয়ে এলো। ‘আপনার সাথে কথা আছে’ বলে ওরা আমাকে কাছে ডাকলো। লম্বা মেয়েটি বললো সে ঢাকার হারমেন মেইনারের ছাত্রী। তার মা আমার অনেক বই কিনে বিতরণ করেছেন।
একজন আধখানা লেখকের জন্য এর চাইতে আনন্দের আর কী হতে পারে?
চার. ২০০০ সাল। আমার লেখার বয়স মাত্র আট মাস। ওদিকে বাসায় বিয়ের তুমুল তোড়জোড় চলছে। ভাবী শ্বশুর মশাই একজন নামকরা ডাক্তার। তখনও আমার ‘মোরা বড় হতে চাই’ বইটি বের হয়নি। কিশোরকণ্ঠের পাতা ঘেঁটে সেই ভাবী শ্বশুর সাহেব আমার লেখা বের করে তার পিতৃপক্ষীয় ও শ্বশুরপক্ষীয় মুরুব্বিদের দেখিয়েছেন আমার পক্ষে মত নেয়ার জন্য। ভাগ্যিস তার হাতে আমার কিম্ভূতকিমাকার কোনো ছবি ছিল না। তাহলে যে কী হতো, আল্লাহ মালুম!
বিয়ের পরে জেনেছি আমার ভাবী স্ত্রী এইচএসসি পরীক্ষার্থী ফারজানা আক্তার নাকি আমাকে লেখার ভেতরই প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন। আসলে সবই খোদার কলম, বকলম মানুষের কী করার আছে।

SHARE

Leave a Reply