Home সায়েন্স ফিকশন রাক্ষসের গ্রহে

রাক্ষসের গ্রহে

আব্দুল গাফফার রনি

রাক্ষসের গ্রহে বিশাল এক পর্বত শ্রেণীর খাড়িতে ল্যান্ড করেছে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ড. জামিলের মহাকাশযান পঙ্খিরাজ-৭১। গ্রহটা যে রাক্ষসদের তা তিনি আগে জানতেন না। তাঁর লক্ষ্য ছিলো টাফা গ্রহের দিকে, সেখানে পিঁপড়ে মানবদের দেশে আটকা পড়েছেন আরেক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। কিন্তু রাক্ষসের গ্রহটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ পঙ্খিরাজ-৭১-এ গোলযোগ দেখা দেয়। তাই এখানেই জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছেন।
গ্রহটা জামিলের বেশ পছন্দ হয়েছে। দেখতে পৃথিবীর মতোই। তবে লোকালয়ের চেয়ে বন-জঙ্গলই বেশি। দূর থেকে দুরবিন দিয়ে কারুকার্যমণ্ডিত প্রাসাদগুলো দেখে ভেবেছিলেন হয়তো সভ্য মানুষের বাস আছে এ গ্রহে।
হ্যাঁ, মানুষ আছে, তাদের বুদ্ধিও আছে, তবে তারা আমাদের মতো সভ্য নয়, আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মতো জংলি মানুষ। গভীর জঙ্গলে জন্তু-জানোয়ারের মতো তাদের বসবাস। শহর আর গ্রামের ওই বিশাল প্রাসাদগুলোতে বাস করে কেবল রাক্ষসেরা। মানুষই তাদের প্রিয় খাদ্য।
পঙ্খিরাজ-৭১ এর যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে জামিলকে হাত লাগানোর দরকার পড়বে না, রোবট বিদ্যাপতিই সব করবে। তবে সে জানিয়েছে সব কিছু ঠিকঠাক হতে ৭২ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। এই সময়টাতে জামিল কী করবেন?
‘গ্রহটা একটু ঘুরেফিরে দেখতে পারলে মন্দ হতো না’- ভাবলেন তিনি।
প্রফেসর শঙ্কুর ফর্মুলায় তৈরি এনাইহিলিন গানটা হাতে নিয়ে খাড়ি থেকে সমতল ভূমির দিকে নেমে এলেন তিনি। পরনে তাঁর রোবটমার্কা নভোচারী পোশাক; পিঠে একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ, নানা রকম বৈজ্ঞানিক জিনিসে ঠাসা।
প্রফেসর শঙ্কুর সেই বিখ্যাত এনাইহিলিন গানের কথা জানো তো? সেই পিস্তল তাক করে কোনো জীবিত অথবা মৃত প্রাণীর দিকে গুলি ছুড়লে মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণীটা একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যায়!
গহিন জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কিম্ভুতাকার একদল রাক্ষসের মুখোমুখি হলেন জামিল। দেখতে গরিলাদের মতো কিন্তু সাইজে পাঁচটা গরিলার সমান একেকটা। মাথায় দু’টি করে বাঁকানো শিং আর ফলার মতো ধারালো লম্বা লম্বা দু’টি করে দাঁত বেরিয়ে আছে গালের দু’পাশ থেকে।
জামিল রাক্ষসদের কাছাকাছি আসতেই দলনেতা হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘হাও মাও খাও, মানুষের গন্ধ পাও! আজব তো তোর চেহারা! রাক্ষসের দেশে কোত্থেকে এসে জুটেছিস?’ জামিল তো বুঝে গেছেন ব্যাপারটা, তাই তিনি চালাকি খাটিয়ে বললেন ‘হাও মাও খাও, রাক্ষসের গন্ধ পাও! আমি ভোক্ষসের দেশ থেকে এসেছি- আমি রাক্ষস ধরে খাই। হঠাৎ করে আমাদের দেশে রাক্ষসের আকাল পড়ে গেছে, তাই ভাবলাম যাই ওদেশ থেকে ঘুরে আসি- যদি এখানে তাগড়া তাগড়া রাক্ষস মেলে। এ বাব্বা, এইটুকু এইটুকু রাক্ষস! তোদের সবকটাকে সাবাড় করে আমার একার ক্ষুধাই মিটবে না; মা-বাবার জন্য বাড়িতে কী নিয়ে যাব?’
জামিলের কথা শুনে রাক্ষসের সর্দার তো মহা আগুন! বজ্রকণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, ‘ব্যাটা তোর সাহস তো কম নয়, লিলিপুট শরীর নিয়ে কিনা আমাদের বলিস এইটুকু এইটুকু!’ দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা,’ বলে আশপাশের গাছপালা, ঝোপজঙ্গল থামের মতো মোটা দু’টি হাত দিয়ে মুচড়িয়ে পাটকাঠির মতো চুরমার করতে লাগল। তার দেখাদেখি অন্য রাক্ষসেরাও শুরু করল সেই বিভীষিকা। তাদের তাণ্ডবে জঙ্গলে ঝড় বয়ে গেল কিছুক্ষণ। তার পর ক্লান্ত হয়ে থামল রাক্ষসেরা। সর্দার জামিলের দিকে ফিরে ফোঁস ফোঁস করে বলল, ‘এবার বুঝেছিস তো ব্যাটা আমরা কত ভয়ঙ্কর!’
‘এর চেয়ে ভোক্ষসরা বেশি ভয়ঙ্কর’- একটুও ভয় না পেয়ে বললেন জামিল।
‘তবে রে…’ বলে সর্দারের বিশাল দু’টি হাত এগিয়ে আসছিল জামিলের গলা লক্ষ্য করে। তিনি দেরি করলেন না, এনাইহিলিন গানটা রাক্ষসটার দিকে তাক করে ট্রিগার চেপে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল রাক্ষস সর্দার। তাই দেখে অন্য রাক্ষসগুলো পড়িমরি করে ছুটে পালালো। জামিল এগিয়ে চললেন শহরের দিকে।
শহরে যখন পৌঁছালেন, তখন রাত নেমে এসেছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শহরে ঢুকেই জামিল বুঝতে পারলেন জঙ্গলের ঘটনা ফুলে ফেঁপে দেশময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এক বাড়ির কানাচ দিয়ে যাওয়ার সময় জামিলের কানে এলো এক মা তার ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছেন এই বলে- ‘এ দেশে ইয়াবড় এক ভোক্ষস এসেছে; রাক্ষস ধরে ধরে খায়! ভোক্ষসটার দাঁত দুটো নাকি এতো বড় যে এই শহরের এ-মাথায় রাখলে ও-মাথায় গিয়েও ফুরোবে না!’
জামিল মনে মনে হাসতে হাসতে রাজপ্রাসাদের দিকে এগোলেন। ‘এখন রাজাকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে রাক্ষসেরা আর কখনো মানুষ ধরে না খায়’- ভাবলেন জামিল।
জামিল দেখলেন ভোক্ষসের ভয়টা রাজপ্রাসাদেও বেশ প্রভাব ফেলেছে। প্রাসাদের সব আলো নিভিয়ে ফেলা হয়েছে, মূল ফটকটা একেবারে আটোসাঁটো করে লাগানো, পিঁপড়ে পর্যন্ত ঢোকার রাস্তা নেই। প্রহরীরাও কেউ বাইরে দাঁড়াতে সাহস করেনি, ভেতরে বসে পাহারা দিচ্ছে।
জামিল প্রাসাদের ফটকে কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে প্রহরী ভয় পাওয়া গলায় বলল ‘কে-রে?’
‘আমি তোর যম, রাজাকে ডাক’- এ পাশ থেকে উত্তর গেল।
রাজা তো প্রথমে ভয়ে আসতেই চায়নি, জামিল তার দলবল ডেকে এনে প্রাসাদ উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিলে অবশেষে মন্ত্রী-সান্ত্রী, পাইক-পেয়াদাসহ হাজির হলো। কিন্তু দরজা খুলতে রাজি হলো না। ভয়ের কারণে হুঙ্কার দেয়ার চেষ্টা করেও পারল না রাক্ষসরাজ, তবু চেষ্টাচরিত করে বলল, ‘হাও মাও খাও, কে তুই? কোথা থেকে এসেছিস?’
‘হাও মাও খাও, আমি ভোক্ষসের দেশ থেকে এসেছি’, জামিল বললেন।
‘খাস কী তুই? পান করিস কী?’
‘খাই রাক্ষস, পান করি অমৃত?’
‘দেখা তোর অমৃত।’
ফটকে নজরদারি ছিদ্রটা খুলে গেল। জামিল ব্যাগের ভেতর থেকে নাইট্রিক অ্যাসিডের বোতলটা বের করে ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন।
বোতলটা শুঁকে রাজামশাই বলল, ‘গন্ধটা তো দারুণ, স্বাদটাও হয়তো অমৃত। খেয়ে দেখো তো মন্ত্রীবর।’ মন্ত্রী ঢকঢক করে গিলে ফেলল সেই তীব্র অ্যাসিড। মুহূর্তের মধ্যেই জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে মরে গেল সে।
তা দেখে রাজা বলল, ‘বুঝলাম তোমরা পান করো রাজকীয় রস, এবার তোমার লেজটা দেখাও, তবেই না বুঝব তোমার আকার কেমন?’
জামিল ফটকের ছিদ্র দিয়ে এক ইঞ্চি মোটা একটা তামার তারের একপ্রান্ত ঝুলিয়ে দিলেন।
‘তোমাদের লেজ এতো চিকন?’ ওপাশ থেকে রাজা বলল।
‘কামড়ে দেখো না?’ জামিল বললেন।
কিন্তু পালোয়ানের মতো একটা রাক্ষস কামড়ে কুমড়েও তারটা ছিঁড়তে পারল না।
‘মানছি তোমাদের লেজ অতি শক্ত, এবার দাঁতের শক্তি দেখাও, আমি একটা লেজ দিচ্ছি।’
লেজ দিতে কেউ রাজি হচ্ছিল না, অবশেষে রাজার কড়া হুকুমে সিপাহসালার তার লেজটা ছিদ্র দিয়ে বের করে দিলো।
অমনি জামিল ধারালো চাকু দিয়ে পোঁচ মেরে লেজটা কেটে তাতে একটু লবণ মাখিয়ে দিলো। সিপাহসালার কাটা লেজে নুনের ছিঁটার যন্ত্রণায় গগনবিদারি একটা চিৎকার দিয়ে বাঁদরের মতো প্রাসাদময় লাফালাফি করতে লাগল।
জামিল বললেন, ‘এবার বুঝেছ রাজামশাই, আমি কী জিনিস! তোমাদের সবকটাকে আস্ত আস্ত চিচিয়ে খাব।’
রাজা আগেই ভড়কে গেছে, ‘চিবিয়ে খাব’ কথাটা শুনে হাউ মাউ করে বলল, ‘দয়া করুন হুজুর, মাফ করে দিন, আপনি যা চান তাই দেব, শুধু আমাদের প্রাণ ভিক্ষা দিন।’
জামিল বললেন, ‘দিতে পারি এক শর্তে, যদি তোমরা আর কোনো দিন মানুষ না খাও, যদি মানুষের আলাদা করে শহর গড়তে দাও, তবেই…’
‘তাই হবে হুজুর, এখন থেকে আমরা বুনো ষাঁড়-হাতি মেরে খাব আর মানুষের জন্য দেশের পশ্চিম অংশটা একেবারে ছেড়ে দিলাম।’
‘দেখো কিন্তু, তোমাদের রাজ্যে আমার গুপ্তচর আছে, আর একবার যদি মানুষ খেয়েছ…’
‘আর বলতে হবে না হুজুর, আর…’
রাক্ষসরাজ হুজুর হুজুর করেই যাচ্ছিল, জামিল নিঃশব্দে সেখান থেকে মহাকাশযানের দিকে পা বাড়ালেন।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply to Rock Boy Tanmay Cancel reply