Home স্মরণ শিশুসাহিত্য সাধনায় কবি ফররুখ আহমদ

শিশুসাহিত্য সাধনায় কবি ফররুখ আহমদ

শরীফ আবদুল গোফরান

আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রচলিত ধারার অন্যতম সার্থক কবি ফররুখ আহমদ। স্বাভাবিক কবিশক্তির অধিকারী কবি ফররুখ আহমদ বাংলা কাব্যসাহিত্যে যেমন উচ্চাসন লাভ করেছেন, তেমনি শিশুসাহিত্য রচনায়ও সবিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ফলে কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন অপূর্ব প্রাণশক্তির প্রতীক।
পুঁথির জগৎ থেকে কাহিনী চয়ন করে আরবি-ফার্সি-উর্দু-হিন্দি মিশ্রিত বাংলায় এই কবি কাব্য সৃষ্টি করে এক স্বতন্ত্র কাব্যজগৎ গড়েছেন।
শিশুসাহিত্য জগতে ফররুখ আহমদ আসেন পাখির বাসা নিয়ে। এই কবি বিচিত্র পাখপাখালির জগৎকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। পাখিদের বিচিত্র প্রসঙ্গ তাঁর শিশুসাহিত্যে ব্যাপক স্থানজুড়ে আছে। তিনি পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে যেমনি কবিতার রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন তেমনি ছড়াসাহিত্যেও ছোটদের সাথী করে নিতে ভুল করেননি। তাঁর পাখিবিষয়ক ছড়াগুলো পাখির জীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গ শিশু-কিশোরদের ভাবিয়ে তুলেছে, আন্দোলিত করেছে। ফলে তিনি যেন প্রকৃতির অপার রহস্য ‘পাখীর বাসা’ নিয়ে হাজির হয়েছেন ছোট্ট শিশু-কিশোরদের মাঝে।
‘পাখীর বাসা’ গ্রন্থে কবি সাতরঙা কবিতা নিয়ে উপস্থিত হন ছোটদের কাছে। পাখির বাসার প্রতিটি ছড়ার বর্ণনা গানে গানে রূপ লাভ করেছে। যেমন-
আয়গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে
পাখির বাসা খুঁজতে যাবো এক সাথে
কোন বাসাটা ঝিঙে মাচায়
ফিঙে থাকে কোন বাসাটায়
কোন বাসাতে দোয়েল ফেরে
সাঁঝ রাতে।
‘পাঁচ মিশালী’তে ঝড় বৃষ্টি ও ঋতু সম্পর্কীয় ছড়া বর্ণিত আছে। যেমন-
বিষ্টি এলো কাশ বনে
জাগলো সাড়া ঘাস বনে
বকের ছানা কোথায়রে
লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।
‘রূপ কাহিনীতে’ রূপকথার রাজপুত্র-রাজকন্যা, কবির চোখে শাহজাদা-শাহজাদী। সিতারা ও শাহীনে ইতিহাসের বীরপুরুষ নেতা, সাহসী নায়ক সম্পর্কে কবিতায় বর্ণিত হয়েছে।
‘চলার গান’-এ দেশ ও জাতিবিষয়ক কবিতারাজি রয়েছে। তাতে রয়েছে দেশ ও জাতির মান, সবুজ পতাকা, আদর্শ, সম্মুখে চলার গান ইত্যাদি। যেমন-
শুনবো না আর পিছন টান
মানবো না আর বান তুফান
ডাকছে খুন রক্তারুণ
ভবিষ্যতের পথ উজ্জ্বল
সামনে চল সামনে চল।
শিশুসাহিত্য রচনায় কবি ফররুখ আহমদের ভাষা ও শব্দের ওপর আশ্চর্য দখল। ছন্দ ও শব্দ চয়নে কবির পাণ্ডিত্য ছোটদের আনন্দের খোরাক জোগায়।
তাঁর শিক্ষাপ্রদ এসব রচনা ছোটদের ভাবিয়ে তোলে। জাগরণী গান গেয়ে শক্তি, সাহস ও বীরত্বের কথায় আন্দোলিত করেছেন ছোট্ট শিশু-কিশোরদের মনকে। ফলে কল্পনার জগৎ বেষ্টন করে আছে তাঁর শিশুসাহিত্য।
শিশুসাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘হরফের ছড়া’। একটি হরফ বা অক্ষর দিয়ে এক একটি ছড়া, যার প্রতিটি শব্দ চয়ন করা হয়েছে শিশুর পরিচিত জগৎ থেকে। চিত্রধর্মী প্রতিটি ছড়ায় শিশুর চেনা জগৎ ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে উপাদান সংগৃহীত হয়েছে। যেমন-
ক-য়ের কাছে কলমিলতা
কলমিলতা কয় না কথা
কোকিল ফিঙে দূর থেকে
কলমি ফুলের রঙ দেখে।
ঝ-য়ের কাছে ঝিঙে
ঝিঙে লতা ফিঙে
ঝিঙে লতা জড়িয়ে গেলো
কালো গরুর শিঙে।

ব-য়ের কাছে বনবিড়াল
আনলো ডেকে সাত শিয়াল
বোল-বোল-বোল আমের বোল
বাদুর এসে বাজায় ঢোল।
কবি ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্যে প্রকাশিত তৃতীয় গ্রন্থ ‘ছড়ার আসর’ প্রথম খণ্ড। আমার মনে হয়েছে কবির সৃষ্টি শিশুসাহিত্যের মধ্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি এই শিশুছড়াগুলো। কবির ছন্দে গাঁথা অধিকাংশ রচনাই হয়েছে গান, মিষ্টিগীতি ভাবনার রূপায়ণ। শব্দ চয়ন, ছন্দ লালিত্য, সঙ্গীতময়তা সকল দিক দিয়েই ফররুখ আহমদের শিশুদের জন্য রচিত ছড়া গতিময়, সমৃদ্ধ ও প্রাণচঞ্চল। তিনি কল্পরাজ্যে হলদি কোটার দেশে যান, সেখানে সব মেহেদি পাতায় হাত রাঙান। সেখানে আছে সাঁঝের পরী, সোনার কাঠি, রূপার কাঠি, জন্তু-জানোয়ার, পশু-পাখি- এসব নিয়ে শিশুদের যে চিরচেনা জগৎ সেখান থেকেই কবি তাঁর ছড়ার পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করেছেন। যেমন-
মাঘ মাসে আবছায়া কুয়াশার পাখা
ঢেকে ফেলে আসমান কালি জুলি মাখা
ঝোলা খুলে হিম হাওয়া ছায়ে ক্ষণে ক্ষণে
রাত্তিরে কাঁপে বাঘ সুন্দরবনে।
কবি ফররুখ আহমদের চতুর্থ গ্রন্থ ‘নতুন লেখা’। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। নতুন লেখা, রংতামাসা, সবুজ নিশান, কিসসা, সোনার সন্ধ্যা, রাসূলে খোদা।
কবি এ গ্রন্থে প্রকৃতির বিচিত্র ভাবের সমারোহ ছন্দে-গানে কল্পনায় বাস্তবে যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি দেশ-জাতি- সমাজ, ধর্ম-নীতির ব্যাখ্যাও করেছেন। ছোটদের মনোরাজ্যে তাঁর একক পুণ্যময় ছবি পরিস্ফুট করতে চেয়েছেন। অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে কবি সত্যের সন্ধান করেছেন। ফলে আল্লাহ-রাসূল ও মহাপুরুষদের মহৎ ভাবনা উৎসারিত হয়েছে তাঁর ছড়ার অনেক পঙ্ক্তিতে। তা ছাড়া হাসি ও কৌতুকময়তা ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্যের এক প্রবলতম লক্ষণ।
কবি ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্য এত অল্প কথায় প্রকাশ করা মোটেও সম্ভব নয়, এ জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা কবি ফররুখ আহমদের পাখীর বাসা, হরফের ছড়া, চিড়িয়াখানা, ফুলের ছড়া, সাঁঝ সকালের কিসসা, ছড়ার আসর, পোকামাকড়, পাগলাইঞ্জিন, দাদুর কিসসা, পাখীর ছড়া, আলোক লতা, খুশীর ছড়া, নতুন লেখা, রংমশাল, নয়া জামাত আমাদের শিশুসাহিত্যকে নতুন জগতের রাজপথের সন্ধান দিয়েছে। তিনি শিশুসাহিত্যের নয়া দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছেন।
শিশু সাহিত্যের এই সামান্য আলোচনা থেকেই বুঝতে পারি কবি ফররুখ আহমদ যে কতো বিশাল ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের পর এমন সুন্দর কবি আর জন্মায়নি আমাদের ভেতর। যেখানে এসে কবি নজরুল ইসলাম থমকে দাঁড়ালেন, সেখান থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু। হাতে তুলে নিলেন পতাকা, পত পত করে উড়ালেন আকাশে। মুখরিত হয়ে গেল সমগ্র আকাশ ও পৃথিবী। তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন। লেখায় স্বপ্ন, সর্বত্র স্বপ্ন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। বলতেন, সমুদ্রের কথা, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বহুদূর যাবার কথা। সিন্দাবাদ, নৌফেল, হাতেম, শাহেরজাদী ইয়াসমিনকে খুঁজে বের করতেন তিনি। সেই সঙ্গে কতো বলেছেন আরব-ইরানের পুরনো গল্প। এরা এক সময় কবির কাছে একরাশ স্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিলেন। সে সব পড়ে আমরাও স্বাপ্নিক হয়ে উঠি। তাঁর কবিতায় নীল সমুদ্রের গর্জন, অচেনা বন্দর, লবঙ্গ দ্বীপ, সবুজপাতার নারঙ্গী বন, নোনা জলের জোয়ার আর পালতোলা জাহাজের যাত্রা- আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ব্যাকুল করে তোলে।
ইতিহাসে যারা বড় মানুষ, তাঁরা আদর্শের কারণেই বড়। আদর্শ মানে জীবনবিষয়ে কোনো বিশ্বাস- এমন বিশ্বাস যা কখনো নড়ে না। ভালো অবস্থা, খারাপ অবস্থায় একই রকম থাকে। এমন বিশ্বাস যার মধ্যে থাকে তাতে মহত্ত্ব আছে। এ জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। অনেক কিছু ছেড়ে দিতে হয়। অনেক লোভের জিনিস বাদ দিতে হয়। যা রক্ষা করতে হলে চরিত্রের একটা শক্তি লাগে। সেই শক্তি সবার নেই। সবার থাকে না। সবার থাকে না বলেই সবার মাঝে আদর্শও থাকে না। যাদের মধ্যে আদর্শ থাকে তাঁদের সংখ্যা খুবই কম, হাতেগোনা যায়। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন সেই রকম একজন আদর্শবান লোক। তাই তিনি মহান। সাধারণ মানুষ হয়েও অসাধারণ।
কবি ফররুখ আহমদ ফুলকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন ফুলের মতো মানুষগুলোকে। গন্ধ বিলানো, আনন্দ বিলানো, আর আপন করে নেয়াই ছিলো তাঁর কাজ। এই মহান কবি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি চিরবিদায় নিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর কথা, তাঁর কবিতা। তিনি সৎপথে চলতেন, সৎকথা বলতেন, তেমনি ছোট্ট বন্ধুদেরকেও আল্লাহর পথে ডাকতেন। নবী (সা)-এর পথে ডাকতেন। বলতেন-
‘আমরা সকল দেশের শিশু যাব
নবীর মদীনায়
তোরা সঙ্গে যাবি আয়।…’

SHARE

Leave a Reply