Home তোমাদের গল্প কুরবানি

কুরবানি

আমীর হামজা
ঈদ এলেই প্রাণ স্পন্দনে মুখর হয়ে ওঠে গোটা মুসলিম জাতি। গ্রাম, গঞ্জ, হাট, বাজার ইত্যাদিতে চলে কত্ত রকমের আয়োজন। অন্যান্য জাতি আনন্দ উৎসব করে। ঢাক ঢোল বাজিয়ে মাতিয়ে তোলে শহর বন্দর। মাথানত করে দেব দেবীর কাছে। আমরা মুসলমানরাও আনন্দ উৎসব করি এবং মহান স্রষ্টার কাছে মাথা নত করি। তিনি আমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ বর্ষন করেছেন সে জন্য তাঁরই প্রশংসা করি এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। তারপর আমরা আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠি। কিন্তু তা বাঁধ ভাঙ্গা নয়। আর আমাদের আনন্দে অন্যদের শামিল করার চেষ্টা করি। ঈদুল ফিতরের পর আমাদের বড় দ্বিতীয় উৎসব ঈদুল আযহা বা কুরবানি ঈদ। কুরবানি মানে আবেগ প্রবণ নয়। আবেগের বসে লাগামহীন ঘোড়ার পৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে তেপান্তরের মাঠ পাড়ি দেওয়া নয়। কুরবানি মানে নিকটবর্তী বা কাছাকাছি অগ্রসর হওয়া। অর্থাৎ পশু কুরবানির মাধ্যমে বান্দা  আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যায়।

আজ শুক্রবার, জুম’আর দিন। আজানের মধুর ধ্বনি দিকে দিকে রটে যায়। মজনু সাহেব ওজু, গোসল সেরে মসজিদের দিকে রওনা দিলেন। ইমাম সাহেব মধুর সুরে আরবিতে খুৎবা পাঠ করলেন। তারপর কুরবানির আত্মত্যাগ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। নামাজ শেষে মজনু সাহেব বাড়ি ফিরে তার স্ত্রী মমতা বেগমকে তার মনের কথাটা ব্যক্ত করলেন। মমতা বেগম বললেন, কুরবানি করবে তো ভাল কথা। হাট থেকে কিনে আন। মজনু সাহেব বললেন, শোন মমতা, কুরবানি মানে আদরের জিনিস জবাই করা। আমাদের ফয়সালের ছাগলটি কুরবানি করলে কেমন হয়!
মমতা বললেন, না! ফয়সাল শুনলে তার ঐ বন্ধুসুলভ ছাগলকে কুরবানি করতে দিবে না। আচ্ছা দেখ ফয়সালকে রাজী করাতে পার কিনা। যেহেতু ওর আদরের জিনিস সেহেতু ওকে অবগত করা দরকার।
ঢং ঢং শব্দে স্কুল ছুটি হয়। ফয়সাল বাড়ি ফিলে আসে। মজনু সাহেব ছেলেকে ডেকে তার ইচ্ছার কথা বললেন। কিন্তু ছেলেকে কিছুতেই রাজী করাতে পারলেন না। ফয়সাল তার বাবাকে অপন মনে অভিমত জানায়। সে বলে, বাবা তুমি বরং হাট থেকে একটা ছাগল কিনে আন।
মজনু সাহেব নিরূপায় হয়ে ছাগল কিনার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ফয়সাালের ছাগল কুরবানি না দেয়ার কারণ আছে। থেকে তিন মাস আগে ফয়সাল বায়না ধরেছে ওকে মোবাইল ফোন কিনে দিতে হবে।  তার মা মমতা বেগম ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে বাবা তুমি ছোট, এখন মোবাইল ফোন দিয়ে কী করবে? তাছাড়া তোমার বাবার হাতেও তেমন টাকা কড়ি নেই। ফয়সাল বলল, আম্মা, তোমরা যে আমাকে টিফিন খেতে টাকা দিতে সেখান থেকে এক হাজার টাকা জমেছে। তার সাথে আর কিছু টাকা দিয়ে একটা মোবাইল ফোন কিনে দাও না আম্মা। মমতা বেগম মাথা খাটিয়ে বললেন, আব্বু শোন। আর তিন মাস পর কুরবানি ঈদ হবে, তাই তুিম এক কাজ কর। এ টাকা দিয়ে সুন্দর একটা ছাগল কিনে রাখ। এ তিন মাসে ভাল যতœ নিলে দেখিস তোর মোবাইল ফোন কেনার টাকা হয়ে যাবে। ফয়সাল বলল, ঠিক আছে আম্মু। ফয়সালের বাবা তিন দিন পর একটা নাদুস নুদুস দর্শনীয় ছাগল কিনে আনলেন।  তারপর শুরু হলো ত্রিমুখী পরিচর্যা। স্কুল থেকে ফিরে ছাগলকে ঘাস, পাতা, পানি খেতে দেয় ফয়সাল। বন্ধুর মতো মনের কথা বলে। তাই সে তার বন্ধুসুলভ ছাগলটাকে কুরবানি করতে দিবে না।

মজনু সাহেব চারদিন পর হাট থেকে সুন্দর একটি ছাগর কিনে আনলেন কুরবানি করার জন্যে। আর মাত্র তিন দিন বাকি কুরবানি ঈদের। আজ ফয়সালের স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে ঘোষণা হলো স্কুল দশ দিনের ছুটি। তাই সবার মনে খুশির ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এবার ঈদে খুব মজা হবে, আনন্দ হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্রেণীশিক্ষক আহম্মদ স্যার সবার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা মন দিয়ে একটা কথা শোন, আর তিন দিন পর কুরবানি ঈদ। এই কুরবানির পিছনে একটি ঘটনা আছে তোমরা তা জান? অনেকে বলল, না স্যার। আপনি আমাদের ঘটনাটি শোনান। তারপর আহম্মাদ স্যার বললেন, শোন তাহলে। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ) ও তার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ)-এর ঘটনা…..। সেই অত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত যুগে যুগে স্মরণীয় করে রাখতে মহান আল্লাহ আমাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব করেছেন। সুতরাং কুরবানি হচ্ছে ত্যাগ, বিসর্জন ইত্যাদি।
আর ইসলামী শরিয়াতের পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে প্রিয় বস্তু (প্রাণীকে) আল্লাহর নামে জবাই দিয়ে নির্দিষ্ট খাতে বণ্টন করাই হলো কুরবানি। ফয়সাল বলল, স্যার, প্রিয় বন্তু ছাড়া কি কুরবানি হবে না? স্যার বললেন, কুরবানি মানেই তো প্রিয় বস্তু। আমরা সচরাচর যেভাবে কুরবানির বস্তু (প্রাণী) কিনি বা জবাই করি- এতে বোধহয় আমাদের কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না বরং নিজে বাড়িতে পুশে যেটা নিজের প্রিয় হয়ে যায় সেটা কুরবানি দিলে আল্লাহ কবুল করেন।
ঢং ঢং শব্দে  স্কুল ছুটি হয়ে গেলো। ফয়সাল বাড়ির দিকে ফিরছে আর মনে মনে ভাবছে- প্রিয় জিনিস ছাড়া কুরবানি যদি না হয় তাহলে আমার আদরের বন্ধুসুলভ ছাগলকে কুরবানি করব। ঈদের দিনে ফয়সাল উত্তম পোশাক পরিধান করে বাবার সাথে নামাজ পড়ে ইমাম সাহেবকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। এবং ফয়সাল নিজে সাথে থেকে তার পোষা আদুরে ছাগলটাকে কুরবানি করল। নিজেদের জন্য এক ভাগ রেখে বাকি তিন ভাগ গোশত আত্মীয়-স্বজন ও গরিব মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দিল। এখন আল্লাহর কাছে ওর একটাই প্রার্থনা আল্লাহ যেন ওর কুরবানি কবুল করেন-
কুরবানিতে অর্থ ব্যয়
সে কি জানে ইব্রাহীমের
মহৎ আত্মত্যাগের কাহিনী
প্রিয় জিনিস কুরবানিতে হবে ভাই
লোক দেখানো নয় আত্মত্যাগ চাই।
পশু জবাই বড় নয়, মনটা বড় চাই
ইব্রাহীমের শিক্ষাতে পাই।

SHARE

Leave a Reply