Home সাহসী মানুষের গল্প

ধবধবে নিটোল নীলাকাশ।
তারায় তারায় ভরপুর আকাশের বুক।
জোসনার আলোক ধারা ছড়িয়ে পড়েছে চার পাশে।
মরুপ্রান্তর, জনপদ- সবই কেমন ফকফকে সাদা।
মক্কার অলিতে-গলিতে কেবলই গুঞ্জন-
কে এনেছেন, কে এনেছেন এমনই আলোক ধারা?
সবার মধ্যে কৌতূহল। সবার মধ্যে জিজ্ঞাসার বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম।
তিনি তো আর কেউ ননÑ প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা)।
তাঁর পাশেই যত নক্ষত্রের ভিড়। তাঁর দিকেই দলে দলে ছুটে আসছে সত্য পিপাসু পথিক।
তেমনই একজন সত্যের পিপাসু আবু মাসউদ আল বদরী (রা)।
আবু মাসউদ ডাক নাম, আর এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম উকবা এবং পিতার নাম আমর ইবন সা’লাবা। সর্বশেষ বাইয়াতে আকাবায় যোগ দিয়ে সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
উহুদ এবং উহুদ-পরবর্তী কাফিরদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যোগ দেন।
তিনি বদরে যোগ দেন এবং এ কারণেই তাঁকে বদরি বলা হয়।
নবুওয়াতের যুগ ও প্রথম তিন খলিফার সময় পর্যন্ত আবু মাসউদ মদিনায় ছিলেন। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কিছু দিনের জন্য বদরের পানির ধারে বসবাস করেছিলেন।
হযরত আলীর খিলাফতকালে মদিনা ছেড়ে কুফায় চলে যান এবং সেখানে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করেন।
তিনি ছিলেন হযরত আলীর (রা) একান্ত সহচর। আলীর (রা) সময়ে তিনি কুফায় যান এবং আলী (রা) সিফফিনে যাওয়ার সময় তাঁকে কুফার আমিরের দায়িত্ব দিয়ে যান।
হযরত আবু মাসউদের এক পুত্র ও এক কন্যার পরিচয় জানা যায়। পুত্রের নাম বাশির এবং কন্যা ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের (রা) স্ত্রী। তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হযরত যায়িদ ইবন হাসান। বাশিরের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় বা তার কিছু পরে।
হযরত আবু মাসউদ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাদিসের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেন। হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবীদের তৃতীয় তবকা বা স্তরে তাঁকে গণ্য করা হয়। হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত ১০২টি হাদিস পাওয়া যায়।
রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনাচারের অনুসরণ এবং সত্যের প্রচার ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ-নিষেধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পালন করতেন। একবার তিনি তাঁর এক দাসকে মারছেন। এমন সময় পেছন থেকে আওয়াজ ভেসে এলো : আবু মাসউদ! একটু ভেবে দেখ। যে আল্লাহ তোমাকে তার ওপর ক্ষমতাবান করেছেন, তিনি তাকেও তোমার ওপর ক্ষমতাবান করতে পারতেন।
আওয়াজটি ছিল রাসূলুল্লাহর (সা)। আবু মাসউদ ভীষণ প্রভাবিত হন। সেই মুহূর্তে তিনি শপথ করেন, আগামীতে কোনো দিন আর কোনো দাসের গায়ে হাত তুলবেন না। আর সেই দাসটিকে তিনি মুক্ত করে দেন।
সত্যের দায়িত্ব পালন থেকেও তিনি কখনো উদাসীন ছিলেন না। আর এ ব্যাপারে ছোট-বড় কারো পরোয়া করতেন না।
হযরত মুগিরা ইবন শুবা (রা) তখন কুফার আমির, একদিন তিনি একটু দেরিতে আসরের নামাজ পড়ালেন। সাথে সাথে আবু মাসউদ প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেন : আপনার জানা আছে, রাসূল (সা) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জিবরিলের বর্ণনা মত সময়ে আদায় করতেন, আর বলতেন, এভাবেই আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি নিজে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করতেন। একদিন তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান রাসূলুল্লাহ (সা) কিভাবে নামাজ আদায় করতেন?
তারপর তিনি নামাজ আদায় করে তাদেরকে দেখিয়ে দেন।
নামাজের জামায়াতে গায়ে গা মিশিয়ে দাঁড়ানো রাসূলের (সা) সুন্নাত। তিনি যখন দেখলেন, লোকেরা তা পুরোপুরি পালন করছে না, তখন বলতেন : এমনভাবে দাঁড়ানোর ফায়দা এ ছিলো যে, তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন তোমরা দূরে দূরে দাঁড়াও, এ জন্যই তো বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
হযরত আবু মাসউদ প্রকৃত অর্থে ছিলেন একজন সত্যের সৈনিক।
ছিলেন রাসূলের (সা) পূর্ণ অনুসারী।
সাহস ছিলো তাঁর একান্ত ভূষণ। যুদ্ধের ময়দানে দেখা যেত তাঁর সেই সাহসের ফুলকি।
ঈমানের দীপ্তিতে ভাস্বর ছিলেন তিনি। অনেক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তারপরও জ্ঞানতৃষ্ণা মিটতো না তাঁর। এ জন্য সকল সময় ছায়ার মত রাসূলের (সা) কাছেই ছুটে যেতেন।
যেমন ছুটেছেন তিনি সত্যের পথে আজীবন পানির ধারে, এই ন্যায়ের পথিক।
এ জন্যই তো তিনি স্পর্শ করতে পেরেছিলেন চূড়ান্ত সফলতার আকাশ।
আমরাও পারি বটে তেমনটি, যদি সত্য ও সাহসের পথে সর্বদা চলমান থাকি।

SHARE

Leave a Reply