Home সায়েন্স ফিকশন সেইভ দ্য আর্থ-০০১

সেইভ দ্য আর্থ-০০১

মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ

অসম্ভব, এ কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে খবরটি পড়ে চিৎকার করে উঠলেন ড. শওকত জামিল। তার চিৎকার শুনে ছুটে এল তার তিন প্রিয় ছাত্র সিফাত, এমদাদ ও অহিদ।
সাধারণত ড. শওকত জামিল তেমন উত্তেজিতে হন না। এমনকি এর আগে কঠিন বিপদের সময়ও অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তাই হঠাৎ চিৎকার শুনে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল তিন ছাত্র। তাদের চোখে-মুখে নতুন কিছু শোনার আগ্রহ। কিন্তু কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছে না। এটাই নিয়ম। যতক্ষণ ড. শওকত জামিল অনুমতি না দেবেন ততক্ষণ তারা চুপ থাকবে।
একটানা কিছুক্ষণ হতবিহ্বল দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পর তিন ছাত্রের দিকে ফিরলেন ড. শওকত জামিল। এরপর নির্দেশ দিলেন হলোগ্রাফিক স্ক্রিনের সংবাদটি পড়তে।
তিন ছাত্র এবার হলোগ্রাফিক স্ক্রিনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
আজকের সর্বশেষ সংবাদ ঊঝঅ (ঞযব ঊধৎঃয ঝপরবহঃরংঃ অংংড়পরধঃরড়হ) রেগা-২ গ্রহের মহাজাগতিক প্রাণী ক্রুরাদের সাথে এক ইলেকট্রকি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর ১০০ জন ছেলেমেয়েকে ক্রুরাদের হাতে স্থানান্তর করা হবে। আর বিনিময়ে ঊংধ পাবে ক্রুরা কর্তৃক জবরদখলকৃত গ্রহ ব্রিন-৪। এই অদল বদল সম্পন্ন হবে মহাশূন্যের সেভেনসিস্টার ক্লাস্টারের গোপন কেন্দ্রে। এ দিকে ঊংধ-এর অসৎ বিজ্ঞানীরা পৃথিবীবাসীকে ভুল বুঝিয়ে ছেলেমেয়ে সংগ্রহ করছে। পৃথিবীবাসীকে বুঝানো হচ্ছে এসব ছেলেমেয়েদেরকে মহাশূন্য ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবী থেকে ১০০ ছেলেমেয়ে নিয়ে স্পেসশিপ গ-১০৯ সেভেনস্টার ক্লাসটারের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
অদৃশ্য রোবট সিএস-৩ ঊঝঅ-এর গোপন সম্মেলন কেন্দ্র, পৃথিবী থেকে।

দুই.
পৃথিবীতে আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তখন পৃথিবী গ্রহের পুরো স্থলভাগ বিভিন্ন দেশে বিভক্ত ছিল। দেশগুলো ছিল সার্বভৌম। কিন্তু একুশ শতকের শেষের দিকে পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো পারমাণবিক যুদ্ধে মেতে ওঠে। এক বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হয় পুরো বিশ্বজুড়ে। অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যায় মানুষ ও পৃথিবী। এই সময় পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানী একত্র হয়ে গড়ে তুলেন ঊঝঅ। তুলে দেয় রাষ্ট্রব্যবস্থা। এরপর থেকে পুরো পৃথিবী ঊঝঅ-এর অধীনে পরিচালিত হয়। ঊঝঅ-এর সেরা দশ স্টারকার্ডধারী পাওয়ারফুল বিজ্ঞানীদের একজন ড. শওকত জামিল। সারা জীবন ধরে পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের জন্য কল্যাণকর গবেষণায় নিয়োজিত তিনি।
ঊঝঅ-এর স্টারকার্ড লাভের পর স্টারকার্ডধারী পৃথিবী পরিচালনাকারী অন্যান্য বিজ্ঞানীর কাজ স্বচক্ষে লক্ষ্য করেন তিনি। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন প্রথম দিকের ঊঝঅ-এর বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর উন্নতির জন্য কাজ করে গেলেও কয়েক যুগ ধরে ক্ষমতাসীন বিজ্ঞানীরা লক্ষভ্রষ্ট হয়ে গেছেন। তারা পৃথিবীর মানুষকে দিনের পর দিন শোষণ করে যাচ্ছেন। নিজের মেধাশক্তি কাজে না লাগিয়ে ভোগ বিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন। অন্যায়ভাবে পৃথিবীর সম্পদ হরণ করে অন্য গ্রহের মহাজাগতিক প্রাণীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তাদের জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে না লাগিয়ে অসত্যের পথে, নিজের স্বার্থের জন্য কাজে লাগাচ্ছেন।
এর প্রতিবাদ করলেন ড. শওকত জামিল। সাথে পেলেন অপর স্টারকার্ডধারী বিজ্ঞানী কৌশিক সাদিককে।
কিন্তু এ প্রতিবাদই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল অপর আটজন স্টারকার্ডধারী বিজ্ঞানীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাদের দু’জনকে বহিষ্কার করা হলো ঊঝঅ থেকে। রাতের আঁধারে দশম প্রজাতির রোবট দিয়ে খুন করা হলো ন্যায়পরায়ণ, সত্যসন্ধানী বিজ্ঞানী ড. কৌশিক সাদিককে।
এসব বিষয়ে পৃথিবীর মানুষকে অন্ধকারে রাখা হলো, তারা কিছুই জানল না।
ড. শওকত জামিল বুঝলেন তার চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। একদিন রাত্রে তিনি লক্ষ্য করলেন তার গবেষণা কক্ষের চারপাশে দশম প্রজাতির রোবটের আনাগোনা। তিনি জানতেন এ রকম ঘটবেই। এ জন্য তিনি আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসসহ তার তিন প্রিয় ছাত্রকে নিয়ে উঠে বসলেন তার নিজের আবিষ্কৃত স্পেসসিপে।
এবার গতি ঘণ্টায় পাঁচ লক্ষ মাইল। এর পূর্বে পৃথিবীতে আবিষ্কৃত স্পেসশিপগুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় তিন লক্ষ মাইল যা রয়েছে ঊঝঅ-এর বিজ্ঞানীদের কাছে। ফলে খুব সহজেই ঊঝঅ-এর স্পেসশিপের নাগালের বাইরে চলে গেল ড. শওকত জামিলের স্পেসশিপ। এরপর ভেনিস গ্রহে ল্যান্ড করলেন ড. শওকত জামিল তার স্পেসশিপ নিয়ে।
এই গ্রহটি অনেকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি। তাই এই গ্রহের অনেক কিছুই তার জানা।
তিন ছাত্রের সহায়তায় ভেনিস গ্রহের বুকে গড়ে তুললেন তিনি তার নতুন গবেষণাগার। ভেনিস গ্রহের চারদিকে তেজস্ক্রিয়ার স্তর দিয়ে সৃষ্টি করলেন নিরাপত্তাবলয়।
কেউ এই নিরাপত্তা বলয় ভেদ করলে সাথে সাথে অ্যালার্ম বেজে ওঠে আর অসংখ্য শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছুটে যায় আগন্তুকের দিকে। ফলে ঊঝঅ-এর কুচক্রী বিজ্ঞানীগণ এ গ্রহে কয়েকবার হামলা চালিয়েও নিরাপত্তাবলয় ভেদ করতে পারেনি।
এরপর ড. শওকত জামিল গবেষণায় মন দিলেন। তার তিন প্রিয় ছাত্রের সহায়তায় আবিষ্কার করলেন অদৃশ্য রোবট।
তারপর তা পাঠিয়ে দিলেন ঊঝঅ-এর গোপন কেন্দ্র থেকে শুরু করে পৃথিবীর সকল স্থানে। তারা নিয়মিত সংবাদ পাঠিয়ে যাচ্ছে ভেনিস গ্রহে।

তিন.
নিজের গবেষণাগারে পায়চারি করছেন ড. শওকত জামিল। তার কপালে চিন্তার রেখা। পাশের চেয়ারে বসে রয়েছে তার তিন প্রিয় ছাত্র।
মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি। তারপর তার তিন প্রিয় ছাত্রের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমাদের কাছে সময় আছে মাত্র ২৪ ঘণ্টা, এর মধ্যেই যা করার করতে হবে। পৃথিবীর স্পেসশিপ সেভেন সিস্টার ক্লাসটারে পৌঁছার আগেই আমাদের পৃথিবীর ছেলেমেয়েদের উদ্ধার করতে হবে। তোমাদের কিছু বলার থাকলে বলতে পার।’
‘স্যার, প্রয়োজনে আমাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা চাই পৃথিবীর ছেলেমেয়েরা পৃথিবীতে ফিরে যাক।’ অনুমতি পেয়ে বলে উঠল সিফাত।
তার কথায় সম্মতি দিলো এমদাদ ও অহিদ।
এরপর ড. শওকত জামিল বলে উঠলেন, ‘তোমার কথা শুনে আমি খুশি। তোমাদের মতো পৃথিবীপ্রেমিক ছাত্র পেয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত। আল্লাহর দরবারে দোয়া করি তোমরা জীবনে অনেক বড় হও, সত্যের সংগ্রামে জয়ী হও।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অপারেশন সম্পর্কে বর্ণনা দিলেন ড. শওকত জামিলÑ ‘আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে আমি যাত্রা করব। আমার সাথে যাবে অহিদ। তোমাদের সাথে আমার আর দেখা না-ও হতে পারে। তাই আমি তোমাদের সবকিছু সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে যাবো। মনে রাখবে, নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও পৃথিবীকে রক্ষা করা তোমাদের দায়িত্ব। বিপদে ধৈর্য হারাবে না। সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। তোমাদের কিছু বলার আছে?’
‘স্যার, এই অভিযানের একটা নাম দিলে পরবর্তীতে একে শনাক্ত করতে সুবিধা হতো।’ বলে উঠল এমদাদ।
‘আমার সাথে এই অভিযানে যাবে অহিদ। তাই অভিযানের নাম সে-ই দেবে।’ অহিদের দিকে চেয়ে বললেন ড. শওকত জামিল।
‘স্যার, এই অভিমান যেহেতু পৃথিবীকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ, তাই নাম দেয়া হোক অপারেশন সেইভ দ্য আর্থ-০০১।’ সাথে সাথে বলে উঠল অহিদ।
‘এই নামটা গৃহীত হলো।’ মুচকি হেসে দিলেন ড. শওকত জামিল।
দেড় ঘণ্টা খাটখাটনি করে গ্রহের সবকিছু সিফাত ও এমদাদকে বুঝিয়ে দিলেন ড. শওকত জামিল। এরপর সবাই মিলে প্রয়োজনীয় জিনিস তুলে নিলেন মহাকাশযান এফ-১০-এ।
আধঘণ্টা পর ভেনিস গ্রহ থেকে বেরিয়ে গেল মহাকাশযান এফ-১০।
ভেনিস গ্রহের বালুময় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধেয় স্যার ও বন্ধুকে বিদায় জানাতে গিয়ে সিফাত ও এমদাদের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। মুখ থেকে অস্পষ্ট স্বরে বেরিয়ে এলোÑ ফি আমানিল্লাহ।
এ সময় তাদের মাথার ওপর জ্বল জ্বল করছিল ভেনিস গ্রহের সূর্য, প্লিরু নক্ষত্র।

চার.
ভেনিস গ্রহ ১০০ ছেলেমেয়ের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল। তাদের মুখের দিকে চেয়ে সমস্ত কষ্ট ভুলে গেলেন ড. শওকত জামিল।
তার আবিষ্কৃত অস্ত্র ও কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়েছে ঊঝঅ-এর কুচক্রী বিজ্ঞানীগণ।
তিনি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন পৃথিবীর ১০০ ছেলেমেয়েকে। তিনি এর পূর্বে লক্ষ্য করেননি ছোট ছেলেমেয়েদের মাঝে এত আনন্দের উৎস রয়েছে। কারণ প্রায় তার পুরো জীবন কেটেছে বিজ্ঞান সাধনায়।
অন্যান্য দিনের মতো সেদিন সন্ধ্যায় গবেষণাগার থেকে বাইরে বের হয়েছেন ড. শওকত জামিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন ছেলেমেয়েরা সবাই অতি শক্তিশালী গ্লোবো দূরবীণ দিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তিনি লক্ষ্য করলেন তাদের সকলের দৃষ্টি নীল গ্রহটির দিকে, যেখানে তাদের জন্ম।
হঠাৎ কী একটা তেজ, অনুভূতি তাকে চেপে ধরল। তিনি গবেষণাগারে ঢুকে পড়লেন। নতুন ভাবনায় মত্ত হলেন।
এখন তার একটাই কাজ, যে করেই হোক পৃথিবীকে উদ্ধার করতে হবে ঊঝঅ-এর কুচক্রী অসৎ বিজ্ঞানীদের হাতে থেকে। পৃথিবীর ছেলেমেয়েদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

SHARE

Leave a Reply