Home স্মরণ তখনকার ঈদে একটা সরলতা ছিল – শাহ আব্দুল হান্নান

তখনকার ঈদে একটা সরলতা ছিল – শাহ আব্দুল হান্নান

ঈদ মানে আনন্দ, আনন্দেই আমরা ছোটবেলায় ঈদ করতাম। রমজানের পরে রোজার ঈদ এবং কুরবানির পরে বকরা ঈদ পালন করতাম আমরা, অনেক আনন্দের সঙ্গে। ঈদুল ফিতরে রমজানের পরে আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন হতো। আমরা সাধ্য মতো নতুন পোশাক পরতাম। এখনকার মতো সুট-প্যান্ট ছিল না, পাঞ্জাবি-পায়জামা ছিল তখন। এখনও তো পাঞ্জাবি-পায়জামা পরেই মাঠে যায়।
তখনকার সমাজে যতটা সম্ভব ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। বাড়িতে বাড়িতে বেড়াতো বাচ্চারা যেমন এখনো বেড়ায়। কিন্তু পার্থক্যটা এই যে, তখন সমাজে কোনো অশ্লীলতা আমি দেখিনি, এইটা হচ্ছে মেজর পার্থক্য। একটা সরলতা ছিল তখন, একটা সাদামাটা ছিল। ঈদের আনন্দের নামে যে এখন একটা জৌলুস হচ্ছে এটা ছিল না। অথবা অতিরিক্ত দেখানো বা প্রদর্শন সেটা ছিল না। সাধারণত ঈদের নামাজ ঈদের মাঠেই হতো। বিকেলে কিছু সময় খেলাধুলা হতো এর বাইরে কিছু হতো না।
আমার কথাতো আলাদা, আমি তো ফজরেই উঠতাম কিন্তু অন্যেরাও ফজরেই উঠতো। আমি গ্রামের ছেলে, গ্রামে আমি যখন ঈদ করেছি অল্প বয়সে, এমনকি শহরেও আমি যখন অল্প বয়সে সিক্স-সেভেনের ছাত্র তখন শহরে চলে আসি। সেখানেও সকালে উঠে পড়তে দেরি করতো না কেউ। ঈদের দিন খুব তাড়াতাড়ি গোসল করার একটা পাল্লা চলতো আমাদের মাঝে।  আমাদের বাড়িতে বড় একটা ইঁদারা ছিল, একশো বছর আগের সরকারি ইঁদারা, আমরা তার পাড়েই গোসল করতাম, পুকুরেও করতাম। এরপর মাঠে চলে যেতাম। সঙ্গে আব্বা থাকতেন, আব্বা না থাকলে চাচারা থাকতেন। মামার বাড়িতে থাকলে নানারা থাকতেন।
আমি যেখানে ঈদের নামাজ পড়তাম সেখানে অনেকটা সাদামাটাই হতো। একটা বড় মাঠ ছিল, সেটা দুই-তিন দিন আগে থেকেই পরিষ্কার করা হতো। তারপর ঈদের দিন খুব সকালে সেখানে চাদর বিছানো হতো বা চটও বিছানো হতো অথবা খালিই থাকতো। মাঠটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। শুকনা দিন হলে এমনই, আর বৃষ্টির দিন হলে মসজিদেই নামাজ হতো।
ঈদের মাঠে ঠিক বাজার ছিল না। আজকাল যে মেলা হয় সেটা হতো না। সুতরাং কিছু কেনার প্রশ্নই ছিল না, এখন যেমন ছোট ছেলেমেয়েরা আবদার ধরে কেনার জন্য।
ইদগাহ থেকে নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে আম্মা-আব্বাকে সালাম করতাম। আমি পা ছুঁয়ে সালাম করতাম না, অল্প বয়স থেকেই আমি আস্সালামু আলাইকুম বলতাম। আমাদের বাড়িতে আট-দশটা ঘর ছিল। সবার ঘরে গিয়ে সবার সাথে সালাম বিনিময় করে কথা বলে আসতাম। সকালে ফিরনি করা হতো মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পিঠা। আর দুপুর ও রাতের জন্য সেই সময়ের মধ্যে পোলাও-কুরমাটা ছিল প্রাচীন খাবার। পোলাও-কুরমা ঈদের সাথে জড়িত, এটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে। সেটা সারা ভারতে একই অবস্থা।
আজকালকার সময়ে আমরা যেমন আত্মীয়-স্বজনকে গিফট দেই তখন এটার রেওয়াজ তেমন ছিল না। হয়তো বা ঈদ উপলক্ষে কিছু টাকা দেওয়া হতো গরিব-মিসকিনকে।
ঈদের দিনের বিকেলটা সাধারণত আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে কাটাতাম। গ্রামের ভেতর অথবা কিছু দূরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে যেতাম। বেড়াতে বেশ মজা লাগতো। এখন তো আর অত বেড়ায় না লোকজন। টেলিভিশনের সামনে বসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে কাটিয়ে দেয়। এসব অনুষ্ঠানের বেশিরভাগটাই আবার আমাদের সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না। আমি বুঝি না আমাদের সন্তানদের আমরা কেন এসব দেখতে দিই। এ থেকে শিক্ষণীয় তেমন কিছু নেই। বরং সংসারে-সমাজে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টির উপাদান এসব থেকে বের হয়ে আসে।
দেশী খেলার মধ্যে আমি দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতাম। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাতে আমি খুব ভালো ছিলাম। আর বিদেশী খেলার মধ্যে ব্যাডমিন্টন আমি পছন্দ করতাম। তখনকার সময়ে হকি, ক্রিকেট এসব খেলা আসেনি।
যদি কোথাও বেড়াতে না যেতাম মাগরিবের মধ্যে বাড়ি ফিরতাম। তখনতো হারিকেনের দিন ছিল। রাত ৭টা-৮টার মধ্যে সবাই শুয়ে পড়তো। পরদিনও ঈদের আমেজ যেন রয়ে যেত।
এখন ঈদের দিনগুলোতে আমার ঠিক আফসোস ঠিক হয় না, কিন্তু মনে হয় আমাদের ঈদ সংস্কৃতিটা অনেকটা বিজাতীয় হয়ে গেছে। অনেকটা অশ্লীলতা ঢুকে পড়েছে। রিয়া বা প্রদর্শন যেটা পোশাকে দেখাতে হবে। আমি যে পোশাক কিনেছি সেটা অন্যকে না দেখালে চলবে না, এই সব ছিল না।
এজন্য আমি বলবো, ঈদ মানে খুশি। আর এই ঈদতো ইসলামের অংশ। সুতরাং ইসলামের পুরো কালচারটা তোমাদেরকে জানতে হবে।

SHARE

Leave a Reply