Home স্বাস্থ্য কথা স্মৃতির দর্পণে কবি মতিউর রহমান মল্লিক

স্মৃতির দর্পণে কবি মতিউর রহমান মল্লিক

শরীফ আবদুল গোফরান
১৯৭৯ সাল। ঢাকায় এসেছি মাত্র। মতিঝিল কলোনিতে বড় ভাইয়ের বাসায় উঠেছি। এখানে এসে প্রথম পরিচয় হলো সাইমুমের সদস্য জাহিদ হোসেনের সাথে। অনেক গুণ ছিলো এই জাহিদের। তিনি একজন ভালো সংগঠক ছিলেন, ভালো গান গাইতে পারতেন, পাশাপাশি ভালো ছাত্রও ছিলেন। লেখালেখির সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে জাহিদ ভাই অল্প কয়দিনে আমাকে আপন করে নিলেন। তিনি এক সময় জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসরের সাথেও কাজ করতেন। আমিও কুমিল্লায় এক সময় সবুজ মেলার সাথে কাজ করতাম। ফলে অল্প কয়দিনে জাহিদ ভাইয়ের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়লাম। জড়িয়ে পড়লাম ফুলকুঁড়ি আসরের সাথেও।
মতিঝিল, আরামবাগ, সবুজবাগ ও খিলগাঁওÑ এই চারটি শাখার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসাবে কাজ শুরু করলাম। পাশাপাশি নাটকের দিকেও মন দিলাম। আরামবাগে জাহিদ ভাইয়ের বাসায় ডা: আকরাম হোসেন রচিত ‘হাতেম আলীরা স্বপ্ন দেখে’ নাটকটির রিহার্সালও শুরু করলাম। এটিই ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক। এই নাটকটি এক সময় শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ঐ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। আমি নিজেই এই নাটকের পরিচালক ছিলাম। আবার বাবার চরিত্রে অভিনয়ও করি। সেদিন এ নাটক দেখার জন্য খ্যাতিমান অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও উপস্থিত ছিলেন। নাটকটি উপস্থিত দর্শকদের মাঝে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফুলকুঁড়ি পরিচালক জয়নুল আবেদীন আজাদ ভাইও উপস্থিত ছিলেন। তিনি খুব খুশি হলেন। তিনি নাটকের সাথে জড়িত সবাইকে তোপখানা রোডে একটি হোটেলে নিয়ে গেলেন। হোটেলে একজন লোক কালো দাড়ি, মাথা ভরা চুল, পায়জামা পাঞ্জাবি পরা, হঠাৎ করে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমো খেলেন। এর আগে এই মানুষটিকে আমি টিএসসিতে সিরাতুন্নবী (সা) অনুষ্ঠানে গান গাইতে দেখেছি। আমার মনে পড়ে তার কণ্ঠের সেই গানটি ছিলোÑ
‘দাও খোদা দাও হেথায় পূর্ণ ইসলামী সমাজ/রাশেদার যুগ দাও ফিরিয়ে দাও কুরআনের রাজ…।’
তখন থেকেই তাঁর সাথে পরিচয় হওয়ার আমার খুবই ইচ্ছা ছিলো। এই মানুষটি ছিলেন সবার প্রিয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক। কবি মল্লিক আমাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর স্নেহ আদরে আমি যেন তার বুকে হারিয়ে গেলাম। যেন পৌঁছে গেছি বহুদিনের প্রতীক্ষিত নিজ ঠিকানায়। জাহিদ ভাই পরিচয় করে দিলেন, ইনি হলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক।
এই পরিচয়ের পর কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সংস্পর্শ থেকে আর কখনো নিজকে আলাদা করতে পারিনি। সব সময় তাঁর কাছে কাছে ছিলাম। তিনি কখনো বন্ধুর মতো, কখনো শিক্ষকের মতো পথনির্দেশনা দিয়েছেন। বয়সে আমি তাঁর দুই বছরের বড় ছিলাম। এ কারণে তিনি সব সময় আমাকে বড় ভাই বলে ডাকতেন। আমি তাঁকে ডাকতাম ‘পীর সাহেব’ বলে। আমার ডাকে তিনি হাসতেন। আমার অনেক স্মৃতি কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সাথে জড়িয়ে আছে। এসব স্মৃতি দু-একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। কত রাত, কত দিন তাঁর সাথে কাটিয়েছি তার কোনো হিসাব নেই।
কবি মতিউর রহমান মল্লিককে শিক্ষকের মতো সম্মান করতাম, শ্রদ্ধা করতাম। আমার কোনো ভালো গান বা কবিতা তাঁর হাতে পড়লে তিনি সাথে সাথে ফোন করতেন, প্রশংসা করতেন, উৎসাহিত করতেন, পরামর্শ দিতেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন একজন গীতিকবি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যে ইসলামী সঙ্গীতকে আধুনিক ভাবধারায একমাত্র তিনিই উজ্জীবিত করেছেন।
এক সময় বাংলা ভাষার অনুকরণে উর্দু, ফার্সি ও আরবি শব্দের সংমিশ্রণে আমাদের দেশে গজল পরিবেশিত হতো। কালক্রমে এসব গজল প্রায় বিলুপ্তির পথে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক তাঁর লেখনির মাধ্যমে ইসলামী ভাবধারার এসব হামদ-না’ত ও গজলকে আধুনিকতায় রূপ দিয়ে বর্তমান সময়ের ইসলামী সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ইসলামী গানের শ্রোতাদের মাঝে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটান।
মুসলিম ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনের জন্য এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্ন পূরণে কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন আজীবন নিবেদিতপ্রাণ। তিনি বীরের জাতি মুসলমানদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে প্রবল আকাক্সক্ষায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন আমার একজন আদর্শবান সাহিত্যিক। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে দক্ষতার জন্যও প্রশংসিত। আমরা সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবদান খুঁজে পাই। মাত্র ৫৪ বছর জীবনকালের মধ্যে কবি মল্লিক আমাদের সাহিত্যে অসংখ্য ছড়া কবিতা, গান, প্রবন্ধ ইত্যাদির চিহ্ন রেখে গেছেন। তাঁর সমস্ত চিন্তায়, কাব্য ভাবনায় কবি ইকবাল, নজরুল ও ফররুখÑ এই তিন কালজয়ী পুরুষের ভাবনার সম্মিলিত ছায়া পড়েছে। এই ভাবনায় সম্মিলনে তাঁর মানস গড়ে উঠেছে সকল সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে শুধুই মানবতাবাদের মজবুত ভিতের ওপর। অন্তরে বাইরে অভিন্নতা, সততা ও বিশালতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে করে তুলেছে দুর্দান্ত সাহসী ও তেজস্বী। ব্যক্তিজীবন, প্রাত্যহিক ও ব্যবহারিক জীবনে কর্মে তার দৃষ্টান্ত রেখেছেন সারা জীবনজুড়ে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের স্বপ্ন ছিলো বিরাট, চিন্তা, ছিলো নিখাদ এবং কর্মে কোন ফাঁক বা অসততা বা ক্লান্তি ছিলো না। তাঁর বিশাল আন্তরিক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে তিনি আপ্রাণ চেষ্টায় গড়ে তোলেন ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির ওপর গবেষণা, এর চর্চা ও প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে দেশের প্রথম ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, ঐতিহ্য সংসদ ও বিপরীত উচ্চারণ। এর অঙ্গনে জমায়েত হয়েছে দলমত নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক, শিল্পী তেমনি ইসলামপ্রিয় সাধারণ মানুষ। তিনি সারাদেশের প্রতিভাবান তরুণদের একত্র করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাতিকে উপহার দিয়েছেন শত শত কবি, সাহিত্যিক ও সঙ্গীতশিল্পী। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নবীন প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভাদীপ্ত তরুণ কণ্ঠগুলো ছড়িয়ে গেছে সারা দেশে।
তাঁর সংস্পর্শে এসে প্রবীণ যশস্বী শিল্পীরা যারা তাদের প্রতিভা ও অবদানের সীমিত বৃত্তে আবদ্ধ ছিলেন, তারা পেলেন যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান। সাইমুম, ঐতিহ্য ও বিপরীত উচ্চারণের কর্মকাণ্ড দেশের মানুষের ঐতিহ্য সংস্কৃতি চেতনায় এনে দিলো এক নতুন প্রাণস্পন্দন, নবজোয়ার।
অবাক বিস্ময় ও মুগ্ধতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মসহ সকল মানুষ অবলোকন করলো, পরিচিত হলো নতুন করে বিস্মৃত প্রায় বিশাল প্রতিভার অনাবিষ্কৃত পরম সম্পদের সাথে যা আমাদের সকল স্তরের মানুষের জীবনবোধে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দায়িত্ব দেশ, জাতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং সম্পূর্ণ ও যথাযথ প্রচার ও প্রসারের মতো, সে দুরূহ কাজ সম্পাদনের জন্য যে ধারার তিনি সূচনা করে গেছেন, তা আজো দুর্জয় গতিতে বহমান, পরিণতির সমুদ্রের দিকে ধাবিত। তাঁর কোনো প্রত্যাশা ছিলো না। প্রাণের আনন্দে প্রাণের তাগিদে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময় হীনম্মন্যতা এবং পরশ্রীকাতরতাপ্রসূত আক্রমণের শিকারও তিনি হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে ভালোবেসে গেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন সবাই। দেশের ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে কবি মতিউর রহমান মল্লিক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল।
যে মানুষটি সারাজীবন অর্থবিত্তের ধার ধারেননি, সেই মানুষটি গভীর নিমগ্ন থেকেছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সকল কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পনায়, পরিচালনায়।
ক্লান্তিহীন মনে হতো আমৃত্যু সে নিমগ্নতা। কর্মচঞ্চল, প্রাণস্ফূর্তিতে ভরপুর এই মানুষটি দীর্ঘদিন বিছানায় শায়িত নিমগ্নতার কোন গভীরে অবগাহন করেছেন তা জানি না। বাইরে কোলাহল, কোন্দল, মানুষের দীনতা কিছুই তাঁকে তখন বিচলিত করেনি। তাঁকে প্রতিদিন দেখেছে শত শত মানুষ, আরো বেশি ভালোবেসে, শ্রদ্ধাবনত হয়ে, কৃতজ্ঞ হয়ে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫৬ সালের ১লা মার্চ বাগেরহাট জেলার রায়পাড়ার বারোইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী কায়েম উদ্দীন মল্লিক, আর মা আছিয়া খাতুন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক কর্মজীবনে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাহিত্য সম্পাদক, কিশোরকণ্ঠ পত্রিকার প্রকাশক, মাসিক কলমের সম্পাদক এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্রের সদস্যসচিব ছিলেন।
কবি মল্লিকের রচিত গ্রন্থের মধ্যে কাব্যÑ আবর্তিত তৃণলতা (১৯৮৭), অনবরত বৃক্ষের গান (২০০১), তোমার ভাষায় তীক্ষè ছোরা, চিত্রল প্রজাপতি, কিশোর কবিতাÑ রঙিন মেঘের পালকি (২০০২), গানÑ ঝংকার (১৯৭৮), যত গান গেয়েছি, গ্রন্থ- নির্বাচিত প্রবন্ধ, সম্পাদনা- পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে, প্রত্যয়ের গান প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিতব্য গ্রন্থÑ চিরকালের গান, পাহাড়ি এক লড়াকু (উপন্যাস অনুবাদ), সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতি (প্রবন্ধের বই), মুন্নার পাণ্ডা (ছোটদের ছড়ার বই)।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে সবুজ মিতালী সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় সাহিত্য সংসদ স্বর্ণপদক, কলমসেনা সাহিত্য পদক, লক্ষ্মীপুর সংসদ সাহিত্য পদক, রাঙ্গামাটি পরিষদ সাহিত্য পদক, খান জাহান আলী শিল্পীগোষ্ঠী সাহিত্য পদক, সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ সাহিত্য পুরস্কার (বাগেরহাট), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সাহিত্য পুরস্কার (বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, প্যারিস, ফ্রান্স), বায়তুশ শরফ সাহিত্য পুরস্কার (চট্টগ্রাম), বাংলাদেশ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার (১৯৯৭), কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০২), বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (২০০৯) লাভ করেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ২০১০ সালের ১২ আগস্ট সর্বশক্তিমান ও পরম দয়ালু আল্লাহর নির্ধারিত দিন ও সময়েই তিনি নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছেন অদৃশ্য জগতে। আগে আর পরে, প্রত্যেক মানুষকেই তাঁর নির্ধারিত দিনে এভাবে চলে যেতে হবে। এটাই পরম সত্য।
তবুও কোন প্রতিভার ভালো মানুষের অকাল বিদায় আমাদের ব্যথিত করে। কবি মল্লিকের বিদায়ও আমাদের ব্যথিত করেছে। সত্যনিষ্ঠ এই নাবিক কবি মতিউর রহমান মল্লিকের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।

SHARE

1 COMMENT

  1. Thanks you so much Mr. Mallik for Gifting me a beautiful name when I was born… I will always have the regret that I could not meet you in this world but In Shaa Allah we will meet in Jannah and I pray for that opportunity to Allah Subhana’Wa’taala….

Leave a Reply