Home গল্প দুই টাকা

দুই টাকা

আফজাল আনসারী

দীর্ঘ কুড়ি বছর ভিক্ষা করিনি। থুক্কু, ভিক্ষুকের মতো হাত পাতিনি। কোনো জিনিস চেয়ে খাইনি। বিজয় দিবস উদ্যাপনের আনন্দ অনেক। বয়স্কদের চেয়ে শিশু-কিশোরেরা সে আনন্দ বেশি করে। আমার এক হালি আন্ডা-বাচ্চা। ওদের আনন্দ দেয়ার জন্য কোথায় যাব? বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছিলাম। টিএসসি চত্বর, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক আয়োজন।
রমনার পয়লা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এখানে ওখানে মনুষ্য মলের তীব্র দুর্গন্ধ। সঙ্গে বাচ্চার মা। অন্যান্য অনেক লোকই সেভাবে। এরমধ্যেই সপরিবারে ছেলেমেয়ে একসাথে ঘুরছে, খাচ্ছে,  মজা করছে।
বহুদিন সপরিবারে এমন ঘুরাফিরা হয়নি রেজিস্টার্ড প্রাইমারী স্কুলের গণিত শিক্ষক মোসলেম উদ্দীনের। এমনিতেই সংসারে মন বসাতে পারছি না। অনটনের মধ্যে সব এলোমেলো লাগে। বড় কারণ রাজনৈতিক। অর্থনীতিকেও দূরে ফেলা মুশকিল। একটু সময় কাটাব বলে পুরাতন প্রিয় সাইকেলটা ঘঁষামাজাা করছি। বাবুর মা বলল, একা একা যাওয়ার চেয়ে বাচ্চা দুইটা সঙ্গে নিয়া যান। বিপদ! এমনিতেই মনখারাপ। আর্থিক অনটন। শেষ মাসের বেতন এখনও সপ্তাহখানেক দেরি। সাধারণ কোনো কাজে ধারকর্জ ভালো লাগে না। মাত্র পাঁচ টাকা পকেটে। বিশেষ দিনে বাইরে গেলে একটু টাকাপয়সা না হলে যেতে মন চায় না। ছোট বাচ্চাটি জোঁকের মতো লেগে আছে। এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হচ্ছে না। অনেক ভুলানোর চেষ্ট করেও ব্যর্থ।
এর আগের যাত্রায় একদিন বাবুর মা ছিল। এক দোকানের সামনে অপমানের এক শেষ। আমার হাতে পঞ্চাশটি টাকাও নেই। বাবু কিনা দাবি করল একশ টাকার জিনিস। শোনা মাত্র রাগে আমার মাথার তালু তেঁতে উঠল। সেদিনকার জ্বালাতন চিরদিন মনে থাকবে। পাক্কা দু’ঘণ্টা দোকানের সাথে চুম্বকের মতো  লেগে আছে। দোকানদারও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কুড়ি টাকার জিনিস পঞ্চাশ টাকা হাঁকল। মানুষের  দুর্বলতায় মানুষ মজা করে, আনন্দ করে। সখের তোলা আশি টাকা। সখ করেছ টাকা খসাও।
সাইকেল নিয়ে ঘোরার আলাদা আনন্দ। বিশেষ করে বাইসাইকেলে। শুধু শক্তি দিয়ে চালালেই চলে। তেমন খরচ নেই, ভাড়া নেই। ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ, উপরন্তু ডায়াবেটিস দফারফা। বাবুর কারণে এই সময়ের অপচয় কোনোভাবেই পোষানো যাবে না। কানে ধরার অবস্থা। চা দোকানের লোকও বাবুকে বিস্কুট-কলা দেখাল তাতেও কাজ হলো না। মনে মনে বললাম, শালা সাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরির মজাটা দেখ। দু’বার ওর মায়ের ঘাড়ে বাচ্চাকে দিয়ে নামাজ পড়েছি। ওর মায়ের পক্ষে ওকে  সামলানো অসম্ভব।
দোকানদার লোকটাও এর মধ্যে আন্ডার ইসটিমেট করা শুরু করেছে। কারণ বাচ্চা যে দু’টো জিনিসের আবদার শুরু করেছে তা অনান্য বাচ্চারা হরহামেশা এমনিতেই খায়। আমরা এ কেমন অভিভাবক? চা-স্টলের একজন আমার দিকে সন্দেহের নজরে তাকাল। বাচ্চা আমার নিজের কি-না তাই বুঝি ভাবছে! বিরাট মুছিবত। বাচ্চার কান্না দেখে লোক জড়ো হওয়া শুরু করেছে। এ দেখি মার খাওয়ার পালা। সামান্য এদিক-ওদিক হলে গণপিটুনির সম্ভাবনা।
কাচুমাচু গলায় বললাম, ভাই আমার নিজের বাচ্চা। বাচ্চাটার রাগ খুব বেশি। রাগ না কমা পর্যন্ত ওর সাথে পারা যাবে না। ক্রোধ এখন উচ্চে।
দু’ঘণ্টা পর একটা ছোট প্রাণ জুস মিস্টার টুইস্টের চিপসেই কাবু করতে পারলাম। হলুদ ম্যাঙ্গো জুসের বোতলটা দিতেই রাগটা প্রাথমিক দ্রবীভূত হলো। বুঝতেই পারিনি ছোট জুসের জন্য এতক্ষণ গো ধরেছিল। মনটা খচ্খচ্ করতে লাগল। শুকনো কচি ক্ষুধার্ত মুখে জুসের বোতলে মুখ লাগিয়ে মুহূর্তেই খেয়ে ফেলল। দৃশ্যটা দেখে চোখে পানি চলে এলো। আহারে, অন্যের বাচ্চারা কত কিছুই না খায় আর আমি সামান্য জুসটাও কিনে দিতে এমন অমানবিক আচরণ করেছি। কানে ধরে তওবা করছি এই জীবনে অবুঝ বাচ্চা নিয়ে ঘুরব না।
শিশুদের শিক্ষক হয়েও অবুঝ বাচ্চাদের অধিকার বোঝার মানবিক বিবেকটুকুও আমার মধ্যে নেই। বাচ্চা নিয়ে ঘোরা আমার সাজে না। ওর মায়ের সাথেও হালকা তর্ক জুড়ে দিলাম।
ভুল করে সুন্দর শীতের এই সন্ধ্যায় দিবস উদযাপন করতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি খেলার মাঠে। যথারীতি আমার বাঁদর স্বভাব প্রিয় বাচ্চা দু’টিসহ এবং বাইসাইকেলে। চিরসবুজ দরিদ্র। সবসময় আমার পকেটে ছাত্রজীবনের মতো দু’চার টাকার বেশি থাকে না। আজকে মাত্র পাঁচ টাকা।
মানুষ বিপদে পড়ার আগে টের পায়। নাপিত দেখলে নখ বাড়ে, খাওয়া দেখলে ক্ষুধা লাগে। পাশের মহিলার কুটুস কাটুস বাদাম খাওয়া দেখে আমার ছোট মেয়ের বাদাম খাওয়ার নেশা জাগ্রত হলো। প্রথম প্রথম দু’বার বাদাম ওয়ালা ঘুরে গেল।
আমি লোভ দেখিয়ে বললাম, আরো ভালো জিনিস খাওয়াব। লোভ দেখানোতে কাজ হলো কি না ওর গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, শক্ত হয়ে আছে। বাচ্চারা বেজার হলে মুহূর্তেই জড় পদার্থ হয়। তার মানে আমার নরম কথায় কাজ হয়নি। দুর্বল বিড়ালের ডাকের মতো নাকি সুরে বলল, ভালো জিনিস খাওয়া লাগবে না, শুধু বাদাম খাব।
তৃতীয় বার বাদামওয়ালা ঘুরে যাওয়ার সময় কে যেন বাদাম ভাঙল। সেই বাদামের মিষ্টি মৌ মৌ করা ঘ্রাণে আমার মনটাও পাগল। শিশুদের ঘ্রাণশক্তি প্রখর। ওরা সে ঘ্রাণে প্রথমেই পাগল হয়েছে। যেমন পাগল হয়েছিল মাস খানেক আগে। হলুদ প্রাণ জুসের বোতল দেখে ঢাকার মতিঝিলে। স্ব-গর্বে বাদামওয়ালাকে ডাকলাম। কথার ভঙ্গি বাদামওয়ালা যেন আমার বাবার কেনা গোলাম। অ্যাই, অ্যাই বাদামওয়ালা, পাঁচ টাকার বাদাম দে।
এখন পাঁচ টাকার বাদাম ওজন করে না। হাতের আন্দাজেই দেয়। ছোট ময়লা দাড়ি-বাটখারা বের করলে নিদেনপক্ষে দশ টাকার খরিদ জরুরি। হাসির ঝিলিক দিয়ে কাগজের কলকিতে সামান্য ক’টা বাদাম দিয়ে চলে গেল।
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছি। একটু পরেই ছোটবাবু বলল, আব্বু আরও বাদাম খাব। মনে মনে আমি বললাম, এই সেরেছে বলে কী? আমার কাছে আর কানা কড়িও নেই!
ন্যাড়া বেল তলায় দু’বার যায় না। আমি বেলতলায় শুধু দু’বারই না বহুবার গিয়েছি। আজ নিয়ে কত বার তার হিসাব কষতে ক্যালকুলেটার প্রয়োজন। মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ পানসে। সামনের সারিতে বসা ছিলাম। আস্তে গোপনে চোরের মতো উঠে চলে এলাম। বাদামের আশায় আমার সাথে ওরাও তাড়াতাড়ি উঠে এলো। ফাঁকে এসে দেখি ভারি বিপদ। ম্যারাথন আবদার। নাকি কান্নার সাথে হাত-পা নাড়ছে।  দু’জন সুর করে কান্না করছে। জোরে জোরে বলছে, বাদাম বাদাম, আব্বু বাদাম!
ভারি মুশকিল। এ জীবনে মাগনা কোনো জিনিস ভিক্ষা করিনি। একজন কিশোর ছেলে বাদাম ফেরি করছিল। ওকে দেখলে না হয় ভিক্ষুকের মতো চেয়ে নিতাম। এছাড়া অতগুলো লোকের সামনে তো মাগনা চাওয়া মুশকিল। কিনতে চাওয়ার ভান করে দু’একটা বাদাম মুখে তুলে চেখে দেখা যায়। বাদাম কেনার দু’টাকাও সাথে নেই। কাজেই ভান করারও সাহস হচ্ছে না। বললাম, তোরা এখানে থাক। দেখি কোনো কিনারা করতে পারি কিনা।
এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে শিশুকালে রাস্তায় দু’টাকার কয়েন পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। মায়ের উপদেশ শুনে সেদিন হাতে তুলিনি। আজ রাস্তায় পেলে কী যে উপকার হত!
বাচ্চাটা এখন বাদামের জন্য প্রকৃত কান্না শুরু করেছে। ইজ্জত পাঙ্চার। এ মুহূর্তে দু’টাকার মূল্য অনেক। দু’টাকা কত ভিক্ষুককে এমনিতেই দিয়েছি। অথচ আজ এখানে আমিই ভিক্ষুক।
দুই শিশুর মধ্যে বড়টার বয়স আট। ওর কাছে ছোটটাকে রেখে বাদামের সন্ধানে বের হলাম। চক্ষুলজ্জা অনেক সময় ত্যাগ করতে হয়। সে কথা গোপনে এক বাদাম ওয়ালাকে বলব। সবার সামনে তো বলা যাবে না। আমার কাছে কোনো পয়সা নেই, এ কথা জানলে লোকে অবজ্ঞা করবে, ঘৃণা করবে। পয়সা নেই বললেও সন্দেহ করবে। পোশাকের দিকে চোখ তুলে তাকাবে। যদি বাদামওয়ালা হেসে বলে ফেলে, পয়সা নেই বললে হলো, এখানের থিক্যা বাড়ি যাইবেন কেমনে? আমি বাইসাইকেলে এসেছি সাইকেলে বাড়ি ফিরব। এতো ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন আছে? ছোট বাদামওয়ালার কাছে এমন ব্যাখ্যা দিতে হলো। বড়টার দায়িত্বে ছোটটাকে রেখে বিজয় মঞ্চের সামনে। সেখানে দু’তিন জন বাদামওয়ালা ঘুরেঘুরে বাদাম বিক্রি করছে। চক্ষুলজ্জায় লোকের সামনে এভাবে বাদাম চাওয়া গেল না। দশ মিনিট পর এমনি এমনিই বাদামবিহীন খালি হাতে চলে এলাম।
বড় মেয়েটা হাঁসফাঁস করছে। চোখ বড় বড় করে জানাল, আপনি বাবুর কাহিনী জানেন আব্বু?
আমার মুখ ঘামছে। ছোট চাপা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, কী কাহিনী?
ও বলল, বাবু মাথার টুপি ফেলে রাগ করেছে।
আর কী করেছে? প্রমাদ গুনলাম।
আরো বড় কাহিনী আছে। বাবু টুপি ফেলে রাগ করে এই লোকের ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। আমি অনেকক্ষণ খুঁজে পাইনি। বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে। বাবু গেল কৈ? বাবু গেল কৈ? অন্ধকারে বাবু বাবু বলে ডাকছি। ভয়ে কান্না চলে এসেছিল। একটু আগে খুঁজে পেয়েছি। লোকের ভীড়ে ছোটদের ফেলে যান, এইটা আপনার কেমুন বিবেচনা হ্যাঁ?
ওর কচি বুকে হাত দিয়ে দেখলাম আসলেই ধুকধুক শব্দ হচ্ছে। ওকে বিপদে ফেলার জন্য মনে কষ্ট লাগল।
ও এখনও সেই মুছিবতের মধ্যে। বললাম, চলো দেখি সামনে কোনো বাদামওয়ালা পাই কি না? আজ তোদের জন্য বাদাম ভিক্ষা করব। কত ভিক্ষুকই তো নিজের সন্তানকে ভিক্ষা করে আনন্দে মুখে খাবার তুলে দেয়।
একবার এমন করে চকলেট চেয়ে খাওয়ানোর কথা মনে হলো। চকলেটওয়ালাকে বললাম, ভাই আমার বাচ্চাকে একটা চকলেট বাকিতে দেন। মূল্য পরে দিয়ে দেব। দোকানদার আমার কথা শুনে মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল। বলল, এক টাকার চকলেট বাকি? এ দোকানদারী জীবনে শুনিনি। দোকনাদার এবার কৌতুক করে বলল, ভাই এতো অল্প মূল্যের জিনিস আপনি বাকিতে খরিদ করেন? আপনার বংশে এ অভ্যাস আর কারো আছে নাকি?
আমি বললাম, ভাইসাহেব, আমার নানাকে দেখেছি চার আনা বাকিতে লবণ কিনেছেন।
দোকানদার বলল, সেটা কোন্ জামানায়?
বাংলাদেশ জন্ম হওয়ার পরে।
সেতো বিয়াল্লিশ বছর আগের কাহিনী। হতদরিদ্রকে দানের ভঙ্গিতে চুল কোকড়ানো দাড়িতে মেহেদী মাখানো দোকানদার লাল কৌটা থেকে একটা চকলেট বের করে শিশুর হাতে দিয়ে বললেন, যাক চকলেট দিয়ে দিলাম। পয়সা পারলে দিয়েন না দিলে হাশরের ময়দানে ঠেকাব না।
চকলেটওয়ালার কথা শুনে আক্কেল গুড়–ম। খাইছে! দেখ ঠেলা, এক টাকার চকলেট দিয়ে আবার রোজকিয়ামত দেখাল। সে লোকের পয়সা এখনও দেয়া হয়নি। সুযোগ পেলে দিয়ে দেব নিয়ত আছে। দোকানদার লোকটা একটা নির্দিষ্ট স্থানেই দীর্ঘ দিন বসে।
বাদামওয়ালাকে তো তেমন কথা বলার সুযোগ নেই। সবাই ঘুরে ঘুরে ফেরি করে। কোনো স্থানে থিতু হয় না। একটু বসলেও ওরা ভবঘুরে। আজ এখানে তো কাল ওখানে।
এখন একটা জিনিস বড় মনে হচ্ছে। টাকার শক্তিই বড় শক্তি। কাছে নগদ একটাকা থাকলে দু’টাকা বাকি নেয়া যায়। সঙ্গে কানাকড়িও নেই। বাকি নেব কী করে? আর বেশি কিছু দাবি করা অসম্ভব। পাঁচ টাকার বাদাম একেবারে কিনে মনে হচ্ছে এ জীবনে মস্তবড় ভুল করেছি। বাবে বারে দু’টাকা দু’টাকা করে কিনে এক টাকা পকেটে রেখে দিলে ভালো করতাম। সেই একটাকা দুর্যোগকালীন মুহূর্তে আপদকালীন কাজে লাগানো যেত।
বিপদ মানুষকে বলে কয়ে আসে না। ছাত্রাবাসের এমদাদকে এক টাকার সদায়পাতি কিনে একটাকা জমা রাখতে দেখতাম। ওর থেকে জীবনশিক্ষা নেয়া উচিত ছিল।
আমার শিশুকালের এক ওস্তাদকে দেখেছি দু’ টাকার বুট-মুড়ি কিনে সকালের প্রাতঃরাশ সারছেন। লবণের চার আনা বাকি নানা লাল খাতায় সযতনে টুকে রাখছেন। এসব আমার চোখের সামেেন ভাসছে। বাচ্চাকে দোষ দিয়ে লাভ কী?

SHARE

Leave a Reply